ঢাকার উপকণ্ঠে অবস্থিত ধামরাইয়ের শ্রীশ্রী যশোমাধবের রথযাত্রা এবং একে কেন্দ্র করে আয়োজিত রথের মেলা কেবল সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি বাঙালির এক প্রাচীন ও গৌরবময় লোক-ঐতিহ্য। প্রায় চারশত বছরের পুরোনো এই উৎসবটি বাংলাদেশ ভূখণ্ডের সবচেয়ে প্রাচীন এবং বৃহত্তম রথযাত্রা হিসেবে পরিচিত।

সূত্র: সংগৃহীত
রথযাত্রার পেছনের মূল পৌরাণিক আখ্যান:
সনাতন ধর্মে জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা এবং একে কেন্দ্র করে আয়োজিত মেলার পেছনে মূলত: উড়িষ্যার শ্রীক্ষেত্র (পুরী) জগন্নাথ মন্দির-কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি অত্যন্ত মধুর ও আবেগঘন পৌরাণিক কাহিনী রয়েছে। রথযাত্রার মূল দর্শনটিই হলো—ঈশ্বর কেবল মন্দিরের ভেতরে চার দেয়ালে বন্দি থাকবেন না, তিনি নিজেই সাধারণ মানুষের মাঝে নেমে আসবেন।
মাসির বাড়ি যাওয়ার আনন্দ ভ্রমণ (প্রধান কাহিনী)
পৌরাণিক কাহিনী ও লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, রথযাত্রা হলো শ্রীকৃষ্ণ (জগন্নাথ দেব), তাঁর বড় ভাই বলরাম (বলভদ্র) এবং ছোট বোন সুভদ্রার তাঁদের মাসির বাড়ি বেড়াতে যাওয়ার উৎসব। শ্রীক্ষেত্রের জগন্নাথ মন্দির থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ‘গুণ্ডিচা মন্দির’-কে জগন্নাথ দেবের মাসির বাড়ি (বা শ্বশুরালয়) বলা হয়।
আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয় তিথিতে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা তিনটি আলাদা সুসজ্জিত রথে চড়ে গুণ্ডিচা মন্দিরের উদ্দেশ্যে রওনা হন। সেখানে তাঁরা সাত দিন অবস্থান করেন এবং নবম দিনে আবার মূল মন্দিরে ফিরে আসেন, যাকে বলা হয় ‘উল্টো রথ’ বা বাহুড়া যাত্রা।
বৃন্দাবনবাসীর প্রেম ও শ্রীকৃষ্ণের ব্যাকুলতা
রথযাত্রার পেছনের আরেকটি গভীর আধ্যাত্মিক কাহিনী জড়িয়ে আছে দ্বারকা ও বৃন্দাবনের সাথে। শ্রীকৃষ্ণ যখন বৃন্দাবন ছেড়ে দ্বারকার রাজা হলেন, তখন বৃন্দাবনের গোপী ও রাধাকৃষ্ণের ভক্তরা তাঁর বিরহে কাতর হয়ে পড়েছিলেন।
পরবর্তীতে একবার সূর্যগ্রহণের সময় কুরুক্ষেত্রে দ্বারকাবাসী এবং বৃন্দাবনবাসীর মিলন ঘটে। বৃন্দাবনের রাধিকা ও অন্য নারীরা শ্রীকৃষ্ণকে দ্বারকার রাজকীয় ঐশ্বর্যের মধ্যে দেখে সন্তুষ্ট হতে পারেননি; তাঁরা চেয়েছিলেন শ্রীকৃষ্ণকে আবার তাঁদের সেই চেনা, সরল বৃন্দাবনে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে। ভক্তদের এই আকুলতার টানেই শ্রীকৃষ্ণ তাঁর ভাই ও বোনকে নিয়ে রথে চড়ে বৃন্দাবনের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন। পৌরাণিক মতে, পুরীর ‘গুণ্ডিচা মন্দির’ হলো সেই পরম শান্তির প্রতীকী ‘বৃন্দাবন’, যেখানে জগন্নাথ দেব তাঁর ভক্তদের টানে ছুটে যান।
