সামুদ্রিক ঘাস: জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে এক নীরব যোদ্ধা

Share post:

Date:

পৃথিবীর ৭১ শতাংশ জুড়ে থাকা মহাসাগর শুধু আমাদের জীবন ধারণের জন্য অপরিহার্য নয়—জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়েও এটি এক বিশাল প্রাকৃতিক শক্তি। আর সেই লড়াইয়ের অন্যতম নীরব সৈনিক হলো সমুদ্রের তলায় বেড়ে ওঠা ছোট্ট এক উদ্ভিদ, সামুদ্রিক ঘাস।

সমুদ্র থেকে এসেছি, সমুদ্রের কাছেই ফেরা

“আমাদের জীবন সমুদ্রের সঙ্গে বাঁধা। সমুদ্রের কাছে গেলে—তা পাড়ি দেবার জন্যই হোক কিংবা শুধু প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখার জনই হোক, আমরা যেন আমাদের উৎপত্তিস্থলেই ফিরে যাই।” কথাগুলো বলেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডি। তার এই কথাগুলো শুধু কাব্যিক নয়, এর মধ্যে লুকিয়ে আছে এক গভীর বৈজ্ঞানিক সত্য।
পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তির ইতিহাসের সঙ্গে সমুদ্রের সম্পর্ক অবিভাজ্য। এই বিশাল মহাসমুদ্র শুধু আমাদের অতীতের অংশই নয়, ভবিষ্যতের পৃথিবীতে মানব জাতির টিকে থাকার সঙ্গেও এর সম্পর্ক গভীর। লক্ষ কোটি বছর আগে সেই উত্তপ্ত বিষাক্ত পৃথিবীকে প্রাণীজগতের বাসযোগ্য করে গড়ে তোলার পেছনে সাগর মহাসাগরের রয়েছে বিশাল ভূমিকা। আমরা যে পৃথিবীতে শ্বাস নেই, যে পরিবেশে বাস করি এবং এখনো পর্যন্ত আমাদের বেঁচে থাকার অপরিহার্য উপাদান অক্সিজেনের সরবরাহকারী হিসেবে সমুদ্রের নিরব ভূমিকা রয়েছে।
কিন্তু সবচেয়ে আতংকের বিষয় হলো জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানটি এখন রয়েছে বিপদের মুখে।
আমাদের এই গল্পের প্রধান চরিত্র হলো সমুদ্রের তলায় জন্ম নেওয়া এক সবুজ তৃণভূমি।

পৃথিবীর জলবায়ুর নিয়ন্ত্রক
পৃথিবীর প্রায় ৭১ শতাংশ বিশাল জলভাগকে মোটামুটি পাঁচটি বড় অঞ্চলে ভাগ করা হয়-আর্কটিক, আটলান্টিক, ভারত, প্রশান্ত এবং দক্ষিণ মহাসাগর।
কিন্তু সমুদ্র পৃথিবীর স্থলভাগের সবচেয়ে বড় অংশ নয়। এটি পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখার সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত।
আমরা প্রায়ই স্থলভাগের বড় বড় বনাঞ্চলকে “পৃথিবীর ফুসফুস” বলে থাকি। আমাদের অনেকেরই ধারণা বনাঞ্চলগুলো বাতাসের অক্সিজেনের সবচেয়ে বড় সরবরাহ করে।
কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো অক্সিজেনের সবচেয়ে বড় অংশ আসে সমুদ্রের জীবজগতের কাছ থেকে। বিজ্ঞানীদের মতে, আমরা নিঃশ্বাসের সাথে যে অক্সিজেন গ্রহণ করি তার প্রায় ৮০ শতাংশ আসে সমুদ্রের উদ্ভিদজগত থেকে।

সমুদ্র পৃথিবীর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে
সমুদ্র স্রোত শত শত কিলোমিটার জুড়ে চলাচল করে। এর মাধ্যমে বিষুবীয় অঞ্চলের অতিরিক্ত তাপ ধীরে ধীরে অন্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। এতে পৃথিবীর বিভিন্ন এলাকার তাপমাত্রার ভারসাম্য বজায় থাকে।

