মউদুদুল আলম। স্বনামেই পরিচিত। ছাপান্নতে জন্ম। বাবা বাংলাদেশের ইতিহাস আগ্রহীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মানুষ, শিক্ষক ও সাহিত্যিক ওহীদুল আলম। পাঠকদের জন্য লিখে রাখি, তিনি ‘চট্টগ্রাম ফটোগ্রাফিক সোসাইটি’-র প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক৷ সাবেক সভাপতি। নিজে ছবি তুলেছেন। আলোকচিত্রের বোধ জাগিয়েছেন শত শত শিক্ষার্থীর প্রাণে। জীবনে ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছেন, আলোকচিত্রের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়াবার অত্যন্ত জরুরি কাজটিকে। শৈশব, কৈশোর, বেড়ে ওঠা, আলোকচিত্রাচার্য মনজুর আলম বেগের সান্নিধ্য ও স্নেহধন্য হওয়া, চিত্রকলা আর কবিতা হয়ে আলোকচিত্রকেই যাপনে ব্যাপ্ত করে নেয়া- এই সব বিষয়ে আন্তরিক, খোলামেলা আলাপে সময় দিয়েছেন নিউজ থ্রি সিক্সটির এডিটর ইন চার্জ সৈকত দে‘কে। আজকে ওয়ার্ল্ড ফটোগ্রাফি ডে। এই দিনটিকে কেন্দ্র করে প্রিয় পাঠক, আপনাদের জন্য বিশেষ আয়োজন এই দীর্ঘ আলাপ। আসুন, সময় ভ্রমণ করি আমাদের প্রিয় অগ্রজের সাথে।

সৈকত দে: আপনার প্রথম স্মৃতি কি মনে পড়ে? আপনি যখন স্মৃতির একদম পিছন দিকে যান। আপনি তো ছাপান্নতে জন্মালেন। একদম শৈশবের কোন স্মৃতি আপনার মনে পড়ে?
মউদুদুল আলম : আমি একটা বেনিয়ান পরে… বেনিয়ান বোঝো তো?
স: ওই যে পাজামা না কি বলে-
ম: ফতুয়া।
স: হ্যাঁ, ফতুয়া টাইপ।
ম: ফতুয়া পরে ছোট আপার কোলে চড়ে সন্ধ্যা বেলায় আমি বাড়ি ফিরছি। এটা আমার হচ্ছে, আমার জ্যাঠারবাড়ি থেকে আমার বাড়ি আমার জ্যাঠারা একটু ভেতরে…
স: হ্যাঁ।
ম: আমার বাড়িতে ফিরে আসছি। এটা আমার খুব মনে পড়ে। তার মাঝে আরেকটা স্মৃতি মনে পড়ে। সকালবেলায় আমি কিচেনের মধ্যে। আমার মা আমাকে নিয়ে বসে আছে। আমার মা আমাকে দুধ খাওয়াচ্ছে ৷ অন্ধকার পূর্ব দিকে ৷ অন্ধকার। উপরের দিকে ফোঁকর আছে। ফোঁকর বেয়ে সকালের আলো পড়েছে আমার মায়ের মুখের উপর। আমি মা’কে… সপ্রতিভভাবে তাকালাম। মা আমাকে… মায়ের ডাগর ডাগর চোখ। মধ্য বয়সে উনি বা তার চেয়ে কম হবে। আমার দিকে তাকালেন। অনেক যত্ন সহকারে উনি আমাকে দুধ খাওয়াচ্ছেন। এবং তাঁর নাকের যে নোলক, একটা ব্লু কালারের একটা ডায়মন্ডের নোলক, তাঁর নাকের মধ্যে আলোটা এখানে এসে পড়েছে এবং আলোর ইয়ে, একদম মিডল পয়েন্টে ঠিকরে বেরিয়ে এসে আমার চোখের উপর পড়েছে। এ দৃশ্যটা আমার কাছে অনেক দিন মনে থাকবে।

স: মানে একভাবে দেখতে গেলে নিজের মায়ের সাথে সেটা আপনার সচেতন ভাবে দেখা। সচেতনভাবে তাঁকে আপনার প্রথম দেখা। মানে মাকে আপনি জানলেন।
ম: আমি জানি না যে আমি তাঁর গর্ভ থেকে বেরিয়ে এসেছি, সেটাও আমি জানি না। হয়তো পরে আরো তিন চার বছর দশ বছর পরে জানব কিন্তু আমার মনে হয়েছে এই চেহারাটা প্রিয় এবং অসম্ভব আমার জন্য নির্ভরশীল।
স: আপনার এই ছোটবেলার যে গ্রাম তারপর এখানে আসলেন।
ম: আমার জন্ম এখানে।
স: আপনার জন্ম এখানে। এই ছোটবেলার যে শহর, আপনার বন্ধুবান্ধব তাদের কথা যদি একটু বলেন। আপনার বেড়ে ওঠার সময়টা। ধরেন, আপনি স্কুলে প্রথম গেলেন বা আপনি টুকটাক বই পড়ছেন, পাঠ্য বইয়ের বাইরে-
ম: তুমি তো আমার নস্টালজিয়ায় হাত দিয়ে দিসো। (হাসি)
স: সেটা হয়তো আমরা পরে একটা দীর্ঘ ইন্টারভিউ করব আপনি এখন…
( আত্মজৈবনিক উপন্যাস লেখার কথা জানালেন আর একটি অসম্পাদিত উপন্যাসের কথা বললেন)
ম: তুমি যেটা বলছো চিটাগাংয়ে তখন খুব শহরে পঞ্চাশটাও গাড়ি ছিল না। রিকশা ছিল কিছু আর বেবি টেক্সি, টু স্ট্রোক।
স: ঘোড়ার গাড়ি ছিল?
ম: প্রচন্ড ঘোড়ার গাড়ি ছিল।
স: আচ্ছা কোতোয়ালীর মোড়টাতে নাকি ঘোড়ার আস্তাবল ছিল?

