আজ ২২শে শ্রাবণ,১৪৩৩।
আজ তিনদিন ধরে আমাদের দিগন্তবৃত্ত শ্রাবণে শ্রাবণময়। অর্থাৎ রবীন্দ্রময়। বৃষ্টিধারা যখন আবহে বাতাসের বাঁশির সুর নিয়ে সরাসরি মেঘের কোল থেকে নেমে আসে তখন আমাদের শ্রবণ জুড়ে বাজে সেই তাঁরই গান- শ্রাবণ তুমি, বাতাসে কার আভাস পেলে / পথে তারি সকল বারি দিলে ঢেলে।
একটা সময় ছিলো, এমন বৃষ্টির গান হৃদয়ের গহীনতম স্তরে পৌঁছে দেবার মন নিয়ে, প্রতি রোমকূপে বৃষ্টির গান পান করবো বলে ঘুমের মাসিপিসিদের সাত সমুদ্রের ওপারে পাঠিয়ে দিয়েছি। আজ বেলা শেষে মা বাবা দুদিকের ওই মায়েরা কড়ায় গণ্ডায় তার শোধ নিচ্ছেন। এখন বৃষ্টির শব্দে কেবলি ঘুম পায়।
আসল কথাটি হচ্ছে আমাদের শ্রাবণ তো শ্রাবণ, বর্ষা মানেই তিনি। তিনি মানে শুধু তাঁর গান নয়, তাঁর তাবৎ সৃজনযজ্ঞও বটে। একেবারে ঘনিয়ে এনে বলা যায়, তাঁর ছিন্নপত্র। ( ঘনিয়ে তোলা কথাটি অন্য কারো) এই ছিন্নপত্রের প্রকৃতি থেকেই নওয়াজীশ আলী খান একশো চল্লিশটি দৃষ্টিনন্দন স্থির চিত্র করেছেন।
১৯২৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে এসে কবিকে থাকতে হয়েছিল বুড়িগঙ্গার ওপর নোঙর ফেলা নবাবদের একঠি স্টিম- লঞ্চে। সেবারে একটি সপ্তাহ ঢাকায় কাটিয়ে যাবার বেলায় লিখেছিলেন গান, “এই কথাটি মনে রেখো।” আমাদের মনে পড়তে বাধ্য যে ছিন্নপত্রের পাতায় পাতায় যেসব ছবি তিনি এঁকেছিলেন সেসব তো আমাদের বাংলাদেশেরই ছবি। ইন্দিরা দেবীকে তো লিখেইছেন, “…চেয়ে চেয়ে দেখবার এবং দেখে দেখে মনটাকে ভরে নেবার এমন জায়গা আর কোথায় আছে?”
১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দের এক পত্রে ভ্রাতুষ্পুত্রীকে ছিন্নপত্রের চিঠিগুলি ফিরে ফিরে পড়ার ইচ্ছে ব্যক্ত করেছেন। কেন? না, অনেকদিনকার সঞ্চিত অনেকগুলো সকাল, দুপুর, সন্ধ্যের ভিতর দিয়ে, পুরনো পরিচিত দৃশ্যাবলির মাঝখান দিয়ে তাঁর বার বার যেতে ইচ্ছে করে। বলেছেন, “আমার গদ্যে পদ্যে কোথাও আমার সুখ দুঃখের দিনগুলি এরকম করে গাঁথা নেই “।ছিন্নপত্রের ১৫০ টি পত্রের মধ্যে ৯৬ টি পত্রেই নানা রূপে, নানা প্রসঙ্গে বাংলার প্রকৃতিই এসেছে ঘুরে ফিরে। ১৬ টির বেশি পত্রে বর্ষা ও বৃষ্টির একচ্ছত্র আধিপত্য ; ক্রমাগত ঝরছে বৃষ্টি, বিরামহীন।
সাজাদপুর, পতিসর বা শিলাইদহ, যেখান থেকে যা কিছু লিখেছেন, বাংলার প্রকৃতিই এসেছে ঘুরে ফিরে। স্বপ্নের মতো সে প্রকৃতিকে কী নিবিড় মগ্নতায় পর্যবেক্ষণ করেছেন, ছিন্নপত্রের ছত্রে ছত্রে তা সপ্রমাণ। স্বপ্নের মোহগ্রস্ত ঘোর কাটলে লেখেন, “পৃথিবী যে বাস্তবিক কি আশ্চর্য সুন্দরী তা কলকাতায় থাকলে ভুলে যেতে হয়।”
পতিসরের ধানকাটা খড়- বিচালিতে আচ্ছন্ন শীতের মাঠ শেষ সূর্যের কমলা – লাল রঙের আস্তরণে কী যে সুন্দর হয়ে ওঠে, তিনি বলেন, “শীতের মাঠ যেন চড়া তেলরঙের ক্যানভাস। অন্যদিকে দিগন্তের শেষপ্রান্তে গাছপালার ঘের দেওয়া পটে লাল নীলে মেশা মায়াময় আবছায়া রূপ, মনে হয় ঐখানে বুঝি সন্ধ্যার বাড়ি, সেখানে যেন গুন গুন স্বরে কোন এক বধূর স্বাপ্নিক প্রতীক্ষা ।
শিলাইদহ,সাজাদপুর ও পতিসরের আশ্চর্য দুপুরগুলোর কথাও ছিন্নপত্রে এসেছে নির্জনতা, নিস্তব্ধতা ও উদাসীনতার ছবি নিয়ে। এসেছে জলের শব্দ, বালির চর, ঝাউবনে থেকে পাখির ডাক এমনকি ধরণীর উত্তপ্ত নিঃশ্বাস গায়ে এসে লাগার কথা। কবির নিতান্তই ব্যক্তিগত চিঠিপত্র, যেসব চিঠিতে বাহুল্য কথা বলতে গেলে নেইই প্রায়, সেসব চিঠিতেও সময় সুযোগ পেলেই তিনি বাংলাদেশের কথা বলতে ভোলেন নি। কাশ্মীর ঘুরে এসে অসুস্থ কন্যার জন্যে উদ্বিগ্ন কবি তাঁর খোঁজ নিলেন সবার আগে। তারপরই কাশ্মীর ভ্রমণ প্রসঙ্গে বললেন, কাশ্মীরটা না দেখলে মনে যে আক্ষেপ থেকে যেত, সেটাই কাটলো শুধু। ” আসলে আমার পদ্মার বালির চরে বোটের কাছে কেউ লাগে না— সেখানে নির্মল আকাশ, নির্মল নদী, নির্মল নদীতীর, নির্মল অবকাশ, সেই আমার ঠিক মনের মতো। ” অসুস্থ কন্যাকে এর বেশি আর কি লিখবেন কবি?
লিখেছেন ইন্দিরা দেবীকে, (১৮৯১,২৩ জুন), “আমার যৌবন ও প্রৌঢ় বয়সের সাহিত্যরস সাধনার তীর্থস্থান ছিল পদ্মাপ্রবাহচুম্বিত শিলাইদহ পল্লীতে।” আমাদের আত্রাই নদীতে ভাসতে ভাসতে ১৯২২ এর ১৫ই জুলাই লিখেছিলেন, “আমি কান পেতে রই।” তাঁকে নিয়ে যা কিছু আমরা লিখতে চাই, ব্যতিক্রমী গুণি ভিন্ন আমাদের সব তাঁর ধনে তাঁরই পূজা। বলা যায়, স্মরণাঞ্জলি।


