বাবর, পানিপথের যুদ্ধে ইব্রাহীম লোদীকে পরাজিত করে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মুঘল সাম্রাজ্য ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে৷ বাবরপুত্র হুমায়ূন শেরশাহ সুরীর কাছে হেরে বছর পনেরো সাম্রাজ্যবঞ্চিত থাকলেও পুনরুদ্ধার করেন। ঐ বছরগুলো বাদ দিলে টানা ১৮৫৭ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিনশো বছর মুঘল সাম্রাজ্যের সূর্য অস্তমিত হয়নি৷ ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ যার আরেক নাম প্রথম ভারতীয় স্বাধীনতা যুদ্ধ৷ কার্ল মার্ক্সের বিখ্যাত বই আছে এ বিষয়ে। এটি চোখের জলে ভাসা এক অধ্যায়, ভারতীয় ইতিহাসের। শেষ সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ (১৮৩৭-৫৭, শাসনকাল) – বাহাদুর শাহ জাফরকে উৎখাত করা হয়। অজস্র বই লিখিত হয়েছে ভারতীয় ও ইংরেজ দুই পক্ষেই। কিন্তু রাজকীয় মানুষদের, বিশেষত রাজপরিবারের কন্যা আর বেগমদের নিয়ে ‘ফার্স্ট হ্যান্ড’ অভিজ্ঞতাপ্রসূত রচনা বিরল। সাতান্ন সালের বিশে সেপ্টেম্বর, ব্রিটিশ বাহিনি রাজকীয় পরিবারের দুটি দুর্গ মাটিতে মিশিয়ে দেয়৷ সাংস্কৃতিক অভিঘাত এখনো নথিভুক্ত হয়নি৷ বৈভবে অভ্যস্ত মানুষের রাস্তায় নেমে আসার বিপর্যস্ত জীবনের অন্ধিসন্ধি কেউ তদন্ত করার প্রয়োজন মনে করেন নাই তেমন একটা৷ তিমুরিদ সাম্রাজ্যের রক্ত বইছে যাদের শরীরে তাঁদের ভবিষ্যতের গতিপথ কেমন করে বদলে দিলো ঐ বিশেষ বছর- তার নির্বাচিত তিনটি ঘটনা নিয়েই আজকের গদ্য৷ আমরা জানি, বাহাদুর শাহ জাফর কবিতা লিখতেন। কবিতার ভাষা ছিলো সাংগীতিক আর মরমিয়া ঘরানা৷ উপাস্য ও আরাধ্যের মধ্যবর্তী কোনো ভেদ থাকতো না ভাষার মরমে। অনন্তের সাথে মিশবার এক ঐকান্তিক আকুলতায় তাঁর মনোজগৎ আচ্ছন্ন থেকেছিলো সমগ্র জীবৎকাল ব্যাপ্ত করে। ফলত, অপরাপর সুলতানদের মতো রাজ্য শাসন বা বিস্তারে মনোনিবেশ করতে পারেননি তিনি৷ তাঁর বিশাল পরিবারের তথা তিমুরিদ সাম্রাজ্যের আত্মীয়দের সংক্ষিপ্ত কয়েকটি জীবনকথা আজকের আলোচ্য৷ আমরা দেখবো, ধুলোমাটিতে নেমে এসেও এক ধরণের আধ্যাত্মিক বাতাবরণ ও বিনয়- সর্বোপরি সাহস কখনো তাঁদের ছেড়ে যায়নি৷ পরম দয়াময়ের অশেষ বাৎসল্যের নির্যাস তাঁদের জীবনে লীন হয়ে ছিলো।

Credit: Abd al-Samad (attributed)/British Museum
যুবরাজের পায়ের গল্প
ভারতের কেন্দ্রবিন্দু দিল্লি সম্প্রসারিত হচ্ছিলো। শাসক ও শাসিতের জীবন চিরতরে বদলে দিয়েছিলো ইংরেজ শক্তি৷ মিউটিনির কয়েক বছর আগে কয়েকজন যুবরাজ শিকারে গিয়েছিলেন৷ পাখি শিকার। গ্রীষ্মের এক সুন্দর সকালে জঙ্গল ভরে উঠেছিলো তাদের কোলাহলে৷ একজন ছিন্নবস্ত্র ফকির অভিবাদন করে অত্যন্ত সম্মানের সাথে জানতে চাইলেন – ‘মিয়া সাহেবজাদা, কেন এই নিষ্পাপ পাখিদের