নেপালের বর্ণিল গাই যাত্রা

Share post:

Date:

নেপালের তিব্বত সীমান্তে রাসুয়া জেলায় ভয়াবহ এবং মর্মান্তিক হড়পা বানে এখন পর্যন্ত ৫৭০ জনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। নিখোঁজ হাজারের উপর। প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক, এই দুর্যোগময় পরিস্থিতিতে নেপালের রাজধানী কাঠমুন্ডু শহরে কেন এমন জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান হচ্ছে? আসলে “গাই যাত্রা” একটি শোকানুষ্ঠান বটে। নেপাল শতাধিক জাতি, ভাষা, সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় বৈচিত্র‍্যের দেশ। গাই যাত্রা মূলত নেওয়ার জাতিদের সামাজিক ধর্মীয় উৎসব। ভালো কথা, নেওয়াররা গরুকেই গাই বলে।

ভক্তপুর তমাদি স্কয়ার চত্বরে ন্যাতাপোল মন্দিরের সামনে গাই যাত্রায় জনস্রোত

সতেরো শতকের মাঝামাঝি সময়ে রাজা প্রতাপ মল্ল’র কিশোর সন্তান মারা যাওয়ার পর রানী মহাশোকে পড়েন। দিনের পর দিন যায় রাতের পর রাত কোনভাবেই রানী সন্তানের মৃত্যুশোক কাটিয়ে স্বাভাবিক হতে পারছিলেন না। এক পর্যায়ে রাজা প্রতাপ মল্ল একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেন। রাজ্যের যেইসব পরিবারে গত এক বছর কেউ না কেউ মারা গেছে সেইসব পরিবারগুলোকে গরুসহ বা শিশুদেরকে গরু সাজিয়ে উপস্থিত হয়ে একটি শোভাযাত্রা করতে বলেন। গরু নিয়ে আসা বা গরু সেজে আসার কারণ হলো, তাদের হিন্দু ধর্মমতে গরু মানুষের মৃত আত্মাকে স্বর্গে যাবার পথ দেখায়।রাজার আদেশানুসারে বিশাল আয়োজনে সবাই সমবেত হলো। শোভাযাত্রায় অগণিত মানুষের হরেক সাজগোছের পাশাপাশি নাচ, গান, ব্যঙ্গাত্মক অঙ্গভঙ্গি, হাসি ঠাট্টাও ছিলো। রানী শোভাযাত্রা দেখে আনন্দিত হলেন এবং শোক ভুলে স্বাভাবিক হয়ে উঠলেন।

ভক্তপুর দরবার স্কয়ারে জনগণের উপচে পড়া ভীড় ঠেলে মৃতের উদ্দেশ্যে বাঁশের তৈরি রথ নিয়ে শোভাযাত্রা

বাস্তবে গাই যাত্রার মাধ্যমে দেখানো হয়, জন্ম মৃত্যু স্বাভাবিক ঘটনা, সবার ক্ষেত্রেই ঘটবে, রোধ করার ক্ষমতা নাই। জগতে জন্মের যেমন আনন্দ থাকবে তেমনি আপনজনের মৃত্যু শোকও থাকবে আবার শোক কাটিয়ে উঠে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে হবে। যাপনকে উল্লসিত রাখতে হবে। ৩৮০ বছরের অধিক সময় ধরে গাই যাত্রা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। শুনেছি গাই যাত্রা কিছুকাল বন্ধও ছিলো। প্রতাপ মল্ল’র শাসনকালের অনেক আগ থেকেই গাই যাত্রা হয়ে আসছে, বিশেষজ্ঞদের এমন মতও আছে দেখলাম।কালের বিবর্তনে এখন নেওয়ারদের পাশাপাশি অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীও গাই যাত্রা পালন করে।
গাই যাত্রা হলো ব্যক্তিগত শোককে সামাজিক সম্মিলনের মাধ্যমে দূর করে একে অন্যের সাথে একাত্ম হবার অসাধারণ শৈলী। এই দিন সরকারি ছুটি থাকে। কাঠমুন্ডু ভ্যালির কাঠমুন্ডু, ভক্তপুর,পাটন, কৃত্তিপুর আর নেপালের এই চারটি স্থানেই গাই যাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। ভক্তপুরে টানা ৮ দিনব্যাপী এবং সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদযাপন হয় গাই যাত্রা। শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারী এবং দর্শনার্থীদেরকে বিভিন্ন পরিবার থেকে ফল,মিষ্টি, ঐতিহ্যবাহী খাবার উপহার দেয়। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যোগ হয়েছে হালে, সেটা হলো এই দিন ওপেন রাস্তাঘাটে, বিভিন্ন মোড়ে এবং টেলিভিশনে রাষ্ট্র, সমাজের অসঙ্গতি, দুর্নীতি তুলে ধরতে ব্যঙ্গাত্মক নাটক, কৌতুক, মিমিক্রি পরিবেশিত হয়। আবার লৈঙ্গিক বৈচিত্রের মানুষরাও স্বাধীনভাবে নিজস্ব পোশাকে শোভাযাত্রাকে রাঙিয়ে তোলে।

