নিউইয়র্কের মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অব আর্টে গত জুনে একটি নতুন প্রদর্শনী শুরু হয়েছে। এই প্রদর্শনীতে মানুষের ৪,০০০ বছরের সঙ্গীতচর্চাকে দেখানো হয়েছে শিল্প ইতিহাসের দীর্ঘ ইতিহাসকে এক্স-রে-র মতো স্ক্যান করে, যতদূর সম্ভব নিঁখুত ভাবে। এই প্রদর্শনীতে মানবতার অস্তিত্বের সন্ধান পেতে বাদ্যযন্ত্রের গঠন পরীক্ষা করা হয়েছে।
“মিউজিক্যাল বডিজ” নামের এই নতুন প্রদর্শনীটি একাধিক দরকারি প্রশ্ন তোলে। ‘হার্ডি-গার্ডি’ ( অতি প্রাচীন তারযুক্ত বাদ্যযন্ত্র) থেকে শুরু করে অ্যাজটেকদের ডেথ হুইসেল ‘এহেকাচিচতলি’ পর্যন্ত, যুগের পর যুগ ধরে বিশ্বজুড়ে এত বাদ্যযন্ত্র কীভাবে এবং কেন তৈরি হয়েছে? এগুলো কি কেবল মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম, না শরীরেরই একটি অংশ ও রূপ?

ছবি: The Metropolitan Museum of Art / The Art Newspaper
জাদুঘরের বাদ্যযন্ত্র বিভাগের কিউরেটর ব্র্যাডলি স্ট্রাউশেন-শ্চেরার এক বিবৃতিতে বলেন, “আমার মনে প্রথমে এক অতি সরল প্রশ্ন জেগেছিল: কেন এত বাদ্যযন্ত্রের আকৃতি এবং নকশার সাথে মানুষের শরীরের সাদৃশ্য আছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই বাদ্যযন্ত্র এবং সঙ্গীতের মাধ্যমে সমগ্র মানবজাতিকে জানার চেষ্টা শুরু হয়। আমরা এই বাদ্যযন্ত্রগুলোর নির্মাণ পদ্ধতি ও ইতিহাসের মধ্যে নিজেদেরই খুঁজে পাই। কারণ আমাদের ইতিহাসের একটি বড় অংশই ছিল সুর। আমাদের অস্তিত্ব ও কাজের কেন্দ্রীয় মনোযোগে থাকা এই সুর আদিকাল থেকেই আমাদের শ্রমে খানিকটা স্বস্তির আশ্রয় দিয়েছে।”

ছবি: The Metropolitan Museum of Art
প্রদর্শনীতে থাকা প্রায় একশো ত্রিশটি শিল্পকর্মের অনেকগুলোই সুর ও শরীরের অন্তর্গত সম্পর্ককে নিজস্ব শিল্পসম্মত উপায়ে ফুটিয়ে তুলেছে। কোনো কোনোটি একদম সরাসরি, যেমন প্রাচীন মিশরের মিডল কিংডম যুগের ( ২০৪০- ১৭৮২ খ্রিস্টপূর্ব) জলহস্তীর দাঁত দিয়ে তৈরি একজোড়া বাদ্যযন্ত্র।মানুষের হাত ও বাহুর সাথে সাদৃশ্য আছে। জাদুঘরের মতে, এই বাদ্যযন্ত্রগুলো ছিল প্রাচীন মিশরে ব্যবহৃত সবচেয়ে শুরুর দিকের পারকাশন।

অন্যান্য কিছু বাদ্যযন্ত্রের গঠনেও শরীরের বিভিন্ন অংশ যুক্ত করা হয়েছে। নাইজার নদীর নিচের দিকের অঞ্চলে পাওয়া ঊনিশ বা বিশ শতকের তৈরি একটি পিতলের ঘন্টায় স্পষ্টভাবে একটি মানুষের মুখ খোদাই করা আছে। ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর বিশ শতকের শুরুর দিকের একটি পারকাশন তিন ফুটের বেশি লম্বা, তার ড্রামের নিচের অংশটি দেখতে স্তন ও পেটের আকৃতির মতো। আবার পূর্ব ভারতে তৈরি ঊনিশ শতকের একটি ধোদরো বানাম (সাঁওতাল বেহালা নামেও পরিচিত) দেখতে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা হাসিখুশি মানুষের মতো। স্ট্রাউশেন-শ্চেরার নিউ ইয়র্ক টাইমসের জোশুয়া ব্যারনকে বলেন, “প্রায় সময় আমরা সাধারণ মানুষেরা, গানকে খুব বিশেষ কোনো বিষয় মনে করি। কখনো কখনো একে উচ্চবিত্ত বা অভিজাতদের একান্ত উপভোগের জিনিস বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু আমরা যখন দেখি, মানুষ যুগ যুগ ধরে সুরে নিমজ্জিত থেকে গান তৈরি করছে, তখন বুঝি এই বোধ আমাদের ডিএনএ সজ্জায় সংযুক্ত হয়ে আছে। মানুষের বেঁচে থাকার জন্য সুরের প্রতি টান অত্যন্ত মৌলিক ও জরুরি একটি বিষয়।”

