গল্পের আল মাহমুদ : প্রকৃতি ও প্রেমে

Share post:

Date:

বাংলার প্রকৃতি স্বাস্থ্যউজ্জ্বল, সবসময়েই উচ্ছ্বল,যৌবনের জয়গান তার সহজাত। শত অপমান, অবমাননা, বিপর্যয়েও সতেজ, সহজ। প্রকৃতিকে দুমড়ে মুচড়ে দিলেও অন্তর্লীন শক্তিতে নিজেই আবার মাথা টানটান। উর্বর এই মাটি, বাংলার মানুষের মন। প্রেমের কামের বাসনা আকাশছোঁয়া, স্বপ্নধোয়া, দ্বিধাহীন। আল মাহমুদের গল্প সৃজনের সময়কালে রাষ্ট্রের নাগরিকের ক্রমাগত পরিবেশ বিনাশ বিনষ্ট করেনি ঋতুবিন্যাস, বর্তমানের মতন একের ভেতরে অন্যে বাঁধেনি বাসা। প্রত্যেক ঋতু আলাদাভাবেই অনুভূত হতো সংবেদনশীল মানুষের সকল ইন্দ্রিয়ে। আমরা যদি ধারাবাহিকভাবে তাঁর গল্পমালা পড়ি, দেখবো পরিবেশের ও মানুষের প্রকৃতির প্রেম এবং এই দুয়ের বিপর্যয় কেমন করে ঘটানো মানুষের পক্ষেই সম্ভব! গল্পগুলো যার কিনা দালিলিক উদাহরণ। পানকৌড়ির রক্ত, কালো নৌকা, জলবেশ্যা, রোকনের স্বপ্নদোলা এবং বুনো বৃষ্টির প্ররোচনা- গল্পসমগ্রের প্রথম পাঁচ গল্প নিয়ে আমাদের আলাপ এগিয়ে নেয়া যাক।

নতুন জামাইয়ের পাখি শিকার ও স্ত্রীসংসর্গের গল্প ‘পানকৌড়ির রক্ত’ প্রায় চিত্রকলার সৌন্দর্যে চিত্রায়িত। এ যেন গল্প নয়, একখানা চিত্রশালার প্রদর্শনীমালা। পাখির ও নারীর রক্ত এখানে একাকার।

‘বিল শুকিয়ে গিয়ে কাদাটা হয়েছে বনশুয়োরের চামড়ার মতো ভারি আর নরম’, শীতের মাঝামাঝিতে এমন এক বিলে পাখি শিকাররত গল্পের উত্তম পুরুষ৷ এখানে পাখি গুলির আঘাতে ‘ তাসের ঘরের মতো পানির উপর শাদা দুটি বড় পাখা খুলে বিছিয়ে’ দেয়। দ্বিতীয় পাখিটি কালো, তার চঞ্চলতায় ‘ জীবিকাজয়ী প্রাণীর দর্প’ ফুটে বের করে। স্ত্রীর গায়ের রঙ বিষয়ে উত্তম পুরুষের মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য : ‘ময়লা বললে যেমন একটা মায়ামমতাময় কালোরঙকে বোঝায়, আমার স্ত্রীর গাত্রবর্ণও তেমনি’। পাখি শিকারীকে দেখে ‘দ্রুত অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সাথে’ ‘ঢেউয়ের দিকে গলা লম্বা করে কাঁথার ওপর সুঁচ গাঁথার মতো শরীরটাকে পানির ভিতর ঢুকিয়ে দিয়ে ডুবে গেল’। হবুস্ত্রীর সাথে প্রথম সাক্ষাতে স্ত্রীর ‘বেণীর ফণায় দুটি শাদা গোলাপ গোঁজা’ এই অভাবিত বাক্য, বেণীকে ফণা হিসেবে কল্পনা একজন খাঁটি প্রেমিককবির পক্ষেই তো সম্ভব। আমাদের কারো কারো মনে পড়বে সেই অমর গান, অকারণে, ‘আলগা করো গো খোঁপার বাঁধন… ‘। দুই শ্যালিকা প্রথম পাখিটিকে বিছিয়ে দেবার পর তার ‘গাঢ় সবুজ পা বর্ষাধানের ঝরাধানের লকলকে ডাঁটার মতো পেছন দিকে বিছিয়ে থাকল। ‘ দ্বিতীয় পাখিকে গুলি করার পর ‘ পাখিটার লাল রক্ত, সবুজ জল ও তার গাঢ় কালো পালকের আলোড়নে যন্ত্রণাদায়ক এক বর্ণের সমারোহ সৃষ্টি করে আমাকে স্তম্ভিত করে দিল।’

