ইঞ্চা: ফুটবলের পাগলা সমর্থক

Share post:

Date:

মেক্সিকান লেখক হুয়ান ভিয়োরো তাঁর ‘গড ইজ রাউন্ড’ বইতে লিখেছেন: ‘শোরগোল করার জন্য ফুটবল একটি ভালো অজুহাত। যে লোককে তার বউ ভর্ৎসনা করে বলে–“তুমি কথা বল না কেন? তুমি কি শুনতে পাচ্ছ না” – সেও খেলা দেখতে যায় এবং প্রাণ ভরে চিৎকার করে।’

তুমুল আড্ডার মধ্যে চুপচাপ বসে থাকা আপনার বন্ধুটিও দেখবেন একটি গোলের মুহূর্তে কেমন সংযম হারিয়ে ফেলে। এই পাগলা সমর্থকদের বোঝাতে স্পেনিশ ফুটবল অভিধানে একটি শব্দ আছে, ইঞ্চা (Hincha, স্প্যানিশ ভাষায় H অনুচ্চারিত থাকে)।শব্দটি দ্বারা একই সাথে ‘সমর্থক (বা ফ্যান)’ এবং ‘ফুলিয়ে তোলা’ (Inflate) বোঝায়।

ধারণা করা হয় যে উরুগুয়ে’তে শব্দটির উদ্ভব ঘটেছে। প্রথম দিকে শব্দটি দ্বারা বোঝানো হতো সেই বালককে যে মাঠে বল ফোলাতো। বিংশ শতকের প্রথম দশকে উরুগুয়ের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ক্লাব “ক্লুব নাসিওনাল দে ফুতবল দে মন্তেভিদেও” প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তারা প্রুদেন্সিও মিগেল রেয়েস’কে তাদের কিটম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়। তার কাজ ছিল বিভিন্ন ফুটবল গিয়ার প্রস্তুত করা, ফুটবল বুট পরিষ্কার করা এবং বল হাওয়া দিয়ে ফোলানো। বল ফোলানোর কাজ করত বলে তাকে ইঞ্চা বলে ডাকা হতো। কিন্তু প্রুদেন্সিও স্রেফ একজন বল ফোলানো বালক হয়ে রইলো না। সে হয়ে উঠলো ক্লাবের সবচাইতে বড় সমর্থক। তার উদ্দীপনাময় চিৎকার অন্যান্য সমর্থকদেরও প্রাণিত করত এবং তাদেরকে ক্লান্তিহীনভাবে সাহস যোগাত। তাকে দেখে লোকে বলত, “ইঞ্চাটিকে দেখ, কিভাবে দলকে উৎসাহ দিচ্ছে।”

প্রুদেন্সিও রেয়েস

এভাবে “ইঞ্চা” শব্দটি অন্য এক অর্থ গ্রহণ করল। প্রুদেন্সিও নিজের অজান্তেই স্পেনিশ ভাষাকে এবং ফুটবল বিশ্বকে নতুন এক শব্দ উপহার দিল–ইঞ্চা। পাগলা সমর্থক। হুয়ান ভিয়োরো’র মতে সমর্থক দুই ধরনের হতে পারে: “বস্তুবাদী সমর্থক, যারা কিনা সবসময় স্কোরবোর্ডের দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখে। তারা বুঝতে চায় তাদের আশার আলো উজ্জ্বল হচ্ছে নাকি প্রদীপ নিভে যাচ্ছে। অপরদিকে আছে রোমান্টিকেরা। চিৎকার করে নিজের দলকে সমর্থন দেওয়ার জন্য তাদের কোন ধরনের তথ্য-উপাত্ত লাগে না। এই সমর্থকরাই ইঞ্চা নামের যোগ্য।”

উরুগুয়ের মন্তেভিদেও’র গ্রান পার্ক সেন্ত্রাল-এ অবস্থিত প্রুদেন্সিও রেয়েস-এর ভাস্কর্য।

