লুকিয়ে থাকা ডিএনএ আর তেরো শত বছরের পুরনো পাণ্ডুলিপির গল্প

Share post:

Date:

প্রাচীন ইতিহাস অনুসন্ধানের উপাদান পার্চমেন্টে (পশুর চামড়ায় বানিয়ে তোলা অতি পুরনো লেখার কাগজ) থাকতে পারে বংশগত বা জিনগত তথ্য। মূল পান্ডুলিপিগুলোর সামান্যতম ক্ষতি না করেই গবেষণার মাধ্যমে সে সকল তথ্য উদ্ধার করা সম্ভব। নতুন একটি গবেষণা বিজ্ঞানীদের মধ্যে এই আশাই জাগিয়ে তুলছে।
বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, ঐতিহাসিক পার্চমেন্ট ম্যানুস্ক্রিপ্টের ক্ষতি না করেই সেখান থেকে কোষের উপাদান সংগ্রহ করা যেতে পারে। এই পদ্ধতিতে তেরো শত বছর পর্যন্ত পুরোনো দলিলের জেনেটিক অ্যানালাইসিস সম্ভব। এই বিশ্লেষণের ফলে তখনকার বাণিজ্য পথ, কৃষিকাজ এবং পান্ডুলিপি তৈরিতে কোন কোন পশুর ত্বক ব্যবহার করা হতো, সেই সম্পর্কে নতুন তথ্য জানা যেতে পারে।

পশুর চামড়া থেকে তৈরি করা হয় এই বিশেষ পার্চমেন্ট কাগজ। ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকার একাধিক অঞ্চলে হাজার হাজার বছর ধরে এই কাগজ ব্যবহার করা হয়েছে। আইনি নথি এবং মানচিত্রসহ বিভিন্ন ধরণের রেকর্ডে কাগজটির দেখা মেলে।

পার্চমেন্ট পশুর ডিএনএ সংরক্ষণ করে

সাইটোলজি ব্রাশ দিয়ে ঐতিহাসিক পার্চমেন্ট থেকে কোষের নমুনা সংগ্রহ করছেন গবেষকেরা। পাণ্ডুলিপির কোনো ক্ষতি না করেই জিনগত উপাদান সংগ্রহ করাই পদ্ধতিটির বিশেষত্ব।
Credit: Nash Dunn/NC State University

উত্তর ক্যারোলিনা স্টেট ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং এই গবেষণাপত্রের সহ-লেখক টিম স্টিনসন বলেন, “যেহেতু এগুলো পশুর চামড়া থেকে তৈরি, তাই পার্চমেন্ট থেকে জিনগত তথ্য সংগ্রহ করা আমাদের পক্ষে বেশিরভাগ সময়েই সম্ভব হয়।” তিনি আরও বলেন, “সেই জিনগত তথ্য আমাদের অতীতে তাকানোর একটি সুযোগ তৈরি করে দেয়। তার মাধ্যমে একটি পান্ডুলিপি কখন এবং কোথায় তৈরি হয়েছিল এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়।”

“লিখিত ইতিহাসের প্রায় শুরু থেকে পার্চমেন্ট কাগজ ব্যবহৃত হয়ে আসছে এবং এতে অধিকাংশ সময় ঐতিহাসিক তথ্য সবিস্তারে লেখা থাকে। এই কারণে কাগজে থাকা জিনগত তথ্য গৃহপালিত খামারের পশুর বিবর্তন, সময়ের সাপেক্ষে তাদের জাতের উন্নয়ন কেমন করে হয়েছে, গবাদিপশুর রোগবালাই এবং এই জাতীয় আরও অনেক বিষয়ে আলোকপাত করতে পারে,” বলেন ম্যাথিউ ব্রিন। তিনি এই গবেষণাপত্রের সহ-লেখক এবং এনসি স্টেটের কলেজ অব ভেটেরিনারি মেডিসিনের ‘অস্কার জে. ফ্লেচার ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর অব কমপ্যারেটিভ অনকোলজি জেনেটিক্স’। স্টিনসন বলেন, “এই গবেষণাপত্রটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জিনগত বিশ্লেষণের এই নতুন ক্ষেত্রের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি ছিল ঐতিহাসিক পার্চমেন্টগুলো হাতে আসা। নমুনা সংগ্রহ করতে গেলে এই সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নবস্তুগুলোর ক্ষতি হতে পারে বলে উদ্বেগ ছিল। আমাদের কাজের ফলে পার্চমেন্টের কোনো ক্ষতি না করেই আমরা নমুনা সংগ্রহ করতে পারি। পুরনো ইতিহাস গবেষণায় এটি একটি বড় মাপের অগ্রগতি।”

অষ্টম শতকের প্রথমার্ধে সিরিয়ায় তৈরি কুফি লিপির একটি পার্চমেন্ট পাতা। পশুর চামড়া থেকে তৈরি এমন প্রাচীন নথিতে শতাব্দীর পর শতাব্দী জিনগত উপাদান সংরক্ষিত থাকতে পারে।
Credit: Richard Mortel/The David Collection

বিশেষ ব্রাশ প্রায় ভেঙ্গে যেতে থাকা পাণ্ডুলিপি রক্ষা করে গবেষণার জন্য, বিজ্ঞানীরা ডিউক ইউনিভার্সিটির রুবেনস্টাইন লাইব্রেরিতে থাকা ৯১টি পাণ্ডুলিপি থেকে কোষের নমুনা সংগ্রহ করতে একটি অনন্য পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন। এই পাণ্ডুলিপিগুলো ইংল্যান্ড থেকে ইথিওপিয়া পর্যন্ত বিভিন্ন স্থান থেকে এসেছিল। এই পাণ্ডুলিপিগুলো অষ্টম শতাব্দীর শেষভাগ থেকে বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগের মধ্যে লেখা হয়েছিল।

