শুভ নববর্ষ

Date:

দি প্যারিস রিভিউতে প্রকাশিত “হ্যাপি নিউ ইয়ার” থেকে

লেখা: লরি স্টোন
অনুবাদ: আদনান আলী

রিচার্ডের সাথে প্রথম আলাপে, ও বলেছিলো, “আমি কার্তেশিয়ান না। শরীর আর মনে আমার কাছে কোন তফাৎ নেই। এমনকি মনটা মাথার মধ্যে আটকে আছে, একথাও আমি বিশ্বাস করি না। আমার মনে হয় মনটা আমার পুরো শরীর জুড়েই, এমনকি শরীর ছাড়িয়ে আরো বাইরে কোথাও বিস্তৃত।” আমি বলেছিলাম, আমারও এমনটাই মনে হয়। সেই উনিশ বছর আগেকার কথা। ও বলেছিল, “আচ্ছা, একহাত কি আরেক হাতকে উপহার দিতে পারে নাকি!” আমার অবশ্য মনে হয়েছিলো, তাও সম্ভব বইকি, তবে হাতগুলো হতে হবে অক্টোপাসের। ও বলেছিল, “এক নদীতে কেউ দু’বার সাঁতার কাটতে পারেনা।” তা তো বটেই!

পুরনো বছরের শেষ দিনটাই একমাত্র ক্ষণ, যখন কিনা আমরা একই সাথে অতীত আর ভবিষ্যৎ দেখতে পাই। সময় থমকে যায়, আর আমরা ঠিক বর্তমানের ক্ষণটুকুতেই আটকে পড়ি। এমন সব পণ করি, যেগুলো আমরা রাখতে পারবো না, আর সেটাও জেনেশুনেই। আমরা চাই পুনর্জন্ম নিতে, যদিও আসলে এই জন্মটাই আমাদের বেশি পছন্দের। আসলে অন্য কাউকে ফাঁসিয়ে দেয়ার চেয়ে, নিজে ডুবে যাওয়াইতো বেশি আরামদায়ক। রিচার্ড বলে, “প্রতিজ্ঞাগুলো সব হচ্ছে মন বদলের ডাক।” একথাটা যখনই ও বলে, একটা অদ্ভুত ভালোবাসায় আমার মন ভরে ওঠে; ওর জন্য, মানুষের মন আর সেটার প্রকৃতিটা ধরে রাখার মধ্যে যে আনন্দ, তার জন্যও।

আমার কথা শুনে নিশ্চয়ই রিচার্ডকে মেলার ভিতরের একটা কাঠের জ্যোতিষী-পুতুল বলে মনে হচ্ছে, পয়সা ভরে দিলেই যার কাছ থেকে।কাগজে লেখা এক টুকরো ভবিষ্যদ্বাণী পাওয়া যায়। রিচার্ডের জন্য ব্যাপারটা প্রশংসাসূচকই, কারণ জ্যোতিষীরা দু-একটা বিষয়ে বেশ জান-পেহচান বলেই তো শোনা যায়। আর প্রতিজ্ঞাগুলো সব মন বদলের ডাকই বটে, তাই বিয়ের সময়, আমরা কোন প্রতিজ্ঞার ধার ধারিনি।

স্কি করার সময় একটা বিষয় কখনো ভুলতে নেই, স্কি এর মাথাটা পাহাড়ের গোড়ার দিকেই মুখ করতে হবে। নাহলে, কেবল বছরের এই সন্ধিক্ষণেই, মধ্যাকর্ষণ তার বল হারিয়ে ফেলে, আর আমরা পড়তে থাকি উর্ধ্বপানে৷ তবে আসল কথা হল, পতন যদি উপরের দিকের না হত, তবে আমরা ভাসতে শিখতাম কী করে? এজন্য স্কি করার সময়টাই, অত সব খুঁটিনাটি বুঝতে হয় না, কোথায় যেন সব খাপে-খাপ মিলে যায়। কারণ নিচের দিকে নামতে চাওয়া একটা স্কি থাকবেই, তা দেখতে যতই মনে হোক দু”টো স্কি-ই সামনের দিকে চলছে। পড়তে থাকাটাকে উড়তে থাকার অনুভূতিতে বদলের কাজটা, মূলত পাহাড়ের।

এজন্য আমি মাঝে মাঝেই ভ্যালেন্তিনা তেরেসকোভার কথা ভাবি, যে কিনা তার ১৯৬৩ সালের ১৬ই জুন প্রথম নারী হিসাবে মহাকাশে গিয়েছিল। প্রায় তিন দিনের ছিল মিশনটা। আমরা পড়ে যেতে ভালোবাসি না, অথচ তিনি ঠিকই কোন কিছুর সাথে আটকে না থাকার থ্রিলটা টের পেয়েছিলেন।

আট বছর বয়সে যখন প্রথম উল্টো ডিগবাজি খেতে শিখলাম, মনে হয়েছিল পৃথিবীর কোন কিছুই আমার অসাধ্য নয়। ভুল ভেবেছিলাম, কিন্তু সেটা বড় কোন ব্যাপার না এখন। নববর্ষের আগের রাতে, যখন সময় থমকে যায়, আমাদের প্রথম শূন্যে ভাসতে শেখার ক্ষণটা মনে পড়ে। মার্গারিটায় প্রথম চুমুক, রোলার কোস্টারের ঘূর্ণায়মান দ্রুততায় নিজেকে হারিয়ে ফেলা। নিজেকে এতই তুচ্ছ মনে হওয়া, যাকে এক নিমিষেই মুছে ফেলা যেতে পারে। একটু পরিবর্তনের জন্যে আমরা হন্যে হয়ে থাকি। নিকট অতীতকে মুছে ফেলতে চাই, যদিও সেটা আসলে এখনো ঘটমান। ভেসে যেতে পারা ব্যাপারটা আসলে কি? নিক্তি দিয়ে সব ঘটনার তুল্যমূল্য বিচার করাটা ছেড়ে দেয়া, এইতো?