ম: হ্যাঁ, আস্তাবল ছিল। তারপর ওইখান থেকে আমি আমার নানা বাড়ি যেতাম। পাঠানটুলি খান বাড়ি। ওইখানে আমার মা আমাকে নিয়ে যেত। আমরা ঘোড়ার গাড়ি করে যেতাম এবং তোমার টাইগার পাস দিয়ে, তখন ব্রিজ তো হয় নাই। ছোট রাস্তা ছিল। রেল লাইনের পাশ দিয়ে, রেলওয়ে ক্রসিং ছিল, লেভেল ক্রসিং ছিল তো একদম মানে মেন্টেইন্ড না।
স: তার মানে টাইগার পাসের দোতলা রাস্তাটা তখন ছিল না?
ম: অনেক পরে হয়েছে। তখন আমার বয়স হার্ডলি সাত থেকে আট বছর।
স: মানে ৬৪ ৬৫।
ম: উম ৬৩ ৬৪।হ্যাঁ হ্যাঁ ঐরকম।
স: আপনার স্কুলের টিচারদের কথা মনে আছে?
ম: ডেফিনেটলি। আরেকটু বলি আমার স্কুল শৈশবে আমার কিছু বন্ধু ছিল। তার মধ্যে আমার কাজিন সোলসের প্রতিষ্ঠাতা, ও ছিল। তারপর আমি ছিলাম। আমার আরেক ভাইপো ছিল সেও সোলসে বাজাতো। বেজ গিটার বাজাত। তো, আমরা একটা ফ্যামিলি বলয়। এই এলাকার মধ্যে নিম্ন মধ্যবিত্ত বা প্রান্তিক মানুষদের, ইয়ে বেয়ারার ডেইলি লেবারার দেখেছিলাম ফলে এখানে আমরা তিন বাড়ি মেইনলি। চার বাড়ি। কানেক্টেড থাকতাম। কারো সাথে মিশতাম না।
স: মানে আপনারা আপনারাই থাকতেন?

ম: আমরা আমরা থাকতাম। তার মধ্যে হচ্ছে আবুল ফজল সাহেবের ছেলেরা। উনি তো আমার বোনের জামাই। তারপর মাহবুব আলমের পরিবার। সাহিত্যিক মাহবুব আলম। আর হচ্ছে তোমার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি মান্নান সাহেব আছে না? আব্দুল মান্নান? উনার বাড়ি। এই চার বাড়ি আমরা থাকতাম। আমরা ক্লাবও করেছি।
স: কি নাম ছিল ক্লাবটার?
ম: ‘আমরা যারা জেগেছি’, তারপর ‘সবুজ সংঘ’ এগুলো করেছি আর কি। তো, মেইনলি আমরা খেলতাম। ফুটবল ব্যাডমিন্টন খেলতাম। মেইনলি ক্রিকেট খেলতাম।
স: আপনাদের সময় শুনেছি আমি যে ফুটবলের বেশ একটা জনপ্রিয়তা ছিল –
ম: প্রচন্ডভাবে। স্টেডিয়ামটা ছিল আমাদের জন্য একটা –
স: স্বর্গরাজ্য-
ম: স্বর্গরাজ্য মানে এটাতে না আসলে আমাদের দিনটা ভালোভাবে যায় না আর কি। আর টিচারদের কথার মধ্যে, তখন ন্যাশনাল অ্যানথেম হয় নাই। পাকিস্তানের ন্যাশনাল অ্যানথেম। যেটা ছিল সেটা ছিল ‘উড়াও উড়াও আজি কওমী নিশান’, আমরা এটা স্কুলে গাইতাম… ‘আমাদের কওমী নিশান’ এটা গাইতাম।
স: তার মানে ওই পাক সার সাদ বাদ এটা অনেক পরে আসছে?
ম: পাক সাদ আমি গাইতাম না তখন। (হাসি) তারপর এরপর ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ এটাও গেয়েছি।
স: মানে দুটো আলাদা গানের লাইন বললেন আপনি?
ম: হ্যাঁ, দুটো আলাদা। আচ্ছা, এইটা গেল। তারপর হচ্ছে আমাদের একজন হিন্দু টিচার ছিলেন। উনি আমাদের ন্যাশনাল অ্যানথেম করাতেন। আমি স্কুলের মধ্যে…
স: পি টি স্যার, পি টি টিচার টাইপের? ফিজিকাল ট্রেনিং করাতেন?
ম: উনি আমাদের ডিসিপ্লিন শেখানো-
স: হ্যাঁ।
ম: তারপর ওই যে মোরাল শেখানো। এইসব আর কি। আমি তখন পড়তাম বাগমনিরাম প্রাথমিক স্কুলে। তখন যুদ্ধ হয়নি। সিক্সটি ফাইভ যুদ্ধের আগে।
স: মানে পাক ভারত যুদ্ধ-
ম: হ্যাঁ। সেটার আগে।
স: বালক বয়স থেকে আপনি আস্তে আস্তে কিশোর হলেন ৷

ম: বালক বয়সের শেষের দিকে আমরা একটু ডানপিটে ছিলাম। আমি একটু ক্রিয়েটিভ ছিলাম। ক্রিয়েটিভের মধ্যে ছবি আঁকতাম তখন। ছবি আঁকতাম ৷ যেহেতু কাগজের স্বল্পতা ছিল, এগুলো সাপ্লাই টাপ্লাই পেতাম না। আমার বাবা স্কুল টিচার। আমাদের ভাই বোন আটজন। ওদের খাওয়ানো, স্কুলিং৷ অনেক টাকা পয়সার ব্যাপার। সুতরাং যে লাকজারিভাবে আমরা… একটা শার্ট একটা প্যান্ট পরে ইস্কুলে গেছি। অল্টারনেটিভ কোন ড্রেস ছিল না। নিজেরাই কাপড় ধুয়ে নিতাম। ইস্ত্রি তো করতে পারতাম না। বালিশের নিচে দিয়ে চাপ দিতাম। সোজা হয়ে যেত।
স: ছোটবেলা থেকেই আপনারা সব কাজ নিজেরা করতেন?
