সম্প্রতি সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের বিমানবন্দরে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা একটি প্রাণঘাতি ক্ষেপনাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এই হামলায় ১৩ জন নিহত এবং শত শত মানুষ আহত হন। এটা ছিলো ইরানে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সৌদি আরবের মাটিতে হুতিদের সবচেয়ে বড় হামলা।
এই হামলাটি এমন একটি সময়ে চালানো হলো যখন সৌদি আরব তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর একটি বড় সম্মেলনের আয়োজন করছে। এই হামলার পর হুথিরা আরও কয়েকটি প্রাণঘাতী হামলা চালিয়েছে।
এসব হামলার মধ্যে দিয়ে ইয়েমেনের এই গোষ্ঠীটি তাদের “ইরানি প্রক্সি” পরিচিতি পরিবর্তন করে সকল মনোযোগ সৌদি আরবের বিরুদ্ধে চলমান তাদের লড়াইয়ের দিকে ঘুরিয়ে দিচ্ছে।
হুথিদের এসব হামলা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার লক্ষণ বলে মনে হচ্ছে। একইসাথে আমরা এটাও মনে করতে পারি যে, কীভাবে ইয়েমেনে এক দশকব্যাপী চলা গৃহযুদ্ধ দেশটির সীমানা পেরিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলো আক্রান্ত করছে।

হুতিদের অবস্থান ও বয়ান
২০০৪ সালে ইয়েমেনে হুতি আন্দোলন প্রথমে একটি সশস্ত্র রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এরপর তারা সৌদি সমর্থিত কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে গৃহযুদ্ধে শুরু করে। বর্তমানে ইয়েমেনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ভূখণ্ড এবং দুই-তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠী হুতিদের নিয়ন্ত্রণে আছে।
এই দীর্ঘ সময়ে তারা ইয়েমেনের সবচেয়ে শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। একই সাথে গড়ে তুলেছে দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের বিশাল ভান্ডার।
আরও পড়ুন: মক্কা চুক্তি: সৌদির পাশে পাকিস্তান-তুরস্ক, তবে সরাসরি যুদ্ধে নয়
ইয়েমেনের যুদ্ধের শুরু থেকেই তাদের প্রতিপক্ষ দেশটির সরকার এবং অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক তাদের ইরানের একটি ‘প্রক্সি’ বা অনুগত গোষ্ঠী হিসেবে ব্যাখ্যা করে আসছে।
তবে এটাও সত্যি যে, হুথিরা দীর্ঘদিন ধরে তেহরানের সাথে ব্যাপকভাবে একাত্মতা প্রকাশ করেছে এবং আঞ্চলিক বিরোধের জায়গাগুলোতে তারা যৌথভাবে কাজ করেছে।
একই সঙ্গে, হুতি আন্দোলনের বিবর্তন ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং দেশটির ঐতিহাসিক লড়াইয়ের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। এটাই হুতি বিদ্রোহীদের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ঠ প্রমাণ করে।
তবে ২০২৬ সাল থেকে হুতি নেতৃত্ব যেভাবে তাদের সামরিক তৎপরতাকে পচিালনা করছে যাতে এটা মনে না হয় যে, এটি ইরান থেকে পরিচালিত হচ্ছে। তাদের রাজনৈতিক বয়ান ও সংগ্রাম মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন ধারার সূচনা বলে মনে হচ্ছে।
এই পরিবর্তনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মাধ্যমে হুতি নেতারা তাদের রাজনৈতিক কৌশলের বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেন।

দেরিতে হলেও যুদ্ধে প্রত্যাবর্তন
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন ইরানে হামলা চালায়, তখন অনেক বিশ্লেষক মনে করেছিলেন যে হুতিরা দ্রুত এই সংঘাতে প্রবেশ করবে।
কারণ এর আগে গাজায় ইসরায়েলের আগ্রাসনের পর ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে তারা ইসরাইলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছিলো।
এক সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে হুতিরা ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে লড়াই করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। তাদের এই পদক্ষেপ এমন একটা সময় শুরু হলো যখন অনেক মুসলিম দেশ ফিলিস্তিনিদের দুর্দশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিলো। হুতিদের এই ভূমিকা মুসলিম বিশ্বে তাদের জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে দেয়।
কিন্তু ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার পর হুতিরা কয়েক মাস ধরে চুপ করে ছিলো। ২০২৬ সালের জুলাই মাসে ইরানি নীতি-নির্ধারকেরা বাব আল-মানদেব প্রণালী সামুদ্রিক চলাচলের জন্য বন্ধ করার যে নির্দেশ দিয়েছিলেন, হুতি নেতারা তা উপেক্ষা করেছেন বলেই মনে হয়েছিল।
হুতিরা তেহরানের আদেশে সবসময় মেনে কাজ করবে- এমনটা ধরে নেওয়া ইয়েমেনি ইতিহাস এবং হুথি আন্দোলন ভুলভাবে বোঝার ফলাফল।
ফিলিস্তিনিদের পক্ষে কাজ করাকে আরব ও আঞ্চলিক জনগণের কাছে মুসলিম ভাতৃত্ববোধ হিসেবে তুলে ধরা সহজ ছিল।
আরও পড়ুন: হুথিদের বাব আল মান্দেব দখল বদলে যাবে যুদ্ধ ও বিশ্ব অর্থনীতির হিসাব
কিন্তু একদিকে অনারব আবার অন্যদিকে শিয়া মতালম্বি ইরানের পক্ষে কাজ করা আরব ইয়েমেনের হুতিদের ব্যাখ্যা করা বেশ সমস্যাজনক ছিলো।
গত আগস্ট মাসে আঞ্চলিক সংঘাতে হুতিদের পুনরায় আগমন ঘটে। এই সময় তাদের রাজনৈতিক বয়ানেও পরিবর্তন ঘটে।
তাদের পুরনো রাজতৈকি বয়ান যা কিনা গড়ে উঠেছিলো তাদের দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরবকে কেন্দ্র করে।
যদিও তাদের এই পদক্ষেপের কৌশলগত ফলাফল শেষ পর্যন্ত ইরানকে নিজস্ব আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংঘাতে সুবিধা করে দিয়েছে।
তবুও হুতিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে তাদের সামরিক অভিযানকে প্রধানত আত্মরক্ষা বা ‘জাতীয় প্রতিরক্ষা’ হিসেবেই দেখছে।

