পুতুল নাচে দেশের কথা: মুস্তাফা মনোয়ার

Share post:

Date:

আসুন, চোখ বন্ধ করি। ভাবি। আমরা যারা আশি বা নব্বইয়ের দশকের জন্মেছি তাদের সবচেয়ে প্রিয় দৃশ্য মাধ্যমের স্মৃতিগুলো কি? তখন বিনোদন মানেই বাংলাদেশ টেলিভিশন আর সেই টেলিভিশনে শোনা আমাদের স্মৃতিতে রয়ে যাওয়া গান ‘আমরা নতুন, আমরা কুঁড়ি’। আমরা অনেকেই ছেলেবেলায়, নিজেদের বেড়ে ওঠার জেলায় ‘নতুন কুঁড়ি’র অডিশন দিতে বাবা মায়ের হাত ধরে কত কত সকাল দুপুর আর বিকেল কাটিয়েছি। বিটিভির লোগো আমাদের আরেকটি স্মৃতি ও ক্ষয়ে আসা বর্তমান। একটি লাল সূর্য আর দিগন্ত প্রসারী রেখা। পুঁথির টানে লেখা অক্ষর। শুক্রবারের সকালে ‘মনের কথা’, পারুলদের আমরা কেউই ভুলিনি। রাগী ষাঁড় আর হাসি খুশি বাউল ভাইকেও। মীনা আর রাজু – দুই ভাই বোন আর তাদের পোষা টিয়া মিঠুকে ভুলে যাওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব? আমাদের ছেলেবেলার ছোট্ট পৃথিবীর এই আনন্দযজ্ঞের নির্মাতা মুস্তাফা মনোয়ার।

পুতুলের সঙ্গে শিল্পীর স্নেহময় মুহূর্ত; বাংলাদেশের টেলিভিশন ও শিশুদের কল্পজগতে তাঁর অবদানের প্রতীকী দৃশ্য।
ছবি: সংগৃহীত

দেশভাগ পূর্ববর্তী যশোর জেলার মাগুরা মহকুমার ( এখন জেলা) শ্রীপুর থানার নাকোল গ্রামের মামা বাড়িতে একটি ছেলে জন্মেছিল ১৯৩৫ সালে পয়লা সেপ্টেম্বর। তখন মেয়েরা সন্তান জন্ম দেয়ার সময় বাবার বাড়ি চলে যেতেন। সমাজের রীতিই ছিল এমন। বাবা বরেণ্য কবি ও বাংলা ভাষায় মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.) এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জীবনী প্রণেতা গোলাম মোস্তাফা। তিন বছর বয়সে মাতৃহারা হন। পৈতৃক নিবাস ছিল ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা থানার মনোহরপুর গ্রামে। শিশু বিদ্যাপীঠে শিশুটির পড়া শুরু হল। ফরিদপুর হয়ে নারায়ণগঞ্জে মেজো বোনের বাসায় থেকে পড়তে থাকেন। নারায়ণগঞ্জ স্কুলে নবম শ্রেণীতে পড়ার সময় ভাষা আন্দোলনের পোস্টার এঁকে জেলে যান। ১৯৫৩ সালে মাধ্যমিক উত্তীর্ণ হয়ে কলকাতার স্কটিশ চার্চে পড়তে গেলেন। কিশোরের প্রতিবেশী ছিলেন প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী। মুজতবা কিশোর বয়সী মুস্তাফা মনোয়ারকে পাঠান সে সময়ের গুরুত্বপূর্ণ চিত্রশিল্পী রমেন চক্রবর্তীর কাছে। রমেন তাঁর আঁকা দেখে পাঠিয়ে দিলেন কলকাতা আর্ট কলেজে। ১৯৫৯ সালে ফাইন আর্টস বিভাগে প্রথম হলেন। তৃতীয় বর্ষে পড়ার সময় অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসে স্বর্ণপদক পান। এই সময়েই সর্বভারতীয় যুব উৎসবে তেল রঙের ছবির জন্য স্বর্ণপদক পুরস্কার পেলেন। এমন আনন্দের খবর শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের কানে গেল। তিনি ঢাকার প্রায় নতুন চারুকলা কলেজে আমন্ত্রণ জানালেন মুস্তাফা মনোয়ারকে। পূর্ব পাকিস্তান চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসাবে তাঁর যোগদানের বছরটি আশ্চর্য এক কাকতাল। রবীন্দ্র জন্ম শত বর্ষ, ১৯৬১ সাল। চিত্রশিল্পীদের জন্য সারা পৃথিবীতেই এখনো স্বপ্নের শহর প্যারিস। একটা বৃত্তির সম্ভাবনা তৈরি হলেও তিনি গেলেন না। জয়নুল আবেদিন কলকাতা এসে তাঁদের বাড়িতে উঠেছিলেন। বলেছিলেন – ওকে প্যারিস যেতে হবে না। আমিই ওকে অনেক জায়গায় পাঠাবো।

কর্মশালায় মুখোশ নির্মাণে ব্যস্ত শিল্পী; চারপাশে ছড়িয়ে আছে পুতুল, মুখোশ ও শিল্পসামগ্রী।
ছবি: সংগৃহীত