কার্বন ডাই-অক্সাইডের বিশাল ভাণ্ডার
বায়ুমণ্ডলে অতিরিক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ সমুদ্রের ভূমিকা অসাধারণ। সমুদ্রের পানিতে কার্বন ডাই-অক্সাইড দ্রবীভূত হয়। তাই
বায়ুমণ্ডলের তুলনায় অনেক বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড সমুদ্রে জমা থাকে। তবে শুধু পানিতে নয়, সামুদ্রিক প্রাণীরাও কার্বন ধরে রাখতে সহায়তা করে।
ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীব থেকে শুরু করে বিশাল তিমি পর্যন্ত সামুদ্রিক জীবজগতের নানা সদস্য কার্বন ধরে রাখার এই প্রাকৃতিক ব্যবস্থার অংশ।
কোনো সামুদ্রিক প্রাণী মারা গেলে তাদের দেহের সঙ্গে থাকা কার্বনের একটি অংশ সমুদ্রের তলায় চলে যায় এবং সেখানে দীর্ঘ সময় আটকে থাকে। তবে সমুদ্রে এমন একটি ছোট উদ্ভিদ আছে, যার অবদান অবিশ্বাস্য।

সি গ্রাস: সমুদ্রের নিচে সবুজ বন
দূর থেকে দেখলে সামুদ্রিক ঘাসগুলোকে খুবই সাধারণ বলেই মনে হবে। কিন্তু এগুলো কোনো সাধারণ ঘাস নয়। সারা পৃথিবীতে ৭০টিরও বেশি প্রজাতির সামুদ্রিক ঘাস রয়েছে। সমুদ্রের শান্ত উপকূলীয় অঞ্চলে অঞ্চলের অগভীর পানির নিচে ঘন অরণ্যের মতো বিশাল তৃণভূমি তৈরি করে।
ছয়টি মহাদেশের ১৫৯টি দেশে প্রায় ৩,০০,০০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে এই ঘাসবন ছড়িয়ে আছ—যা আয়তনের দিক থেকে প্রায় ইতালির সমান। কিন্তু একটি আশ্চর্যের বিষয় হলো, এত বড় এলাকা হলেও তা সমুদ্রতলের মাত্র ০.২ শতাংশ। তাহলে এত ছোট একটি এলাকার গুরুত্ব এত বেশি কেন? কারণ এই সামুদ্রিক ঘাসবনের রয়েছে কার্বন ধরে রাখার অসাধারণ দক্ষতা। গবেষণায় দেখা গেছে, এই সামুদ্রিক ঘাসবন প্রতি বছর সমুদ্রের কার্বনের প্রায় ১০ শতাংশ শোষণ করে। এটা পৃথিবীর সকল বনাঞ্চলের চেয়ে প্রায় ৩৫ গুণ বেশি। সমুদ্রের নিচের এই উদ্ভিদটি পৃথিবীর জলবায়ুর ভারসাম্য রক্ষায় বিরাট ভূমিকা রেখে চলেছে।

সামুদ্রিক ঘাসবন কীভাবে কার্বন ধরে রাখে?
সামুদ্রক ঘাস পানির মধ্য থেকে কার্বন গ্রহণ করে এবং সূর্যের আলো ব্যবহার করে নিজের পাতা ও শিকড় তৈরি করে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, উদ্ভিদটি মারা যাওয়ার পরও তার কাজ শেষ হয় না। তার মৃত পাতা ও শিকড় সমুদ্রের নিচে জমা হয়। এগুলো ধীরে ধীরে পচে। ফলে এর মধ্যে আটকে থাকা কার্বনের একটি বড় অংশ সমুদ্রতলের নিচে চাপা পড়ে। এই কার্বন বায়ু মন্ডলে ছড়িয়ে পড়ে না।
তবে গল্পটি বিপরীত দিকে মোড় নেয়, কারণ—
যে জলজ ঘাসবন কার্বন শোষণ করে পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই করছে, জলবায়ু পরিবর্তন এখন তাকেই ধ্বংস করছে।
পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে। ফলে সমুদ্রের তাপমাত্রাও বাড়ছে। তাপমাত্রা বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সামুদ্রিক ঘাসের ওপর। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উপকূলীয় দূষণ, পানি দূষণ, অপরিকল্পিত উন্নয়ন এবং অনিয়ন্ত্রিত মাছ ধরা। ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে সামুদ্রিক ঘাসবন দ্রুত কমে যাচ্ছে। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রতি ৩০ মিনিটে একটি ফুটবল মাঠের সমান সামুদ্রিক ঘাসবন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।পৃথিবী ব্যাপি প্রায় সাত শতাংশ হারে সামুদ্রিক ঘাসবনের আয়তন কমছে। শুধুমাত্র যুক্তরাজ্য গত শতাব্দীতে তার ৯০ শতাংশেরও বেশি সামুদ্রিক ঘাসবন হারিয়েছে। এটি শুধু একটি উদ্ভিদ হারানোর গল্প নয়। এটা পৃথিবীতে মানব জাতিসহ সমগ্র প্রাণীকুল হারিয়ে যাবার হুমকিতে আছে। সামুদ্রিক ঘাসবন হারালে আমরা হারাবো এমন একটি প্রাকৃতিক ব্যবস্থা, যা কার্বন আটকে রাখতে সাহায্য করে। অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে আমাদের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি অংশই দুর্বল হয়ে পড়ে।

