ইনকা সভ্যতা ও ইন‌কাদের অজানা গল্প…

Share post:

Date:

মূল : The Lost Fortress of the INCA. National Geographic Magazine (June2026)

অনুবাদ : কায়জার কাবির।

আন্দিজ পর্বতমালার উঁচু ঢালে অবস্থিত মাচু পিচ্চু। ইনকা সভ্যতার সবচেয়ে পরিচিত এই প্রত্নস্থল আজও তাদের স্থাপত্য, নগর পরিকল্পনা ও পাহাড়ি জীবনযাত্রার বিস্ময় বহন করে।

প্রথম পর্ব

এতো বছরের চিরচেনা ইনকা সভ্যতার (Inca Civilization) এক নতুন বিস্ময়ময় তথ্য উদঘাটন! আর, সেই গল্পের বিবরণ এমন… টাক্রাচুলো (T’aqrachullo) ধ্বংসাবশেষের দক্ষিণ পেরুর আন্দিজ পর্বতমালার এক বাতাসে ঝাপটা খাওয়া উঁচু মালভূমির ওপর ছড়িয়ে আছে… নিচে বয়ে যাওয়া আপুরিমাক নদী (Apurímac River) থেকে প্রায় ৩০০ ফুট খাড়া ওপরে। আর কিছুদিন আগ পর্যন্ত, এই জায়গার সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো ব্যাপার ছিল নিচের বিশাল ক্যানিয়নের অপূর্ব দৃশ্য। পুরো ধ্বংসাবশেষটা প্রায় ৪৩ একর জায়গাজুড়ে ছড়িয়ে আছে, যার মধ্যে মালভূমির নিচের দিকের এলাকাও রয়েছে। তাই আকারের দিক থেকে টা’ক্রাচুলো মাচু পিচ্চু (Machu Picchu)এর চেয়ে প্রায় চার গুণ বড়। বিখ্যাত মাচু পিচ্চু এখান থেকে উত্তর-পশ্চিমে, প্রায় ১৪০ মাইল দূরে। পেরুর আন্দিজ অঞ্চলে এমন পুরোনো ধ্বংসাবশেষের অভাব নেই। চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে পাথরের তৈরি সোপান আর ভবনের ভিত্তি, যেগুলো ধীরে ধীরে ঝোপঝাড়ে ঢেকে গেছে। প্রত্নতাত্ত্বিকরা ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে টা’ক্রাচুলো ঘুরে দেখছেন। নিচের উপত্যকা থেকে পাহাড়ের গা ঘেষে উঠে যাওয়া একটাই খাড়া সিঁড়ি ধরে সেখানে পৌঁছাতে হয়।
কিন্তু, এত বছরের বেশিরভাগ সময়ে সেখানে গিয়ে তারা যা পেয়েছেন, তা হলো ভাঙা মাটির পাত্রের টুকরো আর নির্জন পরিত্যক্ত ধ্বংসাবশেষ ছাড়া আর কিছুই না।
এরপর ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরের এক সকালে, প্রত্নতাত্ত্বিক দান্তে হুয়ালপাইউঙ্কা (Dante Huallpayunca) পাথরের তৈরি একটি ঘেরাটোপের ভেতরে মাটি সরাচ্ছিলেন। হঠাৎই তার কাছেই কাজ করা এক সহকারী চিৎকার করে উঠল, বস, আমরা কিছু একটা পেয়েছি! শুরুতে হুয়ালপাইউঙ্কা হেসেই উড়িয়ে দেন। কারণ তাঁর দল মজা করে বলছিল, যদি হঠাৎ কোনো গুপ্তধন পাওয়া যায়! কিন্তু এবার, ঘুরে তাকাতেই সোনার সেই চিরোচেনা ঝিলিক চোখে পড়ল!
হুয়ালপাইউঙ্কা তখন সদ্য সেই গবেষক দলে যোগ দিয়েছিলেন, যারা ২০১৯ সাল থেকে পেরুর সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় এই স্থানে খননকাজ করছিল। সেদিন তাঁর দল এমন এক অবিশ্বাস্য আবিষ্কার করল, যা দেখে সবাই ই হতবাক! তারা মাটির নিচ থেকে প্রায় ৩,০০০টি সোনা, রূপা আর তামার তৈরি ছোট ছোট অলংকার (সিকুইন) উদ্ধার করলেন, যেগুলো শত শত বছর ধরে মাটির নিচে চাপা পড়ে ছিল। দলের ছোট্ট অস্থায়ী গবেষণাগারের টেবিলগুলো এতটাই ছোট ছিল যে, সব অলংকার একসঙ্গে রাখারও জায়গা হচ্ছিল না। হুয়ালপাইউঙ্কা একেবারে বিস্মিত হয়ে যান। তিনি বলেন, অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক পুরো কর্মজীবনেও এমন আবিষ্কারের মুখ দেখেন না। পরে, গবেষণায় জানা যায়, এই সিকুইনগুলো ১৬শ শতকের শুরুর দিকে তৈরি করা হয়েছিল। এগুলো ইনকা অভিজাতদের ধর্মীয় ও রাজকীয় অনুষ্ঠানে পরা পোশাক সাজানোর জন্য ব্যবহার করা হতো।