উত্তম পুরুষ প্রবল মাথা ব্যথা নিয়ে ঘরে ফেরে। স্ত্রী জানান দেয় ‘আজ হবে। ব্যাপারটা বন্ধ হয়েছে। ‘ গল্পের শেষ দিক অজস্র রঙে চোখ ঝলসে দেয়। দেখুন পাঠক : ‘ আদিনা বিছানায় উঠে এলে আমি তাকে বুকের কাছে টেনে আনলাম। আমার ব্যথার কোনো উপশম নেই। আদিনা তার বুক দিয়ে আমার মুখমন্ডল ঢেকে দিলে আমি পানকৌড়ির পালকের মতো গাঢ় কালোরঙের মধ্যে আমার জোড়া ভ্রমরের মতো জ্বালাধরা চোখ দুটিকে ডুবিয়ে দিয়ে স্বস্তি পেতে চাইলাম। আস্তে আস্তে কালো পালকের মতো অন্ধকার ফিকে হতে লাগল। লিকার- ভরা চায়ের কাপে ফোঁটা ফোঁটা দুধ মেশালে যেমন হয়, অনেকটা তেমনি। কিম্বা পাঙাশ মাছের পেটের মতো একধরণের ভোর-ভোর অবস্থা এসে আমার চোখের অন্ধকারকে হালকা করে দিল। ‘ আল মাহমুদ প্রথম গল্পেই নারী ও প্রকৃতি, শিকার ও রতিবিভঙ্গ জলরঙের কুশলতায় আঁকেন। বনফুলের ‘ভুবন সোম’ পড়েছিলেন কি না লেখক জানতে ইচ্ছে করে মাঝে মাঝে।

‘কালো নৌকা’ সমুদ্রগামী জেলেদের গল্প যেখানে পরিবার পরিজন প্রায় নিখোঁজ হয়ে যায়৷ মানুষ একটি নিরাপদ সংসার পেতে চেয়ে পায় না। নিয়তি পরিশ্রমী মানুষের জীবনকেও তছনছ করে দেয়। রাসু জলদাস, এই গল্পের নায়ক নিজের ছেলের সমুদ্রে নিখোঁজ হওয়ার বেদনা এবং স্ত্রীর মৃত্যুবেদনা সহ্য করে। পুত্রবধু উন্মাদ ঘুরে বেড়ায় নগ্নদেহে, এই দৃশ্যও সয়ে যেতে হয়। একদিন, মদ খেয়ে নিজের ধীর স্থির সংযত স্নায়ুকে বিপদের প্রান্তসীমায় ঠেলে দিতে হলো তাকে। পুত্র দামোদর আর স্ত্রী সতীর অনুপস্থিতি তার নিজস্ব যুক্তিজাল ভেঙেচুরে দেয়। পুত্রবধুর সাথেই শরীরের ভেতর দিয়ে কোনো একটা সম্পর্কে সম্পর্কিত হতে চায়, মেয়েটির উন্মাদদশার সুযোগে। কিন্তু নিয়তি! শেষ তিন লাইনে নিয়তি সব ছিন্ন করে দেয় : ‘ জোয়ার তখন নৌকাটাকে ঢেউয়ের উপর ভাসিয়ে দিয়েছে। বঙ্গোপসাগরের নোনা বাতাসের গতি মধ্যরাত্রে ডুবন্ত বেলাভূমির উপর দিয়ে হু-হু করে বইতে লাগল। আর বাতাসের সাথে ঘুরপাক খেতে খেতে একটা চালকহীন কালো নৌকা অন্যায় ঢেউয়ের উপর দুলতে দুলতে নিরুদ্দেশের দিকে ভেসে গেল। ‘