সামুদ্রিক ঘাসবন কি বিলুপ্ত হয়ে যাবে?
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এখনই ব্যবস্থা না নিলে ২০৫০ সালের মধ্যে কিছু প্রজাতির সামুদ্রিক ঘাসবন বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। ইতিমধ্যেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের সামুদ্রিক আবাসস্থলগুলোর ঝুঁকিপূর্ণ তালিকাতে স্থান পেয়েছে। কিন্তু সামুদ্রিক ঘাসবনের বিপদ বোঝার জন্য সবচেয়ে ভালো স্থান হলো ভূমধ্যসাগর। এখানকার সামুদ্রিক ঘাসবন এটি পৃথিবীর দীর্ঘজীবী জীবগুলোর মধ্যে অন্যতম। এই আবাসস্থলগুলোর বয়স কয়েক হাজার বছর। এখানে Posidonia oceanica নামের ঘাসগুলো সমুদ্রের পুরোনো এক সবুজ প্রহরী, ভূমধ্যসাগরের বিস্তীর্ণ এলাকায় পাওয়া যায় Posidonia oceanica বর্তমানে এই উদ্ভিদটি বিপদের মধ্যে আছে।

সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয়?
আশ্চর্যের বিষয় কি জানেন? তাপমাত্রা বৃদ্ধির পর সামুদ্রিক ঘাসবনের সবচেয়ে বড় শত্রু হলো নৌকার নোঙর। বড় বড় জাহাজ বন্দরে ভেড়ার জন্য উপকুলে নোঙর ফেলে, সেই নোঙরের কর্ষণে সমুদ্রের নিচে সামুদ্রিক ঘাসবনের প্রচন্ড ক্ষয়ক্ষতি হয়। একটি নোঙর একদিনে যতটুকু ক্ষতি করতে পারে, সেটি পুরোপুরি ফিরে পেতে ১,০০০ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। অর্থাৎ মানুষ যেখানে কয়েক সেকেন্ডে ক্ষতি করতে পারে, প্রকৃতির সেখানে তা সারাতে লাগতে পারে শত শত বছর।

তাহলে কি সব শেষ?
এখনো সুযোগ আছে। সব কিছু একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। বিভিন্ন দেশ ইতিমধ্যেই সামুদ্রিক ঘাসবন রক্ষায় কাজ শুরু করেছে। কেনিয়া, মোজাম্বিক ও যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন জায়গায় মানুষ সমুদ্রের তলায় হারিয়ে যাওয়া সবুজ তৃণভূমি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে।
এখানে ডেনমার্কের গল্পটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
গত শতাব্দীতে দেশটি তার মোহনা ও উপসাগরীয় এলাকায় প্রায় ৯৫ শতাংশ সিগ্রাস হারিয়েছিল। এরপর শুরু হয় পুনরুদ্ধার কর্মসূচি। নির্দিষ্ট দূরত্বে ছোট ছোট জায়গায় সামুদ্রিক ঘাসবনের চারা লাগানো হয়েছে। সব মিলিয়ে
৪০,০০০-এরও বেশি নতুন চারা রোপণ করা হয়েছে।

এখন ডেনমার্কের বিশাল উপকূল জুড়ে সামুদ্রিক ঘাসবনের অরণ্য সৃষ্টি হয়েছে। এ যেন সমুদ্রের নিচে হারিয়ে যাওয়া বন আবার তৈরি করার চেষ্টা। ২০২০ সালে ওয়েলসের Swansea University-এর Seagrass Ocean Rescue দল আরও বড় উদ্যোগ নেয়। স্বেচ্ছাসেবক, গবেষক ও স্থানীয় মানুষ মিলে Pembrokeshire উপকূলের Dale Bay-তে প্রায় দুই হেক্টর এলাকায় ১০ লাখ সামুদ্রিক ঘাসের বীজ রোপণ করেন।

