ইনকা সভ্যতা ও ইনকাদের অজানা গল্প

Share post:

Date:

দ্বিতীয় পর্ব

অনুবাদ : কায়জার কাবির

(স্পেনের সোনার লোভই শেষ পর্যন্ত ইনকা সাম্রাজ্যের পতন ডেকে এনেছিল )

ফ্রান্সিসকো পিসারো (Francisco Pizarro)-র নেতৃত্বে স্প্যানিশ কনকুইস্তাদোররা ১৫৩২ সালে ইনকা সাম্রাজ্য দখল করে। তারা ইনকা শাসকদের মধ্যকার অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়েই এই বিজয় অর্জন করেছিল। কিন্তু স্প্যানিশদের দখলের পরপরই পুরো ইনকা সাম্রাজ্যজুড়ে একের পর এক বিদ্রোহ শুরু হয়।

বেতানসোসের বর্ণনা অনুযায়ী, সবচেয়ে তীব্র বিদ্রোহগুলোর একটি হয়েছিল আনকোকাগুয়া-তে। তিনি এটিকে বর্ণনা করেছেন একটি পবিত্র দুর্গ-নগরী হিসেবে, যা কুসকোর ঠিক দক্ষিণে একটি উঁচু মালভূমির মাথায় অবস্থিত ছিল। এই বিদ্রোহ দমন করতে পিসারোর ভাই একদল স্প্যানিশ সৈন্য নিয়ে দুর্গ আক্রমণ করেন। কিন্তু ইনকা যোদ্ধারা দুর্গে ওঠার একমাত্র সরু পথটি আটকে দেয়। তখন স্প্যানিশরা সরাসরি হামলা না করে দুর্গটিকে ঘিরে অবরোধ শুরু করে। তারা খাবার আর পানির সব পথ বন্ধ করে দেয়।

আন্দিজের খাড়া ঢালে ধাপে ধাপে উঠে গেছে মাচু পিচ্চুর পাথরের ঘর, প্রাঙ্গণ ও কৃষিসোপান। পাহাড়কে নগর ও পবিত্র ভূদৃশ্যে রূপ দেওয়ার ইনকা দক্ষতার সবচেয়ে পরিচিত নিদর্শন এটি; দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত টা’ক্রাচুলো আয়তনে এর প্রায় চার গুণ। তথ্যসূত্র: National Geographic

অবশেষে যখন তারা দুর্গের প্রতিরক্ষা ভেঙে ভেতরে ঢুকতে সক্ষম হয়, তখন মরিয়া হয়ে পড়া অনেক ইনকা বাসিন্দা বন্দি হওয়ার বদলে দুর্গের খাড়া পাহাড়চূড়া থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন।

বেতানসোসের পাণ্ডুলিপি থেকে পাওয়া এই নতুন সূত্র হাতে নিয়ে গবেষক ইয়োহান রাইনহার্ড (Johan Reinhard) পেরুতে আসেন। সেখানে আলিসিয়া কিরিতা (Alicia Quirita) তাঁকে এমন কয়েকটি প্রত্নস্থলে নিয়ে যান, যেগুলো তাঁর মতে আনকোকাগুয়া হতে পারে। টা’ক্রাচুলো (T’aqrachullo) নিজের চোখে দেখার পর রাইনহার্ডের দৃঢ় বিশ্বাস হয়, জায়গাটির ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য স্প্যানিশ বিজেতাদের বর্ণনার সঙ্গে অসাধারণভাবে মিলে যায়।

এরপর ১৯৯৮ সালে তিনি Andean Past সাময়িকীতে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, তিনি সম্ভবত ঔপনিবেশিক যুগের লেখালেখিতে উল্লেখিত “সবচেয়ে রহস্যময় ইনকা প্রত্নস্থলগুলোর একটি” শনাক্ত করতে পেরেছেন। তবে আলিসিয়া কিরিতা তখনও পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারেননি।

এরপর আরও ৩১ বছর কেটে যায়। অবশেষে আরেকটি অবিশ্বাস্য প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারের পর তিনি—এবং এই ক্ষেত্রের আরও অনেক গবেষক—টা’ক্রাচুলোকে একেবারে নতুন দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করেন। যা কিনা, সোনা-রূপার সেই সিকুইনগুলো উদ্ধারের পর টা’ক্রাচুলো (T’aqrachullo)-তে খনন প্রকল্প যেন নতুন গতি পায়। হঠাৎ করেই সবাই বুঝতে পারে, এই প্রত্নস্থলের গুরুত্ব পেরুর সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের হয়তো আগে থেকে যা ভাবা হতো, তার চেয়েও অনেক বেশি।

