আজ রবিবার বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছে ইরান। গ্রুপ পর্বের কোন খেলায় তারা হারেনি। অপরাজেয় ইরান। মাঠে আর মাঠের বাইরে। মার্কিন পরাশক্তির দিগন্ত বিস্তৃত চোখে এক বিন্দু বালুকণা। ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্র ইরানের চারদিকে তুলে দিয়েছিল নানা বিধি নিষেধের দেয়াল। সবাই জানেন এবারের বিশ্বকাপ অনেক বেশি রাজনৈতিক। কোন কোন ক্ষেত্রে ফুটবলের স্পোর্টসম্যানশিপ থেকে অনেক দূরে।
কেউ কেউ বলছেন, ইরানের রাউন্ড অফ ৩২ এ উঠতে না পারা রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। বিষয়টি একটু তলিয়ে দেখার দরকার আছে।

বেলজিয়াম, নিউজিল্যান্ড এবং মিশরের বিপক্ষে ড্র করে তিন পয়েন্ট নিয়ে ইরান গ্রুপ ‘জি’-তে তৃতীয় স্থানে। শনিবার রাতে আলজেরিয়া ইনজুরি টাইমে দুর্দান্ত গোল করে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে গেল। তখন মনে হয়েছিল টাইব্রেকারের সমীকরণে ইরান পরের রাউন্ডে চলে গেছে। কিন্তু মাত্র কয়েক সেকেন্ড পরেই, খেলার একেবারে শেষ মুহূর্তে অস্ট্রিয়া গোলটি শোধ করে সমতায় ফেরে। তাদের এই ড্র ইরানের বিদায় নিশ্চিত করে।
মাঠ এবং মাঠের বাইরে বিভিন্ন সমীকরণের মধ্য দিয়ে যাওয়া ইরানের জন্য এই বিদায় গভীরভাবে দুঃখজনক। কোন আয়োজক দেশ তার অতিথির সাথে এই মাত্রার দুর্ব্যবহার করবার নজির বিরল। সারা পৃথিবী সাক্ষী হয়ে রইল।
এই বছর ইরানের উপর চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধ করার লক্ষ্যে এক চুক্তির শর্তাবলী নিয়ে তেহরান ওয়াশিংটনের সাথে আলোচনা চালাচ্ছে। ইরান সরকার আরো সময় পেতে চাইছে। গত শনিবার উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পায়। ইরান বাহরাইনকে লক্ষ্য করে একটি ড্রোন হামলা চালায়। বাহরাইনে মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম ফ্লিট অবস্থিত। বিশ্লেষকদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রের রাতের বেলার বিমান হামলার জবাবে এই হামলা চালানো হয়েছে। হামলার কয়েক ঘণ্টা পর, ইরান হরমুজ প্রণালীর কাছে একটি জাহাজে আক্রমণ করেছে বলে দাবি করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জানায়,তারা ইরানের একাধিক সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। পারস্পরিক দোষারোপ ও যুদ্ধের শেষ নাই।
বিশ্বকাপ চলাকালীন, ইরানের কোচ আমির ঘালিনোয়েই এবং ফুটবলাররা নানা বিষয় নিয়ে বিক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। তার মধ্যে ছিল, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা, সহায়ক কর্মীদের ভিসা প্রত্যাখ্যান এবং ম্যাচ শেষ হওয়ার পর দ্রুত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করতে বাধ্য করাসহ অজস্র জটিলতা। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা স্পষ্ট জানিয়েছেন, টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার আগেই সমস্ত বিধিনিষেধের কথা জানানো হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল এই বছরের আঠাশ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালায়, জবাবে ইরান এই অঞ্চলে পাল্টা হামলা চালায়। হাজার বছরের বেশি ইতিহাসের ভৌগোলিক সাক্ষী হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেয়। মার্চ মাসে, ইরান তাদের গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলো মেক্সিকোতে স্থানান্তরিত করার অনুরোধ জানায় ফিফার কাছে। কারণ দেশ দুটির মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। দল পৌঁছানোর দুই সপ্তাহ আগে অ্যারিজোনার টুসন থেকে মেক্সিকোর টিজুয়ানাতে তাদের বেস ক্যাম্প স্থানান্তরিত করার অনুরোধটি রক্ষা করা হয়।
প্রথম ম্যাচে, হাজারের মতো ইরানি-আমেরিকান স্টেডিয়ামের বাইরে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। তারা তেহরানের রেজিম পরিবর্তনের আহ্বান জানায়। প্রাক বিপ্লব যুগের সিংহ-সূর্য খচিত পতাকা ওড়ায়। হাজার হাজার মানুষ খেলা দেখার জন্য স্টেডিয়ামে ভিড় জমায় এবং ম্যাচের আগে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের সময় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। খেলা দেখতে আসা মানুষেরা উচ্ছাস প্রদর্শনের পাশাপাশি বিদ্রুপাত্মক চিৎকারে আকাশ বাতাস ভরিয়ে রেখেছিলেন।

লস অ্যাঞ্জেলেসের কাছাকাছি অনুষ্ঠিত প্রথম দুটি খেলার সময় ইরান দলকে খেলার আগের দিন পর্যন্ত ভ্রমণের অনুমতি দেওয়া হয়নি। প্রতিটি খেলা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই মেক্সিকোতে ফিরে যেতে হয়েছিল। পরে যুক্তরাষ্ট্র এই বিধিনিষেধ শিথিল করে। এই কারণে দলটি মিশরের বিরুদ্ধে শুক্রবারের খেলায় নামার দুই দিন আগে সিয়াটলে যাওয়ার অনুমতি পায়। ইরান পরবর্তী পর্বে যেতে পারলে তারা তাদের পরের ম্যাচ ব্রিটিশ কলম্বিয়ার ভ্যাঙ্কুভারে খেলত। মিশরের সাথে শুক্রবারের খেলা ড্র হওয়ার পর ইরানিদের পরবর্তী রাউন্ডে যাওয়ার এক বিন্দু আশা বেঁচে থাকে । খেলা শেষে ঘালেনোয়েই বলেন, “আমাদের সাথে অত্যন্ত কুৎসিত আচরণ করা হয়েছে। আমি আশা করি বিশ্ববাসী এই আচরণ দেখেছে ও এইসব নিয়ে আরো সচেতন হবে।”
ঘালেনোয়েই আরও বলেন, “ইরান জাতীয় দলের এই তরুণ খেলোয়াড়দের কৃতিত্ব ফুটবলের ইতিহাসে লিপিবদ্ধ থাকা উচিত। কেন? কারণ আয়োজক দেশ আমাদের সাথে যত খারাপ আচরণ করা যায় তার চেয়ে বেশি করেছে। অংশগ্রহণকারী দেশ হিসেবে এই আচরণ আমাদের প্রাপ্য ছিল না। কারণ কারো দয়া দাক্ষিণ্যে আমরা বিশ্বকাপ খেলতে আসিনি। যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে আমাদের আসতে হয়েছিল। ”
এদিকে ক্রীড়া বিশ্লেষকদের অনেকেই আলজেরিয়া বনাম অস্ট্রিয়ার খেলাটিকে পাতানো খেলা বলছেন এবং নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করছেন। অপরাজিত দলের এইরকম চাপিয়ে দেয়া অসম্মান প্রাপ্য নয়৷ ফুটবলের স্পিরিট হেরে গেলো পরাশক্তির চাপে। কিন্তু ইরান নৈতিকভাবে জিতে গেল মাঠে এবং মাঠের বাইরে।


