মরণঘাতী ইয়াবা : একটি তদন্তমূলক প্রতিবেদন

Share post:

Date:

ঢাকার এক ছোট, নোংরা এবং বিশৃঙ্খল ফ্ল্যাটের ভেতরের ঘরে, এক যুবক অ্যালুমিনিয়াম ফয়েলের একটি টুকরো ছিঁড়ে নিল। ফয়েলের ওপর একটি কমলা রঙের ট্যাবলেট রাখলো তারপর। কয়েকটি ছেঁড়া দশ টাকার নোট একসঙ্গে পেঁচিয়ে একটি পাইপের আকার দিলো। ফয়েলের নিচে একটি লাইটার জ্বালাল। কিছুক্ষণের মধ্যেই এই যুবক জ্বলন্ত ট্যাবলেট থেকে বের হওয়া ঝাঁঝালো ধোঁয়া ফুসফুসের অনেক গভীরে টেনে নিতে শুরু করলো।

তিন টানেই পুরো ট্যাবলেটটি শেষ। এই যুবক দীর্ঘদিন ধরে মাদকাসক্ত। সে তার দাঁতের ফাঁকে একটি পুরনো প্লাস্টিকের বোতলের ছিপি চেপে ধরে আছে, মুখের ভেতর নতুন ক্ষতি আটকাতে। ধোঁয়া নেওয়ার পরপরই তার চোখ দুটো বিরাট হয়ে এলো। গোল আর প্রকান্ড। ইয়াবা শ্বাসে নেয়ার আফটার এফেক্ট।
আধা ঘণ্টা আগেও তার মধ্যে যে ঝিমুনি ভাব ছিল, তা মুহূর্তেই কেটে গেল। ভর করলো এক বদ্ধ উন্মাদ ও নিয়ন্ত্রণহীন শক্তি। এখন মাত্র সকাল, অথচ আগামী চব্বিশ ঘন্টা তার ক্লান্তি বোধের কোন সম্ভাবনা নেই । এসব ইয়াবার কারণে তৈরি হওয়া এক নিয়মিত অভ্যাস। এই ছোট ট্যাবলেটটি মূলত মিয়ানমারে তৈরি হয়। থাইল্যান্ডে ‘ইয়া বা’ শব্দের অর্থ “পাগল ওষুধ”। একসময় থাইল্যান্ডের দূরপাল্লার ট্রাক চালকেরা এটি আইনীভাবেই ব্যবহার করতেন। থাইল্যান্ডে এটি নিষিদ্ধ হওয়ার কয়েক দশক পর, এখন তা বাংলাদেশে মানুষের জীবন ধ্বংস করছে।
বাংলাদেশে ইয়াবার চাহিদা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এই সময়ে।

ছবি: দ্য টেলিগ্রাফ

ইয়াবা ছোট এক ট্যাবলেট। এতে মেথঅ্যামফিটামিন ও ক্যাফেইনের একটি তীব্র মিশ্রণ থাকে। এই মিশ্রণ ব্যবহারকারীকে এক ধরনের শক্তি সরবরাহ করে । তবে দীর্ঘ সময়ের অপব্যবহারকারীরা গুরুতর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিতে পড়েন।

গত দুই দশকে এশিয়া জুড়ে এর চাহিদা ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়েছে, বিশেষ করে বাংলাদেশে। আমাদের দেশের মিয়ানমারের সাথে একশো ষাট মাইলের যুক্ত সীমান্ত আছে । এই সীমান্ত প্রায় অরক্ষিত। উপকূলীয় শহর কক্সবাজারের আশেপাশে ইয়াবা ধরার ঘটনা ঘন ঘন ঘটে। এই সমুদ্র শহরে পাচারকারীরা কাছাকাছি অবস্থান করা বিশাল রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোকে চালানের ড্রপ জোন আর ইয়াবা ঢাকায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য ক্যারিয়ার অর্থাৎ বহনকারী সংগ্রহের একটি সহজ ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। শুধুমাত্র এপ্রিল মাসেই এই অঞ্চলে পৃথক অভিযানে দশ লক্ষেরও বেশি ট্যাবলেট বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।