এই খননকাজের নেতৃত্বে ছিলেন অভিজ্ঞ পেরুভিয়ান প্রত্নতাত্ত্বিক এমারসন পেরেইরা (Emerson Pereyra)। তিনি পেরুর বিভিন্ন প্রত্নস্থলে কাজ করেছেন, এমনকি মাচু পিচ্চু (Machu Picchu)-তেও টানা ১২ বছর খননকাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর।

তবে, মন্ত্রণালয় তাঁকে এখানে দায়িত্ব দেওয়ার আগে টা’ক্রাচুলো নামটাই তিনি কখনও শোনেননি। আর গবেষক ইয়োহান রাইনহার্ড (Johan Reinhard)-এর সেই তত্ত্ব—যে টা’ক্রাচুলোই হয়তো হারিয়ে যাওয়া আনকোকাগুয়া (Ancocagua)—সেটার কথাও তাঁর জানাই ছিল না। কারণ রাইনহার্ডের গবেষণাপত্রটি ইন্টারনেটের একেবারে শুরুর যুগে ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়েছিল, ফলে পেরুর খুব কম প্রত্নতাত্ত্বিকই সেটি পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন।

২০২৩ সালে, পেরেইরার দল টা’ক্রাচুলো-র আরেকটি অবিশ্বাস্য রহস্য উন্মোচন করে। তারা, এমন একটি বিশাল স্থাপনার ভিত্তি খুঁজে পায়, যেটিকে তারা একটি বৃহৎ মন্দির বলে মনে করছে। গবেষকদের ধারণা, মন্দিরটি একবারে তৈরি হয়নি; বিভিন্ন সময়ে ধাপে ধাপে এটি নির্মাণ করা হয়েছে। এর সবচেয়ে পুরোনো অংশের বয়স প্রায় দুই হাজার বছর। অর্থাৎ এই মন্দির শুধু ইনকারাই ব্যবহার করেনি, তাদেরও আগে কোলা (Qolla) এবং ওয়ারি (Wari) সভ্যতার মানুষও এখানে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করত।

মন্দিরের ভেতরে তারা একটি আচারিক ঝরনার (ceremonial fountain) ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পান। সেখানে একটি পাথরের তৈরি পাত্র ছিল, যেখানে পুরোহিতরা দেবতাদের উদ্দেশে উৎসর্গ নিবেদন করতেন।

আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, সেই পাথরের গাঁথুনির ফাঁকেই পেরেইরার দল সোনার ছোট ছোট খণ্ড (gold nuggets) খুঁজে পায়। এ ছাড়া ওয়ারি যুগের একটি সমাধি থেকে উদ্ধার হয় অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তৈরি লামা আকৃতির ছোট ছোট মূর্তি। পাশাপাশি পাওয়া যায় সোনার পাত এবং নীলচে-সবুজ রঙের খনিজ ক্রাইসোকোলা (Chrysocolla) দিয়ে তৈরি পুমা (Puma)-র আকৃতির অলংকার।

একসময়ের সেই সাধারণ চারণভূমি থেকে একের পর এক এমন অসাধারণ নিদর্শন বেরিয়ে আসতে দেখে প্রত্নতাত্ত্বিকরা আবারও বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান।

পেরেইরা বলেন…

“মাচু পিচ্চুতে কাজ করার সময়ও আমি এমন কিছু কখনও দেখিনি, যা টা’ক্রাচুলোতে আমরা পেয়েছি। সত্যিই এটা অবিশ্বাস্য।”

আজ এমারসন পেরেইরা (Emerson Pereyra) জানেন যে টা’ক্রাচুলো (T’aqrachullo)-র সঙ্গে হারিয়ে যাওয়া আনকোকাগুয়া (Ancocagua) নগরীর সম্ভাব্য সম্পর্ক রয়েছে। তাঁর বিশ্বাস, নতুন আবিষ্কৃত মন্দিরটি এই তত্ত্বের পক্ষে আরও জোরালো প্রমাণ যোগ করেছে।

