মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিমান এয়ার ফোর্স ওয়ান গত বুধবার বেইজিংয়ে অবতরণ করে। তাঁকে স্বাগত জানান উপ-রাষ্ট্রপতি হান ঝেং।২০১৭ সালে তাঁর প্রথম মেয়াদের সফরের পর, প্রথম মার্কিন নেতা হিসেবে চীনের এই সফরে বেইজিংয়ে পৌঁছেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে দুই দিনের আলোচনায় বসবেন। এই বৈঠক মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর তা পুনর্নির্ধারণ করা হয়।
ধারণা করা হচ্ছে, আলোচনার মূল বিষয় দুই পরাশক্তির মধ্যকার বর্তমান উত্তেজনাপূর্ণ বাণিজ্য সম্পর্ক। ট্রাম্প বলেছেন, তিনি শি জিনপিংকে বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের জন্য চীনের অর্থনীতি “উন্মুক্ত” করার অনুরোধ জানাবেন। তিনি আরও যোগ করেন, ইরানের বিষয়েও একটি “দীর্ঘ আলোচনা” আশা করছেন, যদিও চীনের সহায়তা ছাড়াই এই সংঘাত মোকাবেলা করতে নিজের সক্ষমতা তিনি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ইরান ইস্যুতে শি গ্রহণযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন। একই সাথে এটি একটি “উত্তেজনাপূর্ণ সফর” হতে যাচ্ছে এবং “অনেক ভালো কিছু ঘটতে চলেছে” বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

অন্যদিকে শি তাইওয়ানের কাছে মার্কিন অস্ত্র বিক্রি বন্ধ এবং গত অক্টোবরে উভয় পক্ষে সম্মত হওয়া সাময়িক বাণিজ্য বিরতির মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য চাপ দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য শুল্ক বৃদ্ধিকে থামিয়েছিল।
চীনা মিডিয়ার ভাষ্যও এমন ইঙ্গিত করেছে, বেইজিং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি উন্নত ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পর্ক আশা করছে। এই সম্পর্ক অশান্ত আর অনিশ্চিত বিশ্বকে খানিকটা শান্ত ও নিশ্চিত করে তুলতে পারে। বৃহস্পতিবার সফরের মূল অংশ শুরু হওয়ার আগে, ট্রাম্প স্থানীয় সময় বুধবার সন্ধ্যায় এয়ার ফোর্স ওয়ানে বেইজিংয়ে পৌঁছান। দুই নেতার দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার আগে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এ শি-এর সাথে তাঁদের স্বাগতম জানানোর এক অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
একই ভেন্যুতে পরে একটি রাষ্ট্রীয় ভোজসভার আয়োজন করা হবে। শুক্রবার, ট্রাম্প জিনহুয়ানহাই পরিদর্শনে যাবেন। জিনহুয়ানহাই চীনের নেতাদের বসবাস ও কাজ করবার জায়গা, একটি সুরক্ষিত এলাকা। এখানে দুই বিশ্ব নেতা হাত মেলাবেন এবং বন্ধুত্বের স্মারক হিসাবে ছবি তুলবেন। শি-এর সাথে আরেকটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠক এবং একটি আনুষ্ঠানিক মধ্যাহ্ন ভোজনের পর, ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যাওয়ার আগে বিদায়ী অনুষ্ঠানের জন্য বিমানবন্দরে পৌঁছাবেন।

ইলন মাস্ক এবং এনভিডিয়ার সিইও জেনসেন হুয়াং এই সফরে অংশ নিচ্ছেন। ট্রাম্পের এই সফরে তাঁর সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান ব্যবসা ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সিইওরা রয়েছেন। বেইজিংয়ে রাষ্ট্রপতির এই আনুষ্ঠানিক সফরে যারা যোগ দিচ্ছেন তাঁদের মধ্যে রয়েছেন- এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং, অ্যাপলের টিম কুক, টেসলা ও স্পেসএক্স-এর ইলন মাস্ক, ব্ল্যাকরকের ল্যারি ফিঙ্ক এবং মেটা, ভিসা, জেপি মরগান, বোয়িং, কারগিলসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা। এই দলে হুয়াং-এর শেষ মুহূর্তের অন্তর্ভুক্তি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, কারণ এনভিডিয়ার উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স চিপস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটি অন্যতম প্রধান বিষয়। তিনি মূল তালিকায় ছিলেন না, তবে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত আমন্ত্রণে তাঁকে আলাস্কায় যাত্রাবিরতির সময় এয়ার ফোর্স ওয়ানে চড়তে দেখা গেছে।