ম: নিজের কাপড় নিজে ধুতাম। নিজের সব পরিষ্কার করা নিজেরাই করতাম। আমার আম্মার ইন্সট্রাকশন ছিল। কাপড় শুকাতে দেয়া। আমাদের কোন কাজের মেয়ে ছিল না। একজন আসতেন রান্নাবান্না করে চলে যেতেন। আমরা পানি এনেছি মিউনিসিপালটির কল থেকে। আমাদের তখন নিজেদের পানির কল ছিল না।
স: ছবি আঁকার কথা বলছিলেন। কবিতার দিকে গেলেন। আগে ছবি পরে কবিতা?
ম: আগে ছবি তারপর কবিতা।
স: প্রথম কবিতা লেখার মুহূর্তটা মনে আছে আপনার? বা কখন আপনার মনে হল যে একটা কবিতা লেখা যেতে পারে?
ম: আমি যখন স্কুলে পড়তাম। কলেজিয়েট স্কুলে পড়তাম।
স: প্রাথমিক বাগমনিরাম, মাধ্যমিক কলেজিয়েট।
ম: হ্যাঁ। তারপর মহসিন কলেজ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা বিভাগ। তারপর ফটোগ্রাফির জন্য আমি বেগার্ট ইনস্টিটিউট অফ ফটোগ্রাফি, ঢাকায়। বাংলাদেশে আর ছিল না তখন।
স: তারপর কবিতা লেখার ব্যাপারটা।
ম: ছোটবেলায় অন্ত্যমিল দিয়ে লিখতাম। তখন আধুনিক, মিল ছাড়া কবিতা লিখতাম না। তো পরে যখন বয়:সন্ধিক্ষণ হচ্ছে। স্কুলে পড়ছি। স্কুলের ম্যাগাজিনে আমার কবিতা ছাপা হয়েছে।
স: স্কুলের ম্যাগাজিনে?
ম: হ্যাঁ। ‘কিশোর’ আমাদের একটা স্কুল ম্যাগাজিন ছিল। এটা আমার আব্বা সম্পাদনা করতেন।
স: আপনার কবিতার বইয়ের কথা যদি বলেন। মনির ভাই (খড়িমাটি, মনিরুল মনির) বলছিলেন –

ম: ওই কবিতাগুলো আমি দিই নাই। পরে কিন্তু আমি কবিতা লিখতে শুরু করি। প্রথম কবিতা লিখি আমি সেভেন্টি ফাইভের দিকে বা তারও পরে। যখন আমার হাতটা ভেঙ্গে যায়। হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকতাম। তো, কবিতা আওড়াতাম বিভিন্ন ধরনের।তখন আমার বাম হাত ভেঙ্গেছে আমি ডানহাতে কবিতা লিখতাম।
স: এটা কি একাত্তরের পরে?
ম: একাত্তরের অনেক পরে। আমার কবিতার বিষয়বস্তু হচ্ছে আমার রুট। যেখান থেকে আমি এসেছি এবং বহমান নদী নদীর জল। তারপর, যে এই সভ্যতার মানুষগুলো। তারপর মোহনা পর্যন্ত যারা আছে তারা হলো আমার আত্মার আত্মীয়। এদের সাথে আমি বিট্রে কোনদিন করি নাই, করবো না। এবং কেউ বিট্রে করলে আমি তাদের বিপক্ষে কথা বলব। সে যে ধর্মেরই হোক। আই ডোন্ট মাইন্ড। কিন্তু কেউ আমার এই অধিবাসীগুলোর, এই সমতটের মানুষের, কেউ যদি কোন ধরনের ইয়ে করে সেটা আমি সহ্য করব না।
স: প্রথম কবিতা বইয়ের নাম কি ছিল?
ম: নিথর জলের নিঃশব্দে-
স: তারপর তো আপনি ফটোগ্রাফির দিকে গেলেন।
ম: তার আগে থেকে ফটোগ্রাফিতে।
স: এইটা কিভাবে শুরু হলো? মানে আপনার কখন মনে হল যে ঠিক আছে…
ম: আমি তো আমি শুরু করেছি ফটোগ্রাফি, সেভেন্টি সিক্সের দিকে শুরু করি। যেহেতু আমার ভিতরে ছিল ফটোগ্রাফি। অন্তর্গত একটা ব্যাপার ছিল কিন্তু ফটোগ্রাফিতে আসলে কি – আমি ইমেজ দেখি মনের ভিতর কিন্তু এটাকে কিভাবে আমি… এতগুলো ইমেজ চলে যায় প্রতিদিন… এই যে তুমি আমার সাথে কথা বলছো, কতক্ষণ এদিকে তাকাচ্ছ কতক্ষণ ও দিকে তাকাচ্ছ। এখানের মধ্যে কোন একটা মুহূর্ত কিন্তু অনেক সুন্দর। আমি ধরতে পারছি না যেহেতু আমার কোন মেকানিজম বা কৌশল আমার জানা নেই। এটাকে আমার রপ্ত করতে হবে আমার দৃষ্টিকোণ থেকে। এই ফটোগ্রাফি হচ্ছে একটা শিল্প। কিন্তু অনেকে মনে করে এটা যেহেতু একটা যন্ত্র দিয়ে হয়, চাপ দিয়ে হয়ে গেল ছবিটা। এখানে তার পিছনে যে বাহাদুরি – তো, আমি বলি যে তার কম্পোজিশন সেন্স, এবং তুমি যে আমার সাথে কথা বলছো তুমি একটা সাবজেক্ট হিসেবে যখন নিচ্ছি, তোমার তখন তোমার যে ইমোশনটা ফটোগ্রাফি শুধু ফটোগ্রাফি না এটা ইমোশনটাকে ধরা। ইমোশনটাকে ধরতে গেলে কিন্তু তোমাকে এটার উপরে তোমার একটা অবজারভেশন থাকতে হবে এবং এ অবজারভেশন ধরবার জন্য কিছু কলা কৌশল লাগবে। কলা কৌশল মানে হার্ডওয়ার আর অবজারভেশন হচ্ছে সফটওয়্যার, তোমার ফিলিংস যেটা আমি যে একটা- মা যখন- যে কথাটা বলছি-