বাংলাদেশে ২০১৮ সালে ইয়াবা ব্যবসার বিরুদ্ধে একটি বড় ধরনের সরকারি অভিযান সংগঠিত হয়। ফলে বাংলাদেশে দুইশ এগারো জনের মৃত্যু ঘটে, তবে এই ব্যবসা এখনো চলছে। দ্য টেলিগ্রাফ-কে ঢাকার কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে অবাধে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এই নিরাময় কেন্দ্রে ডিটক্স থেরাপি বা বিষমুক্তকরণ চিকিৎসা নেয়া অধিকাংশ মাদকাসক্তই ইয়াবা আসক্তি থেকে সুস্থ হয়ে উঠছেন।

একটি মলিন ভবন। জায়গায় জায়গায় রং উঠে গেছে এই ভবনের। ওপরের তলায় অবস্থিত এই সুরক্ষিত ইউনিটটি ইউনিফর্ম পরা রক্ষীরা পাহারা দিচ্ছেন। তারা ইস্পাতের গ্রিলের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন যা দরকার হলেই তালা আটকে দেয়া যায়। আমাদের প্রবেশ করবার জন্য ইস্পাতের গ্রিল এক পাশে সরিয়ে নেয়া হয়। ভেতরে ঢোকার পর, বর্তমান অধিবাসীদের অপেক্ষারত মুখগুলো আমাদের স্বাগত জানায়। কাউকে কাউকে এই মনোযোগ বা পরিবর্তনের কারণে বেশ আনন্দিত মনে হলো, আবার অন্যদের চোখে-মুখ শক্ত ও ক্ষুব্ধ । তাদের বেশিরভাগকে সর্বোচ্চ মাসখানেকের জন্য ,তাদের বাবা-মা বা পরিবারের অন্য সদস্যরা পাঠিয়েছেন এই নিরাময় কেন্দ্রে। ঢাকার ট্রাফিকের অবিরাম কোলাহল ঠিক বাইরেই শোনা গেলেও তারা কার্যত এখানে বন্দি। যে রাস্তাগুলো থেকে তারা খুব সহজেই অল্প পয়সার ইয়াবা ট্যাবলেটগুলো সংগ্রহ করতে পারত সেসব রাস্তা থেকে তারা এখন বিচ্ছিন্ন। এই ইয়াবাই তাদের টিকিয়ে রেখেছিল এতদিন।

ছবি: দ্য টেলিগ্রাফ

কর্মকর্তারা যদিও জোর দিয়ে বলছেন, এই মানুষগুলো কোনো রকমের বন্দী নন, তবুও জানালার লোহার শিকগুলো অন্য কিছুরই ইঙ্গিত দেয়। পেছনের দেওয়ালে আঁচড় কেটে কেটে দিনের হিসাব লিখে রাখা হয়েছে। তারা মুক্ত হওয়ার মতো সুস্থ বা ‘ক্লিন’ তা প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের এখানেই আটকে রাখা হয়। তেইশ বছর বয়সী শফির মেয়াদের আজ ছয় দিন চলছে। সে চমৎকার এক উজ্জ্বল, মেধাবী তরুণ। ইয়াবা আসক্ত হওয়ার আগে সে ছিল উচ্চমাধ্যমিকের এক কৃতী ছাত্র। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং একজন অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় শিক্ষাবিদের ছেলে হিসেবে তার ভালো জায়গায় পৌঁছানোর মতো যথেষ্ট চেনা-জানা বা যোগাযোগ ছিল। তার চাচা তাকে ইয়াবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে দশ হাজার ট্যাবলেটের এক একটি বড় চালান আমদানি করতেন।

“আমি চাচার সংগ্রহ থেকে মুঠোভর্তি ইয়াবা বড়ি তুলে নিতাম,” শফি স্মৃতিচারণ করে। “আমার বয়স তখন মাত্র তেরো বছর। আমি শুধু কৌতূহল থেকে নিতাম। যখনই মন চাইত, আমি নিয়ে নিতে পারতাম। এর জন্য আমার কোনো টাকা লাগত না।” “আমার সবচেয়ে খারাপ সময়ে, আমি একটানা পুরো সাত দিন না ঘুমিয়ে কাটিয়েছি,” সে স্বীকার করে। “ওই সময় আমি মানসিকভাবে অনেক বেশি ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছিলাম। শান্ত ও ভদ্র হিসেবে পরিচিত একজন মানুষ থেকে আমি হুট করেই আশেপাশের মানুষের ওপর সবসময় মেজাজ হারাতে শুরু করলাম। আমার মা যখন আমাকে খাওয়ার জন্য ডাকতেন, আমি শুধু তাঁর সাথে চিৎকার-চেঁচামেচি করতাম। একবার আমি চার দিন ধরে কিছুই খাইনি।”