মহালক্ষ্মীর মান-অভিমান এবং মেলার আদি রূপ
রথযাত্রার কাহিনীর সাথে দেবী লক্ষ্মীর (জগন্নাথ দেবের পত্নী) একটি খুব মজার ও মানবিক গল্প জড়িয়ে আছে, যা এই উৎসবকে আরও আনন্দময় করে তোলে: জগন্নাথ দেব যখন ভাই-বোনকে নিয়ে রথে চড়ে মাসির বাড়ি যান, তখন তিনি স্ত্রী মহালক্ষ্মীকে মন্দিরে রেখে যান। এতে দেবী লক্ষ্মী অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও অভিমানী হন। রথযাত্রার পঞ্চম দিনে (‘হেরা পঞ্চমী’ নামে পরিচিত) দেবী লক্ষ্মী রাগ করে গুণ্ডিচা মন্দিরে যান এবং গোপনে জগন্নাথ দেবের রথের একটি অংশ ভেঙে দিয়ে চলে আসেন! পরে উল্টো রথের দিন জগন্নাথ দেব যখন মূল মন্দিরে ফিরে আসেন, তখন মহালক্ষ্মী মন্দিরের দরজা বন্ধ করে দেন। স্ত্রীকে শান্ত করতে জগন্নাথ দেব তখন তাঁকে মিষ্টি (রসগোল্লা) উপহার দেন এবং মান ভাঙান।
মেলার আদি যুগ:
পুরীতে এই মান-অভিমানের পর্বটি দেখার জন্য গুণ্ডিচা মন্দির ও মূল মন্দিরের বাইরে লাখ লাখ ভক্তের সমাগম হতো। এই বিশাল জনসমাগমকে কেন্দ্র করেই মূলত প্রাচীনকালে মেলা, হরেক রকম মিষ্টির দোকান এবং লোকজ সামগ্রীর কেনাবেচার সূচনা হয়।
মেলা বসার আধ্যাত্মিক ও সামাজিক কারণ
পৌরাণিক দৃষ্টিকোণ থেকে রথযাত্রার দিনটি অত্যন্ত পবিত্র। বলা হয়, “রথস্থং বামনং দৃষ্ট্বা পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে”—অর্থাৎ, রথে উপবিষ্ট বামন রূপী জগন্নাথ দেবকে দর্শন করলে মানুষের আর পুনর্জন্ম হয় না (সে মোক্ষ লাভ করে)। এই দর্শনের কারণে প্রাচীনকাল থেকেই জাত-পাত ও ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল স্তরের মানুষ রথের রশি টানতে এবং ঈশ্বরকে একনজর দেখতে সমবেত হতো। যেখানেই এত মানুষের সমাগম হতো, সেখানে তাদের খাওয়া-দাওয়া, বিনোদন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনাবেচার জন্য প্রাকৃতিকভাবেই মেলা গড়ে উঠত। কালক্রমে ধর্মীয় এই জমায়েতটিই রূপ নেয় বাঙালির মিলনের উৎসব—’রথের মেলা’-য়।

সূত্র: Xinhua News
ধামরাইয়ের রথ এবং এর মেলার বিবর্তনের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল:
উৎসবের সূচনা ও যশোমাধব বিগ্রহের ইতিহাস