কষ্ট দিচ্ছেন? তারা আপনাদের কি ক্ষতি করেছে? তারাও জীবন্ত। তাদের করুণা করুন৷ তাদেরও আপনাদের মতো যন্ত্রণা হয় ব্যথা পেলে। ‘ বড় যুবরাজ ক্ষেপে গেলেন। ছোটোজন, নাসির- উল- মুলক ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন- ‘ দূর হও! কে হে তুমি আমাদের জ্ঞান দিচ্ছ? আমরা পাপ করছি না। ‘ ফকির বোঝাতে চাইলেন, একমাত্র খাদ্যের প্রয়োজনেই প্রাণি নিধন শ্রেয়। অকারণে ক্ষুদ্র পাখিদের হত্যা অর্থহীন। মির্জা নাসির ধৈর্য্য হারিয়ে পাথর ছুঁড়ে ফকিরের পা ভেঙ্গে দিলেন৷ যুবরাজেরা যখন উদ্ধত ভঙ্গিতে ঘোড়ায় চড়ে কিল্লার দিকে ফিরছিলো- ফকির যন্ত্রণায় চিৎকার করে বলছিলেন- ‘কেমন করে একটি সাম্রাজ্য এমন হৃদয়হীন মানুষেরা প্রসারিত করে? তরুণ যুবরাজ, তুমি নির্দয়ভাবে আমাকে আহত করেছো। আমার স্রষ্টা একদিন তোমাকেও আহত করবেন। তুমিও আমার মতো নিজেকে টেনে হিঁচড়ে জীবন কাটাবে। ‘
বছরখানেক পরেই শাহজাহানাবাদ বিপর্যস্ত হলো কামানের গোলায়৷ কিছু মুঘল শাহজাদাকে ঘোড়ায় চড়ে পালাতে দেখা গেলো,পাহাড়গঞ্জের দিকে। পঁচিশজন ব্রিটিশ সৈন্য ধাওয়া করলে একজন আহত হয়ে ধরা পড়লেন- নিহত হলেন কেউ কেউ। আহতকে ঘোড়ায় বেঁধে ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হলো। সিনিয়র অফিসার- সুলতানের নাতি নাসির-উল-মুলকের পরিচয় পেয়ে তাঁকে নিরাপদেই রাখলেন৷ বিদ্রোহী ভারতীয় সৈনিকেরা একটা শেষ চেষ্টা করেছিলো৷ ব্রিটিশরা শহরে ঢুকে হুমায়ূনের সমাধির কাছে বাহাদুর শাহকে আটক করলেন। তিমুরিদ সাম্রাজ্যের বাতি নিভলো। কিল্লার চারপাশের জঙ্গল ভরে উঠলো মুঘল রাজকন্যার আর্তিতে। শিশুদের সামনেই হত্যা করা হলো পিতাকে। মায়েরা দেখলেন পুত্রের শেষ নি:শ্বাসে ধরিত্রী ক্লান্ত হচ্ছে।
এক পাঠান সৈন্য নাসিরকে মুক্ত করে দৌড়ে পালাতে বললো। কিন্তু তিনি তো কখনোই পায়ে হাঁটেননি। যদিও বাঁচার আকুতি ছিলো তীব্র। পাঠানকে ধন্যবাদ জানিয়ে মাইলখানেক হাঁটলেন উদ্দেশ্যহীন। হুমড়ি খেয়ে পড়লেন তারপর। কণ্ঠ বিশুষ্ক হয়ে এলো, জিভে প্রচন্ড জ্বলুনি। এক ছায়াবৃত গাছের নিচে ক্লান্ত ও ধ্বস্ত বসে পড়লেন তিনি। ঈশ্বরের কাছে নালিশ জানাতে থাকলেন এই পরম দুর্গতিকে কেন্দ্র করে। কবুতরের বাসা দেখে কবুতরও কতো স্বাধীন! এমন ভাবলেন তিনি৷ দাঁতে দাঁত চেপে হাঁটতে হাঁটতে এক গ্রামে পৌঁছে দেখলেন, ত্রয়োদশ বর্ষীয়া মেয়েকে ঘিরে উত্তেজিত কোলাহল। দেখলেন, তাঁরই সহোদরা, বন্দীদশায়৷ কানের দুল টেনে নেয়ায় কান রক্তাক্ত৷ গ্রামবাসীরা হাসছে তাকে ঘিরে। তাদের ছেড়ে দিতে অনুরোধ করায় তারা বললো,কিনে নিতে হবে। এসব হট্টগোলে রঙ্গমঞ্চে আবারো ব্রিটিশ সৈন্যের প্রবেশ এবং নির্বিচারে সকলের বন্দীদশা। শেষ মুহূর্তে ভাইবোন বাঁচলেন বড় সাহেবের দয়ায়। অফিসার ইনচার্জ তাদের মুক্তি দিলেন। দুজনেই এক বণিকের কাছে কাজ নিলেন। বোন বণিকের বাচ্চা সামলাতো আর ভাই ব্যবসা। ছড়িয়ে পড়া কলেরায় বোনটি কয়েকদিন পরেই মরে গেল। নানা ধরনের খেটে খাওয়া, বাড়ি ঘুরে ঘুরে করার কাজ বেছে নিলেন নাসির। অবশেষে ব্রিটিশ সরকার মাসোহারা দিলো সকল যুবরাজকে।
