হুথিদের বাব আল মান্দেব দখল বদলে যাবে যুদ্ধ ও বিশ্ব অর্থনীতির হিসাব

Share post:

Date:

যুদ্ধ শুধু মাত্র যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটা ছড়িয়ে পড়ে সমুদ্রপথে, তেলের বাজারে, বীমার খরচে পোশাক কারখানার উৎপাদন ব্যয়েও, এমনকি বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের দৈনন্দিন তরকারীর বাজারেও। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে একটি বড় ধরনের মোড় পরিবর্তন হয়েছে। ইয়েমেনের
ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরের পেরিম দ্বীপ ও বাব আল মান্দেব প্রণালির দখল নিয়েছে। এটা হুথিদের শুধুমাত্র একটি সামরিক বিজয় নয়। আসল বিষয় হলো—পেরিম দ্বীপটি বাব আল মান্দেব প্রণালির একেবারে প্রবেশমুখে অবস্থিত। বাবেল মান্দেব হলো লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থল, সুয়েজ খালের দক্ষিণ দরজা। অর্থাৎ এমন একটি স্থানের দখল নিয়েছে যেখান থেকে সারা দুনিয়ার অর্থনীতি স্থবির করে দেয়া সম্ভব।

মানচিত্রে বাব আল মান্দেব প্রণালি, পেরিম দ্বীপ ও ইয়েমেনের উপকূলের অবস্থান। মানচিত্র: বিবিসি।

দুই প্রণালি, এক সমীকরণ

পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ। অন্যদিকে বাব আল মান্দেব হলো এশিয়া-ইউরোপ বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ। ইতিমধ্যে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে জ্বালানি তেলের বাজারে চাপ সৃষ্টি করেছে। ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হুথিরা এখন বাব আল মান্দেব দখল করে বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করার দিকেই এগিয়ে চলেছে।
কোনো সন্দেহ নেই যে এই ঘটনা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের উপর প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি করবে। শুধু তাই নয় তেলের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে এই ঘটনা চাপ সৃষ্টি করতে পারে সারা দুনিয়ার অর্থনীতিতে।

শহরের সড়কে অস্ত্রধারী ব্যক্তিদের পদযাত্রা।

এখন বিশ্ববাণিজ্যে কী হবে?

বাব আল মান্দেব অস্থিতিশীল হলে সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসবে এশিয়া-ইউরোপ বাণিজ্যে। এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ লোহিত সাগরে প্রবেশ করে সুয়েজ খালের মাধ্যমে ইউরোপে পৌঁছায়। কিন্তু নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়লে শিপিং কোম্পানিগুলোর সামনে বিকল্প পথ হলো আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে যাওয়া। তবে এই পথ অনেক দীর্ঘ। এর ফলে বাড়বে জাহাজের যাত্রার সময়, জ্বালানি খরচ, জাহাজভাড়া, সমুদ্রবীমার প্রিমিয়াম, পণ্য পরিবহনের ব্যয়। ২০২৩ সাল থেকেই হুথিদের হামলার কারণে বহু আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি লোহিত সাগর এড়িয়ে আফ্রিকা ঘুরে চলাচল করেছে। নতুন করে হুথিদের সামরিক অবস্থান শক্তিশালী হলে সেই সংকট আরও গভীর হতে পারে। আর এর সঙ্গে যদি হরমুজেও জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতির সামনে তৈরি হবে এক অভূতপূর্ব দ্বিমুখী চাপ। হরমুজে জ্বালানি সরবরাহের ঝুঁকি, বাব আল মান্দেবের বাণিজ্যপথের ঝুঁকি।

