মস্তিষ্কের অংশ হারানো বিশেষজ্ঞের আবিষ্কার বাদুড়ের নতুন প্রজাতি
জ্যাক হাডাওয়ে-ওয়েলের নিবন্ধ অবলম্বনে
“আমার মুখের অনেক হাড় চুরমার হয়ে গিয়েছিলো। সহজে গোনা যাচ্ছিল না এই ভেঙ্গে যাওয়া হাড়। আমি খুলির একটি জরুরি অংশ হারিয়েছি, আমার চোখের পেছনে নরম প্লাস্টিক আর মাথায় মেটালের প্লেট লাগানো আছে। আমার ব্রেইনে পচন ধরায় তার এক অংশ কেটে বাদ দিতে হয়েছিল।” ন্যান্সির এক সাক্ষাৎকারে আমরা তাঁর জীবনে ঘটা দুর্ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ এভাবেই পাই।
ডার্বিশায়ারের গ্লসপ এলাকার বাসিন্দা ডক্টর ন্যান্সি আরউইন ছিলেন একজন বাদুড় বিশেষজ্ঞ। চব্বিশ বছর আগে, ২০০২ সালে গ্যাবনে একটি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র আঠাশ বছর। তখন তিনি তাঁর পিএইচডি শেষ করার দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত ছিলেন। মাত্র এক মাস পরেই তিনি ডিগ্রিটি সম্পন্ন করতে পারতেন। এই দুর্ঘটনাই তাঁর ক্যারিয়ার আর জীবনের আশায় দেয়াল তুলে দেয়। তখন তিনি একটি স্বনামখ্যাত তেল কোম্পানিতে কাজ করতেন। তিনি এবং তাঁর স্বামী ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ডের (ডব্লু ডব্লু এফ)-এর সাথে একটি বড় জলযানে ঘুরতে গিয়েছিলেন। তখন অন্য একটি বড় ভেসেল সরাসরি এসে তাঁর মাথায় আঘাত করে এবং তিনি হ্রদে ছিটকে পড়েন। পরের আটচল্লিশ ঘণ্টা তাঁর বেঁচে থাকা খুবই জরুরি ছিল। তেল কোম্পানিটি কঙ্গো প্রজাতন্ত্র থেকে উদ্ধার কাজ দ্রুত পরিচালনার জন্য একটি হেলিকপ্টার পাঠিয়েছিল। এই তৎপরতার ফলেই তাঁর প্রাণ রক্ষা পায়।

ছবি: BBC/মূল উৎস
“এয়ারস্ট্রিপের বাতি জ্বলার জন্য সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা যদি করতাম,আমার পক্ষে বাঁচা সম্ভব হত না। তাই তারা আমাকে একটি ফ্রেঞ্চ অয়েল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে যায়। ফরাসীদের স্থাপনাটিতে ইউরোপীয় চিকিৎসকদের একটি দল ছিল,” তিনি বলেন। প্রথমে তাকে বিমান করে ইউরোপে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন তারা। কিন্তু ন্যান্সির শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে দক্ষিণ আফ্রিকায় নিয়ে যাওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত জোহানেসবার্গের একটি বিশেষায়িত হাসপাতালে ভর্তি হন। হাসপাতালটি জটিল আঘাতের চিকিৎসার জন্য সুনাম ছিল।
দীর্ঘদিন পর সুস্থ হয়ে উঠে তিনি আরেকবার পড়ালেখা এবং হাঁটতে শেখেন। ২০০৯ সালে ন্যান্সি আরউইন অবশেষে ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের গবেষণার কাজে ফিরে আসেন। “আমি প্রায় আট বছর রিহ্যাবে পার করেছি। সেখানে হাঁটা, কথা বলা এবং একজন ফিজিক্যালি চ্যালেঞ্জড মানুষ হিসেবে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া শিখেছি,” তিনি পুরনো দিনের স্মৃতিচারণ করেন।
“আমি ‘প্রোপ্রিওসেপশন’ নামের একটি ক্ষমতা হারিয়েছি। শব্দটির মানে হলো আমি বুঝতে পারি না আমি মহাশূন্যে বা কোন জায়গায় আছি। আমি ছুটে চলা গাড়ি দেখতে পারি না। আমি আমার পিএইচডি শেষ করার খুব কাছাকাছি ছিলাম। কিন্তু আট বছর বিজ্ঞানের বাইরে থাকায় আমি অনেক কিছু ভুলে যাই। তাই আমার পিএইচডি শেষ করার এবং নতুন করে সবকিছু শেখার জন্য একটি সুযোগ জরুরি ছিল। আমরা সবাই জীবনের দ্বিতীয় সুযোগ ডিজার্ভ করি।” আরউইনের গবেষণায় ফিরে আসার প্রায় অসম্ভব এই পথের যাত্রা ‘ড্যাফনি জ্যাকসন ট্রাস্ট’, এক দাতব্য সংস্থার ফেলোশিপের মাধ্যমে সহজ হয়েছিল। এই সংস্থাটি বিশেষ ধরনের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গবেষকদের সাহায্য করে, যারা কোনো কারণে কাজ থেকে বিরতি নেওয়ার পর আবার গবেষণায় ফিরতে চান।