‘রোকনের স্বপনদোলা’ খুব সাদামাটা এক গল্প। স্ত্রীকে নিয়ে রেলভ্রমণের সময় সামনে বসা নারীটিকে দেখে চেনা লাগলে, অনেক ভেবে টের পায় প্রাকবিবাহকালে যে কয়েকজন নারীকে বিবাহেচ্ছায় দেখে বেড়িয়েছিল ইনি তারই একজন কিন্তু তখন মুখোমুখি এতোটাই জড়সড় হয়ে বসেছিলেন তাঁর সৌন্দর্য এই গল্পের সময়কালে, সামনে বসে থাকা পূর্ণ রাতের মত দৃশ্যমান হয়নি। রোকনের স্মৃতিতে নারীদের মিছিল যেভাবে আবির্ভূত হয়, আমার মনে পড়ে গিয়েছিলো ভুবনজয়ী পরিচালক ফ্রাসোয়া ত্রুফো’র ‘দ্য ম্যান হু লাভড ওম্যান’ চলচ্চিত্রখানি যে সিনেমায় মানুষটির শেষকৃত্যে রাশি রাশি মেয়েরা আসে, মিছিল সমারোহে৷ গল্পটির ঘটনা ঘটে রোকনের স্বপ্নের ভেতর। পুরুষহৃদয়ের একটি নিয়মহীন জান্তব যৌনবৈশিষ্ট্য এই গল্পের কাহিনিভাগ মাংসল করেছে৷ এমনকি ঘুম ভেঙে গেলে, সীতাকুণ্ড স্টেশনে এসে রেল থামলে – ‘ বাইরে, পূর্বদিকে চন্দ্রনাথ পাহাড়কে ধরিত্রীর বিশাল পাথুরে স্তনের মতো মনে হল। তার ফাঁক দিয়ে সূর্যের অর্ধাংশকে মনে হল এক অভাবিত উজ্জ্বল ধাতুর লকেট। ‘

‘জলবেশ্যা’ গল্পের জায়গাজমিন লালপুর হাট ও সন্নিহিত মেঘনা নদী, নদীর ভাসমান নারী যারা শরীর বিক্রি করে উপার্জন করে৷ প্রকৃতির চেহারাটা লেখকের কলমেই দেখে নেয়া যাক : ‘ ওপারের গ্রামগুলোকে একটা ক্ষীণ কালোরেখার মতো দেখা যাচ্ছে। রেখার মধ্যে দু- একটা আলোর ফোঁটা, দুধের ফোঁটার মতো স্পষ্ট হয়ে আছে। বেদেদের ঝাঁকবাঁধা নাওগুলোর আলো নদীর ছোট ছোট ঢেউয়ে প্রতিবিম্ব তুলে একটা অখন্ড আলোর মালার মতো ভাসমান মনে হচ্ছে। কিম্বা মনে হচ্ছে, নদীর ভেতরে নুয়ে পড়া কয়েকটা হিজল গাছকে যেন একঝাঁক অতিকায় জোনাকি ঘিরে ধরেছে৷ ‘ আবিদ বেপারী এক মাতৃহারা ছেলে, বাপে খেদানো, হাটে দালালি করে খায়৷ মায়ের কবরস্থানের দিকে চিৎকার করে যখন বলে : ‘মায়ো, বাজান আবার এক বেডিরে বিয়া কইরা আমারে খেদাইয়া দিছে। জমিজিরাত কিছু দেয় নাই৷ আমি বাজারে ব্যবসা করি, দালালি করি। ভালাই আছি। তুই হুনছ মায়ো, আমার কতা? হুনছ?’ আকাশ ব্যাপ্ত করে তারার ভেতর তখন ‘সাপের ডিমের মত শাদা চাঁদ’ দেখা দিয়েছে। এই গল্প প্রতারণার৷ এই গল্প জলে ভেসে বেড়ানো বেশ্যার যাবতীয় পুরুষের ওপর প্রতিশোধ নেবারও এক গল্প। একটি অনন্য সঙ্গমসম্ভাবনা বেদেনীর পরিকল্পিত পায়ের আঘাতে ঝুপড়িখোলা সাপের ছোবলে কেমন করে ছিঁড়েখুড়ে যায় তা না পাঠ করলে পাঠককে ধরিয়ে দেয়া অসম্ভব। এবং এই কারণেই আল মাহমুদের যে তিন গল্প প্রজন্মান্তর জুড়ে ধ্যানী পাঠক মাত্রেরই পরিচিত তার একটি ‘জলবেশ্যা’।

