১.শক্তিকে জাগাতে গেলে ভক্তিকে জাগাতে হবে।
নিজেকে বাঁচাতে গেলে ইষ্ট ও পরিবেশকে বাঁচাতে হবে। আমি বলি, মরে না, মেরো না, যদি পারো মরণকে মার।
২. মানুষের বাড়ি, ভিটে, আমার মনে হয় পূত মন্দির। তার পূর্ব্বপুরুষের স্মৃতি সেখানে জমাট হ’য়ে আছে। যেমন, কথা ধরা থাকে। ধূলির মধ্যেও তেমনি পূর্ব্বপুরুষের স্মৃতির রেশ থাকে। আমার বাড়ী বলতে একটা আভিজাত্য আছে। আমি যদি পন্ডিতজি হ’তাম তাহলে দেশবিভাগ হতে দিতাম না। যে নিজের দেশকে, নিজের বাড়ির ধূলিকে, নিজের বৈশিষ্ট্যকে শ্রদ্ধা করে, সে কারুরটা নষ্ট হয় তা’ বরদাস্ত করতে পারে না।
এই কথাগুলো নানা সময়ে বলেছিলেন শ্রী শ্রী ঠাকুর অনুকূল চন্দ্র। কথাগুলোর পাঠক বুঝতে পারবেন, ঠাকুর পরিবেশ সচেতন ছিলেন৷ লাখো মানুষের চোখের জলের কারণ দেশভাগ তিনি সমর্থন করেননি৷ ব্যক্তির ভেতরের শক্তিতে জাগাবার কথা বলতেন তিনি৷ অনেক বড়ো মাপের মানুষ না হলে মৃত্যুর মতো নিশ্চিত ঘটনাকে জয় করবার কথা তিনি বলতে পারতেন না৷ সাধারণ মানুষ তার জীবন জুড়ে করতে পারা কাজের মধ্য দিয়ে মরণকেও জয় করতে পারে। অর্থাৎ, অন্যের স্মৃতির অংশ হয়ে যায়৷ সাধারণ মানুষ কেমন করে অসাধারণ হয়ে ওঠে, ঠাকুরের জীবন আলোচনায় তার কিছু নমুনা পাওয়া যাবে।
তৎকালীন অবিভক্ত বঙ্গে পাবনা জেলার হেমায়েতপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন অনুকূলচন্দ্র। ১৮৮৮ সালের ১৪ ই সেপ্টেম্বর তাঁর জন্ম হয়। বাবা শিবচন্দ্র চক্রবর্তী আর মা মন মোহিনী দেবীর পুত্রটি ১৮৯৩ সালে নিজের গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। পাবনা ইনস্টিটিউটে ১৮৯৮ সালে ভর্তি হয়ে সেখানেই অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়েন। অল্প কিছুদিন তিনি অমিতাবাদের রায়পুর উচ্চ বিদ্যালয় পড়েন। পশ্চিমবঙ্গের ২৪ পরগনা জেলার নৈহাটি উচ্চ বিদ্যালয় পড়াশোনা করতে থাকেন বঙ্গভঙ্গের বছর ১৯০৫ পর্যন্ত। কলকাতার ন্যাশনাল মেডিকেল স্কুলে পড়ে তিনি হোমিওপ্যাথিতে ডিগ্রি অর্জন করেন। অনুকূলচন্দ্র দেওঘরে দাতব্য চিকিৎসালয়, তপোবন বিদ্যালয়, ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ, এমনকি আলাদা পাবলিশিং হাউস, ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
ব্রহ্মচর্য্য, গার্হস্থ্য, বানপ্রস্থ ও সন্ন্যাস সনাতন আর্য জীবনের এই চারটি স্তর সম্পর্কে ঠাকুর গভীরভাবে ভেবেছেন। এই ভাবনার ফল, ধর্ম আর শারিরীক শ্রমের কাজে যুক্ত থাকার সুন্দর সমন্বয়ে সৎসঙ্গ আশ্রম। শিক্ষা, কৃষি, শিল্প, সুবিবাহ – বিশ্বাসী মানুষের এই চার স্তম্ভের প্রকাশ ঘটলো প্রাচীন ঋষিদের তপোবনের নতুন সংস্করণ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত আশ্রমে।
সৎসঙ্গ আনুষ্ঠানিকভাবে ৪ এপ্রিল ১৯৫১ (২০ চৈত্র ১৩৫৭ বঙ্গাব্দ) তারিখে প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠানটির নামের তাৎপর্য ব্যখ্যা করে তিনি বলেছিলেন, ‘সৎ ও সংযুক্তির সহিত তদগতিসম্পন্ন যাঁরা তাঁরাই সৎসঙ্গী, আর তাদের মিলনক্ষেত্র হল সৎসঙ্গ। ‘
ঠাকুর শ্রী শ্রী অনুকূল চন্দ্র রচনা করেন ছেচল্লিশটির মত বই। তাঁর ধর্মচিন্তা, সমাজ সংস্কারমূলক চিন্তা এই বইগুলোতে পাওয়া যায়৷ ঠাকুরের জীবনের আদর্শ ও উপদেশমালা পাঠের জন্য এগুলোর বিকল্প নেই। বিশেষ করে, ছয় খণ্ডের ‘অনুশ্রুতি’ , ‘সত্যানুসরণ’ বাংলা ভাষার ভাবজগতের সম্পদ। ঠাকুরের প্রেরণা জাগতিক নয় বরং আধ্যাত্মিক। এতে উদ্বুদ্ধ হয়ে হাজার হাজার মানুষ গুরু হিসেবে তাঁকে বরণ করে নেয়। সৎসঙ্গ আশ্রমের মহাকর্মযজ্ঞ দেখতে এসেছিলেন লাল বাহাদুর শাস্ত্রী, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, মহাত্মা গান্ধীর মতন বড়ো মানুষেরা। বাংলা ভাষার প্রখ্যাত সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় তাঁর প্রতিটি বই শ্রী শ্রী অনুকুল ঠাকুরকে ভক্তিভরে উৎসর্গ করেন। ৮১ বছর বয়সে ১৯৬৯ সালের ২৭ জানুয়ারি তাঁর মহাপ্রয়াণ ঘটে। ভারতের বিহার রাজ্যে দেওঘরে নিজের প্রতিষ্ঠিত আশ্রমে তিনি শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন।
মানবতার মুক্তির এই অগ্রপথিককে ‘নিউজ থ্রি সিক্সটি’ পরিবার এই ছোটো লেখার মাধ্যমে শ্রদ্ধা জানাচ্ছে।