ছবি: BBC/মূল উৎস
আরউইনের বক্তব্য ও তার কাজ
“এটি আমার জন্য অনেক বড় এক সুযোগ ছিল,” আরউইন বলেন। “আমাদের চার পাশে এমন অনেক মানুষ আছেন যারা বাবা-মা বা সন্তানদের দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করেছেন। আমাদের এখানে উচ্চশিক্ষিত বিজ্ঞানীদের একটি বড় দল রয়েছে। তারা যেকোনো কারণেই হোক না কেন, নিজেদের পেশা থেকে অল্প সময়ের জন্য দূরে সরে গিয়েছিলেন। কিন্তু তার মানে এই নয় যে তারা অযোগ্য হয়ে গেছেন। তারা দেশের অর্থনীতির উন্নতির জন্যে নিজেদের নিয়োজিত করবার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত।”
সুস্থ হওয়ার পর, ডক্টর আরউইন তার কর্মজীবনের বড় একটি অংশ পাপুয়া নিউগিনিতে কাটিয়েছেন। পাপুয়া নিউগিনিতে তিনি ভ্যানিলা এবং কোকো রপ্তানির একটি কোম্পানি গড়ে তোলেন। পাশাপাশি তিনি বন বিনাশীদের হাত থেকে রেইনফরেস্ট রক্ষার জন্যও কাজ করেন। “আমি পড়াশোনার দিক থেকে রেইনফরেস্ট বাঁচানোর ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠি। আমি রেইনফরেস্টের এমন একটি অর্থনৈতিক মূল্য খোঁজার চেষ্টা করছিলাম যা কেবল কাঠ বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং রোগ প্রতিরোধেও সাহায্য করে। আমি নানারকম গবেষণা এবং গভীরভাবে চিন্তা করে উপলব্ধি করি, নতুন নতুন ভাইরাস বা রোগ (যেমন জিকা এবং কোভিড) ছড়িয়ে পড়ার সাথে বনভূমি ধ্বংসের একটি সম্পর্ক রয়েছে। আপনি যদি পরিবেশ ধ্বংস করেন, তবে বন্যপ্রাণিরা অন্য জায়গায় চলে যায়। বন্যপ্রাণিরা গৃহপালিত পশুর সংস্পর্শে আসে এবং এর ফলে রোগ ছড়িয়ে পড়ে।”

ছবি: Deb Wright/University of York
নতুন প্রজাতির বাদুড় আবিষ্কার
২০১৭ সালে আরউইন পাপুয়া নিউগিনিতে একটি নতুন প্রজাতির বাদুড় তালিকাভুক্ত করেন। এই প্রজাতির বাদুড় ফল খেতে পছন্দ করে। স্টার ওয়ার্স সিনেমার একটি চরিত্রের সাথে মিল থাকায় প্রথমে এটির ডাকনাম দেওয়া হয়েছিল ‘যোদা’ বাদুড়। পরে, দেখতে হাস্যোজ্জ্বল হওয়ায় বাদুড়টির নাম দেওয়া হয় “হ্যাপি টিউব-নোজড ফ্রুট” ব্যাট। আরউইন এটি একটি দুর্গম জঙ্গল থেকে আবিষ্কার করেন।
তিনি বলেন, “যখন আপনি নতুন কোনো কিছুর বিবরণ দেবেন, তখন আপনাকে পুরোপুরি নিশ্চিত হতে হবে পৃথিবীর আর কোথাও এর আগে এই ব্যাপারে কথা বলা হয়নি বা কোনো জাদুঘরে এটি ভুলে ফেলে রাখা হয়নি। পাপুয়া নিউগিনির শতকরা ৮৫ ভাগ মানুষ জঙ্গলে বাস করে। তাদের বিদ্যুৎ বা টিভি নেই। তাই আমার মনে হয়েছে যে তারা কখনো দেখেনি এমন একটি স্টার ওয়ার্স সিনেমার নামে বাদুড়টির নামকরণ করা নৈতিক হবে না। “

ছবি: University of York
সম্মাননা ও জীবনের শিক্ষা
পরিবেশ রক্ষা আর স্থায়িত্ব নিয়ে কাজ করার জন্য বিশে জুলাই আরউইনকে ইউনিভার্সিটি অব ইয়র্ক থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি দেওয়া হয়। এটিকে তিনি একটি বিশাল অর্জন হিসেবে দেখছেন।
গ্র্যাজুয়েশন অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে দেওয়া বক্তব্যের শেষে তিনি বলেন, “আমিই প্রথম [ড্যাফনে জ্যাকসন] ফেলো যিনি সম্মানসূচক ডক্টরেট পেয়েছেন। একটি ট্রাস্ট এবং একটি বিশ্ববিদ্যালয় মিলে আমার মতো একজন ভেঙে পড়া শিক্ষার্থীকে সাহায্য করেছিল। আমি আমার ভেতরের এমন কিছু দক্ষতাকে কাজে লাগিয়েছি যা আমি নিজেই জানতাম না। নিজের এসব গুণ সম্পর্কে অজ্ঞ ছিলাম। একটি রেইনফরেস্ট আজ পর্যন্ত টিকে আছে আমার এবং আমার মতো কারও কারও প্রতিরোধের কারণে।
জীবনের প্রতিটি দিনই একটি উপহার। সাহসী হও এবং যখনই পরিস্থিতি কঠিন হবে, নিজেকে প্রশ্ন করো: ‘এই দিন কি আমায় মেরে ফেলবে?’ যদি উত্তর ‘না’ হয়, তবে থমকে না থেকে সামনে এগিয়ে যাও।”