‘বুনো বৃষ্টির প্ররোচনা’ ইটের ভাটার ব্যবসায়ীর মনোদৈহিক জটিলতার গল্প। সমান্তরালে তার প্রকাশ্যে নারীবান্ধব স্ত্রীর একান্তে গৃহকর্মীর উপর খড়গহস্ত হওয়ার গল্প। এই গল্পে গল্পকার পরিবেশ বিপর্যয়ের ফলাফল সম্পর্কে ভাবেন। ভাবেন হিমালয়ের যে চূড়োয় বাতাস ধাক্কা লেগে ফেরে তা না থাকলে বা খানিক নিচু থাকলে কি হত! আকাশ থেকে ঢাকা শহরকে অচেনা লাগে মাহমুদের৷ অন্তরের চোখ দিয়ে এমনকি প্রাচীন নগরের আত্মাকে দেখে৷ তার মনে হয় : ‘… মানচিত্রটা হল একটা ফালতু ব্যাপার৷ ব্রহ্মাণ্ডের শুধু একটাই মানচিত্র হতে পারে মাহমুদ ভাবল, আর তা পর্বত, নদী, সমুদ্র ও নোংরা নগরাদির চিহ্নহীন একটা নিরেট সবুজ বলের অনুরূপ। অবশ্য এ ধরনের কোনো মানচিত্র বেশ চালাকচতুর হয়ে ওঠা মানবজাতির কোনো কাজে লাগবে না৷ ‘ ‘ঈথারের উপর শাদা উটপাখির ডিম’ এর মত সাদা ধোঁয়ার কুন্ডলী যা কিনা সিগারেট হতেই সৃষ্ট, দাবী করে বসে গৃহকর্মীর পুরো জীবদ্দশার মাইনে। কারণ হিসেবে বলে : ‘ তেইশ বছর যাবত সে পৃথিবীতে আছে। খাটছে। যা কিছু ধুয়ে দেবার ধুয়ে দিচ্ছে। যা কিছু ফলিয়ে তুলবার ফলিয়ে দিয়েছে। তার শরীর তুমি দেখেছ। কোনো খুঁত নেই৷ তার সাধ্যমতো সে ভরিয়ে রেখেছে। গড়ে তুলেছে৷ এখন তার পাওনা মিটিয়ে দিতে হবে না?’ এইভাবে একজন কর্মী মানুষের পুঁজিবাদের কাছে কেবল নয় সাধারণ কান্ডজ্ঞানের কাছে প্রাপ্য সম্পর্কে আমাদের চেতনাটা জ্যান্ত করেন আল মাহমুদ।