লৈঙ্গিক বৈচিত্রের মানুষও সাবলীলভাবে স্বাধীন পোশাকে গাই যাত্রায় নাচানাচি, মকারী করছে

আমি আজ ভক্তপুরে গাই যাত্রা উপভোগ করলাম। কাঠমুন্ডু উপত্যকার প্রাচীন এবং সমৃদ্ধ সংস্কৃতির নগর। ইউনেস্কো ঘোষিত ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ নগর ভক্তপুর। মাটি, কাঠ, বাস্তুবিদ্যায় অকৃত্রিম নিজস্বতা নিয়ে টিকে আছে নেওয়ার জাতি আর নেওয়ারদের অন্যতম প্রধান উৎসব গাই যাত্রা। এই নগরে ঢুকতে ৫০০/- রুপিতে টিকিট কাটতে হয় বিদেশি পর্যটকদের। এখানকার শোভাযাত্রার বিশেষত্ব হলো, প্রতিটি মৃত ব্যক্তিকে স্মরণ করে বাঁশ দিয়ে একধরনের রথ তৈরি করে নারী পুরুষ ভেদে রথটা রঙিন শাড়ি বা ধুতিতে মোড়ানো,গরুর প্রতীকী চিহ্ন বোঝাতে লেজের অবয়বে চামরী গাইয়ের লেজের চুল ঝোলানো হয়েছে, সাথে মৃত ব্যক্তির ছবি।
চারজন কাঁধে করে বহন করছে। রথের র‍্যালিতে একই ধরনের তাল লয়ে ঢোলের বাজনা, লাঠি হাতে নৃত্য, সাথে একই রকম বাণী উচ্চারণ করছে সুরে সুরে। বাজনা, নাচ আর সুরে এক অসাধারণ আবহ তৈরি করে এগিয়ে যাচ্ছে প্রতিটি দল। শিশুরা মুখোশ পরে আছে। গরমের কারণে বেশীক্ষণ মুখে রাখতে পারছেনা। আবার কোন কোন দল ভ্যানের উপর মাটির তৈরি গরু রেখে সেটা নিয়ে র‍্যালি করছে সাথে হারমোনিয়াম তবলা বাজিয়ে ভজন গাইছে। খুব সম্ভবত এরা নেওয়ার জাতি না।নারী পুরুষ শিশু বৃদ্ধ সবাই অংশগ্রহণ করেছে মানে মৃতের সকল নিকটজন। শোভাযাত্রাগুলি ভক্তপুরের প্রাচীন প্রসিদ্ধ দত্তাত্রয় স্কয়ার, দরবার স্কয়ার দিয়ে ন্যায়াতাপোলা মন্দির হয়ে নগরের প্রধান পথ দিয়ে চলছে। রাস্তার দুই ধারে অসংখ্য মানুষ দাঁড়িয়ে, বাড়ীর বারান্দায় বসে, ঘরের জানালা দিয়ে, ছাদ থেকেও র‍্যালী দেখছে কোথাও কোন ঠেলাঠেলি, গেঞ্জাম, হট্টগোল নাই।শোককে ভুলে সকল মিলে আনন্দ উল্লাসে বাঁচার মহা উৎসব শিল্পকর্ম চাক্ষুষ উপভোগ করে আমি এক ঘোরের মধ্যে আছি। দেড় বছর পর নেপালে এসে মনে হচ্ছে নিজেকে বড় একটা উপহার দিলাম। জীবন বড়ই সুন্দর !

ভক্তপুর, নেপাল থেকে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সাবস্ক্রাইব

spot_img

সম্পাদকের নির্বাচিত

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

‘বার্স্ট অফ জয়’ : পুলিৎজার জয়ী ছবির শিক্ষা

ডিজিটাল ক্যামেরা ওয়ার্ল্ড অনলাইনে প্রকাশিত টম মে প্রণীত প্রতিবেদন...

ব্যাটারি রিকশা: আমাদের ভাবনা

ব্যাটারি রিকশা নিয়ে অনেক ধরনের আলাপ চলে আসছে গত...

বাংলার ইগল: বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান

একটি জাতি কেবল তার বর্তমান দিয়ে গড়ে ওঠে না;...

সুস্থ বাংলাদেশের দিকে

মাজার থেকে নৌকা বাইচ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থেকে মুক্ত মতের...