স: একদম শুরুতে যা বলছিলেন-
ম: হ্যাঁ ওইটাই একজন কুমারী মাতা বা ছোট মেয়ে যখন মা হয় সে যদি তার সন্তানকে দেখে দেখার পর সে যদি অসম্ভব পুলকিত বোধ করে, সে বলবে আহা পৃথিবীতে এসেছি। এই সুন্দর পৃথিবীতে আমার একটা বাচ্চা হয়েছে। বাচ্চাকে আমি সুন্দর করে লালন পালন করব। তার যে অভিব্যক্তি তার যে আগ্রহ সেটা তার চোখের মধ্যে ফুটে ওঠে।
স: একদম একদম।
ম: হ্যাঁ? যখন ফুটে ওঠে তখন যে মুহূর্তটা, সেটা ধরার যে ক্যাপাসিটি, মুন্সিয়ানা সেটা যদি না বুঝে তাহলে সে কখনো আলোকচিত্রী হতে পারবে না। শিল্পী হতে পারবে না।
স: বুঝতে পেরেছি।
ম: এইজন্য ফটোগ্রাফি শুধুমাত্র ভালো ক্যামেরা কেনা না। ভালো এক্সপোজার দেয়া না। এক্সপোজারের আগে কিন্তু মনের ভেতর একটা এক্সপোজার দিতে হবে। যেটা তোমার সাবজেক্টকে পোর্ট্রে করবে। সাবজেক্ট থেকে সাবজেক্টে যখন থ্রো করবে তুমি, তোমার ইমোশনাল ভ্যালুটা তখন সেটা রেসপন্ড করে। ওই রেসপন্সের মুহূর্ত, সেটা ফটোগ্রাফি ক্যাপচার করে। এবং এটা একটা অনবদ্য ছবি হয়। এটা কালজয়ী হয়।
স: মানে প্রযুক্তির ব্যাপারটা তো বিভিন্ন কর্মশালার মাধ্যমে শেখানো যায়। কিন্তু অনুভূতির ব্যাপারটা তো মানুষের বেড়ে ওঠার সাথেই সম্পর্কিত। আপনার কি মনে হয়, ছবি তোলার যে অনুভূতি ছবি তোলার সময় হবে, ছবিটা কেমন হবে সেটা কি কাউকে শেখানো যায়? মানে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শেখানো যায়? মানে যেমন কবিতা লেখা বা ছবি তোলার অনুভূতি?
ম: আমি প্রাতিষ্ঠানিকতা ব্যাপারটা ডিফার করি। আমি চারুকলা থেকে পাশ করেছি। ইউনিভার্সিটিতে গেছি। কিন্তু আমি কোনদিন ফিল করিনি বিসিএস ক্যাডার হবো, এডমিনে যাব, আমার সাদা গাড়ি থাকবে, নামলে আমাকে সবাই সালাম দেবে। (হাসি) আমি মনে করি, প্রাতিষ্ঠানিকতার আলাপটা একটা জনবিচ্ছিন্ন আলাপ। জনবিচ্ছিন্ন হলে তুমি শিল্পী হতে পারবে না। প্রথমেই তোমাকে মানুষের কাছে যেতে হবে। মানুষের অনুভূতি জানতে হবে, চিনতে হবে। নিখাদ ভালোবাসা থাকতে হবে। তার মধ্যে মেকি কিছু থাকতে পারবে না।
স: মানে সেলফলেস?
ম: সেলফলেস এবং এটা একদম মেকি না ৷ অনেকে তো জড়িয়ে ধরে স্যাভলন দিয়ে হাত মোছে। বুঝছো? (হাসি)
স: আপনার প্রথম ক্যামেরা কি আপনি কিনেছিলেন? কেউ আপনাকে গিফট
করেছিল? না, বাবা উপহার দিয়েছিলেন? মানে প্রথম ক্যামেরার স্মৃতি আপনার মনে আছে?
ম: আমার বাবা স্কুল টিচার ছিলেন। আমাদের ভাত খাওয়াতে আমার আব্বার অনেক কষ্ট হতো। বই কিনে দিতে অনেক কষ্ট হতো।
স: এটা কি আপনি অন রেকর্ড বলছেন?
ম: হ্যাঁ হ্যাঁ, অন রেকর্ড। এই যে ভনিতা জানি না। আমি এটা বললে আমার বউ যে পালাই যাবে এটা তো না। (হাসি)
স: এইজন্যেই তো আমরা আপনাকে পছন্দ করি।
ম: বুঝছো? আমার বউ তো আমাকে বলে, তুমি এত এভাবে কথা বলো কেন? আমি বলি, যেটা সত্য। সত্য আমি যদি বলতে না পারি আমার দম বন্ধ হয়ে যায়। এইজন্য আমি সব সময় সত্য বলি। এরপর আমাকে কেউ মারলেও আমার আপত্তি নেই। সত্য বলেছি আমি কিন্তু।
স: বুঝতে পেরেছি।
ম: আমার ক্যামেরা কেনার কথা বলছো। যেহেতু আমার বাবা শিক্ষক ছিলেন, আমাকে কাপড় দিতে পারে না, খাওয়া দিতে পারে না, সেখানে ক্যামেরা কি করে- তখন ক্যামেরা মোস্ট এক্সপেন্সিভ। গিফট বা বিভিন্ন কাজের মাধ্যমে টাকা দেয়ার সুযোগ তখন ছিল না। আমাদের যুগে সবচেয়ে বড় ক্যামেরা ছিল জেনিথ ক্যামেরা। রাশিয়ান মেড। এবং আমি ১৫০০ টাকা দিয়ে একটা জেনিথ ক্যামেরা কিনেছিলাম ৷
স: এটা কত সালে?