২০২৫ সালের পর থেকে এ আই চিপস বিষয়ক সমস্যাটি দুই দিকেই সামান্য মাত্রায় কমেছে। গত বছরের বেশিরভাগ সময়ই চীন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি বাণিজ্য যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে ছিল বলে মনে হয়েছিল। যাইহোক, স্থায়ী কোনো সমাধান অধরা থেকে যাওয়ায় দুই পক্ষের মধ্যেই এখনও আলোচনার অনেক কিছু থাকবে।
ট্রাম্প সয়াবিন এবং বিমানের যন্ত্রাংশসহ গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন শিল্প খাতগুলো থেকে চীনা পণ্য ক্রয় বাড়ানোর জন্য চাপ দেবেন বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা ।
রেকর্ড রপ্তানি মাত্রা নিয়ে বেইজিং একটি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে । তবে তাদের এখনও মার্কিন ভোক্তা বাজারের প্রয়োজন আছে। পাশাপাশি, শি নিশ্চিতভাবেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অসৎ ব্যবসায়িক চর্চার বিরুদ্ধে সম্প্রতি ঘোষিত একটি বাণিজ্য তদন্ত বাতিলের জন্য চাপ দেবেন।
গত সপ্তাহে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছিলেন, শীর্ষ সম্মেলনে তাইওয়ান আলোচনার একটি অন্যতম বিষয় হবে। এই আলাপের উদ্দেশ্য হলো এই সমস্যাটি যাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যে উত্তেজনার কারণ না হয়ে দাঁড়ায়, এমন সম্ভাবনা প্রতিরোধ করা। চীনও ইঙ্গিত দিয়েছে, তাইওয়ান একটি প্রধান আলোচনার বিষয়। বুধবার সকালে একজন চীনা কর্মকর্তা তাইওয়ানের সাথে মার্কিন সামরিক সম্পর্ক এবং অস্ত্র বিক্রির বিষয়ে বেইজিংয়ের বিরোধিতার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। ইরানের সাথে সংঘাতের অবসান ঘটাতে চীনের সাহায্যের প্রয়োজন নেই বলে ট্রাম্প জোর দিলেও, তেহরানকে একটি চুক্তিতে আসতে রাজি করাতে তিনি বেইজিংকে উৎসাহিত করবেন বলেই ব্যাপকভাবে আশা করা হচ্ছে।
বিবিসি চীন সংবাদদাতা লরা বিকারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীন যুদ্ধ বন্ধের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। শান্তভাবে একজন মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা গ্রহণের চেষ্টা করছে। কারণ এই সংঘাত রপ্তানির ওপর প্রবলভাবে নির্ভরশীল এবং ধীরগতির চীনা অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ক্ষতি বয়ে আনছে। দুই পরাশক্তির জন্য আরেকটি বড় সমস্যা হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এখানকার প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে একটি পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার সাথে তুলনা করা হয়েছে এবং উভয় পক্ষই সংঘাত এড়াতে সম্ভাব্য সম্মানজনক সমাধান খুঁজছে। বিবিসি উত্তর আমেরিকা সংবাদদাতা অ্যান্থনি জুরচারের মতে একটি চুক্তি সম্পন্ন হতে পারে, যেখানে চীন তাদের নতুন রোবটের মস্তিষ্ক প্রোগ্রামিংয়ের উপযোগী হাই-এন্ড কম্পিউটার চিপসের বিনিময়ে বিরল খনিজ উপাদান (রেয়ার আর্থ) দেওয়ার প্রস্তাব করতে পারে।
বিবিসির রবার্ট গ্রিনালের নিবন্ধ অবলম্বনে


