ডিজিটাল ক্যামেরা ওয়ার্ল্ড অনলাইনে প্রকাশিত টম মে প্রণীত প্রতিবেদন অবলম্বনে স্বাতীলেখা মিত্র
যে কোন খবরের সাথে একটি ছবি থাকে। বিংশ শতাব্দীর সর্বাধিক মুদ্রিত সংবাদচিত্রের একটি তুলেছেন সাল ভেডার। তিনি আমাদের ‘সত্য কাকে বলে’ সে সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়ে গেছেন।তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত ছবিটির নাম “বার্স্ট অব জয়”। আমাদের আজকের ছোট লেখাটি ১৯৭৩ সালের ভিয়েতনাম যুদ্ধের এই ছবিটির পেছনের সত্য গল্পটি কেন্দ্র করে।

১৯২৬ সালে জন্ম নেওয়া আলোকচিত্রী সাল ভেডার গত আগস্ট মাসের বাইশ তারিখ ক্যালিফোর্নিয়ার এল ডোরাডো কাউন্টিতে, নিজের বাসভবনে মারা যান। নিজের ১০০তম জন্মদিনের মাত্র আট দিন আগে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর নাম হয়ত আপনার কাছে অচেনা মনে হচ্ছে, তাঁর কাজ সম্ভবত আপনার চেনা। বিশেষ করে “বার্স্ট অব জয়” ছবিটি। এই ছবি ভিয়েতনাম যুদ্ধের শেষের দিকে আমেরিকানদের আবেগের প্রতীক হয়ে উঠেছিল।
১৯৭৩ সালের ১৭ মার্চ। ক্যালিফোর্নিয়ার ট্রাভিস এয়ারফোর্স বেসে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (AP) হয়ে কাজ করছেন ভেডার। তখন একটি ছবি তোলেন তিনি। ছবিতে দেখা যায়, দীর্ঘ পাঁচ বছরেরও বেশি সময় যুদ্ধবন্দী হিসেবে কাটানোর পর ফিরে আসা লেফটেন্যান্ট কর্নেল রবার্ট এল স্টার্মকে স্বাগত জানাতে কর্নেলের পরিবার বিমানের রানওয়েতে ছুটে আসছে। তাঁর মেয়ে লরি দুই হাত ছড়িয়ে শূন্যে পা ভাসিয়ে ছুটছে বাবার দিকে, এই দৃশ্যই ছিল ছবিটির মূল আকর্ষণ। ‘বার্স্ট অফ জয়’ ১৯৭৪ সালে ফিচার ফটোগ্রাফিতে পুলিৎজার পুরস্কার জেতে। গত শতাব্দীর যেকোনো আমেরিকান নিউজ ফটোর চেয়ে সর্বাধিক রিপ্রিন্ট হওয়া ছবি ‘বার্স্ট অফ জয়’।

স্লাভা সাল ভেডার ছিলেন সেদিন ওই প্রেস কর্নারে ভিড় করে থাকা ডজন খানেক ফটোগ্রাফারদের একজন। সকলে একই রানওয়ের দিকে ক্যামেরার চোখ স্থির করেছিলেন। সমান আলো এবং দূরত্বে কাজ করছিলেন। সাল ভেডার একটি নাইকন এসএলআর ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলেছিলেন। তবে অন্যদের চেয়ে তাঁর ছবি আলাদা হওয়ার কারণ কোনো বড় লেন্স বা দ্রুত শাটার টেপা ছিল না।পরিস্থিতি বোঝার আশ্চর্য এক ক্ষমতা ছিল তাঁর।চোখের কোণ দিয়ে দেখেছিলেন, বাচ্চারা তাদের ফিরে আসার বাবার দিকে ছুটতে শুরু করেছে।কোনো দামি যন্ত্রপাতির চেয়ে এই তাৎক্ষণিক বুদ্ধিটাই আসল ছিল। ঠিকঠিক টাইমিং জরুরি ছিল। ভেডার অসম্ভব ভিড়ের মধ্যে এই ছবিটি তুলেছিলেন। তারপর সবার আগে ছবি পাঠাতে বিমানঘাঁটির একটি মেয়েদের টয়লেটে অস্থায়ী ডার্করুম বানিয়ে ফিল্ম প্রসেস করেছিলেন। ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু করে প্যাটি হার্স্ট ট্রায়াল এবং মসকোন-মিল্ক হত্যাকাণ্ডের ছবি যদি বিবেচনায় আনি আমরা, তাঁর পুরো ক্যারিয়ার গড়ে উঠেছিল সঠিক অবস্থান, ধৈর্য এবং দ্রুত সিন্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে।