রিহ্যাব সেন্টারের শফিসহ মারাত্মক কিছু রোগীর ক্ষেত্রে, ইয়াবার কারণে তৈরি হওয়া এই ঘুমহীন উন্মাদনা পরবর্তীতে আরও শক্তিশালী চেতনানাশক জাতীয় মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেটি ছিল টানা কয়েকদিন জেগে থাকার পর শরীর ও মনকে শান্ত করার একটি উপায়। “ঘুম না আসার ক্ষতিপূরণ করতে আমি হেরোইন নিতাম,” শফি ব্যাখ্যা করে। “আমি সারাক্ষণ এই চক্রের মধ্যে আটকে ছিলাম। একদিন ইয়াবা, তো পরের দিন হেরোইন। এছাড়াও আমি ফেন্টানিল এবং মরফিন নিতাম। হাতের কাছে যা পেতাম তা-ই। বন্ধু বা অন্য ব্যবহারকারীদের অনলাইন ক্যাসিনো ব্যবহারের সুবিধা দিয়ে আমি আমার এই অভ্যাসের টাকা জোগাড় করতাম।”

“মাদক নেয়ার কারণে আমার অ্যাপেন্ডিসাইটিস হয়েছিল। আমি অস্ত্রোপচারের জন্য হাসপাতালে গিয়েছিলাম, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সার্জন আমার অপারেশন করতে রাজি হননি। কারণ চেতনানাশক এবং ব্যথানাশক হিসেবে তারা আমাকে যে পেথিডিন দিতে চেয়েছিলেন, সেটির প্রতি আমার টলারেন্স খুব বেশি ছিল। তারা অপারেশন চালিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি নিতে পারছিলেন না।”

ছবি: দ্য টেলিগ্রাফ

শফির সাথে কথা বলার সময় সে আমার সাথে ইংরেজি এবং আমাদের চারপাশে থাকা অন্যদের সাথে বাংলার মধ্যে সাবলীল যাতায়াত করছিল। তার জীবনের এই চরম অধঃপতন বিশ্বাস করা কঠিন।
সে ভাত আর ডাল খাওয়ার বাটি ধরেছিল হাত দিয়ে। সেই হাতের বাহুতে অসংখ্য সুঁইয়ের দাগ দেখতে পেয়েছি। সে ব্যাখ্যা করে, সস্তা এবং সহজে পাওয়ার কারণে ইয়াবা ঢাকার প্রতিটি কোণায় ছড়িয়ে পড়েছে। জরাজীর্ণ বস্তি থেকে শুরু করে উচ্চবিত্ত এলাকা পর্যন্ত। ইয়াবা পুরো দেশকে সংক্রামিত করা এক ধরনের মহামারী বলে সে মনে করে।

এবারই সে রিহ্যাবে প্রথম আসেনি। ২০২৩ সালে তার পরিবার একটি বেসরকারি পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঁচ মাসের জন্য চিকিৎসার খরচ জুগিয়েছিল। কিন্তু সেখান থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার ঠিক পরের দিন সকাল থেকেই সে আবার ইয়াবা নিতে শুরু করে।
“আমি আমার পরিবারকে অকথ্য কষ্ট দিয়েছি,” শফি অকপটে স্বীকার করে। “আমার উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করার জন্য কলেজে ভালো একটা সুযোগ ছিল, কিন্তু প্রচুর ইয়াবা নেওয়ার কারণে আমি পড়াশোনা ছেড়ে দিই। এবার এখানে সুস্থ হতে আসার সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণ আমার নিজের। আমার অনেক ধরনের শারীরিক জটিলতা দেখা দিয়েছে। আমার রক্তনালীগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। আমাকে কিছু একটা করতেই হবে।”
শফি অলস পায়ে হেঁটে তার ডরমিটরিতে ফিরে যায়। সে একটি লোহার ফ্রেমের বিছানার ওপর পাতলা তোশকে শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। ক্লিনিকের চারটি ডরমিটরিতে মোট বত্রিশটি বিছানা রয়েছে। এই বিছানাগুলো প্রায় সব সময়ই রোগীতে পূর্ণ থাকে।