স্প্যানিশ ইতিহাসলেখক লেওন (Pedro Cieza de León) পেদ্রো সিয়েসা দে তাঁর বর্ণনায় লিখেছিলেন, আনকোকাগুয়ার মন্দির কনকুইস্তাদোরদের সময়েও “অত্যন্ত প্রাচীন এবং গভীর শ্রদ্ধার পাত্র” ছিল। অনেক গবেষকের মতে, এই মন্তব্য থেকে বোঝা যায় যে মন্দিরটি ইনকাদের আগের ওয়ারি (Wari) সভ্যতার সময় থেকেই ব্যবহৃত হয়ে আসছিল।

তারপরও, এতেই শেষ নয়।

সবুজ পাহাড়ের গভীর গিরিখাত দিয়ে বয়ে চলেছে আপুরিমাক নদী। নদীর প্রায় ৩০০ ফুট ওপরে বাতাসে উন্মুক্ত এক মালভূমিতে দাঁড়িয়ে টা’ক্রাচুলো—এমন দুর্গম অবস্থানই প্রাচীন বসতিটিকে দীর্ঘদিন বাইরের দৃষ্টি থেকে আড়াল করে রেখেছিল। তথ্যসূত্র: National Geographic

পেরেইরার খননকাজে এমনও কিছু প্রমাণ মিলেছে, যা থেকে মনে হয় টা’ক্রাচুলো-র শেষ দিকের ইনকা বাসিন্দারা হয়তো যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, কিংবা ইতোমধ্যেই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিলেন। গবেষকরা সেখানে যা খুঁজে পান— গোলাকার পাথরের তৈরি নিক্ষেপাস্ত্রের মজুত, অবসিডিয়ান পাথরের তৈরি বর্শার ফলক, এমনকি মানুষের কঙ্কালও, যেগুলোতে সহিংস আঘাতের স্পষ্ট চিহ্ন রয়েছে। পেরেইরার আরও মনে আছে, খননকাজের শুরুর দিকে তারা দেখেছিলেন মালভূমিতে ওঠার পথটি ছয় থেকে দশ ফুট উঁচু পাথরের স্তূপে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে আছে। তিনি বলেন, “শুরুতে আমরা ভেবেছিলাম সিঁড়িগুলো হয়তো প্রাকৃতিকভাবেই ধসে পড়েছিল।”

কিন্তু এখন তিনি এবং তাঁর সহকর্মীরা মনে করেন, ওই পাথরের স্তূপ আসলে দুর্ঘটনাবশত তৈরি হয়নি। সম্ভবত ইনকারাই ইচ্ছাকৃতভাবে প্রবেশপথগুলো ধ্বংস করে দিয়েছিল, যাতে স্প্যানিশ সৈন্যরা সহজে দুর্গে ঢুকতে না পারে। তবে একটি বিষয় এখনও রহস্যই রয়ে গেছে… পেরেইরা টা’ক্রাচুলো-তে এখনো পর্যন্ত স্প্যানিশদের উপস্থিতির সরাসরি কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ খুঁজে পাননি। তাহলে যদি সত্যিই টা’ক্রাচুলোই সেই আনকোকাগুয়া হয়ে থাকে, তাহলে কী ঘটেছিল?!

স্প্যানিশ কনকুইস্তাদোররা কি শুধু মূল্যবান জিনিস লুট করে চলে গিয়েছিল, তাই তাদের উপস্থিতির তেমন কোনো চিহ্ন রয়ে যায়নি? নাকি, ইনকারাই নিজেরাই স্প্যানিশদের হাতে শহরটি তুলে না দিতে সেটি ধ্বংস করে দিয়েছিল? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর হয়তো একদিন মিলবে। তবে খুব শিগগিরই নয়…

পেরেইরার নেতৃত্বে খননকাজ ২০২৪ সালে শেষ হয়।

ততদিনে প্রত্নতাত্ত্বিকরা বিশাল এই প্রত্নস্থলের অর্ধেকের একটু বেশি অংশ পরীক্ষা করতে পেরেছিলেন। বাকি অংশ এখনো একেবারেই অক্ষত অবস্থায় রয়ে গেছে।

ইচ্ছে করেই সেই অংশ ভবিষ্যতের গবেষকদের জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে, যাতে একদিন আরও উন্নত প্রযুক্তি, আধুনিক খননপদ্ধতি এবং নতুন বিশ্লেষণ কৌশল ব্যবহার করে সেখানে আবার গবেষণা চালানো যায়।