ম: সেভেন্টি সেভেন, এরকম। কিনেছিলাম এটা শাটার স্পিড ৫০০ পর্যন্ত ছিল ৷ সুতরাং এখানে অনেক সীমাবদ্ধতা। যেহেতু ক্যামেরা পেছনে ক্লিক করে দেখার কোন সুযোগ নাই ৷ হ্যাঁ হ্যাঁ তুমি কি তুললা কি কম্পোজিশন কিছুই বলতে পারবে না-
স: আর তখন তো ফিল্মে তোলা, ফুজি বা কোডাক…
ম: তখন ফিল্মে তোলা ছিল।
স: ছত্রিশটা করে ছিল।
ম: ছত্রিশটা। লিভার যেটা আছে, আমরা খুব ইকোনোমিক্যালি টান দিতাম ৷ বেশি টানলে কিন্তু একটা কম পড়ে। তার মানে আমরা সাইত্রিশ বা আটত্রিশটা পেতাম ৷
আমার ভাই তখন বুলগেরিয়াতে পড়তো ৷ পেইন্টিং এর ছাত্র ছিল ৷ সোফিয়া বিশ্ববিদ্যালয়। তো, আমার বড় ভাই আমার ইমিডিয়েট বড়, যে ফাইন্যান্স থেকে পাশ করেছে মাসুদুল আলম, মাসুদ- তো উনি আমার জন্য কালার, প্রচুর কালার নিয়ে আসছিল- তারপর আমার জন্য ফিল্টার পেপার –
স: মানে যা দিয়ে ছবি প্রসেস করে?
ম: হ্যাঁ ওইটা। তারপর একটা পোর্টেবল এনলার্জার, ব্রিফকেস টাইপ। এটা উনি নিয়ে আসছিলেন।
স: এইসব নিয়ে আপনি তো বেশ বড়লোক হয়ে গেলেন। আনন্দের জিনিস।
ম: আমি আমার রুমের মধ্যে সারারাত ছবি প্রিন্ট করতাম বসে বসে ৷ এভাবে হাত পাকালাম ৷ যখন আমার চোখে এসিড পড়ল-
স: এটা কত সালে?
ম: সেভেন্টি ফাইভে৷ তারপর শুয়ে শুয়ে মনজুর আলম বেগের ‘আধুনিক ফটোগ্রাফি’ একটা বই ছিল। আমি পড়তাম। পড়তে পারতাম না বেশি। চোখে পেইন হত। আর আমি ভিজুয়ালাইজ করতাম। তোমাকে এটা বলে রাখি, এই বইটা হচ্ছে দুই বাংলায়- প্রথম বাংলায়…
স: ফটোগ্রাফির বই।
ম: হ্যাঁ, ঢাকার কোন পাবলিশার ছাপাবার জন্য রাজি হয়নি ৷ পরে কলকাতা থেকে এটা ছাপানোর ব্যবস্থা করা হয় ৷ আমরা ওটাই পড়লাম৷ ওই প্রিন্টটাই ৷
স: উনার সাথে আপনার ব্যক্তিগত পরিচয় কেমন করে হলো?
ম: কার? বেগ স্যারের সাথে?
স: হ্যাঁ।
ম: আমি একদিন শুয়ে শুয়ে পত্রিকা পড়ছি।
স: বই পড়তে গিয়ে তো আপনি ওনার ফ্যান হয়ে গেছেন। তারপর আপনার কিভাবে পরিচয় হলো?

ম: আমি বলি- ‘কচি পাতা প্রথম প্রাতে/ কি কথা কয় আলোর সাথে’, রবীন্দ্রনাথের একটা গান। আমার মনে মনে একটা- (চায়ে চিনির কথা জেনে গেলেন একজন) এটা হল আলোর যে বিচ্ছুরণ, সেটার সাথে লাউয়ের ডগা… তোমার লাউয়ের ডগা ওঠে, পাতাটা যখন উঠে, কতগুলো শুং দেখবা সূক্ষ্ম শুং- এগুলোর সাথে কচি পাতার একটা চুম্বন হয়। এই চুম্বন আমার ক্যামেরায় কেমন করে ধরবো।
স: রবীন্দ্রনাথ কিন্তু ফটোগ্রাফির আসল কথাটা বলে গেছেন-
ম: হ্যাঁ বলে গেছেন ৷ এটা বুঝতে হবে তোমাকে। তো, এটা ক্যাপচার করতে পারার জন্য আমি ফটোগ্রাফির প্রতি ইন্টারেস্টেড হই। বেগ স্যারের বই পড়তাম। একদিন পেপারে পড়লাম৷ ফটোগ্রাফি শিখুন। চুরাশি অবলিক এ সায়েন্স ল্যাবরেটরি কোয়ার্টার রোড, ঢাকা। এলিফ্যান্ট রোডের অপজিটে। আমি আর দেরি করি নাই ৷
স: আপনার ওই হোল্ডিং নাম্বার সহ মনে আছে?
ম: হ্যাঁ। আমি চলে গেলাম। উনার সাথে দেখা হল। বেগার্ট ইনস্টিটিউট অফ ফটোগ্রাফি। তখন সেভেন্টি নাইন ৷ এক মাস ব্যাপী একটা ফটোগ্রাফির কোর্স করি। যেগুলো পড়েছিলাম সেগুলো ধাতস্থ করলাম। ক্যামেরা ছিল না, উনার ক্যামেরা ছিল। ছবি তুললাম, নেগেটিভগুলোকে প্রিন্ট করলাম।
স: আপনার জেনিথ ক্যামেরা কি এর পরের ঘটনা?