পাকিস্তান আমলের রুদ্ধ সময়ে তরুণ প্রভাষক চারুকলা কলেজে বসন্ত উৎসব করলেন। প্রথমবারের মতো নাটক মঞ্চস্থ হলো। ডাকঘর। সেই নাটক পরবর্তী সময়ের কয়েকজন প্রতিভাবান অভিনেতার জন্ম দিয়েছে। টেলি সামাদ, কেরামত মওলা- অল্প বয়সী প্রভাষক মুস্তাফার আবিষ্কার। জামিল চৌধুরী আর কলিম শরাফীর মত বিশিষ্টজনেরা তারুণ্যের উৎসবে মুগ্ধ হন৷ কিন্তু, ছেলে আর মেয়ের বন্ধুত্বপূর্ণ সহাবস্থান চারুকলার আদ্যি কালের বদ্যি বুড়ো মনোভাবাপন্ন প্রতিক্রিয়াশীল শিক্ষকদের পছন্দ হলো না৷ তিনি খানিকটা একা হতে থাকলেন। সেই সময়, জামিল চৌধুরী আর কলিম শরাফীরা তাঁকে টেলিভিশন স্টেশন হওয়ার কথা জানান৷

১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর। এই দিনে পাকিস্তান টেলিভিশন কর্পোরেশনের ঢাকা কেন্দ্র উদ্বোধন করা হয়। টেলিভিশনে প্রথম প্রচারিত অনুষ্ঠানে প্রথম গান গেয়েছিলেন ফেরদৌসী রহমান। গানটি ছিল – আবু হেনা মোস্তফা কামালের লেখা ‘এই যে আকাশ নীল হল আজ / এ শুধু তোমার প্রেমে।’ টেলিভিশন কেন্দ্রের প্রথম প্রযোজক ছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার। তিনি তখন স্টেশন প্রোডিউসার হিসেবে কর্মরত। উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের ‘ দ্য টেমিং অফ দ্য শ্রু’ অবলম্বনে ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’ এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রক্তকরবী’- বিশেষ করে এই দুই নাটকের প্রযোজনা আমাদের শিল্প ইতিহাসের অনন্য সম্পদ। তাঁর পাপেট শো ‘ক আর খ’ একাধিক দেশে পুরস্কার পেয়েছিল।

নিজের তৈরি পুতুলের সাজ ঠিক করছেন শিল্পী; শিশু-কিশোর সংস্কৃতি ও পুতুলনাচে তাঁর দীর্ঘ সাধনার স্মারক।
ছবি: সংগৃহীত

গণমানুষের স্বপ্ন আর দ্রোহ তাঁর সারা জীবনের কাজের মধ্যে প্রেরণা হয়ে ছিল। রাষ্ট্রীয় সিস্টেমের মধ্যে থেকেও সাধারণ মানুষের কল্যাণে অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ তিনি করেছেন। এক সাক্ষাৎকারে ‘মনের কথা’র চরিত্র পারুল সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছেন – ‘একটি মেয়ে পারুল যেন সাত ভাইকে জাগাতে পারে ‘। এই জাগরণ সম্ভাব্যতার কথাই সদ্যপ্রয়াত কিংবদন্তি মুস্তফা মনোয়ারের জীবন সাধনা। অনেক পুরস্কার পেয়েছেন নানা বয়সে। কিন্তু সবচেয়ে বড় পুরস্কার আমার ধারণায়, জীবন জুড়ে দেশের মাটির সাথে যুক্ত হয়ে থাকবার যে বোধ সেই বোধটি অর্জন।

নিজের স্মৃতি একটুখানি বলি। ছড়া শিল্পী লুৎফর রহমান রিটন ‘ছোটদের কাগজ’ নামে একটি অসামান্য পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। ১৯৯৬ সালে ‘ছোটদের কাগজ’ হলুদ প্রচ্ছদের যে ঈদ সংখ্যা সংখ্যা প্রকাশ করেছিল তার তুলনা আগে বা পরে অন্তত বাংলাদেশের শিশু-কিশোর পত্রিকায় পাওয়া যায় না। পত্রিকার প্রথম সংখ্যা থেকেই হুমায়ূন আহমেদ ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাস লিখেছেন- ‘কালো যাদুকর’। পাশাপাশি মুস্তাফা মনোয়ার এর পুতুল নাচের ছবি দিয়ে সুন্দর শিশু কিশোর গল্প। এত ভালো লাগতো যে আজও চোখে জেগে আছে। ত্রিশ বছরের বেশি সময় পরেও। গল্প করতে করতে, দেশের কথা বলতে বলতে, প্রাণ প্রকৃতির কথা শোনাতে শোনাতে তিনি আমাদের শিশুদের, কিশোরদের অথবা যারা এখনো শিশুমন বাঁচিয়ে রেখেছেন সেইসব বড়দের ছবি আঁকা শেখাতেন ছুটির দিনের সকাল বেলায়।

মঞ্চের আলোয় বসে থাকা বরেণ্য শিল্পী; তাঁর শিল্পজীবনের উষ্ণতা ও প্রশান্তির এক মুহূর্ত।
ছবি: সংগৃহীত

এইসব দিন আর আসবে না ভাবতেই মন বিপন্ন বোধ করে। দেশের প্রতি, সাধারণ মানুষের প্রতি ভালবাসবার ব্যাপারটি সবাইকে সারা জীবন জুড়ে বলে যাওয়া বড় সহজ কথা নয়। আমাদের ছেলেবেলা সম্ভাব্য সকল রঙে ভরিয়ে তোলার জন্য আপনাকে ভালোবাসা, প্রিয় বন্ধু মুস্তাফা মনোয়ার।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সাবস্ক্রাইব

spot_img

সম্পাদকের নির্বাচিত

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

আমার ব্যারিম্যান

সে ও বার্গম্যান আমার জীবনে প্রথম এসেছিলো। আজ সে...

শরীরের রূপান্তর সুরযন্ত্রে: একটি বাদ্যযন্ত্র প্রদর্শনী

নিউইয়র্কের মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অব আর্টে গত জুনে একটি নতুন...

ঢাকার ধামরাইয়ের রথের মেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য অনুসন্ধান

ঢাকার উপকণ্ঠে অবস্থিত ধামরাইয়ের শ্রীশ্রী যশোমাধবের রথযাত্রা এবং একে...