সেন্টমার্টিন দ্বীপে সাগরতলে কোরাল ব্লিচিং

Date:

বিশ্বজুড়ে সামুদ্রিক পরিবেশ আজ এক অস্তিত্ব রক্ষার সংকটে দাঁড়িয়ে। এই সংকটের সবচেয়ে দৃশ্যমান অথচ করুণ রূপ হলো কোরাল ব্লিচিং।

আপাতদৃষ্টিতে,  এই ধবধবে সাদা রঙ দেখতে নান্দনিক মনে হলেও, এটি আসলে সাগরের তলদেশের এক নীরব হাহাকার। এই পরিবর্তন শুধু কোরালের রঙ হারানো নয়, বরং একটি জটিল পরিবেশগত বিপর্যয়ের বহিঃপ্রকাশ; যা সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, উপকূলীয় নিরাপত্তা এবং আমাদের জীবন-জীবিকার ওপর সরাসরি আঘাত হানছে।

কোরাল কোনো সাধারণ পাথর বা উদ্ভিদ নয়, এটি একটি জীবন্ত প্রাণী যা ‘পলিপ’ (Polyp) নামে পরিচিত। পৃথিবীর মোট সাগরের মাত্র ১ শতাংশ এলাকা দখল করে থাকলেও, পৃথিবীর প্রায় ২৫ শতাংশ সামুদ্রিক জীব কোনো না কোনোভাবে এই কোরালের ওপর নির্ভরশীল। তাই কোরালের ক্ষতি মানেই কেবল একটি প্রাণীর মৃত্যু নয়, বরং পুরো একটি সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ভেঙে পড়া।

কোরাল ব্লিচিং কি?

কোরাল ব্লিচিং বা কোরালের সাদা হয়ে যাওয়া বর্তমানে বিশ্বব্যাপী পরিবেশবিজ্ঞানীদের কাছে অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। এর গুরুত্বের পেছনে বেশ কিছু শক্তিশালী কারণ রয়েছে। কারণগুলো দেখা যাক।

সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ১–২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যায়, তখন কোরাল প্রচণ্ড চাপে পড়ে এবং দেহ থেকে শৈবালকে বের করে দেয়। শৈবাল চলে যাওয়ার সাথে সাথে কোরাল তার রঙ হারিয়ে সাদা হয়ে পড়ে এই অবস্থাকেই বিজ্ঞানীরা ‘কোরাল ব্লিচিং’ বলেন। তাপমাত্রা বৃদ্ধি ছাড়াও অতিরিক্ত অতিবেগুনি রশ্মি, সমুদ্রের অম্লতা বৃদ্ধি এবং অতিরিক্ত পলি বা দূষণ এই ব্লিচিং প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে।এছাড়াও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের সংকট,উপকূল রক্ষা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি,অর্থনীতি ও খাদ্যের ওপর প্রভাব,জলবায়ু পরিবর্তনের সতর্কবার্তা,কোরালের পুনরুদ্ধার ক্ষমতা কমে যাওয়া।

পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা, মানুষের জীবন ও জীবিকা নিশ্চিত করা এবং উপকূলীয় অঞ্চলের নিরাপত্তার স্বার্থেই কোরাল ব্লিচিংকে বর্তমান সময়ের অন্যতম বড় পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হয়।

সেন্টমারটিন্স দ্বীপের জলেরতলে কোরাল ব্লিচিং । ছবি: শরীফ সারওয়ার

ব্লিচিং হওয়া মানেই কি কোরাল মারা যাওয়া?

না, ব্লিচিং হওয়া মানেই কোরাল মৃত নয়। এটি একটি “জরুরি অবস্থা”। যদি পানির তাপমাত্রা দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে আসে, তবে কোরাল আবার শৈবালগুলোকে গ্রহণ করে বেঁচে উঠতে পারে। কিন্তু যদি প্রতিকূল অবস্থা দীর্ঘদিন চলে, তবে কোরাল খাবারের অভাবে মারা যায় এবং তার ওপর কালো বা বাদামী শৈবালের আস্তরণ পড়ে পচন ধরে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট (সেন্ট মার্টিন দ্বীপ)

বাংলাদেশের ​সেন্টমার্টিন দ্বীপে  হয়তো লক্ষ্য করেছেন যে, পর্যটনের চাপ, প্লাস্টিক বর্জ্য দূষণ ও অতিরিক্ত সেডিমেন্টেশন এবং অপরিকল্পিতভাবে পাথর উত্তোলনের ফলে সেখানকার কোরালগুলো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে “Ghost Nets” বা পরিত্যক্ত জালগুলো কোরাল ব্লিচিং ও টিস্যু নষ্ট করার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে।

কোরাল রক্ষা করা যায় যেভাবে :