কয়েক বছর পর- এক পীর বাবাকে দেখা গেলো চিতলি কবর আর কামরা বাঙ্গাসের চারপাশে হাঁটছেন পা টেনে, দেখে মনে হয় অভিজাত তিমুরিদ- চেঙ্গিজ গোত্রের কেউ। তাঁর পা পক্ষাঘাতগ্রস্থ। কাঁধে ব্যাগ। পথচারীরা দু চারটে করুণার মুদ্রা নিক্ষেপ করছেন সেই ব্যাগে। ভাতার টাকাগুলো শেষ করে তিনি ঋণগ্রস্থ হয়েছেন৷ এখন ভিক্ষাই পেশা তাঁর।নিয়তি এক অনতিক্রমণীয় অভিঘাত আনে মানুষের জীবনে, ধনী বা দরিদ্র৷
দিল্লির মতি মহল আর চিতলি কবরের দিকে যাওয়ার রাস্তায় কাল্লু খাস কি হাভেলি নামে এক লোকালয় আছে। প্রতি রাতে বেশ লম্বা, শীর্ণকায়, সাদা দাড়িভর্তি মুখ নিয়ে এক ভিক্ষুক বেরিয়ে আসেন৷ জামা মসজিদের দিকে যান৷ দৃষ্টিরহিত চোখ। ময়লা, ছেঁড়া পায়জামা, কুর্তা পরনে- দোমড়ানো টুপি লম্বা, জটাবৃত চুল পুরো ঢাকতে পারেনি৷ পায়ে অতি মলিন চপ্পল। চ্যাপ্টা, প্রায় ভঙ্গুর মাটির বাটি আর বাঁশের লাঠি দুই হাতে৷ চিৎকার করে আল্লার কাছে চান এক পয়সার আটা৷ প্রতিদিন। এই কণ্ঠেই বাসিন্দারা চমকে যান৷ এতো করুণার্দ্র স্বর! সকালে তাঁকে দেখা যায় না। পক্ষাঘাতগ্রস্থ পা টেনে টেনে সোজা জামা মসজিদের দিকে হেঁটে যান। একই কথা বলতে বলতে।

Credit: Robert Tytler and Charles Shepherd/British Library
সম্রাটের হাতে ভিক্ষার পাত্র
হাতে গোণা অল্প কয়েকজন মানুষই জানেন, তিনি সম্রাটের নাতি মির্জা কামার সুলতান৷ এক সময় তিনি ছিলেন নারীকুলের নয়নমণি৷ কিন্তু এখন, সর্বহারা। বাহাদুর শাহের কন্যা কুরাইশা বেগমের পুত্র তিনি৷ ছেলেবেলায় তাঁকে সবাই সাহিব- ই – আলম – মির্জা কামার সুলতান বাহাদুর নামেই চিনতো সকলেই। কোনো গ্লানি নেই তাঁর৷ কেন না ভাগ্যচক্রের ঘূর্ণি বিষয়ে কেউই পূর্বাবগত হতে পারে না৷ সকালে বেরোতে তাঁর লজ্জা করে কারণ এই তল্লাট কেবল নয়, সমগ্র ভারতবর্ষকেই এককালে শাসন করেছেন তাঁরা৷ এখন কেমন করে ভিক্ষাপাত্র হাতে দাঁড়ান! তাঁর আকুতি কেবল আল্লার কাছেই৷ প্রজাদের কাছে কামারের কিছু চাইবার নেই৷ তিনি একদিন জানিয়েছিলেন ‘বেগমত কা আঁশু’- বইয়ের লেখক খাজা হাসান নিজামিকে – ‘নিরব থাকো৷ আচম্বিতে জেগে উঠেছিলাম যখন৷, স্বপ্ন নিমজ্জিত ছিলাম। এখন, পূর্ণ জাগ্রত দশায়- ঐ স্বপ্ন ফেরেনি আর, আসবে না কখনো।’ ১৮৫৭ সালের পর কত রকম অসুবিধায় পড়তে হয়েছিলো- লেখকের এই প্রশ্নের উত্তর হিসেবেই তাঁর এই দার্শনিকতা দীর্ঘশ্বাসের সাথে উচ্চারিত হয়েছিলো।

Credit: London Printing and Publishing Co.