বিকেলের দিকে, ইয়াবাসক্ত মানুষেরা সারিবদ্ধ বেঞ্চে বসেন। তখন চিকিৎসকরা তাদের সুস্থ করে তোলার জন্য উদ্দীপনামূলক বক্তব্য দেন। দেয়ালের গায়ে মাদকের ভয়াবহতা নিয়ে কঠোর সতর্কবার্তা ঝুলছে। একটি পোস্টারে ফাঁসির দড়ির ছবির ওপর লেখা- ‘মাদকাসক্তি? কোনো অজুহাত নয়’। অন্য একটি পোস্টারে মানুষের শরীরে ইয়াবার ক্ষতিকর প্রভাবগুলো ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

সাতাশ বছর বয়সী সিফাত জানান, কিশোর বয়সে কৌতূহলবশত শুরু করার পর এখন ইয়াবা ছাড়া তাঁর একটি দিনও চলে না। বস্তির এক গলির দোকানে বিক্রয়কর্মী হিসেবে চাকরি পাওয়ার পর এই মাদকের ওপর তাঁর নির্ভরশীলতা আরও জেঁকে বসে। প্রতিদিন সম্ভাব্য ক্রেতাদের সাথে অনর্গল কথা বলার জন্য যে বাড়তি শক্তির প্রয়োজন হতো, ইয়াবা তাঁকে সেটিই জোগাত। নিরাময় কেন্দ্রে কয়েক সপ্তাহ থাকার পর সিফাত কিছুটা শান্ত হলেও, তাঁর মধ্যে এখনো এক ধরনের অস্থিরতা ও চাপা উত্তেজনা টের পাওয়া যায়। ইয়াবার অভিজ্ঞতা এক সময়ের শান্ত স্বভাবের এই ছেলেকে হিংস্র এক রাস্তায় চাঁদাবাজ, গুণ্ডায় পরিণত করেছে।

“ইয়াবা খাওয়ার সাথে সাথেই মেজাজ খিটখিটে হয়ে যেত,” সিফাত বলেন। “ইচ্ছে হলেই আমি অন্যদের ওপর চড়াও হতাম, কখনো কিল-ঘুষি মারতাম, আবার কখনো লাঠি দিয়ে আঘাত করতাম।”
“মাঝে মাঝে রাস্তায় নিজের বন্ধুদেরই আক্রমণ করে বসতাম। বাসায় ফিরে আসবাবপত্র ভাঙচুর করতাম। সবসময় রাগ মাথায় চড়ে থাকত বলে ঘরের জিনিসপত্র এদিক-ওদিক ছুড়ে মারতাম।”
২০২৩ সালে বিয়ে করার পর সিফাতের এই অভ্যাস কিছু সময়ের জন্য কমেছিল। কিন্তু দাম্পত্য জীবনে ঝগড়া শুরু হতেই তিনি আবারও ইয়াবায় ফিরে যান। দিনে পাঁচটি বড়ি খেতেন তিনি। এই নির্ভরতা তাঁর ঘুম এবং খাওয়ার অভ্যাসকে পুরোপুরি এলোমেলো করে দিয়েছিল। সবচেয়ে খারাপ দিনগুলোর কথা স্মরণ করে সিফাত জানান, তিনি টানা তিন দিন জেগে থাকতেন। তারপর একটানা ২৪ ঘণ্টা ঘুমাতেন।
সিফাত স্বীকার করেন, ইয়াবা খেলে তার মনে হতো তিনি শক্তিমান। জীবনে সবকিছুই পাবেন। ” কিন্তু এই অভ্যাস আমার এবং আমার পরিবারের অনেক বড় ক্ষতি করেছে। আমি এখন তীব্র অনুশোচনায় ভুগি। আমাকে একজন ভালো মানুষ হয়ে উঠতে হবে।”
শোবার ঘরের বাসিন্দাদের অনেকেই আশঙ্কাজনকভাবে কম বয়সী। একেবারে সদ্য স্কুল গণ্ডি পার হওয়া নিষ্পাপ চেহারার কিশোর।

