সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে ‘মক্কা পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’ নামে নতুন সামরিক সহযোগিতা চুক্তি করেছে। মূলত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীসহ অন্যান্য বর্হিশক্রুর হাত থেকে সৌদি আরবের নিরাপত্তার জন্যই সামরিকভাবে শক্তিশালী পাকিস্তান ও তুরস্ককে কাছে টেনেছে সৌদি আরব। তবে ঐ চুক্তিতে পাকিস্তান ও তুরস্ক সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়নি। তাদের ভূমিকা থাকবে মূলত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি ও সৌদি ভূখণ্ডের প্রতিরক্ষায় সহায়তা করা।
সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমান এই ‘মক্কা পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’ কে ‘সম্মিলিত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা’ হিসেবে ব্যাখ্য করেন। একই সময়ে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী বাব আল-মানদাব প্রণালী থেকে হুতিদের সরিয়ে দেওয়ার অভিযান শুরু করে। এই অভিযানে সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনীর প্রায় ১০০টি সামরিক বিমান অংশ নেয়।
চুক্তি সাক্ষরের পর থেকেই বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছিলো, যদি সৌদি আরব আক্রান্ত হয় তাহলে পাকিস্তান আর তুরস্ক কি সামরিক সামরিক সহায়তা দেবে। তবে এই দুই দেশ সৌদি আরবের সাথে সহযোগিতার সিদ্ধান্ত নিলেও সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেবার প্রতিশ্রুতি করেনি।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ এই চুক্তি সম্পর্কে বলেছেন, এই প্রতিরক্ষা চুক্তিতে পাকিস্তান ও তুরস্ক সৌদি আরবকে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ ও নজরদারিতে সাহায্য করবে। সরাসরি সামরিক অভিযান পরিচালনা করবে সৌদি বাহিনী।

দীর্ঘদিন ধরেই সৌদি আরবে পাকিস্তানের প্রায় ৮ হাজার সেনা সদস্য রয়েছে। শুধু তাই নয় সেখানে পাকিস্তানের জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান, ড্রোন ও এইচকিউ-৯ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও মজুদ করে রেখেছে। ফলে সৌদি আরবকে তাৎক্ষণিক সামরিক সাহায্য করার ক্ষমতা পাকিস্তানের রয়েছে।
তবে তুরস্কের পরিস্থিতি ব্যতিক্রম। বিদেশের মাটিতে সেনাবাহিনী মোতায়েনের বিষয়ে দেশটির সাংবিধানীক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তুরস্কের সংবিধানের ৯২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিদেশে সেনা সদস্যদের সংসদের অনুমোদন প্রয়োজন রয়েছে।
এদিকে চুক্তি স্বাক্ষরের দুই মাস পরও তুরস্কের সংসদ এটি অনুমোদন করেনি। তবে তিন দেশের সামরিক জোটের কার্যক্রম ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। পাকিস্তানের অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল নুমান মাহমুদকে যৌথ সামরিক কমান্ডের প্রথম মহাসচিব করা হয়েছে।
সৌদি-ইয়েমেন যুদ্ধে পাকিস্তান কার্যত নিরপেক্ষ রয়েছে। ২০১৫ সালের দেশটি হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে সরাসরি অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
তবে পাকিস্তান তখন একটি শর্ত দিয়েছিল। সৌদি আরবের ভূখণ্ড বা ইসলামের পবিত্র স্থানগুলো হুমকির মুখে পড়লে দেশটি সৌদি আরবের পাশে দাঁড়াবে।

বর্তমান চুক্তিতেও সেই অবস্থানের প্রতিফলন দেখা যায়। পাকিস্তান সৌদি আরবে অবিস্থত ইসলামের পবিত্র স্থানগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পক্ষে। কিন্তু তারা ইয়েমেনের সাথে যুদ্ধে জড়াতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের রয়েছে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। অন্যদিকে, ইয়েমেন বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিলে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হতে পারে। তাই পাকিস্তান সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তা দিতে চাইলেও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে আগ্রহী নয়।
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিকে অনেকে ন্যাটোর প্রতিরক্ষা চুক্তির সঙ্গে তুলনা করছেন। ন্যাটো অনুচ্ছেদ ৫ অনুযায়ী, কোনো সদস্য রাষ্ট্র বর্হিশত্রু দ্বারা আক্রান্ত হলে অন্য রাষ্ট্রগুলো সম্মিলিতভাবে তাকে সহায়তা করবে। তবে তার অর্থ এটা নয় যে, প্রতিটি রাষ্ট্রকে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিতে হবে।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার পর ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫ প্রথমবারের মতো কার্যকর হয়। সদস্যদেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে বিভিন্নভাবে সহায়তা করতে এগিয়ে আসে।
আরও পড়ুন: হুথিদের বাব আল মান্দেব দখল বদলে যাবে যুদ্ধ ও বিশ্ব অর্থনীতির হিসাব
তবে মক্কা চুক্তি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। ন্যাটোর মতো এর যৌথ সামরিক বাহিনী নেই। ন্যাটোর মতো প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতাও এই জোটের নেই।
তুরস্কের জন্য আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য হলেও সৌদি আরব ন্যাটোর সদস্য নয়। কাজেই সৌদি আরবে তুর্কি সেনারা আক্রান্ত হলে ন্যাটোর প্রতিরক্ষা চুক্তি কার্যকর হবে না। সেই ক্ষেত্রে মক্কা চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এদিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনে বাব আল-মানদাব প্রণালী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের মোট বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ এই পথ দিয়ে পরিচালিত হয়। প্রণালীটি বন্ধ বা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়লে পণ্য পরিবহনে গুরুতর ক্ষতি হতে পারে। এতে একদিকে যেমন পরিবহন খরচ বাড়বে অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে চাপ তৈরি হবে।