সব সমর্থকই ইঞ্চা নয়। কেউ কেউ কেবল দলের ফলাফল অনুসরণ করে। জিতলে আনন্দিত হয়, হারলে দূরে সরে যায়। কিন্তু ইঞ্চারা হয় অন্যরকম। তাদের সমর্থন কোনো যুক্তি মানে না। দল যখন শিরোপা জেতে তখন যেমন সে গ্যালারিতে থাকে, দল যখন রেলিগেশনের মুখে দাঁড়িয়ে থাকে তখনও সে একই আবেগ নিয়ে উপস্থিত হয়। তার কাছে সমর্থন একটি সিদ্ধান্ত নয়, বরং পরিচয়ের অংশ।

এই নামধারীরা তাদের চিৎকার শুরু করেছিল যখন উরুগুয়ে ছিল বিশ্বসেরা। আশ্চর্য হলো, এই উরুগুয়ে দলের এক অদ্ভুত ক্ষমতা আছে। চিৎকার বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা, পুরো স্টেডিয়ামকে নিস্তব্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা। ১৯৫০ সালে তারা মারাকানাকে নিস্তব্ধ করে দিয়ে ব্রাজিলকে পরাজিত করে বিশ্বকাপ জিতে নেয়। ২০১১ সালে বুয়েনস আইরেস-এ পুরো গ্যালারিকে নিস্তব্ধ করে দিয়ে আর্হেন্তিনার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয় কোপা আমেরিকা।

লাতিন আমেরিকায় ইঞ্চা কেবল একজন দর্শক নয়। সে খেলার একটি সক্রিয় চরিত্র। বুয়েনস আইরেস, মন্তেভিদেও বা বোগোতার স্টেডিয়ামগুলোতে ম্যাচের আগেই শুরু হয় তার উপস্থিতি। পতাকা, ব্যানার, ড্রাম, ট্রাম্পেট এবং সম্মিলিত গানের মাধ্যমে তারা স্টেডিয়ামকে রূপ দেয় এক ধরনের উৎসবে। অনেক সময় খেলোয়াড়েরা বলেন, গ্যালারির এই শক্তিই তাদের অতিরিক্ত প্রেরণা জোগায়।

ইঞ্চার জীবন আসলে পরাজয় দিয়েই পূর্ণ। একটি দল বা ক্লাব বছরের পর বছর সমান তালে পারফর্ম করে না কিংবা শিরোপাও জেতে না। কিন্তু লক্ষ লক্ষ সমর্থক দলকে সমর্থন দিতে প্রস্তুত থাকে। কারণ ইঞ্চা কোন যুক্তি মানে না, সে ফলাফলের চেয়ে স্মৃতি, আশা এবং পরিচয়ের প্রতি অনুগত। প্রতিটি মৌসুমের শুরুতে সে চায় আবার আশাবাদী হতে, বিশ্বাস করতে। তার ভাবতে ভাল লাগে, এবার হয়তো সবকিছু বদলে যাবে। এই আশাবাদই তাকে বারবার স্টেডিয়ামে ফিরিয়ে আনে।

[তথ্যসূত্র: হুয়ান ভিয়োরো’র ‘গড ইজ রাউন্ড’, লা লিগা ব্লগ, উইকিপিডিয়া এস্পানিয়ল]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সাবস্ক্রাইব

spot_img

সম্পাদকের নির্বাচিত

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের আমলনামা ১৯৬৬

তেইশে জুলাই, ছেষট্টি- বুয়েনোস আইরেসের টিট্রো কোলোনের সবাই একত্রিত...

বৃষ্টিতে, ঠান্ডায়, অন্ধকারে

লেখা: আনহেল দি মারিয়া ভাষান্তর: রোহণ ভট্টাচার্য আমার আজও স্পষ্ট মনে...

ইরান : মার্কিনি দিগন্ত বিস্তৃত চোখে এক বিন্দু বালুকণা

আজ রবিবার বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছে ইরান। গ্রুপ পর্বের...

ফুটবলতুতো ভাইবোন

ফুটবলকে 'গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ' ঘোষণার অগণিত কারণ বিদ্যমান।...