এই পাঁচ গল্পে আমরা দেখতে পাচ্ছি গল্পের চরিত্ররা অনেক বেশি শরীরকাঙাল। লুকিয়েচুরিয়ে নানাভাবে নারীশরীরের নানা মণিমাণিক্যের সন্ধান তারা দক্ষ ডুবুরীর কায়দায় করতে চায়৷ কোথাও প্রতারণা অনুষ্ঠিত হয়, কোথাও এমনকি অজাচারের অন্যায়ে গল্পের বর্তমান অগ্রাহ্য করে ভেসে যায় দুটি নারীপুরুষবাহী নৌকা। পরের তিন গল্পে লেখকের সন্ধানের অনেকটা জুড়ে মানুষের মন।

‘মাংসের তোরণ ‘ গল্পের তরুণ প্রকৌশলী পয়সার বিনিময়ে কিনতে চেয়েছিলো নিটোল নারীদেহ। কিন্তু এই নারী একইসাথে জননীও। ছেলের স্কুলব্যাগ কিনে দিতে হবে পরদিনই। তাই ধনীপুত্রের খামখেয়ালের কাছে ভেসে গেলে তার চলে না এবং এ কারণেই বিন্দুমুহূর্তের জন্য প্রকৌশলী জননীর ভুলবোঝা আবেগের জন্য ক্ষণেকের জন্য বর্তমান বিস্মৃত হলেও তাকে টাকাটা ঠিকই তুলে নিতে হয়। এবং যাওয়ার বেলায় মাতাল ও ঘুমে প্রায় তলিয়ে যাওয়া আনজামের কাছে হয়ত পয়সাটা সঠিক উপার্জনের জন্যই সে নগ্ন হয়ে দাঁড়ালে আমরা বাংলা গল্পের ম্যাজিক দেখি : ‘ আনজাম দিলারার শাদা তলপেটের ওপর বাতিটার সবুজ আলোর বিকিরণ দেখতে লাগল। কিন্তু মাথা বা বাহু কিছুই নাড়াতে পারল না। তার স্থিরনিবদ্ধ চোখে দিলারার বিস্তৃত সবুজাভ নাভীমূলকে বাংলাদেশের মানচিত্র বলে মনে হল কিনা, কে জানে। কারণ সেখানে এককালের সন্তানধারণের ফাটল অর্থাৎ বলিরেখা সুস্পষ্ট থাকায় চিহ্নগুলো মাতাল চোখে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা বা ধলেশ্বরী বলে ভাবা এখন আনজামের পক্ষে বিচিত্র নয়। ‘

চিররোগা একটি মেয়েকে গভীরভাবে ভালোবাসবার গল্প ‘ভেজা কাফন’। দুনিয়াতে কোনো কোনো প্রেমে মানুষ এমনভাবে, এমন আক্ষরিক অর্থে ‘পড়ে’, যেখানে উদ্ধারের পথ থাকে না। এই নূরী মেয়েটি যার গোড়ালিকে গল্পের নায়কের মনে হত ‘ বোশেখের মেঘের ফাঁকে বিদ্যুতের চমক’, যে কিনা লিখত প্রচুর চিঠি, সে মরে গেছে। মাত্র পাঁচ পৃষ্ঠার গল্পে মেয়েটির স্পষ্টবাদিতা, প্রেম, অঝোর পত্রাবলী, যৌন তৃপ্তি ও অতৃপ্তি, সন্তান আকাঙ্ক্ষা সত্ত্বেও মরে যাবে জেনে মা না হওয়া সব এমনভাবে চিত্রনাট্যধরণে উল্লেখিত যে মনের ভেতর প্রচন্ড শুকনো এক হাহাকার চৈত্রদুপুরের অনেক ঝরাপাতার ঘূর্ণির অভ্যন্তরভাগের মত শূন্যতা তৈরি হয়। ‘ আমি দেখলাম নূরীর নাকফুলটি তার নাকে না থাকায় চিরচেনা মুখটি বড়ো অপরিচিত লাগছে৷ মাঝে মাঝে আমাদের বাড়ির পুকুর থেকে যখন লাল শাপলার গুচ্ছ তুলে ফেলা হয়, তখন পুকুরের টলটলে পরিচ্ছন্ন পানিকে যেমন লাগে তেমনি। ‘ শেষ দুই বাক্য পাঁচ পৃষ্ঠার গল্পকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।