এই পথ নিরাপদ রাখতে ইয়েমেনের সরকারি স্থলবাহিনী ও সৌদি বিমান বাহিনীর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তান ও তুরস্ক সৌদি আরবের তেলক্ষেত্র ও সামরিক স্থাপনা রক্ষায় সহায়তা করলে সৌদি বাহিনী ইয়েমেনে সামরিক অভিযান চালাতে বেশি মনোযোগ দিতে পারবে।
মক্কা পতিরক্ষা চুক্তির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ইয়েমেনের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া। ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী দেশটির উপকূলসহ রাজধানী সানার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার কথাও জানিয়েছে। হুতিরা ২০১৪ সাল থেকে সানা দখলে রেখেছে।
ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী সানা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করলে যুদ্ধ আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। পাকিস্তান এই ঝুঁকি এড়াতে চায়। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বলেছেন, মক্কা চুক্তি সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক। তবে সম্প্রতি পাকিস্তান থেকে এডেনে অস্ত্র পাঠানোর খবর প্রকাশিত হলে দেমটির প্রকৃত ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
পাকিস্তান বা তুরস্ক যদি ইয়েমেন সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে এবং ইয়েমেনে যদি তাদের সৈন্য হতাহত হয় তাহরে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠবে। তখন দুই দেশ কী পদক্ষেপ নেবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
মক্কা চুক্তি শুধু তিন দেশের নিরাপত্তার বিষয় নয়। এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও চীনের স্বার্থও জড়িত। সৌদি আরব হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি হামলা চালানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চেয়েছিল। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই অনুরোধে সম্মত হননি।
আরও পড়ুন: ট্রাম্পের চীন সফর
অন্যদিকে, পাকিস্তানকে ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টিও বিবেচনা করতে হচ্ছে। সৌদি আরবকে প্রতিরক্ষামূলক সহায়তা দেয়া এবং হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেওয়া এই দুইটি অবস্থানের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এই নীতি বজায় রাখতে পারলে পাকিস্তান দুই দেশের সঙ্গেই সম্পর্ক ভালো রাখার সুযোগ পাবে।
চীনের জন্যও বাব আল-মানদাব প্রণালী গুরুত্বপূর্ণ। এই পথ দিয়ে চীন এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পণ্য আমদানী-রপ্তানী করে। পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায় মক্কা চুক্তির আঞ্চলিক প্রভাব বেইজিংয়ের জন্যও গুরুত্বপূর্ন।
মক্কা চুক্তির মাধ্যমে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সামরিক সহযোগিতাযর এক নতুন দীগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। পাকিস্তানের আগে থেকেই সৌদি আরবে সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম পাঠিয়েছে। তবে তুরস্কের সেনা মোতায়েনের ক্ষেত্রে সংসদের অনুমোদন নিতে হবে।
চুক্তির সফলতা নির্ভর করবে তিনটি দেশের সহযোগিতা কতটা কার্যকর হয়, সৌদি আরবের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত করা যায় এবং ইয়েমেনের যুদ্ধ কতটা সীমিত রাখা সম্ভব হয়, তার ওপর।
সব মিলিয়ে, মক্কা চুক্তির মূল লক্ষ্য সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা জোরদার করা। পাকিস্তান ও তুরস্ক বিভিন্ন সহায়তা দেবে, তবে সরাসরি যুদ্ধে জড়াবে না। একদিকে সৌদি আরবের নিরাপত্তা রক্ষা এবং অন্যদিকে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে না পড়া- এই দুইটির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে পাকিস্তান ও তুরস্কের জন্য বড় পরীক্ষা।
আরও পড়ুন: গ্রেপ্তর-অবরোধ-বিক্ষোভে উত্তাল দিল্লী: মোদির জন্য অগ্নী পরীক্ষা


