বহুদিন পরে বাংলাদেশে একটি পূর্ণাঙ্গ দৈনিক সংবাদপত্র আত্মপ্রকাশ করলো। বহু বছরের অভিজ্ঞ সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক মোস্তফা মামুন এই নতুন সংবাদপত্রের সম্পাদক। পত্রিকাটির নাম- দৈনিক আগামীর সময়। বেশ কিছুদিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিন্ন ধরনের গ্রাফিক্স এবং আইডিয়ায় সাধারণ মানুষের তুমুল আগ্রহ সৃষ্টি করে আজ আঠারো মে প্রকাশ ঘটলো পত্রিকাটির। ব্রডশিটে ১৬ পৃষ্ঠার নিয়মিত আয়োজনের পাশাপাশি আজ ছিলো ‘শুরুর সুবাস’ শিরোনামে বিশেষ ক্রোড়পত্র। রাজনীতি এই ক্রোড়পত্রের আলোচ্য বিষয়। ১৬ পৃষ্ঠার এই আয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ। বর্তমান তারুণ্যের বুদ্ধিজীবীতার মননের পাটাতনের জরুরি আলাপ তুলেছেন কবি ও সাংবাদিক তৌহিদুল ইসলাম। বাকি নিবন্ধগুলো আমায় টানেনি।
বাংলাদেশের ইতিহাসের সাতজন অনিবার্য নেতার সাথে সংক্ষেপে নতুন প্রজন্মের পরিচয় করিয়ে দেয়াটা চমৎকার উদ্যোগ। যদিও কমরেড মুজফ্ফর আহ্মদের চিরচেনা নামের বানানের মধ্যখানে আ-কার পড়ে তিনি আহমেদ হয়ে গেলেন কেমন করে আমার জানা নেই। বইপত্রে চিরকাল এই বানানটি দেখেছি। আইএ পরীক্ষায় পাস করতে না পেরে রাজনীতিতে যোগ দেবার কথাটা মানে না পেরেই তিনি যোগ দিয়েছেন এই বার্তাটি নতুন প্রজন্মের মধ্যে এক ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উপর ছোট্ট লেখাটি খানিক রয়ে সয়ে লেখা মনে হলো। কোথাও অতি পরিচিত ‘জাতির পিতা’ শব্দ দুটি দেখলাম না। মন খারাপ হলো, অভ্যাসবশত।
আজকের দিনে পত্রিকার দুটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন বাংলাদেশের ফুটবলের দিন বদলের নায়ক হামজা চৌধুরীর ইন্টারভিউ। বাংলাদেশের কোন পত্রিকায় এই প্রথম তিনি দীর্ঘ ইন্টারভিউ দিলেন। এখানে তিনি বাংলাদেশের ফুটবল দলের সাথে খেলা, তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রাণ খুলে পাঠকদের জানিয়েছেন। প্রকৃতই এক্সক্লুসিভ এক আয়োজন। মন ভরে গেলো। এমিরেটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর পূর্ণ পৃষ্ঠা সাক্ষাৎকার আজকের অন্য প্রাপ্তি। তবে পৃষ্ঠাটিতে ছাপাখানার ভূতের নৃত্যের ফলে কিংবা সম্পাদকীয় অনবধানতার কারণে একের অধিক ভুল ঘটেছে। তাই পূবালী সম্পাদক মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ হয়ে গেলেন মাহফুজুল্লাহ। বিচিত্রা পত্রিকার দায়িত্বে আমরা দেখলাম জনৈক সাদাত চৌধুরীকে। এসব অবহেলা বেদনাদায়ক কেননা একটি জনবন্ধু হতে যাওয়া পত্রিকা ইতিহাস ধরে রাখে।
তরুণ অনুবাদক ইমরান ওয়াহিদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কয়েকটি পর্যবেক্ষণ জানিয়েছেন।