আন্দিজের পাথুরে গিরিখাতের ভেতর দিয়ে বয়ে চলেছে আপুরিমাক নদী। টা’ক্রাচুলো ধ্বংসাবশেষের নিচের এই নদীপথ ইনকা সভ্যতার ভূগোল ও যোগাযোগব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।

আর, টাক্রাচুলো (T’aqrachullo)-তে এত মূল্যবান জিনিস পাওয়ার পর পুরো খননকাজকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করা শুরু হল, এরপর খননে প্রায় ৬০০টি স্থাপনার সন্ধান মেলে,বাড়িঘর, সমাধি, প্রাচীন দেবতাদের উপাসনালয়, আর সেগুলোর সঙ্গে উদ্ধার হয় অগণিত সোনা-রূপাসহ মূল্যবান ধাতুর তৈরি ধর্মীয় নিদর্শন। সব মিলিয়ে পরিষ্কার হয়ে ওঠে যে, টা’ক্রাচুলো কোনো প্রত্যন্ত, গুরুত্বহীন জনপদ ছিল না। বরং এটি সম্ভবত ইনকা সাম্রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় কেন্দ্র ছিল।

এখন অনেক বিশেষজ্ঞ আরও সাহসী একটি ধারণার পক্ষেও মত দিচ্ছেন। তাঁদের মতে, টাক্রাচুলো আসলে বহুদিন ধরে হারিয়ে যাওয়া একটি ইনকা নগরী, যার নাম ছিল) আনকোকাগুয়া (Ancocagua) । তবে, এটিকে কিন্তু কোনভাবেই আর্জেন্টিনার আন্দিজ পর্বতমালায় অবস্থিত বিশ্বের অন্যতম উঁচু শৃঙ্গ আকোনকাগুয়া এর (Aconcagua) সাথে গুলিয়ে ফেলা যাবে না।
শত শত বছর ধরে ইনকা এই নির্জন পাহাড়ি দুর্গ-নগরীর অবস্থান ছিল এক রহস্য। ঔপনিবেশিক যুগের ইতিহাস লেখকেরা এটিকে ইনকাদের সবচেয়ে পবিত্র মন্দিরগুলোর একটি বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁদের লেখায় আরও উল্লেখ আছে যে, এখানেই এক ভয়াবহ, রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত স্প্যানিশদের হাতে ইনকা সাম্রাজ্যের পতনকে আরও বেগমান করে তোলে। যদি এই ধারণা সত্যি হয় অর্থাৎ, টা’ক্রাচুলোই যদি সেই কিংবদন্তির আনকোকাগুয়া দুর্গ হয়ে থাকে, তাহলে একসময় অবহেলিত এই স্থান শুধু পেরুর ইতিহাসেই নয়, ইনকা সাম্রাজ্যের শেষ দিনগুলোর ইতিহাসও নতুন করে লেখার সুযোগ করে দিতে পারে।

দক্ষিণ পেরুর পাথুরে উপত্যকায় ছড়িয়ে থাকা টা’ক্রাচুলো ধ্বংসাবশেষ। নতুন প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান এই স্থানকে ইনকা ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে সামনে এনেছে।