ছবি: The Metropolitan Museum of Art / The Crosby Brown Collection of Musical Instruments
“মিউজিক্যাল বডিজ” প্রদর্শনীর অন্যতম প্রধান এক বিষয় প্রেম ও যৌনতায় বাদ্যযন্ত্রের ভূমিকা। জাপানের ঊনিশ শতকের এক উডব্লক প্রিন্ট আধুনিক মানুষের চোখে সাধারণ মনে হতে পারে। মনে রাখতে হবে, সে যুগে এমন ছবি ছিল অনেক বেশি ইঙ্গিতপূর্ণ এবং উশকানিঘেরা। ছবিতে একজন নারীকে ‘শাকুহাচি’ (এক ধরণের জাপানি বাঁশি) বাজাতে দেখেন দর্শকেরা । মিউজিয়ামের বর্ণনা অনুযায়ী, ছবিটির পেছনে এক ধরনের চাপা যৌনতার ইঙ্গিত আছে। স্ট্রাউচেন-শেরার দ্য গার্ডিয়ানের ভেরোনিকা এস্পোসিতোকে বলেন, “জাপানি সংস্কৃতিতে, এমনকি কিছুদিন আগে পর্যন্ত পশ্চিমা সংস্কৃতিতেও নারীদের বাঁশি বা রেকর্ডারের মতো বাদ্যযন্ত্র বাজানো নিষেধ ছিল। মুখে রেখে বাজানো যায় এমন যেকোনো বাদ্যযন্ত্র বাজানোকে সে যুগে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মনে করা হতো।”
এই প্রদর্শনীতে আধুনিক যুগের কিছু বাদ্যযন্ত্রও রয়েছে। এসব ইন্সট্রুমেন্ট বড় বড় কনসার্টে বাজানো হয়েছে। এখানে আছে বিখ্যাত গায়ক প্রিন্সের বেগুনি রঙের ‘লাভ সিম্বল’ গিটার (যা নারী ও পুরুষের প্রতীককে একসাথে প্রকাশ করে)। প্রদর্শনীর বিশেষ আকর্ষণ ‘পিয়ানোআর্ক’ নামের একটি গোলাকার পিয়ানো। এই পিয়ানো লেডি গাগার কনসার্টে বাজানো হয়েছিল।
মেট মিউজিয়ামের প্রধান নির্বাহী ম্যাক্স হোলিন এক বিবৃতিতে বলেন, “এই বহুমাত্রিক সংবেদনসম্পন্ন প্রদর্শনীটি একেবারেই অন্যরকম। এখানে চমৎকার সব বাদ্যযন্ত্র, নানা বস্তু এবং শিল্পকর্মের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে কেমন করে হাজার হাজার বছর ধরে শব্দ, বাদ্যযন্ত্র এবং মানুষের শরীর একে অপরের সাথে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে আছে।” একটি মজার তথ্য দিয়ে শেষ করি। পৃথিবীর প্রাচীনতম বাদ্যযন্ত্র ষাট হাজার বছরের পুরনো। নিয়ানথার্ডাল বাঁশি। নির্মিত হয়েছিলো ভালুকের উরুর হাড় থেকে।
নিউইয়র্কের মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অব আর্টে “মিউজিক্যাল বডিজ” প্রদর্শনীটি আগামী সাতাশে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে।
স্মিথসোনিয়ান অনলাইনে প্রকাশিত, পত্রিকাটির নিয়মিত প্রতিবেদক ক্রিস্টিয়ান থোরাসবার্গের প্রতিবেদন অবলম্বনে