জাফর সুলতানের গল্প
রাজা পঞ্চম জর্জ আর রাণী মেরির অভিষেককে কেন্দ্র করে দিল্লি দরবার ১৯১১ সালে দিল্লি শহরের চেহারা আপাদমাথা বদলে দিচ্ছিলো, নিয়তিসমেত। নতুন শহর পরিকল্পিত হচ্ছিলো, মানচিত্রে নিখুঁত চিত্রিত হচ্ছিলো সেসব। অযোধ্যার গর্ব, মনসুর আলী খান সফদরজঙ্গের সমাধির কাছে অনেক ইটের ভাটা বসানো হয়েছিলো, বিখ্যাত প্রকৌশলীরা তাঁদের প্রকৌশলের যাদুবিদ্যা দেখানো শুরু করলেন৷ দরিদ্ররা কাজ পাচ্ছিলেন৷ ইট বানানো হলে, ঠেলাগাড়িতে আর ট্রেনে চলে যাচ্ছিলো দিল্লির রাজকীয় নির্মাণ যজ্ঞের দিকে।
১৯১৭ সালের মে মাসের সতেরো তারিখ, প্রখর মধ্যাহ্ন। খান বাহাদুর শেঠ মোহাম্মদ হারুণের ইটের ভাটা থেকে দিল্লির দিকে আসছিলেন এক বৃদ্ধ। ধুসর চুল দাড়ি আবৃত ধুলোবালিতে। কপালে লাল ইটের গুঁড়ো। কুতুব সাহিবের দিক থেকে এক মোটরগাড়ি এসে কয়েকবার হর্ন বাজালেও তিনি শুনলেন না শ্রুতিজনিত সমস্যার জন্যে। গাড়ির ড্রাইভার শেষ মুহূর্তের সংঘর্ষ এড়ালো৷ আরোহী ছিলো এক নাদুস পাঞ্জাবী বণিক। তখনকার দস্তুর অনুযায়ী চাবুক বের করে অসহায় বৃদ্ধটিকে মারা শুরু করলো।
আত্মসম্মান টনটনে বৃদ্ধের। চাবুক ধরে ফেলে মাতাল পাঞ্জাবীটাকে মার দিলেন তিনি হাতের সুখ করে।ড্রাইভার বাধা দিতে এলে তাকেও কয়েক ঘা। তাদের পলায়নোদ্যত দেখে বৃদ্ধ চিৎকার করে উঠলেন – ‘ তামুরিদ চড় বেশ সুখকর নয়, কি বলো হে বাবাসকল!’ কানে খাটো তিনি তাদের অঝোর গালিবর্ষণ না শুনে নিজের কাজে ফিরলেন। রাইসানার দিকে যেতে থাকলেন৷ নতুন দিল্লি শহর সেখানেই নির্মিত হচ্ছিলো৷
মামলা হলো। বৃদ্ধ অকপটে ‘দোষ’ স্বীকার করলেন। জানালেন, এক সময় তাঁর পূর্বপুরুষ ভারতবর্ষের শাসক ছিলেন৷ দারোগা হাসতে শুরু করলেন। ভাবলেন, পাগলা বুড়ো। পাগলা গারদে পাঠাবার কথাও বললেন চিৎকৃত কণ্ঠে। জেলে পাঠাবার আদেশ হলো, কোর্টে তোলার আগে৷ দু’দিন হাজতবাস শেষে – সিটি ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে উপস্থিত করা হলো। চার্জ পঠিত হলো যেহেতু শুনতে পাচ্ছিলেন না। বৃদ্ধের বয়ান শুরু হলো – ‘ আমার নাম জাফর সুলতান। মির্জা বাবরের পুত্র আমি৷ হিন্দুস্তানের শাহেনশাহ আমার নানা, দ্বিতীয় মঈনুদ্দীন আকবর শাহ। সারা দুনিয়া ঘুরে ফিরে এসেছি ঐ ঘটনার পরে। ঘটনার দিন- এমনই গরম ছিলো ১৮৫৭ তেও।’ পুরো বিবরণ দিয়ে গেলেন তিনি নিষ্পম্প কণ্ঠে।

