আজও পুরান ঢাকার বিকেল মানেই কোলাহল। সরু রাস্তায় রিকশার ঘণ্টি, দোকানিদের ব্যস্ততা, পথচারীদের ছুটে চলা—সব মিলিয়ে শহর যেন নিজের গতিতেই ছুটে চলে। সেই ব্যস্ততার মধ্যেই শুক্রবার বিকেলে পৌঁছালাম আরমানিটোলার আর্মেনিয়ান চার্চে। বাইরে থেকে পুরোনো একটি স্থাপনা মনে হলেও ভেতরে পা রাখতেই মনে হলো, এখানে সময় যেন সত্যিই একটু ধীর হয়ে আসে।
প্রবেশমুখে দায়িত্বে থাকা নিরাপত্তাকর্মী বিনয়ের সঙ্গে স্বাগত জানালেন। তাঁর আচরণে ছিল আন্তরিকতা, কিন্তু কোনো আনুষ্ঠানিক কঠোরতা ছিল না। পাশে একটি টেবিলে রাখা দর্শনার্থী রেজিস্টার। সেখানে নাম, প্রবেশের সময় এবং কতজন প্রবেশ করছেন—এসব তথ্য লিখে ভেতরে যেতে হয়। নিজের নাম ও প্রবেশের সময় লিখে যখন চার্চের প্রাঙ্গণে পা রাখলাম, তখন বাইরের ব্যস্ত শহরটাকে যেন হঠাৎ অনেক দূরের মনে হলো।

ছবি: নয়ন চক্রবর্ত্তী
সামনে পুরোনো স্থাপত্য। চারপাশে সবুজ। নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা সমাধিফলক। আর তার মাঝখানে আর্মেনিয়ান চার্চ—পুরান ঢাকার চেনা দৃশ্যপটের ভেতর একেবারেই আলাদা একটি জগৎ। চার্চটির সৌন্দর্য জাঁকজমকে নয়, বরং তার সরলতায়।পুরোনো দেয়াল, খিলানযুক্ত দরজা-জানালা এবং প্রাঙ্গণের শান্ত পরিবেশ মিলিয়ে স্থাপনাটির মধ্যে এক ধরনের মায়া তৈরি হয়েছে। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেই বোঝা যায়, এটি শুধু একটি পুরোনো ভবন নয়; দীর্ঘ সময়ের স্পর্শে তৈরি একটি স্মৃতিসৌধ।
আঙিনায় থাকা জবা ফুলের গাছটি চোখে পড়ার মতো। লাল জবা ফুটে আছে পুরোনো সমাধিফলকের পাশে। দৃশ্যটির মধ্যে অদ্ভুত এক বৈপরীত্য—একদিকে পাথরে খোদাই করা মানুষের নাম ও মৃত্যুর তারিখ, অন্যদিকে সদ্য ফোটা ফুল। যেন একই আঙিনায় মৃত্যু ও জীবনের দুই ভিন্ন গল্প পাশাপাশি বলা হচ্ছে।

ছবি: নয়ন চক্রবর্ত্তী
বিকেলের স্নিগ্ধ বাতাস তখন গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে বয়ে যাচ্ছিল। পুরান ঢাকার কোলাহল চার্চের দেয়ালের বাইরে থাকলেও তার কোনো শব্দ এখানে এসে তেমনভাবে পৌঁছাচ্ছিল না। কয়েক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, ব্যস্ত বর্তমান থেকে সরে এসে বহু পুরোনো কোনো সময়ের দরজায় দাঁড়িয়ে আছি। এই নীরবতার পেছনে রয়েছে কয়েক শতাব্দীর ইতিহাস।
ঢাকায় আর্মেনীয়দের উপস্থিতি মূলত বাণিজ্যের সূত্রে। কয়েক শতাব্দী আগে আর্মেনীয় বণিকেরা বাংলায় এসে ব্যবসা-বাণিজ্যে যুক্ত হন। ঢাকাতেও তাদের একটি শক্তিশালী বাণিজ্যিক উপস্থিতি গড়ে ওঠে। পাট, চামড়া, কাপড়সহ বিভিন্ন পণ্যের ব্যবসার সঙ্গে তারা যুক্ত ছিলেন। ঢাকার যে এলাকায় তাদের বসতি গড়ে উঠেছিল, সময়ের সঙ্গে সেই এলাকার নাম হয়ে যায় আরমানিটোলা।
১৭৮১ সালে নির্মিত হয় এই চার্চ। এর আনুষ্ঠানিক নাম হলি রেজারেকশন চার্চ। যে জায়গায় চার্চটি দাঁড়িয়ে আছে, সেটি একসময় আর্মেনীয়দের কবরস্থান ছিল। তাই চার্চের প্রাঙ্গণের সমাধিফলকগুলো নিছক পুরোনো পাথর নয়; এগুলো ঢাকার ইতিহাসে একসময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা একটি সম্প্রদায়ের অস্তিত্বের সাক্ষ্য।
সমাধিফলকের সামনে দাঁড়ালে ইতিহাসের সঙ্গে মানুষের দূরত্বটা কমে আসে। পাথরে খোদাই করা নাম, জন্ম ও মৃত্যুর তারিখ দেখে মনে হয়, তারাও একদিন এই শহরের রাস্তায় হেঁটেছেন। ব্যবসা করেছেন, পরিবার নিয়ে থেকেছেন, স্বপ্ন দেখেছেন। আজ তাদের জীবন নেই, কিন্তু নামগুলো রয়ে গেছে এই শহরের মাটিতে।