পূর্ববর্তী একটি বিমানবন্দর বোমাহামলা
২০২৬ সালের গ্রীষ্মে, একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। হুথিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা থেকে তেহরানগামী বিমান পরিচালনা করতে থাকে। এই জন্য তারা প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত বিমান বন্দরটি সচল করে।
হুতিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা রাজধানী সানায় অবস্থিত এই বিমানবন্দরটি ইসরায়েলের হামলার পর ২০২৪ সাল থেকে বন্ধ ছিল।
এর অর্থ হলো, হুতি-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে প্রবেশ ও প্রস্থান তাদের প্রতিপক্ষেরদের আরোপিত বিধিনিষেধের অধীন থাকা।
বিমানবন্দর বন্ধ থাকায় হুথিদের কেবল বেসামরিক নাগরিকদের যাতায়াতই বন্ধ করেনি, বরং তাদের প্রশিক্ষণ ও সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রেহের সুযোগও সীমিত করেছিল।
আরও পড়ুন: যুক্তরাজ্য কি ভেঙে যাওয়ার পথে?
গত ১৩ জুলাই সৌদি সামরিক বাহিনী সানা বিমানবন্দরে একটি বিমান অবতরণের সময় রানওয়েতে বোমাহামলা চালায়। এই ঘটনায় হুতিরা নতুন করে রিয়াদের সাথে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে।
হুতিদের বর্তমান কৌশলটি ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন বোমাহামলা ও অবরোধের মতো, এই ঘটনা ইয়েমেনে বছরের পর বছর ধরে গৃহযুদ্ধ টেনে এনেছে।
এবার হুতিরা সৌদি আরবের বন্দর এবং তেল রফতানিকারক অবকাঠামোতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করছে। এর মাধ্যমে তারা সৌদি আরবের উপর একই ধরণের অবরোধ আরোপের চেষ্টা করছে।

সৌদির জন্য হুতিদের পাল্টা আঘাত
হুতিদের এই নতুন কৌশল দুটি উদ্দেশ্যে কাজ করে। প্রথমত, এটি হুতিদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় অর্থনৈতিক সংকটের দায়, ব্যর্থতা ও দুর্নীতির ওপর জনগণের দৃষ্টি না ফেলে সৌদি-অবরোধের দিকে ঠেলে দেওয়ার সুযোগ দেয়। দ্বিতীয়ত, এটি অঞ্চলজুড়ে সংঘাত বাড়াবার একটি যুক্তি তৈরি করে।
২০২৫ সালের অক্টোবরে গাজায় আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতির পর হুতি নেতৃত্ব লোহিত সাগরে ইসরায়েল-সংযুক্ত জাহাজগুলোতে হামলা বন্ধ করেছিল।
একইভাবে, মে ২০২৫-এ ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে সমঝোতার পর তারা মার্কিন জাহাজে হামলা স্থগিত করে।
সেপ্টেম্বরে ২০২৬-এ ওমানে মার্কিন কূটনীতিকরা হুতি প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠক করেন বলে জানা যায়।
তবে সৌদি আরবের ক্ষেত্রে হুতিরা খুব একটা নমনীয়তা দেখায়নি। রিয়াদ এমনিতেই হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্রের হামলার মুখে পড়ছিলো।
ফলে, সৌদি বিমানবন্দরে প্রচন্ড হামলার মাধ্যমে হুতি নেতৃত্ব সৌদি আরবকে বেশ বিপদে ফেলেছে।
সেপ্টেম্বরের শুরুতে হুথিরা বাব আল-মানদেব প্রণালীতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। এর মাধ্যমে হুতিদের প্রতিশোধমূলক কৌশল আরও জোরদার হয়।
এতে লোহিত সাগরে সৌদি আরবের সমুদ্র বাণিজ্যের ওপর হুতিরা প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা পায়।
রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলা প্রমাণ করে, ড্রোন এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হুতিদের সৌদি আরবের বেশিরভাগ অংশে হামলা চালানোর ক্ষমতা দিয়েছে।
সৌদি আরবের বেসামরিক অবকাঠামো, বিশেষ করে বিমানবন্দরগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হুতিদের প্রতিশোধমূলক আক্রমণের যৌক্তিকতাকেই তুলে ধরে।
হুতিদের এই ক্রমবর্ধমান আগ্রাসী অভিযানে অঞ্চলটি ক্রমাগত সংঘাতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, এতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোকে আবারও আঞ্চলিক সংঘাতে টেনে আনবে কিনা তা একটি বড় প্রশ্ন।
তবে এর কোনো কিছুই পরও গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধে ক্লান্ত ইয়েমেনি জনগণ। তাদের দুর্দশার কোনো সীমা পরিসীমা নেই। যে যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে দরিদ্র দেশের ভঙ্গুর অবকাঠামোকে আরও ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে।
আরও পড়ুন: গ্রেপ্তর-অবরোধ-বিক্ষোভে উত্তাল দিল্লী: মোদির জন্য অগ্নী পরীক্ষা
Source: Reuters
অনুবাদ: News360