বিশ্ব বাণিজ্যের ওপর গড়ে ওঠা এক সুবিশাল সাম্রাজ্য…

ইনকারা যখন একের পর এক অঞ্চল জয় করছিল, তখন তারা আগের অনেক রাস্তা এক করে প্রায় ২৫,০০০ মাইল দীর্ঘ একটি বিশাল সড়ক নেটওয়ার্ক তৈরি করে। এই ইনকা রোড (Qhapaq Ñan) প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মানুষের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করেছিল। এর ফলে ওই সময়ই, মাচু পিচ্চু ও (Machu Picchu) টা’ক্রাচুলো (T’aqrachullo) এই সাম্রাজ্যের বিভিন্ন শহরের মধ্যে পণ্য, সম্পদ এবং নতুন নতুন ধারণার আদান-প্রদান এর কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
আলিসিয়া কিরিতা (Alicia Quirita) বড় হয়েছেন টা’ক্রাচুলো থেকে খুব বেশি দূরে নয়। এলাকাটি সুইকুতাম্বো (Suykutambo) নামে একটি প্রত্যন্ত গ্রামীণ অঞ্চলে, যেখানে তিনটি নদী এসে মিলেছে। তাঁর শৈশব ছিল পুরোপুরি আন্দীয় ঐতিহ্যে ও সংস্কৃতিতে গড়ে ওঠা। তিনি আন্দিজ অঞ্চলের নারীদের মতো বোনা শাল আর চওড়া স্কার্ট পরতেন, কোকা পাতা চিবাতেন, আর বাড়িতে পরিবারের সঙ্গে কথা বলতেন কেচুয়া (Quechua) তে, যেটি ছিল ইনকাদের নিজের ভাষা। তবে, স্কুলে তাঁর শিক্ষকরা তাঁকে নিজের ভাষায় কথা বলতে দিতেন না। কিরিতার ভাষায়, আমার নিজের ভাষা ব্যবহার করতে নিষেধ করা হতো তার পরিবর্তে, বাধ্য করা হতো স্প্যানিশে কথা বলতে। তবুও তিনি নিজের সংস্কৃতি নিয়ে সবসময় গর্ববোধ করতেন। আর পূর্বপুরুষদের এই ভূমির প্রতি গভীর ভালোবাসাই তাঁকে প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে পড়াশোনা করতে অনুপ্রাণিত করে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় কিরিতা, কুসকো (Cusco) শহরে থাকতেন। সেখান থেকেই তিনি তাঁর সহকর্মী মারিৎসা কানদিয়া (Maritza Candia)-কে নিয়ে প্রথমবার টা’ক্রাচুলো সফরে যান। তখন তাঁরা গবেষণাপত্রের জন্য ওই অঞ্চলের এমন সব প্রত্নস্থল খুঁজে দেখছিলেন, যেগুলোর কোনো সরকারি নথি ছিল না। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় তাঁরা বেশিরভাগ সময় সাইকেলে চড়ে যেতেন, আর রাত কাটাতেন সেই প্রাচীন ধ্বংসাবশেষের মাঝেই, তাঁবু খাটিয়ে। একসময় এই সব জায়গাই ছিল বিশাল ইনকা সড়ক নেটওয়ার্কের অংশ। পাথর আর বালু দিয়ে তৈরি প্রায় ২৫,০০০ মাইল দীর্ঘ রাস্তা সাম্রাজ্যের বিভিন্ন শহর ও বসতিকে এক সুতোয় বেঁধেছিল। এই পথ ধরে বর্তমান ইকুয়েডরের কুইটো (Quito) থেকে শুরু করে চিলির সান্তিয়াগো (Santiago) পর্যন্ত যোগাযোগ ছিল। টা’ক্রাচুলোতে এসে কিরিতা অবাক হয়ে যান! ইনকাদের নিদর্শনের পাশাপাশি তিনি খুঁজে পান হুওয়ারি (Huari/Wuari) সভ্যতার মাটির পাত্রের ভাঙা টুকরো। এই সভ্যতা ইনকাদেরও আগের ছিল, আর তখন পর্যন্ত ইতিহাসবিদদের ধারণা ছিল, হুওয়ারি সভ্যতা এত দক্ষিণ পর্যন্ত কখনো বিস্তৃত হয়নি। কিরিতা স্মৃতিচারণ করে বলেন, (মাটির ওপরেই যে পরিমাণ নিদর্শন পাওয়া যাচ্ছিল, সেটা সত্যিই অবিশ্বাস্য ছিল) …