কোরাল রক্ষা করা একটি চ্যালেঞ্জিং কাজ, তবে স্থানীয় এবং বৈশ্বিক উভয় পর্যায়ে সঠিক পদক্ষেপ নিলে কোরাল ব্লিচিং রোধ করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত কোরাল  পুনরুজ্জীবিত করাও সম্ভব।

স্থানীয় দূষণ চাপ কমানো

​কোরাল যখন তাপমাত্রার কারণে চাপে থাকে, তখন অন্যান্য দূষণ তার মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

প্লাস্টিক ঘোস্ট নেট অপসারণ

 সমুদ্রের তলদেশ থেকে পরিত্যক্ত জাল (Ghost nets) এবং প্লাস্টিক বর্জ্য পরিষ্কার রাখা অত্যন্ত জরুরি,

সেডিমেন্টেশন নিয়ন্ত্রণ

উপকূলীয় এলাকায় অপরিকল্পিত নির্মাণ কাজ বন্ধ করা, যাতে কাদা বা পলি গিয়ে কোরালের ওপর আস্তরণ তৈরি করতে না পারে।

অ্যাঙ্কর বা নোঙর নিয়ন্ত্রণ

নৌকার নোঙর যেন সরাসরি কোরাল ওপর না পড়ে, সেজন্য ‘বয়া’ ব্যবহার নিশ্চিত করা।

সরাসরি স্পর্শ বন্ধ করা

 পর্যটকরা যেন কোরালের ওপর দিয়ে না হাঁটে সে বিষয়ে কঠোর নিয়ম করা।

কোরাল নার্সারি কৃত্রিম প্রজনন

​এটি সরাসরি প্রতিকারের একটি কার্যকর পদ্ধতি

হিট-রেসিস্ট্যান্ট কোরাল

ল্যাবে বা নার্সারিতে এমন কোরাল জন্মানো যা উচ্চ তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে, এবং সেগুলোকে পরে সাগরে প্রতিস্থাপন করা।

কোরাল প্রতিস্থাপন

 কৃত্রিম কাঠামো তৈরি করে কোরালকে বড় হওয়ার জন্য নিরাপদ ভিত্তি প্রদান করা।

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন রোধ ​ব্লিচিংয়ের মূল কারণ জলবায়ু পরিবর্তন। কার্বন নিঃসরণ কমানোর মাধ্যমে সাগরের পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রাখা দীর্ঘমেয়াদী একমাত্র সমাধান।

সেন্টমারটিন্স দ্বীপের জলেরতলে কোরাল ব্লিচিং । ছবি: শরীফ সারওয়ার

সচেতনতা

কমিউনিটি ইনভলভমেন্ট

দ্বীপের স্থানীয় বাসিন্দাদের এই সংরক্ষণ প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা, যাতে তারা কোরাল রক্ষাকে নিজেদের দায়িত্ব মনে করে।

কৃত্রিম কোরাল স্থাপন বর্তমান বিশ্বে সামুদ্রিক পরিবেশ রক্ষায় একটি অত্যন্ত কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।

বিশ্বের অনেক দেশেই কৃত্রিম কোরাল তৈরি করা হয়েছে, তবে এক্ষেত্রে শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র (ফ্লোরিডা), অস্ট্রেলিয়া (গ্রেট ব্যারিয়ার রিফের ক্ষতিপূরণ পুষিয়ে নিতে), ইন্দোনেশিয়া, মালদ্বীপ, থাইল্যান্ড, এবং মেক্সিকো।

কোরাল ব্লিচিং কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়,এটি আসলে আমাদের গ্রহের অসুস্থতার এক জোরালো লক্ষণ। সাগরের নীল জলরাশির নিচে যে বর্ণিল জগৎ আজ ধূসর হয়ে যাচ্ছে, তা আসলে আমাদের সুন্দর ভবিষ্যতেরই বিসর্জন। যদি আমরা কার্যকর পদক্ষেপ না নিই, তবে আগামী প্রজন্ম হয়তো এই রঙিন মহাজগৎকে সাগরের তলে নয় কেবল বইয়ের পাতায় বা স্থিরচিত্রেই খুঁজে পাবে।

শরীফ সারওয়ার

ডাইভমাস্টার ও আন্ডারওয়াটার ফটোগ্রাফার।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Share post:

সাবস্ক্রাইব

spot_img

সম্পাদকের নির্বাচিত

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

সমুদ্রের তলদেশের ‘সবুজ মুক্তো’: পুষ্টি ও সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত

“কখনো কি ভেবেছেন, সমুদ্রের তলদেশে আঙুরের মতো দেখতে একটি...

লায়ন ফিশ: সমুদ্রের বিষাক্ত রাজপুত্র

সমুদ্রের নীল জলরাশির নিচে যে কয়টি প্রাণী একাধারে অসীম...