আগ্নেয়াস্ত্র হাতে একদল সশস্ত্র ব্যক্তি।

শুরু হবে নতুন মূল্যস্ফীতি

বাব আল মান্দেবের এই সংকটের সবচেয়ে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখা যাবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। অতি দ্রুত এই সংকটে তেল ও পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়ে যাবে। তেল ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধির অর্থ হলো প্রতিটি পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাবে। রয়টার্সের হিসাবে, ইতিমধ্যেই
অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০৭ ডলারের ওপরে উঠে গেছে।সংকটের সমাধান না হলে এই মূল্য বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে। তেলের দাম বাড়লে শুধু পেট্রোল-ডিজেলের দাম বাড়ে না। বাড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পের কাঁচামাল, পরিবহন ও পণ্য উৎপাদনের খরচ। সবচেয়ে দুশ্চিন্তার বিষয় হলো জীবনযাত্রার ব্যায় বৃদ্ধি পাবে। দুনিয়া জুড়ে দরিদ্র ও মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রার মান পড়ে যাবে। তারা আরও দরিদ্র হবে।
এর ফলে একটি চক্র তৈরি হয়—
যুদ্ধ → তেলের দাম বৃদ্ধি → পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি → মূল্যস্ফীতি → সুদের হার কমানোর সুযোগ কমে যাওয়া → বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধিতে চাপ।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ তখন আর শুধু আঞ্চলিক সমস্যা হিসেবে নেই; এটি এখন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটে পরিণত হয়েছে।

সমাবেশে অস্ত্র হাতে ও মুষ্টিবদ্ধ হাত উঁচিয়ে অংশগ্রহণকারীরা।

যুদ্ধে ইরানের নতুন কৌশল?

বাব আল মান্দেবের এই সংকট বর্তমান যুদ্ধের ময়দানে ইরানের জন্য একটি বড় সুযোগ সৃষ্টি করেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান প্রতিটি ফ্রন্টে সরাসরি যুদ্ধ না করেও যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের উপর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ইরান একদিকে হরমুজে সামরিক সক্ষমতা ব্যবহার করতে পারে, অন্যদিকে হুথিরা বাবেল মান্দেবে চাপ তৈরি করতে পারে। এই সংকট মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্রকে আরও আগ্রাসী হতে হবে। হয়ত ট্রাম্প প্রশাসনকে এখন একই সঙ্গে পারস্য উপসাগর, লোহিত সাগর, ইয়েমেন, সৌদি আরব ও অন্যান্য মিত্রের নিরাপত্তার জন্য কাজ করতে হবে। কিন্তু এই কৌশলে
যথেষ্ট ঝুঁকি আছে। হুথিদের দমন করতে যদি সৌদি আরব বা অন্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ করে, তাহলে সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়বে।

যুক্তরাষ্ট্রের সামনে তিন পথ

ওয়াশিংটনের সামনে এখন তিনটি কঠিন পথ।
প্রথমত, হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে যাওয়া।
দ্বিতীয়ত, সৌদি আরব ও অন্যান্য আঞ্চলিক মিত্রের মাধ্যমে যৌথ প্রতিরোধ গড়ে তোলা।
তৃতীয়ত, ইরানের সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে কূটনৈতিক সমঝোতার পথ খোঁজা।
প্রথম পথটি সামরিকভাবে কার্যকর হলেও এর ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। কারণ ইয়েমেনে বড় আকারের অভিযান শুরু হলে যুদ্ধের নতুন ফ্রন্ট খুলতে পারে। ইরান সমর্থিত প্রক্সিরা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের উপর হামলা বৃদ্ধি করতে পারে। অন্যদিকে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ তেলের দাম ও বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতিকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে, যেখানে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ব্যয় আরও বাড়বে।

পিকআপে দাঁড়িয়ে অস্ত্র উঁচিয়ে ধরেছেন একদল সশস্ত্র ব্যক্তি।

বাংলাদেশের জন্য সতর্কবার্তা?

বাংলাদেশের থেকে ইয়েমেন হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে হলেও বৈশ্বিক বাণিজ্যের মানচিত্রে সেই দূরত্ব খুব বেশি নয়। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের অন্যতম প্রধান বাজার ইউরোপ। সেই বাজারে পণ্য পাঠানোর সমুদ্রপথ হলো সুয়েজ বাব আল মান্দেব প্রনালি।
দীর্ঘ সময় ধরে এই পথ অস্থিতিশীল থাকলে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের কয়েকটি সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে। জাহাজভাড়া বাড়বে। পণ্য পৌঁছাতে বেশি সময় লাগবে। বীমা খরচ বাড়বে।ক্রেতাদের ডেলিভারি সময় নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হবে।