আমি তাঁর সাথে একমত। ফলে অনুমতি নিয়ে লেখাটি তুলে দিচ্ছি – ” আমার কাছে আগামীর সময়ের লুক অ্যান্ড ফিল বেশ লাগলো। বাজারের পত্রিকাগুলোর বেশিরভাগই একে অপরের রেপ্লিকা। লোগো প্লেসমেন্ট, কলাম ট্রিটমেন্ট, পাতার ডিজাইন সবই যেন একরকম। পাশাপাশি রাখলে আলাদা করে চোখে পড়া মুশকিল। এখন তো আবার লোগো মিমিক করেও পত্রিকা বের করা হয়। সবার লোগোই থাকে মাঝে বা বামে। আগামীর সময় সেখানে লোগো ডানে সরিয়ে দিয়েছে, ফলে চোখে আটকাচ্ছে। তবে তার চেয়েও বড় কথা হলো, প্রচলিত একঘেয়ে কলাম ট্রিটমেন্ট ভেঙে নিজস্ব একটা স্টাইল এনেছে এরা। ঠাসাঠাসি করে ৬ বা ৮ কলামে হরাইজন্টাল এক্সিসে ধাপে ধাপে অজস্র হেডলাইনের দমবন্ধ সামনের পাতা নেই এখানে। এরা পাতা এনেছে ভার্টিকাল ডিজাইনে। ফলে শুধু ওপর থেকে নিচে তাকালেই চলছে, ডান বাম ওপর নিচ এক্স ওয়াই যেড করতে হচ্ছে না। কলাম নিয়ে ঠাসাঠাসি না করায় সবখানেই পর্যাপ্ত স্পেস আছে, শ্বাস ছাড়ার জায়গা আছে। এমনকি লোগোর অংশেও পর্যাপ্ত স্পেস আছে। পড়তে আরাম লাগছে। প্রধান চমক হিসেবে মাঝখানে কার্টুন দিয়ে মেইন হেডলাইন ফিচারের এই ধাঁচ ধরে রাখলে এই সিগনেচার মানুষ মনে রাখবে। সব মিলে খুবই সমসায়ময়িক এবং মুচমুচে লাগলো প্রথম দিনের ডিজাইন। আশা করি আগামীর সময় নাড়াচাড়া করতে ভালো লাগবে। “
সংক্ষেপে বলতে গেলে,বত্রিশটি পৃষ্ঠা সুচিন্তিত অভিনব ধরনের পৃষ্ঠা সজ্জায় সজ্জিত। গত প্রায় ত্রিশ বছরের নিয়মিত সংবাদপত্রের নিয়মিত পাঠক হিসেবে আমি আশা করব দৈনিক আগামীর সময় সত্যকার অর্থেই আগামীর সময় হয়ে উঠবে। সম্পাদক আমাদের আশা জাগিয়েছেন। তিনি লিখেছেন- “রাজনীতি থাকবে। অতি রাজনীতি নয়। ইতিহাসের চর্চা থাকবে, অকারণ চর্বিতচর্বণ নয়। সংবিধান-চেতনা সব থাকবে কিন্তু মনে করিয়ে দেব, এ সবকিছুর কেন্দ্রে রাখতে হবে মানুষকে। মানুষের জীবন বদলের চেয়ে, তার সমৃদ্ধির চেয়ে বড় কোনো রাজনীতি হতে পারে না। কোনো সংবিধান, ইতিহাস, চেতনা মানুষকে বাদ দিয়ে নয়। কেন যেন মনে হয়, আমরা সবকিছু নিয়ে ভাবতে ভাবতে মানুষকেই যেন ভুলে যাচ্ছি। অতি রাজনীতি আর তর্কাতর্কির তিক্ততায় অন্য যে জীবন আছে, সেই জীবন যাচ্ছে হারিয়ে। আমরা সেই জীবনও দেখাতে চাই, যেখানে আনন্দ আছে, সম্ভাবনা আছে, সুর আছে, সহনশীলতা আছে। আছে ভালোবাসা। বহু বছর পর দেশে আবার আসছে একটা পরিপূর্ণ পত্রিকা, যাতে সব থাকবে। খেলা-ফিচার-বিনোদন মিলিয়ে সম্পূর্ণ পারিবারিক পত্রিকা।
এসব আয়োজনের মধ্যমণি মানুষ। মানুষের শক্তিকে জাগিয়েই গড়তে চাই সেই আগামী যে আগামী স্বপ্নের মতো সুন্দর।
অতএব আগামীর সময় আমাদের হাতে। আগামীর সময় আপনার হাতে।
আর হাতে নিলে মনে হতেও পারে, এই আরেকটার বোধহয় দরকার আছে!”
কেউ কথা রাখে না। মানুষকে কেন্দ্রে রাখার যে প্রতিশ্রুতি সম্পাদক দিয়েছেন আমরা আশা করি তিনি তা রাখবেন। আপাতত আমরা সদ্য জন্ম নেয়া দৈনিক আগামীর সময়কে শুভেচ্ছা জানাই নিউজ থ্রি সিক্সটি পরিবারের পক্ষ থেকে।