‘নীল নাকফুল’ সে-ই চিরপরিচিত বৃদ্ধ জোতদারের গৃহকর্মী সুন্দরী তরুণীকে বিয়ে করার গল্প হলেও এই গল্প জোতদার, ভূমিহীন কৃষক, মজুর এইসকল চরিত্রেদের তাদের আচরণ, খাদ্য অভ্যাসসহ এমনভাবে তুলে ধরা হয়েছে এটি বাংলাদেশের শস্যফলনের গল্প, এখানেও শস্য ও নারী সমার্থক। গল্পকার বড়ো নিষ্ঠুর কেন না ওসমানকে একটা অসহ্য বেদনভার চেপে রেখে কদমবুসি করতে হয় ছোটোচাচীকে। আহা! সে কী তখন প্রেমিকার পা স্পর্শের বিন্দু আনন্দ পেয়েছিলো! কিন্তু নীল নাকফুল তবু সে স্মৃতির অলংকার করে রাখেনি।

বাংলা কবিতা যতটুকু বুঝি, বাংলাদেশের সবচেয়ে অনুভবী পরিশ্রমী কবি আল মাহমুদ। অনেকেই জানবেন, মুক্তিযুদ্ধের আগেই কলকাতায় সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় ও তাঁর বন্ধুরা যে মিনিবুক আন্দোলন গড়ে তুলেন, ছোটো বুকপকেটের মতন বইয়ের সেই বইসিরিজে বাংলাদেশের একমাত্র প্রতিনিধি ‘সোনালী কাবিন’ ও তিনি৷

আমাদের ছদ্ম প্রগতিশীলতা যা কিনা কবিতার বিশুদ্ধ অবয়ব না বুঝে তার উপর রাজনীতি আরোপ করে তারা শেষ বিচারে বাংলা কবিতার শত্রু। আমার কাছে বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকার দুষ্প্রাপ্য একটি সংখ্যা আছে। সেইখানে শামসুর রাহমান আর আল মাহমুদ দুই বন্ধুর কবিতা পাশাপাশি। বাংলা সাহিত্যে সবচেয়ে বড় কবিতাবোদ্ধার সমস্যা হয় নাই। আমরা কবিতার চেয়ে রাজনীতি বেশি বুঝি তাই তাঁকে ভালোবাসতে, মর্যাদা দিতে আমাদের সমস্যা হয়। কয়েকটি গল্পের ধারাবাহিক পাঠে আমরা দেখলাম বাংলা সাহিত্যের সম্পদ এই গল্পগুলোকে অস্বীকার করলে আমরা আমাদের নির্বুদ্ধিতারই প্রকাশ ঘটাবো।

2 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সাবস্ক্রাইব

spot_img

সম্পাদকের নির্বাচিত

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

মুঘল সাম্রাজ্যের তিন দার্শনিক গল্প

বাবর, পানিপথের যুদ্ধে ইব্রাহীম লোদীকে পরাজিত করে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন...

ঔপন্যাসিক ইয়াং যুয়ান জি’র সাক্ষাৎকার

অনুবাদ : স্বাতীলেখা মিত্র 'তাইওয়ান ট্রাভেলগ' লেখার পেছনের অনুপ্রেরণা সম্পর্কে...

পাপের প্রেত

লর্ড ডানসেনি ভাষান্তর: সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় আমার ভাইয়ের সঙ্গে সেই বিশাল নির্জন...

তিন টুকরো চিন্তা : রবীন্দ্র প্রাসঙ্গিক

মার্ক্সিস্ট স্কুলের সামান্য ছাত্র হিসেবে জানি, একটা গল্প কে...