ছবি: দ্য টেলিগ্রাফ

সতেরো বছরের আমিনের মতো কেউ কেউ বয়ঃসন্ধির সময় থেকেই ইয়াবা নেয়া শুরু করেছিল। তার অধঃপতন একটি চেনা পথ ধরেই শুরু হয়েছিল। আট সন্তানের এক দরিদ্র পরিবারের ছেলে। শৈশবেই তাকে যে কঠোর শারীরিক পরিশ্রম করতে বাধ্য করা হয়েছিল, সেই ক্লান্তিকর বাধ্যতাকে সহজ করে দিয়েছিল এই মাদকের উদ্দীপক প্রভাব।

“এই জিনিস আমাকে সুপার ম্যানের মতো অনুভূতি দিত,” সে স্মৃতিচারণ করে বলে, “মনে হতো আমিই সেরা, আমার চারপাশের সবার চেয়ে উন্নত। যে টাকা আমার পরিবারকে দেওয়ার কথা ছিল, তা আমি ইয়াবার পেছনে খরচ করতে শুরু করলাম। এরপর, দীর্ঘ সময় ধরে জেগে থাকার জন্য আমার আরও বেশি ইয়াবার প্রয়োজন হতে লাগল। আমি বাড়ি থেকে জিনিসপত্র চুরি করে বিক্রি করা শুরু করলাম।” “যখন আমার বাবা-মা বিষয়টি জানতে পারলেন, তাঁরা আমাকে এখানে নিয়ে এলেন। কারণ নিজে থেকে এটি বন্ধ করতে পারছিলাম না। যদিও আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যে আমি ছেড়ে দেব।”

“ইয়াবা আমাদের সামাজিক কাঠামোকে ধ্বংস করে দিয়েছে,” বলেন এই কেন্দ্রের আবাসিক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ রাহয়ানুল ইসলাম। “আমাদের অবস্থা এখন আঠারোশো চল্লিশের দশকের আফিম যুদ্ধের আগের চীনের মতো। গ্রামীণ এলাকায় অবৈধ টাকা এবং ক্ষমতা ইয়াবার সাথে জড়িয়ে গেছে।”
“এখানে আমরা এমন লোকদের নিয়ে কাজ করি যারা ইয়াবা গ্রহণ করে। এই ইয়াবার ধরণটি সিন্থেটিক ক্যাফেইনের সাথে মিশ্রিত মেথামফেটামিন হতে পারে, পাশাপাশি অন্যান্য সিন্থেটিক চেতনা লুপ্ত করার উপাদানও থাকে। তারপর তাদের ঘুমানোর জন্য অন্য আরেকটি উপাদান গ্রহণ করতে হয়। এই মিশ্রণটিকে ‘গরিবের স্পিডবল’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। অন্যান্য দেশের মতো কোকেন ও হেরোইনের যুগ্ম উপস্থিতি আছে, তবে এটি আরও নিম্নমানের উপাদান দিয়ে তৈরি।” ইয়াবার ওপর নির্ভরশীল তরুণদের স্ট্রোক এবং হার্ট ফেইলিউরের শিকার হওয়ার অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে। যদিও এই মাদকটি হেরোইনের মতো রাসায়নিকভাবে আসক্তি তৈরি করে না।

ডা. ইসলাম আরো বলেন- ইয়াবা বাংলাদেশের জনাকীর্ণ শহরগুলোর পাশাপাশি গ্রামীণ এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, রিকশাচালকদের মধ্যে সস্তা ইয়াবার ব্যবহার ব্যাপকভাবে বিস্তৃত। পর্যাপ্ত অর্থ উপার্জনের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে হয় বলে তাঁরা ইয়াবাকে মুক্তির উপায় ধরে নিয়েছেন।

শফি আর আমার দেখা অন্যান্যদের বর্ণনার মতোই, তিনি ইয়াবার মাধ্যমে ঘটা দীর্ঘস্থায়ী স্নায়বিক উত্তেজনা এবং অনলাইন জুয়াখেলার আসক্তির মধ্যকার সংযোগটি নিশ্চিত করেন, যা বাংলাদেশে আরেকটি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেশ কয়েকজন তরুণ আমাকে জানান, ইয়াবা যৌন ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এমন একটি বহুল প্রচলিত বিশ্বাসের ফাঁদে পড়ে তারা এটি গ্রহণে প্রলুব্ধ হয়েছিলেন । বাংলাদেশের মতো একটি রক্ষণশীল মুসলিম রাষ্ট্রে ইয়াবা বিক্রির জন্য একটি বুদ্ধিদীপ্ত কৌশল।