ছবি: নয়ন চক্রবর্ত্তী
চার্চটির অতীতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি ঘড়ির গল্পও। একসময় এর পাশে একটি ঘড়ির টাওয়ার ছিল। সেই ঘড়ির ঘণ্টাধ্বনি পুরান ঢাকার মানুষের কাছে পরিচিত ছিল। পরে ঘড়ি বন্ধ হয়ে যায়। ১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে টাওয়ারটিও ধ্বংস হয়। আজ সেখানে নেই সেই ঘড়ি, নেই ঘণ্টাধ্বনি; আছে শুধু তার স্মৃতি।
চার্চের প্রাঙ্গণে হাঁটতে হাঁটতে মনে হলো, একটি স্থাপনার ইতিহাস আসলে শুধু তার নির্মাণকাল কিংবা স্থাপত্যের বিবরণে শেষ হয় না। তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের জীবন, বাণিজ্যের উত্থান-পতন, অভিবাসনের গল্প, ধর্মীয় পরিচয় এবং একটি শহরের পরিবর্তনের ইতিহাস। সেই অর্থে আর্মেনিয়ান চার্চ ঢাকার বহুত্ববাদী অতীতের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক।
সময়ের কথা মনে পড়ল আবার বের হওয়ার মুহূর্তে। প্রবেশের সময় যে রেজিস্টারে নাম লিখেছিলাম, এবার সেখানেই লিখলাম প্রস্থানের সময়। কয়েক ঘণ্টা আগে যে সময়টি লিখে ভেতরে ঢুকেছিলাম, এখন আরেকটি সময় লিখে বেরিয়ে এলাম। ছোট্ট এই আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে কেমন যেন একটি প্রতীকী অর্থ খুঁজে পেলাম—ইতিহাসের একটি অধ্যায়ে কিছুক্ষণ অবস্থান করে আবার বর্তমানের শহরে ফিরে আসা।
বের হওয়ার পথে নিরাপত্তাকর্মীর সঙ্গে আবার দেখা হলো। তাঁর মুখে তখনও সেই বিনয়ী অভিব্যক্তি। ফটক পেরিয়ে বাইরে আসতেই পুরান ঢাকা তার চেনা রূপে ফিরে পেলাম। রিকশা চলছে, মানুষ ছুটছে, দোকানে ব্যস্ততা।
শুধু আমার ভেতরে তখনও রয়ে গেছে চার্চের বিকেলটি—পুরোনো দেয়ালের নীরবতা, সমাধিফলকের সারি, জবা ফুলের লাল রং আর বিকেলের মৃদু বাতাস।
আর্মেনিয়ান চার্চ থেকে বেরিয়ে মনে হলো, ইতিহাস সবসময় বইয়ের পাতায় কিংবা জাদুঘরের কাচের ভেতর বন্দি থাকে না। কখনো ইতিহাস একটি পুরোনো গির্জার আঙিনায় দাঁড়িয়ে থাকে। তার পাশে একটি জবা ফুল ফুটে থাকে, বাতাস ধীরে বয়ে যায়, আর শত বছরের পুরোনো পাথর নীরবে বলে যায়—এই শহরে একদিন অন্যরকম মানুষও বাস করত, তাদেরও ছিল স্বপ্ন, প্রার্থনা, ব্যবসা ও ভালোবাসার গল্প।

ছবি: নয়ন চক্রবর্ত্তী