এদিকে এখন পেরুর সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের প্রধান লক্ষ্য হলো একসময়ের ঝোপঝাড়ে ঢাকা এই প্রত্নস্থলটিকে এমনভাবে সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার করা, যাতে ভবিষ্যতে পর্যটকদের জন্য এটি উন্মুক্ত করা যায়।

টা’ক্রাচুলো এখনো তার সব রহস্য উন্মোচন করেনি। তবে সামনে হয়তো এমন এক সময় আসছে, যখন এই বিস্ময়কর ইতিহাস আর শুধু গবেষকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না—পৃথিবীর আরও অনেক মানুষ এসে নিজের চোখে সেই রহস্যের সাক্ষী হতে পারবেন।

গত নভেম্বরে, ৮২ বছর বয়সী ইয়োহান রাইনহার্ড (Johan Reinhard) এবং ৫৯ বছর বয়সী, আলিসিয়া কিরিতা (Alicia Quirita) ১৯৯৪ সালের সেই প্রথম সফরের পর আবার একসঙ্গে টা’ক্রাচুলো (T’aqrachullo)-তে ফিরে আসেন।

কুসকোর এসপিনার প্রদেশে সুইকুতাম্বোর ‘তিন গিরিখাত’; উঁচু আগ্নেয় শিলাপ্রাচীরের মাঝ দিয়ে এঁকেবেঁকে এগিয়েছে নদী। এই দুর্গম আন্দীয় ভূদৃশ্যের কাছেই টা’ক্রাচুলো—যে প্রত্নস্থলকে গবেষকেরা হারিয়ে যাওয়া আনকোকাগুয়ার সম্ভাব্য অবস্থান বলে মনে করছেন। তথ্যসূত্র: পেরুর পরিবেশ মন্ত্রণালয়

মালভূমির চূড়া থেকে দেখা সেই মনোমুগ্ধকর দৃশ্য আগের মতোই ছিল—যেমনটা ছিল তিন দশক আগে। কিন্তু জায়গাটির প্রায় সবকিছুই ততদিনে বদলে গেছে।

এখন রাইনহার্ড আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরও বেশি নিশ্চিত যে টা’ক্রাচুলোই বহুদিন ধরে হারিয়ে যাওয়া আনকোকাগুয়া (Ancocagua) নগরী।

অন্যদিকে কিরিতা দীর্ঘদিন ধরে এই ধারণা নিয়ে সংশয়ে ছিলেন। তাঁর মনে হতো, টা’ক্রাচুলোতে সেই বিশাল, জাঁকজমকপূর্ণ স্থাপত্যের ছাপ নেই, যা কুসকো (Cusco) বা স্যাক্রেড ভ্যালি (Sacred Valley)-কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা অন্যান্য পবিত্র ইনকা প্রত্নস্থলে দেখা যায়। ইনকারা আপুস (Apus)—অর্থাৎ পবিত্র পাহাড়ের আত্মাদের—উদ্দেশে নানা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করত।

কিন্তু সেদিন, টা’ক্রাচুলো-র চারদিকে হাঁটতে হাঁটতে, নতুন খনন করা শত শত স্থাপনা দেখে কিরিতার ধারণা ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে। ধাপে ধাপে তৈরি সেই বিশাল ধর্মীয় প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানের দিকে তাকিয়ে তিনি, বললেন… প্রমাণ তো এখানেই আছে। আমরা মন্দিরেই দাঁড়িয়ে আছি!

যে তরুণী একসময় সাইকেলে চেপে এক প্রত্নস্থল থেকে আরেক প্রত্নস্থলে ঘুরে জরিপ করতেন, আজ সেই আলিসিয়া কিরিতা পেরুর অন্যতম শীর্ষস্থানীয় মাঠপর্যায়ের প্রত্নতাত্ত্বিক। তাঁর কাছে টা’ক্রাচুলো-র খননকাজের সবচেয়ে বড় গুরুত্ব কোনো ৫০০ বছরের পুরোনো রহস্যের সমাধান নয়। বরং, এর আসল মূল্য অন্য জায়গায়…

উনিশ ও বিশ শতকে ইনকাদের বহু পবিত্র স্থানের তথাকথিত “আবিষ্কার” করেছিলেন মূলত বিদেশি গবেষকেরা। কিন্তু টা’ক্রাচুলো-র গবেষণা ও খননকাজ পরিচালনা করেছেন পেরুর নিজস্ব প্রত্নতাত্ত্বিকরাই।

