অনুলিখন: শরীফ সারওয়ার
মাছ মানেই জলের গভীরে সাবলীল সাঁতার, ফুলকা দিয়ে শ্বাস নেওয়া আর ডাঙায় উঠলেই খাবি খেয়ে প্রাণ হারানো—প্রকৃতির এই চিরাচরিত নিয়মের দারুণ এক ব্যাতিক্রম হলো মাডস্কিপার (Mudskipper) বা কাদালাফিয়ে মাছ। উপকূলীয় কর্দমাক্ত চরে জোয়ার-ভাটার লুকোচুরির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেঁচে থাকা এই অদ্ভুত প্রাণীটি মাছ হয়েও ডাঙার পরিবেশের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে খাপ খাইয়ে নিয়েছে। সুন্দরবন কিংবা দেশের উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ অরণ্যে কাদার ওপরে এদের ছোটাছুটি যে কাউকে অবাক করবে।
মাডস্কিপার হলো অক্সডারসিনেই (Oxudercinae) উপগোত্রের অন্তর্ভুক্ত গোবিরিডি পরিবারের মাছ। সাধারণ মাছের মতো এদেরও ফুলকা থাকে, তবে ডাঙায় দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকার জন্য এদের রয়েছে বিশেষ অভিযোজন। মুখের ভেতরের অংশ এবং চামড়া বা ত্বক ভিজিয়ে রেখে এরা বাতাস থেকে সরাসরি অক্সিজেন শোষণ করতে পারে। তবে এর জন্য তাদের ত্বক সবসময় ভেজা রাখা বাধ্যতামূলক। তাই এরা এমন জলাশয় বা কর্দমাক্ত এলাকা বেছে নেয় যেখানে জোয়ারের পানি নেমে গেলেও মাটি বা কাদা পর্যাপ্ত আর্দ্র থাকে।
শুধু কাদা বা ডাঙায় হাঁটাই নয়, মাডস্কিপাররা তাদের শক্তিশালী বুকপাকনা বা ফিনকে হাতের মতো ব্যবহার করে ম্যানগ্রোভ বনের গাছের শেকড়ে বা ডালে অনায়াসে ওপরে উঠে যেতে পারে। এদের পেছনের অংশ এবং অত্যন্ত শক্তিশালী লেজের পেশির সাহায্যে এরা ডাঙার ওপর ব্যাঙের মতো বেশ দূর পর্যন্ত লাফিয়ে চলতে পারে। আর এই লাফানোর বিশেষ ক্ষমতার জন্যই এদের নাম হয়েছে ‘মাডস্কিপার’।
জলের বাইরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বা প্রয়োজনে দিনের একটি বড় অংশ কাটিয়ে দিতে পারে এই মাছ। কাদার নিচে সুড়ঙ্গ বা গর্ত খুঁড়ে সেখানে তারা নিজেদের বসবাসের উপযোগী ভেজা ও নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করে নেয়।
মাডস্কিপারের মাথার ওপরে ব্যাঙের মতো বড় ও উভমুখী চোখ থাকে, যা দিয়ে এরা ডাঙায় থাকা অবস্থাতেই চারপাশের ৩৬০ ডিগ্রি কোণে শিকার ও শত্রুর উপস্থিতি দেখতে পায়। চোখ সতেজ ও ভেজা রাখতে তারা মাঝে মাঝেই চোখের পলক ফেলে বা চোখের নিচের বিশেষ থলেতে চোখ ডুবিয়ে নেয়।
মাডস্কিপাররা বেশ টেরিটোরিয়াল বা নিজেদের এলাকা নিয়ে অত্যন্ত সচেতন হয়। কেউ তাদের নির্দিষ্ট সীমানায় অনুপ্রবেশ করলে এরা চমৎকার ভঙ্গিমায় পিঠের ডানা ফুলিয়ে এবং হুমকি প্রদর্শন করে তেড়ে গিয়ে লড়াইয়ে লিপ্ত হয়।

বিজ্ঞানীদের মতে, জলচর প্রাণী থেকে স্থলচর প্রাণীদের বিবর্তনের ধারায় মাডস্কিপার এক জীবন্ত সংযোগ বা প্রমাণ হিসেবে কাজ করে। কোটি কোটি বছর আগে জল থেকে ডাঙায় জীবনের যাত্রার শুরুটা ঠিক কেমন হতে পারে, এই মাছগুলোর জীবনযাত্রা পর্যবেক্ষণ করলে তার একটি স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। এছাড়া উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বনের খাদ্যশৃঙ্খলে এরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কাদার ভেতরের ক্ষতিকর জৈব পদার্থ, পোকামাকড় ও ছোট ছোট শৈবাল খেয়ে এরা যেমন পরিবেশ পরিষ্কার রাখে, তেমনি অনেক পাখি ও জলচর প্রাণীর প্রধান খাদ্য হিসেবেও এরা প্রকৃতিতে ভারসাম্য বজায় রাখে।
মাডস্কিপার মাছ যেন জলচর থেকে স্থলচর প্রাণীদের বিবর্তনের এক জীবন্ত প্রমাণ। জলবায়ুর পরিবর্তন ও উপকূলীয় পরিবেশ রক্ষাকারী এই অদ্ভুত সুন্দর মাছগুলো প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখতে দারুণ ভূমিকা পালন করছে। আমাদের উপকূলীয় জীববৈচিত্র্যের এই অনন্য সদস্য সম্পর্কে আরও ব্যাপক গবেষণা এবং সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।