জনশ্রুতি ও ইতিহাস অনুযায়ী, পাল বংশের রাজা যশোপাল একবার ধামরাইয়ের কাছে শিমুলিয়া গ্রামে বেড়াতে যাওয়ার সময় তাঁর হাতি একটি মাটির ঢিবির সামনে এসে থমকে দাঁড়ায়। অনেক চেষ্টা করেও হাতিটিকে সামনে নেওয়া না গেলে রাজা কৌতূহলী হয়ে স্থানটি খনন করার নির্দেশ দেন। সেখানে মাটি খুঁড়ে একটি সুরক্ষিত মন্দির এবং শ্রীবিষ্ণু মূর্তির অনুরূপ একটি সুন্দর মাধব মূর্তি পাওয়া যায়। রাজা যশোপাল ধামরাইয়ের বিশিষ্ট পণ্ডিত শ্রী রামজীবন রায় মৌলিকের ওপর এই মূর্তি প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব দেন। রাজার নামের সাথে মিলিয়ে বিগ্রহের নাম রাখা হয় ‘শ্রীশ্রী যশোমাধব’। পরবর্তীতে বাংলা ১০৭৯ সন (১৬৭২ খ্রিস্টাব্দ) থেকে এই বিগ্রহকে কেন্দ্র করেই ধামরাইয়ে রথটানা ও মেলার আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়।
রথের বিবর্তন ও বালিয়াটির জমিদারদের অবদান
শুরুর দিকে রথটি বাঁশ ও কাঠ দিয়ে সাধারণ আকারে তৈরি করা হতো। তবে সময়ের সাথে সাথে এর কলেবর বৃদ্ধি পায়:
বাঁশের রথ থেকে কাঠের রথ (১৬৭২ – ১৬৯৭): প্রথম দিকে এটি ছিল সম্পূর্ণ বাঁশের তৈরি।
জমিদারদের ঐতিহ্য (১২০৪ বঙ্গাব্দ থেকে): মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ার বিখ্যাত বালিয়াটির জমিদারেরা এই রথযাত্রার মূল পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তাঁরা বংশানুক্রমে ধামরাইয়ে চারটি বিশালাকার কাঠের রথ তৈরি করে দেন।
১৯৩৩ সালের ঐতিহাসিক রথ: বালিয়াটির জমিদারদের সহায়তায় ধামরাই, কালিয়াকৈর ও সিংগাইরের কাঠশিল্পীরা প্রায় এক বছর ধরে একটি ত্রিতল বিশিষ্ট বিশাল রথ নির্মাণ করেন, যা ১৯৩৩ সালে (১৩৪০ বঙ্গাব্দ) সম্পন্ন হয়। এর উচ্চতা ছিল ৬০ ফুট এবং প্রস্থ ৪৫ ফুট। রথটিতে ৩২টি বিশাল কাঠের চাকা এবং সামনে দুটি কাঠের খোদাই করা ঘোড়া ছিল। এটি টানার জন্য প্রায় ২৭ মণ পাটের রশি (কাছি) লাগত। এই রথের গায়ের পৌরাণিক শিল্পকর্ম এতটাই বিখ্যাত ছিল যে, একসময় তা ঢাকা আর্ট কলেজের সিলেবাসেও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
১৯৭১ সালের আঘাত ও বর্তমান রথ
১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ধামরাইয়ের এই ঐতিহাসিক এবং সুপ্রাচীন কাঠের রথটি পুড়িয়ে দেয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ঐতিহ্য ধরে রাখতে প্রথমে বাঁশ দিয়ে সাময়িক রথ বানানো হয়েছিল। পরবর্তীতে দানবীর রণদা প্রসাদ সাহার (আর.পি. সাহা) পরিবার এবং স্থানীয় কমিটির প্রচেষ্টায় উৎসব চলতে থাকে। ২০১০ সালে ভারতীয় হাইকমিশনের আর্থিক সহায়তায় সম্পূর্ণ নতুন করে আবার একটি ত্রিতল লোহার ও কাঠের সমন্বয়ে রথ তৈরি করা হয়, যার উচ্চতা প্রায় ২৭ ফুট এবং এতে ১৫টি চাকা রয়েছে।
মাসব্যাপী রথের মেলা