ম: জেনিথ ক্যামেরা এটার পরের ঘটনা।
স: আমি ক্রোনোলজি মেলানোর চেষ্টা করছি।
ম: আমি কিন্তু জেনিথ ক্যামেরা তার আগে ব্যবহার করেছি ৷ ভাই ওর ক্যামেরা নিয়ে চলে গেছে। বুলগেরিয়া থেকে যখন আসলো, ক্যামেরা দিয়ে গেছে আর এটা নিয়ে গেছে। ফলে ক্যামেরাটা ব্যবহার করতে পারিনি ৷ পরে পনেরোশ টাকায় একটা ক্যামেরা কিনি, নিউমার্কেট থেকে বোধ হয়। জেনিথ ই বোধ হয় মডেল-
স: বেগ স্যার শিক্ষক হিসেবে কেমন ছিলেন? মানে উনার সাথে আপনার সখ্য কেমন ছিল?
ম: বেগ স্যার, বেগ সাহেবের সাথে সখ্য মানে কি… উনি আমার গুরু। গুরুদের কাজ কি? তাঁরা কাজ করেন ভেতরের সুপ্ত আগুনটা জ্বালিয়ে দেয়া…
স: উদ্বুদ্ধ করা-
ম: সুতরাং উনি খুব সিম্পল মানুষ ছিলেন। কোনও ধরনের ডাঁট টাট কম ছিল।
স: প্রাণ দিয়ে পড়াতেন?
ম: একদম। আমি তো অনুরাগী, অনুসারী মানুষ ছিলাম। খুব ফলো করতাম। ইনডোরের ছবি তুললাম, এমসিকিউ পরীক্ষা হল। হাতে কলমে আর পুঁথিগত একসাথে ৷ প্রথম হলাম ৷ আমার বন্ধু ভিসি মান্নানের ছোট ভাই,ও সেকেন্ড হল। তেরো জন ছিলাম, দুজনেরই চট্টগ্রামের।
স: ফটোগ্রাফিক সোসাইটি কেমন করে প্রতিষ্ঠা?
ম: তখন চারুকলায় ভর্তি হয়েছি। স্যার আমাকে খুব পছন্দ করতেন। পরীক্ষা দেয়ার পর যখন সার্টিফিকেট পেলাম তখন বেগ স্যার আমাকে বললেন, বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটি নামে একটা সংগঠন আছে। সেভেন্টি নাইনে বলছেন আর বাংলাদেশে ফটোগ্রাফির জন্ম সেভেন্টি সিক্সে। উনি আমাকে বললেন, সোসাইটির মেম্বার হতে। আমার কাছে শব্দটা পুরোপুরি নতুন। ফটোগ্রাফি তো বুঝি, সোসাইটি তো বুঝলাম না। স্যার বললেন, সোসাইটি মানে ফটোগ্রাফারদের মিলনমেলা। তারপর মেম্বারশিপ নিলাম কয়েক মাস পর, ১৯৮০তে। আমার সিরিয়াল নাম্বার থ্রি এইট সেভেন, ৩৮৭।
স: আপনার এইটাও মনে আছে?
ম: হ্যাঁ, মনে থাকবে না কেন! ভাবছিলাম চট্টগ্রামে কিছু করা যায় কিনা। স্যারকে জিজ্ঞেস করলাম, কেমন করে ফটোগ্রাফি সোসাইটি করেছেন। উনি আমাকে সাইক্লোস্টাইলে ছাপানো কাগজপত্র দিলেন। সাইক্লোস্টাইল তো বোঝো?
স: হ্যাঁ, এরকম ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে (হাত নেড়ে দেখাই)
ম: হ্যাঁ হ্যাঁ।
স: আপনাদের সময় কার্বন পেপার ছিল বোধ হয়?
ম: হ্যাঁ, বিভিন্ন অফিসে। কার্বন পেপার ছিল আর সাইক্লোস্টাইল। মানে ফটোস্ট্যাটের আগে।
স: ফটোস্ট্যাটের বাবা।
ম: মানে আগের ধাপ। দিলেন কাগজপত্র। চট্টগ্রামে একটা সোসাইটির শাখা করতে বললেন। কিন্তু আমি রাজি হলাম না। তারপর… (বিকেলের জল খাবার আসলো, সুন্দর ট্রলিতে) পারিবারিকভাবেই তো সংগঠক ছিলাম। তুমি জানো, কবি নজরুল আমাদের বাড়ি দু’ বার এসেছিলেন! (কবি, সাহিত্যিক দিদারুল আলম, মউদুদুল আলমের অকালপ্রয়াত জ্যেঠা, কবির বিশেষ বন্ধু ছিলেন। ) স্যারকে বললাম, চট্টগ্রাম করব ৷ স্যার বললেন, মৃণাল সরকারকে রাখতে। এই একটা লোক।
স: উনি বোধহয় বোধনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ফর্সা করে হ্যাংলা পাতলা৷ আমি সেই ক্লাস নাইনে দেখেছিলাম।
ম: বোধনের প্রিন্সিপাল ছিলেন উনি। চট্টগ্রামে এলাম। মৃণালদাকে খুঁজে চলেছি। একদিন চেম্বার প্রেসে পেলাম। চেম্বার প্রেসের নাম শুনেছো?
স: না না।
ম: প্রিন্টার্স চেম্বার্স আছে না?
স: হ্যাঁ হ্যাঁ।
ম: ইয়ে তোমার মোমিন রোডে। ওদের আর কি- ওদের একটা ব্রাঞ্চ ছিল সদর ঘাটে। ওইখানে মৃণাল দাকে পেলাম ৷ এখানে প্রুফ দেখছিলাম একটা বইয়ের। বাবার পরিচিতির সূত্রে। আবার প্রেসের মালিকও আমায় চিনতেন ৷ আদাব দিলাম। চা দিল। খেলাম ৷ আমি ফটোগ্রাফিক সোসাইটি করতে যাওয়ার কথা বললাম। উনি বললেন, তোমরা চাটগাইঁয়ারা পারবে? তোমরা শুঁটকি খাও। (হাসি)
স: উনার অরিজিন কি চট্টগ্রাম ছিল?