বাংলাদেশের পোশাকশিল্প এমনিতেই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ও বাজারের দুর্বল চাহিদার মুখে রয়েছে। ফলে অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় রপ্তানিকারকদের লাভের মার্জিনে চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
অন্যদিকে তেলের দাম বাড়লে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়, পরিবহন ব্যয় ও উৎপাদন খরচও বাড়বে। ফলে সংকটটি আসতে পারে দুই দিক থেকে—
রপ্তানি ব্যয় বাড়বে, আমদানি ব্যয়ও বাড়বে। এর সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং মূল্যস্ফীতি যুক্ত হলে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে।

ছোট দ্বীপ, বড় যুদ্ধ

পেরিম দ্বীপ মানচিত্রে খুব ছোট একটি ভূখণ্ড। কিন্তু ভূরাজনীতিতে তার গুরুত্ব বিশাল। শুধুমাত্র অবস্থানগত কারণে ভূরাজনীতিতে তার গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। পেরিম দ্বীপটি বাব আল মান্দেব প্রনালির ঠিক মাঝ বরাবর অবস্থিত। এখানে খুব হালকা অস্ত্র সজ্জিত হয়ে বিশাল যুদ্ধ জাহাজকেও ঠেকিয়ে দেয়া যায়। বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, এটি খুব সংর্কীণ কয়েকটি সমুদ্রপথের ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল। ছোট্ট হরমুজ প্রণালির সমস্যা হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার অস্থির হয়ে পড়ে। বাব আল মান্দেবে সমস্যা হলে এশিয়া-ইউরোপ বাণিজ্য অস্থির হয়ে ওঠে। আর একই সঙ্গে এই দুটি স্থানে একই সময়ে সংকট তৈরি হলে তার আঘাত পৌঁছে যায় বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি স্তরে। এ কারণেই হুথিদের পেরিম দ্বীপে অগ্রযাত্রা শুধু ইয়েমেনের সামরিক মানচিত্রের পরিবর্তন নয়। এটি ইরান যুদ্ধের একটি সম্ভাব্য নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত। যদি হরমুজ ও বাব আল মান্দেব—দুই সামুদ্রিক করিডরই দীর্ঘ সময়ের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বিশ্ববাণিজ্যের শ্বাসনালির ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। আর তখন যুদ্ধের মূল্য শুধু ইরান, যুক্তরাষ্ট্র বা ইয়েমেনকে দিতে হবে না। মূল্য দিতে হবে ইউরোপের ভোক্তাকে,
এশিয়ার রপ্তানিকারককে, তেলের বাজারকে—এমনকি বাংলাদেশের একটি পোশাক কারখানাকেও।
হরমুজে আগুন জ্বললে তার উত্তাপ বাব আল মান্দেবে পৌঁছায়। আর বাব আল মান্দেবে সমুদ্রপথ অশান্ত হলে তার ঢেউ এসে লাগে ঢাকার অর্থনীতিতেও।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সাবস্ক্রাইব

spot_img

সম্পাদকের নির্বাচিত

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

সবার আগে বাংলাদেশ’: ক্রিয়েটিভ উইংসের বিশেষ আলোকচিত্র প্রতিযোগিতার ফলাফল

প্রেস রিলিজ ক্রিয়েটিভ উইংসের আয়োজনে 'সবার আগে বাংলাদেশ' শিরোনামের আলোকচিত্র...

ক্রিয়েটিভ উইংসের আয়োজনে ন্যাশনাল ফটোগ্রাফি প্রতিযোগিতা আহ্বান

১৯ আগস্ট সারা বিশ্বে ওয়ার্ল্ড ফটোগ্রাফি ডে পালিত হয়।...

প্রেস রিলিজ: এইউডব্লিউ-এর প্রথম হিউম্যানিটিজ কনফারেন্স উদ্বোধন

চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ, ১০ জুলাই ২০২৬ চট্টগ্রামের হোটেল আগ্রাবাদে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি...

সরদারের জন্মশতে

‘কৃষকের সন্তান সরদার ফজলুল করিম দেশের কৃষিজীবী ও শ্রমজীবী...