তারেক মাসুদ জন্মেছিলেন ১৯৫৭ সালের ছয় ডিসেম্বর। ফরিদপুর জেলার নূরপুর গ্রামে জন্মে, খানিকটা বড় হয়ে মাদ্রাসায় ভর্তি হলেন। মুক্তিযুদ্ধের কারণে পড়াশোনায় বাধ্য হয়ে বিরতি ঘটাতে হলো। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর স্কুল ও কলেজ জীবন পেরিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে চলচ্চিত্রের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন চলচ্চিত্র সংগঠনের সাথে যুক্ত হওয়ার সুবাদে৷ তাঁর প্রথম কাজের বিষয় ছিলেন বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী সুলতান। প্রায় সাত বছর জুড়ে, ভাস্কর্য খোদাইয়ের মতো, অল্প অল্প করে দৃশ্য ধারণ করে শেষ পর্যন্ত ১৯৮৯ সালে ‘আদম সুরত’ সকলের সামনে আসে। আমাদের ভাষার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লেখক আহমদ ছফা রচিত ‘বাংলার চিত্র ঐতিহ্য : সুলতানের সাধনা’ শীর্ষক দীর্ঘ প্রবন্ধটি আদম সুরত নির্মাণে গভীর অনুপ্রেরণা দিয়েছে তারেক মাসুদকে। এই নির্মাতা চলচ্চিত্রগুরু ছিলেন আরেক অসামান্য চলচ্চিত্র স্রষ্টা আলমগীর কবির৷
মুক্তিযুদ্ধ সময়ে দৃশ্য ধারণ করেছিলেন মার্কিন নির্মাতা লিয়ার লেভিন। কিন্তু অর্থাভাব আর নানা ব্যক্তিগত কারণে তাঁর কোনও কিছু নির্মাণ করা হয়ে উঠল না। প্রায় বিশ বছর পর তারেক মাসুদ ও ক্যাথেরিন মাসুদ দম্পতির সাথে তাঁর দেখা হওয়া সম্ভব করে তুলেছিলো ‘মুক্তির গান’ আর ‘মুক্তির কথা’ প্রামাণ্য চিত্র দুটি। অগ্নিঝরা দিনের কথা ফিরে ফিরে মনে করতে আমাদের এই দুই কাজের কাছে আসতেই হয়। নিজের মাদ্রাসায় পড়াকালীন বাল্যকাল মহৎ কবিতার মত উঠে আসে তাঁর সবচেয়ে আলোচিত পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘মাটির ময়না’-তে৷ কান চলচ্চিত্র উৎসবে অফিসিয়ালি প্রদর্শিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘মাটির ময়না’। ২০০২ সালে পঞ্চান্নতম কান চলচ্চিত্র উৎসবের ‘ডিরেক্টরস ফোর্টনাইট’ বিভাগে প্রদর্শিত এবং পুরস্কৃত হয়েছিল চলচ্চিত্রটি। ‘অন্তর্যাত্রা’ চলচ্চিত্রে তিনি ডায়াসপোরার বাঙালির কথা বলেন। তাঁর শেষ পূর্ণদৈর্ঘ্য কাজ ‘রানওয়ে’, দুই হাজার দশের সময়ের বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা স্পষ্ট দৃশ্যে, রাখ ঢাক বাদেই উঠে আসে। এই চলচ্চিত্র ষোল বছর পরের বাংলাদেশের অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
পনের বছর আগে, দুই হাজার এগারোর আজকের দিনে মানিকগঞ্জ থেকে ‘কাগজের ফুল’ ফিল্মের লোকেশন রেকি করে ঢাকা ফিরছিলেন তারেক মাসুদ। সাথে ছিলেন সাংবাদিক মিশুক মুনীর, যাপনসঙ্গী ক্যাথেরিন( আহা, আহমদ ছফা তাঁদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন আর অন্য জল হাওয়ার মেয়ে থেকে গিয়েছিলেন এই দেশে তারেককে ভালোবেসে), চিত্রশিল্পী ঢালী আল মামুনসহ আরও কয়েকজন। সড়ক দুর্ঘটনায়, প্রয়াত হলেন তারেক আর মিশুক৷
তারেক মাসুদের প্রতি আমার একটা অভিমান আছে। ‘আদম সুরত’-এ আমরা আহমদ ছফাকে শুধু হেঁটে যেতে দেখি। একটু কথা বলতে দেখি না।
থিয়েটার ইনস্টিটিউটে তিনি শেষ ছবি ‘রানওয়ে’ নিয়ে এসেছিলেন। প্রদর্শনীর পর আমার তৎকালীন প্রেমিকা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন অন ক্যামেরা। ঐ ফুটেজে আমার হলুদাভ জ্যাকেটের খানিক অংশ দেখা যায়। ‘রানওয়ে’ ডিভিডির এক্সট্রা অংশে দেখেছিলাম৷ অনেকদিন ছিলো আমার কাছে।
তাঁর চলচ্চিত্র সংক্রান্ত লেখাপত্র সাক্ষাৎকার জরুরি জিনিস। ভবিষ্যতের নির্মাতাদের আগলে রাখবার সম্পদ। সেদিন, দুই হাজার এগারো সালের তেরো আগস্ট। আমি ‘প্রথমা’ প্রকাশনার চট্টগ্রাম আউটলেটের তখন শাখা ব্যবস্থাপক, কাজ করছি। অনুবাদক আলম খোরশেদ আমায় খবরটা জানান। তৎকালীন প্রেমিকা শুনে বলেছিলেন, তাঁর খুব ইচ্ছা ছিলো তারেক মাসুদের ছবিতে কাজ করবার।
আমি আমার অতি প্রিয় চিত্রশিল্পী ঢালী আল মামুন দাদার জন্য চিন্তিত হয়ে পড়েছিলাম। পরম করুণাময় তাঁকে অন্তত আমাদের মধ্যে ফিরিয়ে দিয়েছেন। মিশুক মুনীরের মতো কৃতী মানুষ আমরা হারিয়েছি পূর্ণ বিকাশের আগেই।
তবে আমি আজও মনে করি পোলিশ মায়েস্ত্রো আন্দ্রে মুঙ্ক, আলমগীর কবির, তারেক মাসুদের ‘দুর্ঘটনা’ নিছক দুর্ঘটনা নয়৷ ভাবি, ‘কাগজের ফুল’ শেষ পর্যন্ত কেমন হতো? প্রদর্শনকাতর এই দেশের চলচ্চিত্র ক্ষেত্রে তাঁর পরবর্তী কাজ কেমন হতো?
মুক্তিযুদ্ধের সময়টি নিয়ে ‘নরসুন্দর’-এর চেয়ে ভালো কাজ তো আমাদের ভাষায় নেই। নূরপুর গ্রামের বালক, বিশ্ববিদ্যয়ের ধীমান যুবক নিজের স্বতন্ত্র চলচ্চিত্র ভাষা সম্বল করে সারা পৃথিবীতে ক্রম সম্প্রসারিত হচ্ছেন। তারেক মাসুদ আমাদের যৌথ স্মৃতি থেকে বিলীন হবেন না কোনদিন৷