ম: না, রংপুর। রংপুর হলেও এখানে অনেকদিন।ফরেস্ট ল্যাবরেটরি ফটোগ্রাফার। উনার ওখানে যেতে বললেন। তারপরের দিন গেলাম ৷ নাসিরাবাদ উনার অফিস।
স: তারপর?
ম: উনিও জানালেন চেষ্টা করেছিলেন এখানে সোসাইটি করতে। কাগজপত্র দেখালেন। বললেন, আপনাকে দিয়ে হবে ৷ আবার হোটেল লুসাইতে উনার একটা শিক্ষালয় ছিল ৷ ফটোগ্রাফি শেখাতেন। কিন্তু সোসাইটি হয়নি ৷ তিনি এখানে পড়াতেন। আবার চিটাগাং আর্ট কলেজে পড়াতেন। আর্ট কলেজের স্টুডেন্ট, যারা বিকেলে পড়তে যায়, তাদের নিয়ে একদিন বসলাম। যারা ইন্টারেস্টেড। বসে কথা বললাম। বাইরের ফটোগ্রাফি লাভার যারা ফাইন আর্ট থেকে লেখাপড়া করছে, যারা ফাইন আর্টসের লাভার থাকে তারা অবশ্যই ফটোগ্রাফি লাভার হয়। এটা একদম রিলেটেড। একদিন মিটিং করলাম- ১১ মার্চ সকাল নয়টায়। আর্ট কলেজের চত্বরে।
স: কত সালে?
ম: তিরাশি, এগারো মার্চ, আমি মৃণাল দা
স: আপনারা শুধু-
ম: আমরা দু’জন। মান্নান ভাইকে ডাকলাম। আমাদের টিচার শাহ মুহাম্মদ আনসার আলী স্যার উনি আসলেন- ডাক্তার মঈনউদ্দিন,মেডিকেল স্টুডেন্ট। একটা মেয়ে ছিল, নাম নাজমা, চারুকলার ছাত্রী। সব মিলিয়ে ওইদিন, মইনুরা ছিল-
স: আমাদের মইনু ভাই-
ম: হ্যাঁ হ্যাঁ, পূর্বার মইনু ছিল। আমরা মিলে তিরাশি সালে বসে একটা মিটিং করলাম। ওই মিটিংয়ে আমাকে অ্যাড হক কমিটির প্রধান করে একটা কমিটি হলো ৷ আমি চারজনকে নিলাম। তারপর আমাদের লোগো করা, কি নাম হবে, সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নেয়া, গঠনতন্ত্র করা। তারপর এগারো নভেম্বর তিরাশি সালেই আমরা শিল্পকলা একাডেমিতে একটা এক্সিবিশন করলাম। চট্টগ্রামের ইতিহাসে ফর দ্য ফার্স্ট টাইম একটা, সম্মিলিত একটা প্রদর্শনী ৷ জাতীয় ভিত্তিক, আনিসুজ্জামান ওপেন করেছিলেন। এটিই চট্টগ্রামে প্রথম জাতীয় ভিত্তিক প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনী। সেই শুরু হল…
স: তো আপনারা তুলসী ধামের অপজিটের অফিসটাতে কখন আসলেন?
ম: চুরানব্বইতে গেছি।
স: মাঝখানের দীর্ঘ সময় আপনাদের অফিস কোথায় ছিল?
ম: প্রথমে তো আমার এই বাসা। আলম বাগ, কাজীর দেউড়ি। এরপর চলে গেছি আমরা নিউমার্কেট ফটো রামায়। তখন আমরা ফটোগ্রাফি মানে বুঝতাম তৌফিকুল ইসলামকে। তিনি ফটো রামার মালিক। আমাদের পারিবারিক বন্ধু ছিলেন। আমি যখন এগারো মার্চ মিটিং ডাকলাম, তিনি শ্বশুরবাড়িতে ছিলেন সেদিন৷ তৌফিক ভাইকে সেদিন পাইনি, সিলেটে ছিলেন। তিনি প্রায় তিন মিটিং পরে এসেছেন। কিন্তু উনি আমাদের আর্থিক সহযোগিতা করতেন। মৃণালদাকে প্রথম প্রেসিডেন্ট, আমি প্রথম সেক্রেটারি, তৌফিক ভাইকে ভাইস প্রেসিডেন্ট করেছি, না মান্নান ভাইকে ভাইস প্রেসিডেন্ট করেছি ৷ দুইজনই ভাইস প্রেসিডেন্ট ৷ এই হচ্ছে শুরু। তারপর আমরা ন্যাশনাল করলাম, ইন্টারন্যাশনাল করলাম, আউটিং করেছি, পিকনিক করেছি, দেশের বাইরে গেছি।
স: কোন কোন দেশে গেছেন?
ম: ইন্ডিয়া গেছি, নেপাল গেছি, ভুটান গেছি।
স: আপনি আপনার ছবির ভ্রমণ সংক্রান্ত বইয়ের কথা বলুন এখন।
ম: একটা বই আছে। পাঁচশো বই ছেপে ছিলাম, দুই হাজার চৌদ্দ পনেরোর দিকে।
স: ওয়ার্ল্ড ফটোগ্রাফি ডে তে নতুন প্রজন্মের জন্য কি বলতে চান?
ম: আমাদের যুগে তো ইকুইপমেন্টের সীমাবদ্ধতা ছিল। আমাদের অবারিত আগ্রহ ছিল। আমার ইমাজিনেশনকে, আমাদের ইমাজিনেশনকে যেন অন্যজন অনার করে সেইভাবে আমরা কাজ করতাম। অনেক এক্সপেরিমেন্ট করেছি। তাতে হয়তো
কাজে আন্তরিকতা এসেছে। প্রত্যেকটা ডট, লাইন আমরা কিন্তু অনেক ভেতর থেকে এঁকে দিয়েছি। ফলে এইটার প্রতি ভালোবাসা অসীম ৷ মানুষ মনে করত ফটোগ্রাফি মানে বিলাসিতা। ফটোগ্রাফি মানে হচ্ছে বউয়ের ছবি বা ভাইয়ের ছবি।
স: বা বিয়ে-শাদির ছবি…
ম: হ্যাঁ, কিন্তু ফটোগ্রাফি। সমাজে যে অবদান রাখছে, এটা তো ডকুমেন্টেশন করছে। শিল্প তো বটেই। অনেকে জানে না, বোঝে নাই হয়তো। আমরা ফটোগ্রাফি সোসাইটি করার মাধ্যমে এই জিনিসটা বোঝাতে সক্ষম হয়েছি ৷ ফলে এখন ফটোগ্রাফির জন্য মানুষ অনেক পয়সা খরচ করে, চিন্তা করে। ফটোগ্রাফিক সোসাইটির সার্থকতা এটিই, বুঝছো?
