স্পাইডার ম্যান ফ্র্যাঞ্চাইজির নতুন ফিল্ম আসছে। অ্যা ব্র্যান্ড নিউ ডে। হাসি মুখ স্পাইডারম্যান আমরা কতোই না দেখেছি, কিন্তু স্মাইলিং ফেস বা হাসি মুখ স্পাইডার? সম্প্রতি এমন এক ধরনের ছোট্ট মাকড়সা পাওয়া গেছে যাকে দেখলেই হাসি মুখে আছে বলে মনে হয়। সাইটেক অনলাইন অবলম্বনে লিখেছেন নিরুপম বিশ্বাস।
একশো বছরের বেশি সময় ধরে বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করতেন হাসি খুশি অবয়বের এই প্রাণী কেবল হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জেই বাস করে। ছোট, উজ্জ্বল রঙের শরীর, পিঠে এক স্পষ্ট লাল হাসির চিহ্ন থাকা হ্যাপি ফেস মাকড়সা বিশ্বের অন্যতম পরিচিত মাকড়সা। যেহেতু বিজ্ঞানীরা ভাবতেন এটি হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জেই পাওয়া যায় ফলে এটিকে অন্য কোথাও না পাওয়া যাওয়া একটি অনন্য ও অদ্ভুত প্রাণ বলে মনে করা হতো। ফরেস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট এবং রিজিওনাল মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রির বিজ্ঞানীরা ভারতের উত্তরাখণ্ডের পাহাড়ি অঞ্চলে একই রকম হাসিমুখের একটি নতুন মাকড়সার প্রজাতির সন্ধান পাওয়ার পর ধারণাটি বদলে গেল। তাঁরা এর নাম দিয়েছেন থেরিডিওন হিমালয়ানা (Theridion himalayana)। চলতি পরিচয় হিমালয়ান হ্যাপি ফেস স্পাইডার।

ছবির ক্রেডিট: Devi Priyadarshini and Ashirwad Tripathy
আকস্মিক আবিষ্কারের আনন্দ
নতুন প্রজাতির মাকড়সা সংক্রান্ত গবেষণার অন্যতম লেখক এবং রিজিওনাল মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রির বিজ্ঞানী দেবী প্রিয়দর্শিনী বলেন, “আবিষ্কারটি ছিল সম্পূর্ণ আকস্মিক, কারণ আমাদের জরিপটি ছিল মূলত পিঁপড়াদের কেন্দ্র করে ।” তিনি আরও যুক্ত করেন, “কিন্তু আমার সহ-লেখক [আশীর্বাদ ত্রিপাঠী] আমার চেনার জন্য উঁচু পার্বত্য এলাকা থেকে ক্রমাগত মাকড়সা পাঠাচ্ছিলেন। পরে, একদিন চমৎকার এক সকালে, তিনি একটি ড্যাফনিফাইলাম পাতার নিচের অংশের এক ছবি শেয়ার করলেন। আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। কারণ আমার স্নাতকোত্তর পাঠগ্রহণের সময় হাওয়াই দ্বীপের মাকড়সা দেখেছিলাম। এই মাকড়সাটির সাথে হাওয়াই দ্বীপের বাসিন্দার আশ্চর্য মিল দেখে আমি তখনই বুঝতে পারি, সবাই মিলে বড়সড় কিছু একটা পেয়ে গেছি। আমি তাকে খুঁজে পাওয়া সব ধরনের মাকড়সার নমুনা পাঠাতে বলি। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে পরবর্তী কয়েক মাসের মধ্যে আবিষ্কারটি সম্পন্ন হয়ে ওঠার গল্প সংক্ষেপে এইমাত্র। প্রিয়দর্শিনী আমাদের জানান, উঁচু পার্বত্য অঞ্চলের মাকড়সার জীবন, বাসস্থান এসব নিয়ে তাঁর অনেক দিন ধরেই আগ্রহ ছিল। কারণ পাহাড়ের পরিবেশ ও গাছের সমারোহ সমতলের চেয়ে একদম আলাদা হয়। তিনি যুক্ত করেন, ” আমাদের জীবনে ঘটা আকস্মিক এই ঘটনাটি এই অঞ্চলের অন্যান্য বৈচিত্র্যময় প্রজাতির মাকড়সা নিয়ে কাজ করার একটি বড় সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।” প্রিয়দর্শিনীর সহগবেষক আশীর্বাদও জানান, আরও বড় আয়োজনে অনুসন্ধান চালালে এই প্রজাতির মধ্যে আরও নতুন নতুন বৈচিত্র্য খুঁজে পাওয়া যেতে পারে।

