প্রায় একুশ বছরের জীবন। তীব্র, শ্রমশীল, মানুষের প্রতি দায়বোধ তাঁর লেখার একমাত্র অর্জুনের চোখ। তিনি কবি, সম্পাদক, বামপন্থী রাজনীতির সংগঠক, ‘কিশোর কবি’ খ্যাত সুকান্ত ভট্টাচার্য। কবিতা ও কবির যাপন ইতিহাসের দিনানুদিনে বয়ে যায়। আমাদের অনেকের মনে পড়বে, সত্তর আশি বা নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের পাড়ার গ্রন্থাগার বা সাংস্কৃতিক সংগঠনের উদ্যোগে পালিত হতো ‘রবীন্দ্র- নজরুল-সুকান্ত’ সন্ধ্যা। কেউ কেউ মজা করে সংক্ষেপ করে নাম দিয়েছিলেন রসুন সন্ধ্যা। রবীন্দ্রনাথের প্রবল প্রভাবের সময়ে নিজের এক স্বতন্ত্র কাব্যভাষার জোরে স্মরণীয় কাজী নজরুল ইসলাম৷ রবীন্দ্রনাথ আটত্রিশ বছরের অগ্রজ। ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে রবীন্দ্রনাথ, একটি উজ্জ্বল শতাব্দীর প্রায় মধ্যবর্তী সময়ে জন্ম, একেবারে শেষ বছরের নজরুল। ১৮৯৯। সুকান্ত দুজনেরই অনুজ। আজ তাঁর একশ বছর হলো।
স্বল্পদৈর্ঘ্য জীবনে কত কাজ করেছেন ভেবে বিস্মিত হই। না, কেবল রচনাসমগ্রের আয়তনের দিক থেকে তাঁকে বিবেচনা করা ঠিক হবে না৷ সুকান্ত জীবন সাধনা তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা এমনকি নিজের লেখাপত্রের চেয়েও বিশাল। মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসেছিলেন৷ উত্তীর্ণ হলেন না। ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা ‘স্বাধীনতা’-র কিশোর বিভাগ ‘কিশোর সভা’ পরিচালনা করতেন। বন্ধুদের লেখা চিঠিতে সমকালীন কথাসাহিত্য, মানুষের মুক্তির রাজনীতি সম্পর্কে তাঁর চর্চার কিছু বিবরণ পাওয়া যায়। রবীন্দ্রপ্রয়াণের পর তিনি রেডিও’র ‘গল্প দাদুর আসর’ বিভাগে যোগ দেন। রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি করতেন। তাঁর রচিত গানে সুর দেন কিংবদন্তী পঙ্কজ কুমার মল্লিক। কথাসাহিত্যিক, রাজনৈতিক সংগঠক সোমেন চন্দ প্রকাশ্য দিনের আলোতে খুন হয়ে যাওয়া সুকান্তকে ব্যথিত করেছিল। সুকান্ত ফ্যাসিবাদবিরোধী লেখক ও শিল্পীসঙ্ঘে যুক্ত হলেন। তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষ তাঁকে আলোড়িত করেছিল। এই সঙ্ঘ থেকে তিনি সম্পাদনা করলেন গুরুত্বপূর্ণ বই – আকাল৷ সে সময়ের প্রায় সকল উল্লেখযোগ্য কবির কবিতা ছিল এই সংকলনে। কমিউনিস্ট পার্টির সাথে অল্প বয়সেই যুক্ত হন৷ ব্যক্তিগত চিন্তায় ডুবে থাকা নয়, তিনি সার্বক্ষণিক ভেবেছিলেন সমষ্টির চিন্তা। কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, গীতিনাট্য, ছড়া- এক কথায় সাহিত্যের প্রায় সব মাধ্যমেই তিনি নিরন্তর লিখেছেন৷ দীর্ঘদিন যক্ষ্মা রোগে ভুগে ভারতের স্বাধীনতার অল্প কিছুদিন আগে সাতচল্লিশের তেরো মে তিনি মৃত্যু বরণ করেন। নিজের রাজনৈতিক দলের প্রতি নিবেদিত শ্রম, নিজের স্বাস্থ্যের প্রতি খেয়াল না রাখা বা রাখতে না পারা তাঁর অকালে চলে যাওয়ার কারণ৷ তিনি তাঁর বই দেখে যেতে পারেননি৷ মৃত্যুর পর প্রথম বই ‘ছাড়পত্র’ প্রকাশিত হয়৷
ধারাবাহিকভাবে অন্যান্য রচনা৷ মাত্র পাঁচটি গল্প, আট কাব্যগ্রন্থ, কিছু গান, গীতিনাট্য, বেশ কিছু চিঠি রেখে গেছেন সুকান্ত ভট্টাচার্য।
স্বেচ্ছাব্রত নিয়েছিলেন মানুষের মুক্তির সংগ্রামে জীবন উৎসর্গ করবেন৷ তাঁর জীবন সময়ে দেশ ও দেশের বাইরের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনার আলো ছায়া পাঠকেরা পাবেন নাতিদীর্ঘ রচনাসংগ্রহে। ইচ্ছে করেই কোনও কবিতার উদ্ধৃতি দিলাম না। আমার আশা, নতুন প্রজন্ম তাঁর সাহিত্য ও জীবন ব্যক্তিগত আগ্রহেই পড়বেন৷ তিনি তাঁর শত জন্মদিনেও প্রাসঙ্গিক৷ আরও শত জন্মদিন প্রাসঙ্গিক থাকবেন৷