“তাদের চিকিৎসা করা আমাদের জন্য খুবই হতাশাজনক,” ডা. ইসলাম আরো যুক্ত করেন। “চিকিৎসার জন্য আমরা ব্যবহার করতে পারি এমন কোনো সুনির্দিষ্ট ওষুধ নেই, কারণ এই মাদকটির রাসায়নিক গঠন অত্যন্ত জটিল ও পরিবর্তনশীল।”

বাংলাদেশে আনুমানিক ২৩ লক্ষ ইয়াবা ব্যবহারকারী রয়েছে। কর্তৃপক্ষ দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হওয়ার পরেও , মিয়ানমারের জঙ্গল সীমান্তের ক্যাম্পগুলো থেকে মাদক সম্রাটদের লক্ষ লক্ষ ইয়াবা ট্যাবলেটের কারখানা নিরবচ্ছিন্নভাবে চলছে। এটি বেশিরভাগই শান রাজ্যে উৎপাদিত হয়। রাজ্যটি মিলিশিয়াদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এবং সাধারণের নজর থেকে অনেক দূরে। একটি উৎস বন্ধ হয়ে গেলে দ্রুতই আরেকটি গজিয়ে ওঠে বিষলতার মতো৷

বাংলাদেশ সরকারের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একজন মনোরোগ বিষয়ক সোশ্যাল ওয়ার্কার আদনান জোবায়ের বলেন, “এখানে ইয়াবা এত বেশি ছড়িয়ে পড়ার কারণ হলো পরিবহন খুব সহজ এবং অন্যান্য মাদকের তুলনায় অনেক সস্তা।” “মানুষ সহজেই এক ধরণের সাময়িক উত্তেজনা পায় এবং দ্রুত তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। শুরুতে একটি ইয়াবা বড়ি আপনাকে এক সপ্তাহ সচল রাখতে পারে, কিন্তু শীঘ্রই তা বেড়ে তিন বা চারটিতে দাঁড়ায়। আসক্ত হয়ে পড়ার পরই মানুষের মধ্যে উদ্বেগ, সিজোফ্রেনিয়া, বিষণ্ণতা এবং পারসোনালিটি ডিজঅর্ডার দেখা দেয়। ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে এবং তাদের বেশিরভাগই কিশোর-কিশোরী।”

আলাদা একটি অফিসে, পুনর্বাসন পরামর্শক সুমি খান আরেকজন তরুণের বাড়ি ফেরার আগে শেষ সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন। তরুণের স্বগত উক্তির মতো দেওয়া উত্তরগুলো সব ইতিবাচক ছিল। পরামর্শক তাঁর ফর্মের সব ঘরে টিক চিহ্ন দিতে পারেন। কিন্তু নিজের ঘরে ফিরে গিয়ে, প্রতিদিনের হাড়ভাঙা খাটুনির ফাঁদে পড়ে ইয়াবার আকর্ষণ কমানোর মতো বিকল্প নেই বলতেই চলে। বাংলাদেশের ১৭ কোটি ৮০ লক্ষ মানুষের জীবনকে অত্যন্ত কঠিন করে তুলেছে এই বিকল্প না থাকা।

সূত্র : দ্য টেলিগ্রাফ অনলাইনে ১১ জুন প্রকাশিত টম প্যারির প্রতিবেদন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সাবস্ক্রাইব

spot_img

সম্পাদকের নির্বাচিত

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

আমার ব্যারিম্যান

সে ও বার্গম্যান আমার জীবনে প্রথম এসেছিলো। আজ সে...

শরীরের রূপান্তর সুরযন্ত্রে: একটি বাদ্যযন্ত্র প্রদর্শনী

নিউইয়র্কের মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অব আর্টে গত জুনে একটি নতুন...

পুতুল নাচে দেশের কথা: মুস্তাফা মনোয়ার

আসুন, চোখ বন্ধ করি। ভাবি। আমরা যারা আশি বা...