ইনকা জনগোষ্ঠীর কোনো পরিচিত লিখিত ভাষা ছিল না। তাই তাদের ইতিহাসের বড় অংশই লিখে গেছে সেই ঔপনিবেশিক শাসকেরা, যারা একসময় তাদের ভূমি দখল করেছিল।

কিন্তু টা’ক্রাচুলোতে প্রতিটি নতুন আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে যেন সেই হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের একেকটি অংশ আবার নিজেদের কাছে ফিরে আসছে।

পেরেইরার মতে, এই হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস পুনরুদ্ধার করাই তাঁর কাজের সবচেয়ে তৃপ্তিদায়ক দিকগুলোর একটি।

তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা নিয়মিত টা’ক্রাচুলো-র আশপাশের গ্রামগুলোতে সভা করেন। সেখানে তারা নিজেদের আবিষ্কারের কথা স্থানীয় মানুষদের জানান এবং এসব নিদর্শনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেন।

পেরেইরা বলেন…

আমরা মানুষকে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি আর পরিচয় ফিরে পেতে সাহায্য করছি।

ইনকাদের ইতিহাসের বড় অংশই লিখেছেন সেই ঔপনিবেশিকরা যারাই, তাদের উচ্ছেদ করেছিল।

কিন্তু টা’ক্রাচুলোতে প্রতিটি নতুন আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে সেই ইতিহাসের হারিয়ে যাওয়া অধ্যায়গুলো যেন ধীরে ধীরে আবার উদ্ধার হয়ে ফিরে এসে আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে । তবে পেরেইরা, কিরিতা এবং অন্য গবেষকদের আশা, ভবিষ্যতে আরও অনেক মানুষ টা’ক্রাচুলো সম্পর্কে জানবে।

নব্বইয়ের দশকে মারিৎসা কানদিয়া (Maritza Candia)-র সঙ্গে কিরিতা যে গবেষণাপত্র লিখেছিলেন, সেখানে এই ধ্বংসাবশেষ কীভাবে সংরক্ষণ করা যায় এবং একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা যায়, তার একটি পরিকল্পনাও ছিল। তাঁদের আশা ছিল, এতে পর্যটন বাড়বে, আর সেই আয় তাঁদের নিজ অঞ্চলের মানুষের কাজে লাগবে। কারণ এখানকার অধিকাংশ মানুষ এখনো কৃষিকাজ আর খনিশিল্পের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তখন তাঁদের স্বপ্ন ছিল অনেক ছোট।

কিন্তু এখন যদি সত্যিই এই জায়গাটি হারিয়ে যাওয়া সেই প্রাচীন মন্দির হিসেবে স্বীকৃতি পায়, তাহলে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে পর্যটকেরা, ইতিহাসবিদরা এখানে ছুটে আসতে পারেন। পেরেইরা বলেন, আপাতত পর্যটক আসা, মাত্রই শুরু হয়েছে। যারা আসছেন, বেশিরভাগই কুসকো এলাকার স্থানীয় মানুষ। যেদিন রাইনহার্ড আর কিরিতা সেখানে গিয়েছিলেন, সেদিন একজন পর্যটকও ছিল না।

তবুও দুজন প্রত্নতাত্ত্বিকের মনেই একই ছবি ভেসে উঠছিল।

হয়তো খুব শিগগিরই একের পর এক মানুষ সেই সরু পাথরের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠবে। বিস্তীর্ণ পাথরের স্থাপনাগুলোর দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকবে। আর অনুভব করবে এমন এক পবিত্রতার আবেশ, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়েও আজও অটুট রয়ে গেছে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সাবস্ক্রাইব

spot_img

সম্পাদকের নির্বাচিত

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

লুকিয়ে থাকা ডিএনএ আর তেরো শত বছরের পুরনো পাণ্ডুলিপির গল্প

প্রাচীন ইতিহাস অনুসন্ধানের উপাদান পার্চমেন্টে (পশুর চামড়ায় বানিয়ে তোলা...

আমার ব্যারিম্যান

সে ও বার্গম্যান আমার জীবনে প্রথম এসেছিলো। আজ সে...

শরীরের রূপান্তর সুরযন্ত্রে: একটি বাদ্যযন্ত্র প্রদর্শনী

নিউইয়র্কের মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অব আর্টে গত জুনে একটি নতুন...