প্রতি বছর আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে যশোমাধবকে প্রধান রথে চড়িয়ে ধামরাইয়ের মূল সড়ক দিয়ে টেনে ‘গোপনগর’ (মাধব ও জগন্নাথ দেবের শ্বশুরবাড়ি বা মাসির বাড়ি হিসেবে পরিচিত) নিয়ে যাওয়া হয়। এর ৯ দিন পর অনুষ্ঠিত হয় ‘উল্টো রথযাত্রা’। এই পুরো সময় জুড়ে ধামরাইয়ের প্রধান সড়ক ও এর আশপাশে বসে মাসব্যাপী রথের মেলা। মেলায় ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের ঢল নামে। মেলার মূল আকর্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে:
হরেক রকমের স্টল: মাটির খেলনা, তৈজসপত্র, বাঁশ ও বেতের তৈরি ঐতিহ্যবাহী আসবাবপত্র এবং শৌখিন জিনিসপত্র।
খাবার-দাবার: মেলার চিরন্তন ঐতিহ্যবাহী জিলাপি, খই, মুড়কি, বাতাসার বিশাল সমাহার।
বিনোদন: গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী পুতুলনাচ, সার্কাস, নাগরদোলা এবং বিভিন্ন লোকজ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
ধামরাইয়ের রথের মেলা কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি শত বছরের অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং বাংলার লোকসংস্কৃতির এক মিলনমেলা।
ধামরাইয়ের পর ঢাকার আরেকটি অতি পরিচিত ঐতিহাসিক স্থান হলো পুরান ঢাকার নবাবপুর রোডের ‘রথখোলা’। গুলিস্তান পেরিয়ে নবাবপুর রোডে ঢুকতেই এই প্রাচীন মোড়টির অবস্থান। ধামরাইয়ের মতো এখানে এখন আর বিশালাকার কাঠের রথ বা মাসব্যাপী মেলা নিয়মিত দেখা না গেলেও, ঢাকার ইতিহাসের পাতায় এই ‘রথখোলা মেলা’ এবং এই স্থানটির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও রোমাঞ্চকর অতীত রয়েছে।
ঢাকার এই রথখোলার ইতিহাস এবং এর ঐতিহ্যবাহী মেলার বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:

সূত্র: The Prominent
নামকরণের ইতিহাস ও প্রথম রথযাত্রা
ঐতিহাসিকদের মতে, উনিশ শতকের শুরুতে বা তারও আগে ঢাকার নবাবপুর ও তাঁতীবাজার এলাকার তৎকালীন ধনাঢ্য সনাতন ধর্মাবলম্বী বসাক এবং বণিক সম্প্রদায় এই এলাকায় রথযাত্রার সূচনা করেছিলেন। রথযাত্রার উৎসবের সময় এখানে একটি বড় কাঠের রথ রাখা হতো এবং সেখান থেকেই রথটানা শুরু হতো।
সারাবছর রথটি যেখানে রাখা বা ‘খোলা’ হতো, সেই খালি জায়গাটিই কালক্রমে স্থানীয় মানুষের কাছে ‘রথখোলা’ নামে পরিচিতি পায়। জেমস ওয়াইজের বিবরণী এবং ঢাকার প্রাচীন মানচিত্রেও এই রথখোলার উল্লেখ পাওয়া যায়। সে সময় ঢাকার ফুলবাড়িয়া (বর্তমান বঙ্গবাজার ও রেলস্টেশনের আশেপাশের এলাকা) পর্যন্ত এই উৎসবের বিস্তৃতি ছিল।
ঢাকার সর্বজনীন উৎসব ও তৎকালীন রথের মেলা
ব্রিটিশ আমলে নবাবপুরের এই রথখোলাকে কেন্দ্র করে যে রথযাত্রা ও মেলা হতো, তা ছিল ঢাকার অন্যতম প্রধান লোক-উৎসব।
