চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ, ১০ জুলাই ২০২৬
চট্টগ্রামের হোটেল আগ্রাবাদে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের (এইউডব্লিউ) হিউম্যানিটিজ প্রোগ্রাম আয়োজিত প্রথম হিউম্যানিটিজ কনফারেন্সের উদ্বোধন হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশ ও বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে আসা ছাত্র, শিক্ষক এবং সিনেমা নির্মাতা। দুই দিনব্যাপী এই কনফারেন্সে সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন, ভাষা, সংস্কৃতি, আইডেন্টিটি, অভিবাসন, লিঙ্গ, আদিবাসী জ্ঞান এবং হিউম্যানিটিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা চলে।
কনফারেন্সের আহ্বায়ক অধ্যাপক মাসুদুর রহমান তার সূচনা বক্তব্যে প্রোগ্রামের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশা প্রকাশ করে বলেন হিউম্যানিটিজ (মানবিক বা মানববিদ্যা শিক্ষা) মূলত আমাদের কথা বা ভাবনাকে তুলে ধরে। তিনি ধন্যবাদ জানান সকল অংশগ্রহণকারী এবং ক্লিফটন গ্রূপ এবং ডিটস যাদের স্পনসর এই কনফারেন্স আয়োজন করতে ভূমিকা রেখেছে। এরপর স্বাগত ভাষণ দেন এইউডব্লিউর ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. সঙ্গীতা রায়ামাঝি। ড. সঙ্গীতা হিউম্যানিটিজ কেন আজও গুরুত্বপূর্ণ তার একটি সহজ অথচ জোরালো যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি শ্রোতাদের বলেন, “জীবনের প্রতিটি প্রতিটি ক্ষেত্রে মানবিকতাই মূল এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্বকে বদলে দেয় হয়তো, কিন্তু মানবিকতা আমাদের মানুষ করে তোলে,” তিনি অংশগ্রহণকারীদের নিজেদের ধারণাকে প্রশ্ন করার, ভিন্ন মতামত বা দৃষ্টিভঙ্গি শোনার এবং এই নিয়ে কথোপকথন গড়ে তোলার একটি জায়গা হিসেবে এই কনফারেন্সকে ব্যবহার করতে উৎসাহিত করেন। তিনি হিউম্যানিটিজকে “সমাজের বিবেক, তার স্মৃতি এবং তার কল্পনা যা আমাদের অতীতকে সংরক্ষণ করে, বর্তমানকে আলোকিত করে এবং ভবিষ্যৎকে অনুপ্রাণিত করে।” বলে তার বক্তব্য শেষ করেন।
আদিবাসী অধিকার, আদিবাসী/ নৃতাত্ত্বিক জ্ঞান এবং পরিবেশ সুশাসন নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত অতিথি বক্তা রাজা দেবাশীষ রায় জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য, ভাষা এবং মানবাধিকার কীভাবে একে অপরের সাথে জড়িত তা নিয়ে কথা বলেন। পার্বত্য চট্টগ্রামে তার অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি যুক্তি দেন যে বাংলাদেশের পরিবেশ রক্ষা করতে হলে সেসব আদিবাসী সম্প্রদায়ের কথা শুনতে হবে, যারা বহু প্রজন্ম ধরে বনভূমি ও নদী রক্ষা করে আসছে। তিনি বলেন, “যত বেশি আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার দেওয়া হবে, তত বেশি শান্তি থাকবে।” আদিবাসী বা পিছিয়ে থাকা সম্প্রদায়ের অধিকারকে বেশি স্বীকৃতি দিলে সামাজিক সম্প্রীতি ও গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হয়। তিনি আদিবাসী ভাষাগুলোর প্রতি আরও স্বীকৃতির আহ্বান জানান, এবং সতর্ক করেন যে কোনো ভাষাকে যখন স্বীকৃতি দেয়া হয় না, তখন একটি সম্পূর্ণ জীবনযাত্রাও অস্বীকৃত থেকে যায়, যা তিনি সমগ্র মানবজাতির জন্য একটি বড় ক্ষতি বলে অভিহিত করেন।
“হোয়াই হিউম্যানিটিজ ম্যাটার টুডে” শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড হিউম্যানিটিজের অধ্যাপক ও ডিন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক ড. কায়সার হক। প্রায় পাঁচ দশকের অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেন যে হিউম্যানিটিজের স্নাতকরা অন্যদের তুলনায় কর্ম্মসংস্থান নিয়ে বেশি অনিশ্চয়তায় থাকে বলে কথা প্রচলিত আছে, কিন্তু কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা কোন ডিসিপ্লিন বা বিষয়ে নেই? তিনি বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন, বলেন যে শিক্ষার্থীরা ভাষা ও অন্যান্য মৌলিক বিষয়ে দুর্বল ভিত্তি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসছে যার জন্য দায়ী স্কুল ব্যবস্থা, এবং প্রকৃত সংস্কার শুরু করতে হবে স্কুল পর্যায় থেকেই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রসঙ্গে তিনি একইসাথে সতর্কবার্তা ও আশা জানিয়ে বলেন, “আমরা যদি খাপ খাইয়ে না নিই, তাহলে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হবে যেখানে যন্ত্র যন্ত্রের সাথে কথা বলবে,” এবং শিক্ষকদের মৌলিকত্ব ও মৌলিক চিন্তাভাবনা মূল্যায়নের নতুন পদ্ধতি নিয়ে ভাবতে উৎসাহিত করেন। তিনি অনুবাদ ও বিশ্বসাহিত্যকে এমন এক ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরে বক্তব্য শেষ করেন, যেখানে হিউম্যানিটিজ ক্রমাগত বিস্তৃত হচ্ছে এবং সংস্কৃতিগুলোকে একে অপরের সাথে যুক্ত করছে। দিনের শেষভাগে চারটি বিষয়ভিত্তিক প্যানেল অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে অংশ নেন এইউডব্লিউ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, ইউল্যাব, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, চিটাগং ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, নেপালের ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় এবং কানাডার কনকর্ডিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা, যারা সাহিত্য ও দৃশ্যকলা থেকে শুরু করে স্মৃতি, লিঙ্গ, অভিবাসন এবং দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস পর্যন্ত নানা বিষয়ে আলোচনা করেন। সম্মেলন ১১ জুলাই আরও ৫টি সেশনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে। কনফারেন্স মিপ্রু মারমা এবং জ্যোতি টিনা উপস্থাপনা করেন।
মিডিয়া যোগাযোগ
অধ্যাপক মাসুদুর রহমান
প্রফেসর অব প্র্যাকটিস অ্যান্ড অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর অব জেনারেল এডুকেশন
এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন


