২০২২ বিশ্বকাপ। পোল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার গ্রুপ পর্বের ম্যাচ। ৩৯ মিনিটে পেনাল্টি পেল আর্জেন্টিনা। স্বাভাবিকভাবেই বলের সামনে দাঁড়ালেন আর্জেন্টিনার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মানুষ—লিওনেল আন্দ্রেস মেসি।
কিন্তু পুরো স্টেডিয়ামকে অবাক করে দিয়ে পেনাল্টি থেকে গোল করতে ব্যর্থ হলেন তিনি।
সেই বিশ্বকাপে এরপর আরও চারবার পেনাল্টি নিতে হয়েছিল মেসিকে। দুইবার নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে, দুইবার ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনালের মহারণে। আপনি জানেন, ওই চারটি পেনাল্টির একটিও মিস করেননি তিনি। বরং পেনাল্টিগুলো দেখলে বোঝা যায়, কতটা দুর্নিবার ছিল সেগুলো।
পরবর্তীতে অনেকেই বলেছিলেন, পোল্যান্ডের বিপক্ষে সেই মিসটাই হয়তো শাপে বর হয়েছিল। কারণ ওই মিসের পর মেসি নিশ্চয়ই এমনভাবে নিজেকে প্রস্তুত করেছিলেন, গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে আর তাঁকে আটকানো যায়নি।
পাঠক, চিত্রনাট্যটা কি পরিচিত লাগছে?
এবারও গ্রুপ পর্বে মেসির পেনাল্টি মিস।
এরপর কি আবার সেই দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাওয়ার পালা—ফাইনাল পর্যন্ত?
আমার উত্তর দেব শেষের দিকে। তার আগে চলুন গতকালের ম্যাচে ফিরি।
অস্ট্রিয়া যে সহজ প্রতিপক্ষ হতে যাচ্ছে না, তা স্কালোনির দল ভালোভাবেই জানত। প্রেসিং ফুটবলের মাধ্যমে আর্জেন্টাইনদের ঠিকমতো শ্বাসও ফেলতে দেবে না তারা—এটা অনুমেয়ই ছিল।
ম্যাচের ৯ মিনিটে লাওতারো মার্টিনেজকে ফাউল করা হলে ভিএআরের সিদ্ধান্তে পেনাল্টি পায় আর্জেন্টিনা। বলের সামনে আবারও মেসি। কিন্তু তাঁর বাঁ পায়ের শট পোস্টের ডান পাশ ঘেঁষে বাইরে চলে গেলে স্তব্ধ হয়ে যায় গ্যালারি। ডালাস স্টেডিয়ামের হাজার হাজার আর্জেন্টাইন সমর্থক যেন নিজেদের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না।
সেই দমবন্ধ করা অস্ট্রিয়ান ডিফেন্সে প্রথম ভাঙন ধরে ৩৮ মিনিটে। লেফট ব্যাক ফাকুন্দো মেদিনার পাস থিয়াগো আলমাদা ডামি দিয়ে ছেড়ে দেন মেসির জন্য। সেখান থেকে কোনো দ্বিধা ছাড়াই জালে বল জড়িয়ে দেন মেসি।
বিশ্বকাপে মেসির ১৭তম গোল। পেছনে পড়ে যান মিরোস্লাভ ক্লোসে, রোনালদো নাজারিও, গার্ড মুলার, পেলের মতো কিংবদন্তিরা।

ছবি: রয়টার্স
গোলটির পর রাত জেগে ক্লাব ফুটবল দেখা পাঁড় ভক্তরা হয়তো একসঙ্গে চিৎকার করে উঠেছিলেন—
“আরে, এটা তো আগে দেখেছি! এটা একটা ক্লাসিক!”
আর সত্যিই, সেটি ছিল এক ক্লাসিক। এল ক্লাসিকোর স্মৃতি মনে করিয়ে দেওয়া এক গোল।
২০১৭ সালের ২৩ এপ্রিল সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে ২-২ সমতায় থাকা ম্যাচের শেষ কয়েক সেকেন্ডে মেসির সেই অবিশ্বাস্য গোল—যার পর দর্শকদের সামনে নিজের জার্সি তুলে ধরেছিলেন তিনি। ফুটবলপ্রেমীদের চোখে এখনো লেগে আছে সেই আইকনিক উদযাপন।
প্রথম গোলের পরও রালফ রাংনিকের শেখানো প্রেসিং ফর্মুলায় লড়ে যাচ্ছিল অস্ট্রিয়া। আক্রমণ গুছিয়েও শুধু শেষ স্পর্শটা দিতে পারছিল না তারা। কয়েকবার আর্জেন্টাইন দুর্গ ভেদ করে বিপজ্জনক জায়গায়ও পৌঁছে গিয়েছিল।
শেষে অতিরিক্ত সময়ে মেসির ডিফেন্সচেরা পাস খুঁজে পায় হুলিয়ান আলভারেজকে। কিন্তু জাল খুঁজে পায় না বল। কিপারের ঠেকিয়ে দেওয়া বলে শট নেন মেসি। সেটিও ফিরে আসে। আবার শট নেন তিনি। এবার বল জড়িয়ে যায় জালে।
২-০ ব্যবধানে ম্যাচ শেষ করে নিজের ঝুলিতে ১৮ গোল নিয়ে পরের রাউন্ড নিশ্চিত করেন লিওনেল মেসি।

ছবি: রয়টার্স
আগামীকাল মেসির ৩৯তম জন্মদিন। নিজের জন্মদিনের আগে এর চেয়ে বড় উপহার আর কী হতে পারে?
দুই ম্যাচে আর্জেন্টিনার যে পাঁচ গোল, তার সবকটিতেই মেসির ছাপ। পুরো আর্জেন্টিনা দলের দায়িত্ব যেন আবারও তাঁর কাঁধে। আক্রমণের ছন্দ বেঁধে দেওয়ার সুতোও যেন সেই পুরোনো বাঁ পায়ের কাছেই।
বয়স বেড়েছে, কিন্তু ধার কমেনি।
তলোয়ারের চেয়েও ধারালো সেই মেসির ওপর ভর করেই আলবিসেলেস্তেরা আরেকটি বিশ্বকাপ ঘরে তোলার স্বপ্ন দেখছে। ২০২২ সালের চিত্রনাট্য যদি আবার লিখতে হয়, তবে সেখানে অসির চেয়ে মেসিকেই বড় হয়ে উঠতে হবে।
কারণ আপাতত স্কালোনির তূণে এর চেয়ে বড় কোনো তীর নেই।