“ক্যামেরার শাটার চাপার চেয়ে মানুষের মনের কথা বোঝা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”
ইতিহাসের অন্যতম সেরা একটি আইকনিক ছবির আলোকচিত্রী এমন একটি সত্য বুঝতে পেরেছিলেন, যা বর্তমান যুগের অনেক আলোকচিত্রীই বুঝতে পারেন না। এই সব বলেন বিবেচনার মাঝে একটি বিষয় প্রায়শই মানুষ ভুলে যায়। ছবির পেছনের গল্পটি মোটেও আনন্দের নয়। বাড়ি ফেরার ঠিক তিন দিন আগে, একজন ধর্মযাজক স্টার্মের হাতে তাঁর স্ত্রীর একটি চিঠি তুলে দিয়েছিলে। চিঠিতে তাঁর স্ত্রী বিবাহবিচ্ছেদের দাবি জানিয়েছিলেন। সেদিন তিনি বিমানঘাঁটিতে এসেছিলেন কেবল চারপাশের মানুষের মন আর সামাজিকতা ঠিক রাখতে। এক বছরের মধ্যে তাঁদের ডিভোর্স হয়ে যায়।
ছবির এই ইতিহাস ভেবে দেখলে আশ্চর্য লাগে, ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো যখন ১৯৭৪ সালের প্রতিযোগিতার ছবি বিচার করে দেখছিল তখন ‘বার্স্ট অফ জয়’ নিউজ বা ফিচার ক্যাটাগরির বদলে হিউমার ক্যটাগরিতে প্রাইজ পেল। অবশ্য এই অবাক লাগা বিচারকদের কোনো সমালোচনা নয়। একটি ছবি মূলগত অর্থে ঠিক কী, এই পুরস্কার তারই একটি স্বীকৃতি।

একটি ছবি নিজের ভেতরে তার পেছনের পুরো গল্পটা বয়ে বেড়ায় না। শুধুমাত্র সময়ের একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে কেমন দেখতে লাগছিল, তা ফুটিয়ে তোলে। ছবির অর্থ আবিষ্কার বা বিচারের দায়িত্ব দর্শকের। এই ছবিকে হিউমার বা কৌতুকের তালিকায় রাখা আসলে নির্দেশ করে আমরা নিজেরা পুনর্মিলনের মুহূর্তগুলোকে কতটা খাঁটি ও সহজ-সরল হিসেবে দেখতে চাই। অথচ সেই রানওয়েতে আসলে কী ঘটছিল, তার সাথে ছবির মিল নেই বললেই চলে।
তাই ছবিটি থেকে শেখার মতো বিষয় কেবল ভিয়েতনাম যুদ্ধ বা আলোকচিত্রী ভেডারকে নিয়ে নির্দিষ্ট কিছু নয়। একটি ছবি যা দেখাচ্ছে এবং ছবিটির আসল মানে যা, এই দুইয়ের মধ্যবর্তী ব্যবধান উপলব্ধি করা ‘বার্স্ট অফ জয়’ ছবির শিক্ষা। অন্য মানুষরা কত দ্রুত আপনার জন্য সেই দূরত্ব নিজেদের মতো করে পূর্ণ করতে ছুটে আসে, এটি তারই প্রমাণ।
ভেডার পৃথিবীকে কেবল একটি দৃশ্য বা ছবি দিয়েছিলেন। পৃথিবী নিজে ঠিক করে নিয়েছিল তার অর্থ। আজকের দিনে কাজ করা প্রতিটি আলোকচিত্রী যখনই একটি ছবি সবার সাথে ভাগ করেন, তারা প্রত্যেকবার এই একই ক্ষমতা অন্যের হাতে তুলে দেন। আলোকচিত্রে আগ্রহীদের শিক্ষাটি স্মরণে রাখা দরকার। সামনের সময়ে কোনো ছবিকে যখন একদম নিখুঁত মনে হবে, তখন সে ছবি আসলে যতটা নিখুঁত দেখাচ্ছে, বাস্তবে ততটা নিখুঁত নাও হতে পারে।