সমুদ্রের নিচে নার্সারি
যুক্তরাজ্যে Ocean Conservation Trust একটি বিশেষ ল্যাব তৈরি করেছে। স্কুবা ডাইভাররা সমুদ্র থেকে বীজযুক্ত ঘাসের চারা সংগ্রহ করেন। এরপর সেগুলো নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে বড় করা হয়।
এই প্রকল্পের জন্য প্রয়োজন ছিল প্রায় ৭ লাখ বীজ। সেই লক্ষ্য পূরণ করতে সংগ্রহ করতে হয়েছিল প্রায় ১৭,৫০০টি চারা। এরপর ২০২১ সালের এপ্রিলের শেষ দিকে ইংল্যান্ডের Plymouth Sound-এর সমুদ্রতলে ২,২০০ ব্যাগ চারা রোপণ করা হয়। লক্ষ্য ছিল এগুলোকে ধীরে ধীরে প্রায় ছয়টি ফুটবল মাঠের সমান একটি নতুন সামুদ্রিক ঘাসবনের তৃণভূমিতে পরিণত করা। তবে চারা বড় হওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের রক্ষা করাও জরুরি। তাই নাবিকদের ওই এলাকা থেকে দূরে থাকার অনুরোধ করা হয়েছে। কারণ একটি
নোঙর যে ক্ষতি করতে পারে, সেটি পূরণ করতে হয়তো শত শত বছর লেগে যেতে পারে।

প্রয়োজন অর্থ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
সামুদ্রিক ঘাসবন রক্ষার জন্য শুধু সচেতনতা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন অর্থ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। সামুদ্রিক ঘাসবন যে বিপুল পরিমাণ কার্বন ধরে রাখে, তার অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণ করা গেলে সংরক্ষণ প্রকল্পের জন্য অর্থ সংগ্রহ করা সহজ হতে পারে। কেনিয়া একটি উদাহরণ তৈরি করেছে। সেখানে সামুদ্রিক ঘাসবন রক্ষার একটি প্রকল্পের অর্থ সংস্থান করা হয়েছে কার্বন ক্রেডিট বিক্রির মাধ্যমে। গবেষণায় দেখা গেছে, ওই এলাকার সামুদ্রিক ঘাসবন অন্য অনেক জায়গার তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি কার্বন আটকে রাখতে পারে। অর্থাৎ প্রকৃতি রক্ষার কাজটি শুধু পরিবেশগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ নয়; সঠিক ব্যবস্থাপনায় এটি অর্থনৈতিকভাবেও মূল্যবান হতে পারে।

এক হেক্টর সামুদ্রিক ঘাসবন সমান দশ হেক্টর বন
গবেষণায় দেখা গেছে এক হেক্টর সামুদ্রিক ঘাসবন ভূমিতে থাকা প্রায় ১০ হেক্টর বনের সমপরিমাণ কার্বন ধারণ করতে পারে। তাই সমুদ্রের নিচে একটি ছোট সবুজ তৃণভূমিকে রক্ষা করার অর্থ শুধু সামুদ্রিক পরিবেশ রক্ষা করা নয়—এটি জলবায়ু রক্ষারও একটি অন্যতম উপায়। কিন্তু এখানেই ফিরে আসে সেই পুরোনো সমস্যা-জলবায়ু পরিবর্তন। কারণ তাপমাত্রা বাড়লে সামুদ্রিক ঘাসবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঝড়, জলচ্ছাস শক্তিশালী হলে সামুদ্রিক ঘাসের অগভীর শিকড় উপড়ে যেতে পারে। অন্যদিকে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বাড়লে সূর্যের আলো সমুদ্রের তলায় থাকা উদ্ভিদের কাছে পৌঁছাতে সমস্যা হয়। কাজেই সামুদ্রিক ঘাসবনের সামনে একাধিক বিপদ।

কিছু আশার কথা
গবেষণায় দেখা গেছে, বেশ কিছু প্রজাতির সামুদ্রিক ঘাসের পরিবর্তিত পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে টিকে থাকার ক্ষমতা রয়েছে, Zostera marina তেমনই একটি প্রজাতি যার মধ্যে প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে নিজেকে বদলে নেওয়া ক্ষমতা রয়েছে।
তবে এই ক্ষমতা কতটা কাজে আসবে, তা নির্ভর করবে ভবিষ্যতের জলবায়ু পরিস্থিতি এবং আমরা এখন কী পদক্ষেপ নিই তার ওপর।