এই পদ্ধতিতে সাইটোলজি ব্রাশ দিয়ে পার্চমেন্টের ওপর অত্যন্ত আলতোভাবে ঘষা হয়। এই ব্রাশ ঠিক সেই ধরনের যা প্যাপ স্মিয়ার পরীক্ষার জন্য ব্যবহার করা হয়। প্যাপ স্মিয়ার পরীক্ষা মূলত জরায়ুর নিচের অংশের কোষে অস্বাভাবিকতা সনাক্ত করবার একটি পদ্ধতি। ব্রীন বলেন, “সাইটোলজি ব্রাশগুলো শুকনো থাকা ব্যবহার করা যায়। এই বিশেষ ব্রাশ নমুনা নেওয়া প্রত্নবস্তুটির কোনো ক্ষতি না করেই কোষের উপাদান চমৎকারভাবে সংগ্রহ করতে পারে।”

ভেড়ার চামড়ার পার্চমেন্টে তৈরি ইথিওপিয়ার একটি প্রাচীন ধর্মীয় গ্রন্থ। ইউরোপ থেকে উত্তর-পূর্ব আফ্রিকা পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে দীর্ঘকাল পার্চমেন্ট ব্যবহৃত হয়েছে।
Credit: Momir Alvirović/Adligat

জিনতত্ত্ব জেনেটিক্স এক নতুন আর্কাইভের উন্মোচন করেছে

কাঠের ফ্রেমে টানানো ছাগলের চামড়া থেকে তৈরি পার্চমেন্ট। পশুর ত্বকের কোষীয় উপাদানই বহু শতাব্দী পর জিনগত তথ্য উদ্ধারের সুযোগ তৈরি করছে।
Credit: Michal Maňas

বিশেষ ব্রাশ থেকে উপাদান সংগ্রহের পর, বিজ্ঞানীরা কোষগুলো আলাদা করেন। এই আলাদা কোষ নিয়ে তাঁরা ফরেনসিক স্তরের পরবর্তী প্রজন্মের সিকোয়েন্সিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে জেনেটিক সিকোয়েন্স উদ্ধার করেন। উদ্ধার করা সিকোয়েন্সের প্রসার ঘটান তারপর।
স্টিনসন বলেন, ” ইতিহাস, সাংস্কৃতিক আর কৃষিভিত্তিক চর্চা সম্পর্কে নতুন ও বাস্তব তথ্য পেতে আমরা মূলত অত্যাধুনিক প্রযুক্তি এবং জেনেটিক বিশ্লেষণ পদ্ধতি ব্যবহার করছি।” ব্রীন বলেন, “আমরা দেখিয়েছি যে এই প্রাচীন পার্চমেন্টের কোন ধরনের ক্ষয় না করেই এই সব অমূল্য ঐতিহাসিক থেকে বিপুল পরিমাণ নতুন তথ্য বের করে আনা যেতে পারে। আমরা গভীরভাবে বিশ্বাস করি, আমাদের কাজ ঐতিহাসিক নথিপত্র সংরক্ষণের দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর মধ্যে আমাদের প্রতি আস্থা তৈরি করবে।”
স্টিনসন আরও যুক্ত করেন , “আমরা এই ক্ষেত্রের সম্ভাবনা নিয়ে খুবই উত্তেজিত। আমাদের কাজের নতুন সকল সম্ভাবনাকে আরও খতিয়ে দেখার জন্য অর্থের যোগানের সন্ধান করছি। আমরা প্রমাণ করেছি, এসব কাজের ফলে ঐতিহাসিক তথ্যের একটি বিশাল ও অব্যবহৃত উৎস ধীর গতিতে হলেও নির্মিত হচ্ছে। আমরা ইতিহাস উদ্ধারের কাজ সাধ্যমতো চালিয়ে যেতে চাই।”

ব্রীন বলেন, “এই গবেষণায় আমাদের সামনে অপূর্ব সব সুযোগ রয়েছে। এটি মূলত সম্পূর্ণ নতুন একটি ক্ষেত্র, যা জিনতত্ত্ব থেকে শুরু করে মধ্যযুগীয় ইতিহাস পর্যন্ত সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের একসাথে নিয়ে এসেছে।”

সাইটেক ডেইলিতে প্রকাশিত নর্থ ক্যারোলিনা স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ম্যাট শিপম্যানের নিবন্ধ অবলম্বনে

ডিএনএর ডাবল হেলিক্স কাঠামো। পার্চমেন্ট থেকে সংগৃহীত কোষের জেনেটিক সিকোয়েন্স বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্ট পশুর প্রজাতি, বংশবিকাশ ও অতীতের কৃষিচর্চা সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
Credit: National Human Genome Research Institute

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সাবস্ক্রাইব

spot_img

সম্পাদকের নির্বাচিত

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

ইনকা সভ্যতা ও ইনকাদের অজানা গল্প

দ্বিতীয় পর্ব অনুবাদ : কায়জার কাবির (স্পেনের সোনার লোভই শেষ পর্যন্ত...

আমার ব্যারিম্যান

সে ও বার্গম্যান আমার জীবনে প্রথম এসেছিলো। আজ সে...

শরীরের রূপান্তর সুরযন্ত্রে: একটি বাদ্যযন্ত্র প্রদর্শনী

নিউইয়র্কের মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অব আর্টে গত জুনে একটি নতুন...