Credit: Dr. John Murray/Murray Collection
বৃদ্ধের বলা শেষ হতে আদালতের ভেতর পিনপতন নিরবতা নামলো। একজন মুসলিম অফিসার বেদনায় কেঁদে উঠলেন। কোর্ট তাঁকে সম্মানের সাথে মুক্তি দিলো৷ অভিযোগকারীদের জরিমানা হলো কেন না হামলা তাদের দিক থেকে। ব্রিটিশ ভাতার কথা জানতে চাইলে তিনি কঠিন পরিশ্রমে অর্জিত অর্থের প্রতি নির্ভরতার কথাই জানান। ইট বহন করে প্রতিদিন তিনি তিন থেকে চার রুপি পান। মাসিক পাঁচ রুপি ভাতায় কী হবে তাঁর! লেখকের সাথে কথা হয় জাফর সুলতানের। মহাবিদ্রোহের দিনগুলির কথা জানতে চাইলে বলেন- ‘আরেকবার বলা মিথ্যে বলার মতোই৷ সামনে তা আসছে তা নিয়ে ভাবা কুসংস্কারের মতোই৷ যা চলে গেছে তা মিথ্যে। কেবল বর্তমানই সত্য। আমার মনে হয়, আমাদের বর্তমানেই বিশ্বাস করা উচিত। শান্তি ও স্বস্তিতে সরলভাবে দিন অতিবাহিত করা জরুরি।’
জাফর সুলতান, বাহাদুর শাহের ভাই মির্জা বাবরের ছেলে। তিনি মায়ের খুব আদরের সন্তান ছিলেন৷ মা আর জাফর পালাচ্ছিলেন৷ গুজ্জাররা তাঁদের সব লুঠ করে নিলো। জনৈক চৌধুরী মায়ের অবশিষ্ট সোনাদানা আশ্রয় দেয়ার নামে নিয়ে প্রবঞ্চনা করলো৷ মায়ের কবরটাও দিতে পারেননি তিনি৷ নির্যাতনে মায়ের মৃত্যু হয়। ঘুরতে ঘুরতে বোম্বে গেলেন৷ এক ধর্মপ্রাণ দলের সাথে মোক্কা-ই- মোয়াজামায় যান৷ দশ বছর থেকে মদীনায় পাঁচ বছর। সিরিয়া, বাইত-উল-মুকাদ্দস অবস্থান করেন কিছুকাল৷ আলেপ্পো হয়ে বাগদাদে গিয়ে দুই বছর ধর্মসাধনা করলেন। করাচী গেলেন তার বাদে৷ বছর কয়েক পর নিজের এলাকা দিল্লি ফিরলেন৷ খাজা জিজ্ঞেস করেছিলেন-‘এসব কথা আমি লিখতে পারি আমার বইতে?’, তিনি স্মিত হেসে উত্তর দেন-‘অবশ্যই লিখবেন৷ কিন্তু এটিও যুক্ত করবেন- সবকিছু, এই মরপৃথিবীতে যা ঘটে, সময়ের অতিক্রমণ হোক, আপনার প্রতি প্রদর্শিত ক্ষমা হোক, আপনাকে বিপর্যস্ত করা সমস্যারাশি হোক, সবই সাময়িক৷ এই সকল আয়োজন বস্তুত, সর্বশক্তিমানের কাছ থেকে আসা সাবধাণবাণী৷ ‘

Credit: Unknown photographer/Wikimedia Commons
‘টিয়ার্স অফ দ্য বেগমস: স্টোরিজ অফ সারভাইভর্স অফ দ্য আপরাইজিং অফ এইটিন ফিফটি সেভেন ‘, খাজা হাসান নিজামী রচিত বই অবলম্বনে