হরেক মেলার মিলনমেলা: আষাঢ় মাসের রথযাত্রার সময় এই রথখোলা মোড় থেকে শুরু করে বর্তমান টিপু সুলতান রোড ও লন্ডন মার্কেট এলাকা পর্যন্ত বিশাল মেলা বসত। ঢাকার তাঁতি, শাঁখারি, এবং নবাবপুরের গন্ধবণিকদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে এই মেলা জমে উঠত।
মেলার আকর্ষণ: তৎকালীন পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কারিগরেরা আসতেন মাটির সানকি, পুতুল, কাঠের খেলনা, এবং বাঁশ-বেতের তৈজসপত্র নিয়ে। আর ঢাকার বিখ্যাত মিষ্টির কারিগরেরা মেলার একপাশে বসাতেন জিলাপি, কদমা, বাতাসা আর মুড়কির দোকান।
আদি মরণচাঁদ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের উত্থান:
ঢাকার বিখ্যাত এবং প্রায় দেড়শত বছরের পুরোনো মিষ্টির দোকান ‘আদি মরণচাঁদ ঘোষ অ্যান্ড সন্স’ এই রথখোলার মেলা ও রথযাত্রাকে কেন্দ্র করেই নবাবপুরে প্রথম জমে উঠেছিল।
রথখোলার শতবর্ষী ‘দুধের আড়ত’ ও বিবর্তন
রথখোলার মেলার ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে আছে ঢাকার এক অদ্ভুত ঐতিহ্য—’রথখোলা দুধের আড়ত’। লোকশ্রুতি অনুযায়ী, রথযাত্রার সময় পার্শ্ববর্তী মন্দিরে ভক্তরা জগন্নাথ দেবের উদ্দেশ্যে দুধ উৎসর্গ বা পূজা দিতে আসতেন। ঢাকার আশেপাশের এবং বুড়িগঙ্গার ওপার থেকে গোয়ালারা এখানে দুধ নিয়ে আসতেন। পূজার দুধের এই সমাগম থেকেই ব্রিটিশ আমলে এখানে গড়ে ওঠে একটি স্থায়ী দুধের বাজার বা আড়ত, যা আজও শত বছর ধরে টিকে আছে। প্রতিদিন সন্ধ্যায় এখনো মুন্সিগঞ্জ বা কেরানীগঞ্জ থেকে খামারিরা ড্রাম ভর্তি খাঁটি দুধ নিয়ে এই রথখোলায় আসেন এবং নিলামের মাধ্যমে তা বিক্রি হয়।
মেলা ও রথের বর্তমান অবস্থা
কালের বিবর্তনে, বিশেষ করে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর পুরান ঢাকার ভৌগোলিক ও সামাজিক কাঠামো সম্পূর্ণ বদলে যায়। নবাবপুর রোডটি ধীরে ধীরে দেশের বৃহত্তম ইলেকট্রনিক্স ও যন্ত্রাংশের বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হয়। ঘিঞ্জি দালানকোঠা আর তীব্র যানজটের কারণে রথখোলার সেই আদি উন্মুক্ত মাঠ বা বড় মেলা বসার স্থানটি হারিয়ে গেছে।
তবে ঐতিহ্য একেবারে হারিয়ে যায়নি। বর্তমানে ঢাকার প্রধান রথযাত্রা উৎসবটি মূলত স্বামীবাগের ইসকন (ISKCON) মন্দিরকে কেন্দ্র করে মহাসমারোহে আয়োজিত হয়। স্বামীবাগ থেকে শুরু হওয়া বর্ণাঢ্য রথযাত্রার শোভাযাত্রাটি এই ঐতিহাসিক নবাবপুর রোড ও রথখোলা মোড় অতিক্রম করেই ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে গিয়ে শেষ হয়। বড় মেলা না বসলেও রথযাত্রার দিনটিতে এখনো রথখোলা সংলগ্ন রাস্তায় ছোটখাটো খেলনা ও মিষ্টির পসরা বসে, যা পুরান ঢাকাবাসীকে তাদের কয়েকশত বছরের পুরোনো ঐতিহ্যের কথা মনে করিয়ে দেয়।