আমাদের সামনে দুটি পথ
একদিকে আছে এমন একটি প্রাকৃতিক ব্যবস্থা, যা আমাদের জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, কার্বন আটকে রাখে এবং সামুদ্রিক জীবনের জন্য আবাসস্থল তৈরি করে। অন্যদিকে রয়েছে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, দূষণ, অতিরিক্ত মাছ ধরা, উপকূলীয় উন্নয়ন, নৌকার নোঙর এবং শক্তিশালী ঝড়। আমরা চাইলে সামুদ্রিক ঘাসবন রক্ষা করতে পারি। নোঙর ফেলার জন্য সংবেদনশীল এলাকা এড়িয়ে চলতে হবে। পানির দূষণ কমাতে হবে। অতিরিক্ত মাছ ধরা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ধ্বংস হয়ে যাওয়া সামুদ্রিক ঘাসবনের জায়গায় নতুন চারা লাগানো যেতে পারে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—জলবায়ু পরিবর্তনের মূল কারণগুলো কমানোর জন্য বৈশ্বিকভাবে কাজ করতে হবে।

পৃথিবীকে বাঁচানোর গল্পটি হয়তো লেখা হচ্ছে সমুদ্রের নিচে
জলবায়ু পরিবর্তনের কথা উঠলে আমরা সাধারণত বরফ গলা, পানির উচ্চতা বৃদ্ধি, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, দাবানল কিংবা ভয়াবহ ঝড়ের কথা ভাবি। কিন্তু পৃথিবীকে রক্ষা করার গল্পের আরেকটি অধ্যায় লেখা হচ্ছে আমাদের চোখের আড়ালে—সমুদ্রের তলায়। সেখানে নীরবে বেড়ে উঠছে সবুজ এক তৃণভূমি।
তারা নীরবে বেড়ে ওঠে। তারা সূর্যের আলো ব্যবহার করে বেড়ে ওঠে, কার্বন ধরে রাখে এবং সমুদ্রের অসংখ্য প্রাণীর জন্য আশ্রয় তৈরি করে।
অথচ সেই নীরব যোদ্ধারাই আজ বিপন্ন। প্রতি ৩০ মিনিটে পৃথিবীর কোথাও না কোথাও একটি ফুটবল মাঠের সমান সামুদ্রিক ঘাসবন হারিয়ে যাচ্ছে। একটি নোঙরের আঘাতের ক্ষত সারতে কখনো কখনো এক হাজার বছর লেগে যেতে পারে।
তবু গল্পটি এখানেই শেষ নয়। মানুষ চাইলে ধ্বংস হওয়া সামুদ্রিক ঘাসবন ফিরিয়ে আনতে পারে। নতুন তৃণভূমি তৈরি করতে পারে। হয়তো ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে আমাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্রগুলোর কিছু কোনো কারখানায় তৈরি হবে না। হয়তো সেগুলো ইতোমধ্যেই তৈরি হয়ে আছে—সমুদ্রের নিচে। আমাদের কাজ হলো সেগুলোকে ধ্বংস না করা।
শেষ পর্যন্ত শুধু একটি প্রশ্ন রয়ে যায়।
যে সমুদ্র যে আমাদের বাঁচিয়ে রাখছে—আমরা কি তাকে বাঁচিয়ে রাখার মতো দায়িত্বশীল হতে পারব?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সাবস্ক্রাইব

spot_img

সম্পাদকের নির্বাচিত

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

ডাঙায় হাঁটে, গাছে চড়ে রহস্যময় ‘মাডস্কিপার’ মাছ

অনুলিখন: শরীফ সারওয়ার ​মাছ মানেই জলের গভীরে সাবলীল সাঁতার, ফুলকা...

স্টিং রে: সমুদ্রতলের নীরব প্রহরী ও নীল অর্থনীতির অমূল্য সম্পদ

অনুলিখন  শরীফ সারওয়ার ​সাগরের নীল জলরাশির নিচে ডানা মেলে ভেসে...

মিষ্টি জলের মাছে প্রথম বার সংক্রামক ক্যান্সার চোখে পড়েছে বিজ্ঞানীদের

ইউনিভার্সিটি অফ ভারমন্টের অধ্যাপক জশুয়া ব্রাউনের নিবন্ধ অবলম্বনে মেলানোমা (এক...

হিমালয়ের হাসি মুখ মাকড়সা

স্পাইডার ম্যান ফ্র‍্যাঞ্চাইজির নতুন ফিল্ম আসছে। অ্যা ব্র‍্যান্ড নিউ...