ছবির ক্রেডিট: Devi Priyadarshini and Ashirwad Tripathy
মহান হিমালয়ের নামে নামকরণ
এই বিশেষ প্রজাতিটির নাম, ‘হিমালয়ানা’ (himalayana)। এই নাম রাখা হয়েছে সেই পর্বতশ্রেণীর নামানুসারে যেখানে দুই হাজার মিটারেরও অধিক উচ্চতায় এই মাকড়সা আবিষ্কৃত হয়েছিল। আশীর্বাদ বলেন, “আমরা দুজনেই সুমহান হিমালয় পর্বতশ্রেণীর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে প্রজাতিটির নাম ‘হিমালয়ানা’ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।হিমালয় কেবল ভারত দেশটিকে সুরক্ষা নিশ্চিত করে না। নিজের প্রশস্ত বুকে এক বিরাট জীববৈচিত্র্যও ধারণ করে আছে। এই মাকড়সাটি এই অঞ্চলের প্রথম পলিমরফিক তথা বহুরূপী প্রজাতি ছিল। এই কারণে আমরা মাকড়সাটির বিশেষ প্রজাতিটিকে এই অসাধারণ পর্বতশ্রেণীর প্রতি উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত নিই।”

ছবির ক্রেডিট: Devi Priyadarshini and Ashirwad Tripathy
সকলের জন্য উন্মুক্ত (ওপেন-অ্যাক্সেস) জার্নাল ‘ইভোলিউশনারি সিস্টেমেটিক্স’-এ প্রকাশিত এই গবেষণায় উত্তরাখণ্ডের তিনটি স্থান—মাক্কু, তালা এবং মন্ডল থেকে সংগৃহীত নমুনার মধ্যে বত্রিশটি রঙের ভিন্নতা বা “মর্ফ” নথিভুক্ত করা হয়েছে।ডিএনএ পরীক্ষা থেকে জানা গেছে, হাওয়াইয়ের ‘হ্যাপি ফেস’ (হাস্যোজ্জ্বল মুখাবয়ব) মাকড়সার সাথে নতুন প্রজাতিটির প্রায় সাড়ে আট শতাংশ জিনগত অমিল রয়েছে। ভারতীয় মাকড়সাটি একটি সম্পূর্ণ আলাদা বংশধারার,এশিয়ায় স্বাধীনভাবে বিবর্তিত হয়েছে। ডি এন এ টেস্টের প্রামাণিক পরীক্ষার মাধ্যমে তথ্যটি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

ছবির ক্রেডিট: Devi Priyadarshini and Ashirwad Tripathy
অজানা এখনও রহস্যময় ডিজাইনের কারণ
মুখের হাসির মতো এই দাগ দেখতে অত্যন্ত আকর্ষণীয় যদিও প্রকৃতির দেয়া চিহ্নের আসল কাজ কী তা এখনো স্পষ্ট নয়। প্রিয়দর্শিনী ব্যাখ্যা করে বলেন, “এই বহুরূপী প্রকাশের পেছনের কারণ খুবই জটিল এবং অনন্য। প্রথম দেখাতেই উপলব্ধি করা যায়, এই নকশাগুলো নিশ্চিতভাবে বন্য পরিবেশে তাদের টিকে থাকতে সাহায্য করে। কেন তারা পিঠে এমন নকশা বেছে নেয় ও তাদের জীবনচক্রে এটি ঠিক কী কার্যকরী ভূমিকা পালন করে, সেসব এখনো আবিষ্কার করা বাকি। এটি নিশ্চিতভাবেই গভীর কোনো জিনগত রহস্যের ইঙ্গিত দেয়।” আশীর্বাদ আরও উল্লেখ করেন যে, এই সুনির্দিষ্ট মাকড়সাটি একই ধরণের রঙের নকশা থাকা অন্যান্য ছোট ছোট প্রাণীদের মাঝে পাওয়া গেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, এই প্রজাতির মাকড়সাগুলো প্রায়শই আদা জাতীয় গাছে বাস করে। তাদের হাওয়াইয়ান আত্মীয়দের আচরণের সাথে মিলে যায় হাসি মুখ মাকড়সাদের কার্যকলাপ। যেহেতু আদা গাছ হাওয়াইয়ের নিজস্ব উদ্ভিদ নয়, তাই এই সংযোগটি বিজ্ঞানীদের মনে বিবর্তন সম্পর্কিত নতুন প্রশ্ন তুলেছে। প্রিয়দর্শিনী কণ্ঠে বিস্ময় নিয়ে বলেন, “মাকড়সাগুলো কীভাবে ঠিক আদা জাতীয় এবং একটি আক্রমণাত্মক উদ্ভিদ প্রজাতিকে বেছে নিল? হতে পারে টি. হিমালয়ানা, টি. গ্রালেটর -এর চেয়ে বয়সে বড় কোনো আত্মীয়, যদিও এটি আবিষ্কৃত হয়েছে ১২৫ বছর পরে! এসব এখন একটি বড় দাবি মনে হলেও, যদি কোনো হারিয়ে যাওয়া সূত্র থেকে থাকে আদা জাতীয় গাছের প্রতি আগ্রহী হাসি মুখ মাকড়সাদের আচরণ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তা খুঁজে বের করাই হবে আমাদের আগামী কাজের লক্ষ্য।”

ছবির ক্রেডিট: Devi Priyadarshini and Ashirwad Tripathy