খাড়া পাহাড়, সরু উপত্যকা ও প্রাচীন পাথুরে স্থাপনার মাঝেই লুকিয়ে আছে টা’ক্রাচুলোর অতীত। দুর্গসদৃশ এই ভৌগোলিক অবস্থানই একে দীর্ঘদিন রহস্যের আড়ালে রেখেছিল।

১৯৮৬ -১৯৯০ সালে, টাক্রাচুলো

১৯৮৬ সালে টাক্রাচুলো এলাকাটি প্রায় একটি সাধারণ গবাদিপশুর চারণভূমি ছাড়া আর কিছুই ছিল না। কৃষকেরা ধ্বংসাবশেষের মাঝেই পশু চরাতেন, আলুর চাষ করতেন। পরে যে পাথরের ঘেরাটোপের ভেতর থেকে হুয়ালপাইউঙ্কা সোনার অলংকার খুঁজে পান, সেটি তখন আলপাকা রাখার খোঁয়াড় হিসেবে ব্যবহার হতো।

মাচু পিচ্চু পর্বতের উচ্চতা নির্দেশ করা কাঠের সাইনবোর্ড। ইনকা সভ্যতার পরিচিত ভূদৃশ্যের সঙ্গে এই পাহাড়ি পথ আজও পর্যটক ও গবেষকদের আকর্ষণের কেন্দ্র।

কুসকোর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সান আন্তোনিও এবাড-এর প্রত্নতত্ত্বের অধ্যাপক আলিসিয়া কিরিতা বলেন…ইনকা সভ্যতার পুরো জায়গাটাই ছিল একেবারে পরিত্যক্ত। চারদিকে শুধু ঝোপঝাড় আর গাছপালা জন্মে গিয়েছিল। পরবর্তী বছরগুলোতে কিরিতা ও তাঁর সহকর্মী মারিৎসা কানদিয়াই প্রথম গবেষক হিসেবে টা’ক্রাচুলোতে পদ্ধতিগত ভাবে জরিপ শুরু করেন আর তাঁরাই প্রথম বুঝতে পারেন, বাইরে থেকে যতটা সাধারণ মনে হয়, এই জায়গার ইতিহাস আসলে তার চেয়ে অনেক বেশি ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ।
সবকিছু বদলে যায় ১৯৮৭ সালে!! সে বছর স্পেনের একটি ব্যক্তিগত সংগ্রহে স্প্যানিশ বিজিত যোদ্ধাদের (কনকুইস্তাদোর) সময়কার একটি পুরোনো পাণ্ডুলিপির হারিয়ে যাওয়া কিছু অংশ খুঁজে পাওয়া যায়। এই পাণ্ডুলিপির লেখক ছিলেন কেচুয়া ভাষা জানা একজন। হুয়ান দে বেতানজোস (Juan de Betanzos) ঔপনিবেশিক ইতিহাসলেখক। তিনি শুধু আনকোকাগুয়ার (Ancocagua) বর্ণনাই দেননি, বরং ইনকা সাম্রাজ্যের শেষ সময়ে সেখানে সংঘটিত এক ভয়াবহ যুদ্ধের হৃদয়বিদারক কাহিনিও লিখে গেছেন…

( প্রথম পর্ব সমাপ্ত)

আগামী পর্বে : স্পেনের সোনার লোভই শেষ পর্যন্ত ইনকা সাম্রাজ্যের পতন ডেকে এনেছিল …

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সাবস্ক্রাইব

spot_img

সম্পাদকের নির্বাচিত

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

আমার ব্যারিম্যান

সে ও বার্গম্যান আমার জীবনে প্রথম এসেছিলো। আজ সে...

শরীরের রূপান্তর সুরযন্ত্রে: একটি বাদ্যযন্ত্র প্রদর্শনী

নিউইয়র্কের মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অব আর্টে গত জুনে একটি নতুন...

পুতুল নাচে দেশের কথা: মুস্তাফা মনোয়ার

আসুন, চোখ বন্ধ করি। ভাবি। আমরা যারা আশি বা...

ঢাকার ধামরাইয়ের রথের মেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য অনুসন্ধান

ঢাকার উপকণ্ঠে অবস্থিত ধামরাইয়ের শ্রীশ্রী যশোমাধবের রথযাত্রা এবং একে...