মাঝে মাঝে ভাবি, ইংল্যান্ড চলে গেলে কেমন হয়। চৌত্রিশ বছর বয়েস পর্যন্ত রিচার্ড ওখানেই ছিল। ছেড়ে আসার সময় জানতো, অন্য জায়গায় ওকে বেখাপ্পা মনে হবে। তবে থাকার জায়গাটা যদি বসবাসের জন্য মনঃপূত না হয়, তবে ইচ্ছেমত একটা বয়স ঠিক করে, কাগজের নৌকার উঠে তার পাল তুলে দিয়ে, পছন্দমত কোন জায়গায় চলে যাওয়াই ভালো।

এজন্য আমরা যখন নতুন কোথাও থিতু হওয়ার কথা ভাবছিলাম, আমি এডিনবার্গের নাম প্রস্তাব করলাম। কারণ দুজনের কেউই কখনো সেখানে থাকিনি, আর একটা টিভি সিরিজ দেখে জায়গাটা বেশ জুতসই মনে হয়েছিল। কিন্তু রিচার্ড আপত্তি করল এই বলে যে, “শীতকালে এডিনবার্গ ঠান্ডা আর অন্ধকারে ছেয়ে থাকে, তার চেয়ে চলো ডরসেট যাই।”

গ্রীষ্মকালে আমরা ডরসেটে বেড়াতে গিয়েছিলাম আগে। একটা প্রকাণ্ড খাড়া পাহাড় চূড়া ধরে হাঁটছিলাম, আর এর মধ্যেই রিচার্ডের সুগার ফল করেছিল। ওর সামলে ওঠার সময়টায়, আমরা ঘাসের উপর শুয়ে ছিলাম, ছাতা দিয়ে তাঁবুর মত বানিয়ে। ডরসেটের সাগরতীরে সবাই ফসিল খুঁজে বেড়াতো, কিন্তু আমরা কখনোই কিছু খুঁজে পাইনি৷ এজন্য ডরসেটের কথা মনে হলে আমার কেমন যেন অভিশপ্ত বোধ হয়। “আরে, আমরা তো সারাজীবনই ফসিল খুঁজতে পারবো,” রিচার্ড আমাকে সান্ত্বনা দিলো। “ফসিল খুঁজে পাওয়ার চেয়ে, নিজেরা ফসিলে পরিণত না হওয়াটাই বেশি দরকারি।” কথাটা অবশ্য মিথ্যে না।

রিচার্ডের ভাই মারা গেলে রিচার্ড “পিয়ানো” নামে একটা লেখা লিখেছিলো। ছেলেবেলার স্মৃতি রোমন্থন করে লিখেছিলো, “১৯৯০ এ, আমি একটা পিয়ানো কিনেছিলাম, যেটা আজ পর্যন্ত আমি বয়ে চলেছি। ওইটা উপর তলায় পড়ে আছে, আর আমিও আবার পণ করছি, বাজাতে শিখবোই এইবার।”

আর সত্যিই, শিখছে ও এবার। তার মানে দাঁড়ালো, চাইলে আমরা নিজেদের বদলাতে পারি, প্রতিজ্ঞাগুলো শুনতে যতই রুপকথার সেই ধনুর্ভাঙা পণের মত শোনাক। বাস্তবেও কখনো কখনো অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়। যদি রিচার্ডের ব্যাপারটা বলি, মরে যাওয়ার আগে জীবনটা খুব করে যাপন করে নিতে চায় ও, আর সেটাই কারণ।

আমার জীবনের বেশিরভাগ ঘটনাগুলি হয়েছে কোন পরিকল্পনা ছাড়া। ” নিরাপদে পৌঁছালে, জানিও” সবাই বলত। ১৯২৩ সালে ৭৮ বছর বয়সে মারা যাওয়ার কিছুদিন আগে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলা সারা বার্নহার্ডট এর একটা কথা আমার ভারি পছন্দের, “জীবনটা বড় ছোট, এমনকি যারা মেলাদিন বাঁচে, তাদের জন্যও। তাই আমাদের যারা ভালবাসে, আর আমরা যাদের ভালোবাসি তাদের জন্যই আমাদের বাঁচা উচিত। ঘৃণা বড়ই ক্লান্তিকর। যতটুকু সম্ভব নিরাসক্ত থাকা, ক্ষমাশীল হওয়া আর চলতি পথের চেনা মুখগুলোকে ভুলে না যাওয়াটাই আসল।”

যদি পারতাম, চলার পথের সব সাথীকে জানাতাম, “পৌঁছে গেছি, নিরাপদেই।”

দি প্যারিস রিভিউতে ছাপা হওয়া লেখিকার “হ্যাপী নিউ ইয়ার” শিরোনামের লেখা থেকে সংক্ষেপিত ও পরিমার্জিত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Share post:

সাবস্ক্রাইব

সম্পাদকের নির্বাচিত

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

পয়লা বৈশাখ  বাংলা নববর্ষ উদযাপনের ইতিহাস

বাংলা নববর্ষ আমাদের সংস্কৃতিতে কিভাবে এলো তা জানতে হলে...

প্রাণের ঠাকুর শ্রী শ্রী অনুকূল চন্দ্র

১.শক্তিকে জাগাতে গেলে ভক্তিকে জাগাতে হবে।নিজেকে বাঁচাতে গেলে ইষ্ট...

সৃষ্টির নেশায়… জীবনের চলমান চিত্র

সৃষ্টির নেশায় আমরা এই প্রত্যয় নিয়ে প্রায় ১৫ বছর...