স: নতুন প্রজন্মের জন্য পরামর্শ?
ম: পরামর্শ? একটা ছবি তোলার আগে কিন্তু চিন্তা করতে হবে ৷ ইউ হ্যাভ টু থিংক কেন ছবিটা তুলব? বিষয়বস্তুতে কিভাবে ফোকাস করব? খালি তো মডেলের ছবি তোলা ফটোগ্রাফি না। (হাসি) প্রত্যেক ছবির পেছনে যে একটা দুঃখবোধ আছে, সেটাও কিন্তু ফটোগ্রাফিতে মাথায় রাখতে হবে। লাইফ ইজ নট এ গেম, গেম তো না।
স: না, না।
ম: এটার মধ্যে অনেক sorrow আছে। এটা তোমাকে ভিজুয়ালাইজ করতে হবে। তোমার ইমেজে আনতে হবে। ইমেজে আনার জন্য ইউ হ্যাভ টু অবজার্ভ, ইউ হ্যাভ টু টক উইথ দ্য পিপল। এবং বই পড়তে হবে। তোমাকে রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়তে হবে, নজরুলের কবিতা পড়তে হবে, সুকান্ত পড়তে হবে, গীতা পড়তে হবে, কোরআন পড়তে হবে।
স: মানে পড়ুয়া না হলে ভালো ফটোগ্রাফার হওয়া যাবে না?
ম: না, বোধটাকে জাগাতে হবে। বোধ শাণিত করতে হবে। তো, আমার মেসেজ হচ্ছে, সময় আসবে সময় যাবে কিন্তু তুমি যে কালেই থাকো না কেন তোমাকে বোধ জাগাতে হবে। তুমি ভালো ক্যামেরা ইউজ করো কিন্তু বোধ নাই, হবে না ৷ আমরা যারা ফটোগ্রাফি করেছি, উই ওয়্যার এক্সপেরিয়েন্সড। আমার চেয়ে আমার ছাত্ররা ভালো ক্যামেরা নিয়ে হাঁটে ৷ ওরা যখন টাকা থাকে ডলার থাকে সবচেয়ে বেস্ট ক্যামেরা শোরুম থেকে…
স: কিনে ফেলে-
ম: তাক থেকে কিনে-
স: অনলাইনে অর্ডার দিয়ে-
ম: গলায় ঝুলাই ফেলতেছে। বলে কি আমি জেড নাইন ক্যামেরা কিনেছি। নিক্কনের, অনেক দামী ক্যামেরা।
স: আজকের শেষ প্রশ্ন হচ্ছে। এতক্ষণ অলরেডি বহু বিরক্ত করে ফেলেছি।
ম: না, আমি বিরক্ত হচ্ছি না।
স: আজকের শেষ প্রশ্ন। আমার ব্যক্তিগত কৌতুহল, আগ্রহের জায়গা থেকে বলা, আপনি কি মনে করেন কখনো কখনো ইকুইপমেন্ট বা ইনস্ট্রুমেন্ট যদি একটু কম দামিও হয় একটু লো ক্যাটাগরি হয়, কিন্তু কারো যদি ধরেন মানে বোধ শাণিত থাকে, ভেতরের চোখ থাকে…
ম : অদম্য ইচ্ছে –
স: তাহলে কি ভাল ছবি তোলা সম্ভব?
ম: একদম, অ্যাবসলিউটলি।
স: মানে ওই জায়গাটা সব সময় ভালো ডিভাইসের উপর নির্ভর করে না?
ম: শোনো, ডিভাইসটা কি? ডিভাইসটা তোমার, তুমি ডিভাইসকে এক্সপ্লয়েট করছো।
স: হ্যাঁ হ্যাঁ।
ম: তোমার আল্টিমেট উদ্দেশ্য হচ্ছে, ফিলিংসটা- সেটাকে তুমি ইয়ে করা, ভিজুয়ালাইজ করা…
স: এই কথাটাকেই আমি হেডলাইন করবো। এই যে এখন যে কথাটা বললেন।
(হাসি)
আলোকচিত্রের শিক্ষক, চট্টগ্রাম ফটোগ্রাফিক সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সভাপতি, স্বনামধন্য আলোকচিত্রী মউদুদুল আলমের বাসভবন আলমবাগে এই আলাপটি ঘটেছিল সতেরোই আগস্ট, বিকেল সাড়ে তিনটার একটু পর প্রায় পাঁচটা পর্যন্ত৷ এই আলাপের একটি সম্পাদিত সংস্করণ এতো সময় নিয়ে প্রিয় আগ্রহী আপনারা পড়লেন। আপনাদের কৃতজ্ঞতা।
তাঁর চারটি বইয়ের নাম লিপিবদ্ধ করে রাখি।
১. আজকের ফটোগ্রাফি (১৯৯১) / রাশা প্রকাশনী, চট্টগ্রাম।
২. নিথর জলের নিঃশব্দে, কবিতা, ১৯৮৭/ রাশা প্রকাশনী, চট্টগ্রাম।
৩. কাশ্মীর স্মৃতি/ ভ্রমণের বই/ ১৯৯০ /রাশা প্রকাশনী। ৪. হৃদয়ে আমার বাংলাদেশ Bangladesh: My Love, 2016/ সিপিভিএ


