স্টিং রে: সমুদ্রতলের নীরব প্রহরী ও নীল অর্থনীতির অমূল্য সম্পদ

Share post:

Date:

অনুলিখন  শরীফ সারওয়ার

​সাগরের নীল জলরাশির নিচে ডানা মেলে ভেসে চলা শান্ত ও রাজকীয় প্রাণী ‘স্টিং রে’ (Stingray) সমুদ্রের জীববৈচিত্র্যের এক চমৎকার অংশ। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান, টেকসই নীল অর্থনীতি এবং সামুদ্রিক পরিবেশ রক্ষায় এটি একটি অমূল্য সম্পদ। কোটি বছরের ইতিহাস বুকে নিয়ে বেঁচে থাকা এই জলজ বিস্ময়কে গবেষকরা সমুদ্রের স্বাস্থ্যের অন্যতম প্রধান ‘জীবন্ত সূচক’ হিসেবে বিবেচনা করেন।

বাংলাদেশের সেন্টমাটিন্স দ্বীপের পাশে নীল জলের তলে স্টিংরে।
ছবি: শরীফ সারওয়ার

​ স্টিং রে হলো কার্টিলেজনির্ভর মাছ, যাদের সাধারণ মাছের মতো শক্ত হাড়ের বদলে নরম তরুণাস্থি থাকে। হাঙরের দূরসম্পর্কীয় আত্মীয় এই প্রাণীটি Elasmobranchii শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। এদের চ্যাপ্টা ও গোলাকার শরীরের দুই পাশের বিশাল পাখনা ডানার মতো কাজ করে।

বিজ্ঞানীদের মতে, বর্তমানে বিশ্বে ম্যানটা রে, ঈগল রে, ব্লু-স্পটেড রে এবং হুইপটেইল রে-সহ প্রায় ২০০-এর বেশি প্রজাতি রয়েছে।

​দিনের বেলা বালুর নিচে নিখুঁতভাবে শরীর লুকিয়ে এরা ‘ক্যামোফ্লেজ’ বা ছদ্মবেশ ধারণ করে অলস সময় পার করে। রাতে সক্রিয় হয়ে এরা চোখের বদলে ‘অ্যাম্পুলা অফ লোরেনজিনি’ (Ampullae of Lorenzini) নামক বিশেষ বৈদ্যুতিক সংবেদনশীল অঙ্গের সাহায্যে বালুর নিচের শিকারের হৃৎস্পন্দন টের পায় এবং শক্ত দাঁতের পাটি দিয়ে খোলস ভেঙে আহার সম্পন্ন করে।

স্টিং রে প্রাকৃতিকভাবে অত্যন্ত শান্ত হলেও বিপদে পড়লে চাবুকের মতো লম্বা লেজের করাত-কাঁটা বা ‘বার্ব’ শত্রুর শরীরে ফুটিয়ে দেয়। এই কাঁটার বিষ প্রোটিন-ভিত্তিক জটিল টক্সিন, যা তীব্র যন্ত্রণা, পেশির খিঁচুনি এবং কোষে পচন ধরাতে পারে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে গরম পানি ও সঠিক চিকিৎসায় এই বিষের কার্যকারিতা নষ্ট করা সম্ভব।

​ সেন্ট মার্টিন্স দ্বীপের গভীর,অগভীর জলের তলে ‘ব্লু-স্পটেড স্টিং রে’ এবং ‘হুইপটেইল রে’ সচরাচর দেখা যায়, যা স্থানীয়দের কাছে ‘শাপলা পাতা মাছ’ বা ‘হাউশ মাছ’ নামে পরিচিত। এদের অবাধ বিচরণ দেখে গবেষকরা সেন্ট মার্টিন্সের জলজ পরিবেশের স্বাস্থ্য পরিমাপ করেন।

​এরা ‘ওভোভিভিপ্যারাস’ (Ovoviviparous) পদ্ধতিতে বংশবৃদ্ধি করে, যেখানে মায়ের জরায়ুর ভেতরে ডিম ফুটে বাচ্চা তৈরি হয় এবং জরায়ুর দুধ খেয়ে এরা বড় হয়। প্রজাতিভেদে এরা একবারে ২ থেকে ১০টি বাচ্চার জন্ম দেয় এবং এদের গড় আয়ু ১৫ থেকে ২৫ বছর পর্যন্ত হতে পারে।

বাংলাদেশের সেন্টমাটিন্স দ্বীপের পাশে নীল জলের তলে স্টিংরের চোখ।
ছবি: শরীফ সারওয়ার

​ মালদ্বীপ, অস্ট্রেলিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় স্টিং রে ও ম্যানটা রে দেখার জন্য ইকো-ট্যুরিজমে কোটি কোটি ডলারের যোগান আসছে, যা বাংলাদেশও কাজে লাগাতে পারে। এছাড়া, ক্যানসার কোষ ধ্বংস করতে, বাতের ব্যথার ওষুধ তৈরিতে এবং জীবাণুরোধী চিকিৎসাসামগ্রী গবেষণায় এদের বিষ ও ত্বকের গঠন নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। ​জলভাগের ভারসাম্য বজায় রাখতে প্রতিটি প্রাণীর অস্তিত্ব অত্যন্ত জরুরি। স্টিং রে রক্ষা করার অর্থ হলো আমাদের সাগর মহাসাগর এবং মানবজাতির ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সাবস্ক্রাইব

spot_img

সম্পাদকের নির্বাচিত

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

মিষ্টি জলের মাছে প্রথম বার সংক্রামক ক্যান্সার চোখে পড়েছে বিজ্ঞানীদের

ইউনিভার্সিটি অফ ভারমন্টের অধ্যাপক জশুয়া ব্রাউনের নিবন্ধ অবলম্বনে মেলানোমা (এক...

হিমালয়ের হাসি মুখ মাকড়সা

স্পাইডার ম্যান ফ্র‍্যাঞ্চাইজির নতুন ফিল্ম আসছে। অ্যা ব্র‍্যান্ড নিউ...

ধেয়ে আসছে এল নিনো!

পৃথিবীর পরিবেশ সচেতন বিজ্ঞানীরা প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর নিবিড় নজর...

কাপুচিন বানরের ভাঙা সংসার

বিজ্ঞানীদের নতুন গবেষণা আমাদের জানায়, এল নিনো আর লা...