দুর্গাপূজা: ধর্মীয় ঐতিহ্য থেকে সর্বজনীন উৎসব

Share post:

Date:

দুর্গাপূজা বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব। প্রতি বছর শরৎকালে দেবী দুর্গার আরাধনাকে কেন্দ্র করে মণ্ডপে মণ্ডপে পূজা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও নানা আয়োজন করা হয়। হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাসে দেবী দুর্গা অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির বিজয়ের প্রতীক।

তবে বর্তমানের জাঁকজমকপূর্ণ দুর্গোৎসব এক দিনে গড়ে ওঠেনি। প্রাচীন ধর্মীয় আখ্যান, রাজা-জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতা এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে এটি আজকের রূপ পেয়েছে।

হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, মহিষাসুর নামের এক অসুরের অত্যাচারে দেবতা ও মানুষ বিপদে পড়ে। তখন দেবতাদের সম্মিলিত শক্তি থেকে দেবী দুর্গার আবির্ভাব ঘটে। দেবতারা তাকে নানা ধরনের অস্ত্র প্রদান করলে তিনি মহিষাসুরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবর্তিন হন এবং অসুরকে পরাজিত করেন। এই কাহিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায় এবং অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির বিজয়কে তুলে ধরে।

দূর্গাপুজার একটি মণ্ডপ
দূর্গাপুজা, ছবি: ইন্টারনেট

ভারতীয় ধর্মীয় ঐতিহ্যে দেবী উপাসনার ইতিহাস অনেক প্রাচীন। তবে বাংলায় বর্তমান রীতির শারদীয় দুর্গাপূজা ঠিক কখন শুরু হয়েছিল, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না।

তবে মধ্যযুগ থেকে বাংলায় দূর্গাপূজার ইতিহাস পাওয়া যায়। বাংলায় দুর্গাপূজার আচার অনুষ্ঠান ও নিয়মকানুন নিয়ে বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থ রচিত হয়। ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে ‘দুর্গোৎসববিধি’ ও ‘দুর্গাপূজাবিধানপ্রয়োগ’ নামে পূজাসংক্রান্ত পাণ্ডুলিপির নথি রয়েছে। এগুলো বাংলায় দুর্গাপূজার ইতিহাস ও সংস্কৃতি বুঝতে সাহায্য করে।

আরও পড়ুন: দুর্গা ও মহিষাসুরের যুদ্ধ: হিন্দু পুরানের পৌরাণিক কাহিনি

ষোড়শ শতকে বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোয় ব্যাপক পরিবর্তন আসে। মুঘল শাসনের সময় স্থানীয় রাজা ও ভূস্বামীদের প্রভাব বৃদ্ধি পায়। তাঁরা পূজানুষ্ঠানের মাধ্যমে ভক্তি প্রকাশের পাশাপাশি নিজেদের সামাজিক মর্যাদা তুলে ধরতেন। এ সময় বিশাল আকারের দুর্গাপূজার আয়োজনের ঐতিহ্য দেখা যায়। মূলত ধনী ভূ-স্বামী ও জমিদারগণ এই বিশাল আয়োজনের মাধ্যমে নিজেদের আভিজাত্য প্রকাশ করতেন।

দূর্গাপুজার একটি মণ্ডপ
দূর্গাপুজার একটি মণ্ডপ; ছবি: dhakatribune

রাজা কংসনারায়ণ ও শারদীয় দুর্গোৎসব

বাংলায় জাঁকজমকপূর্ণ দুর্গাপূজার ইতিহাসে রাজশাহীর তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, ষোড়শ শতকে তিনি বিপুল অর্থ ব্যয় করে দুর্গাপূজার আয়োজন করতেন। এ কারণে তাহেরপুর বাংলার প্রাচীন দুর্গোৎসবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।

তবে দুর্গাপূজার প্রথম উদ্যোক্তা কে, তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এ প্রসঙ্গে নদিয়ার রাজা ভবানন্দ মজুমদার এবং কলকাতার সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের নামও উল্লেখ করা হয়। ১৬১০ সালের সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার পূজার সূচনা করেন।

আরও পড়ুন: ঢাকার ধামরাইয়ের রথের মেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য অনুসন্ধান

তাই কংসনারায়ণকে নিশ্চিতভাবে প্রথম উদ্যোক্তা বলা কঠিন। তবে বাংলায় জাঁকজমকপূর্ণ দুর্গাপূজার প্রসারে রাজপরিবার ও ভূস্বামীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

অষ্টাদশ শতকে বাংলার ধনী পরিবারগুলোর দুর্গাপূজা আরও জাঁকজমকপূর্ণ হয়ে ওঠে। কলকাতার শোভাবাজার রাজবাড়ির পূজা এর অন্যতম উদাহরণ। রাজা নবকৃষ্ণ দেবের উদ্যোগে এই পূজা ব্রিটিশ শাসনামলে কলকাতার অভিজাত সমাজে পরিচিতি লাভ করে।

দূর্গাপুজার একটি মণ্ডপ
দূর্গাপুজা; ছবি: Barsha

দুর্গোৎসববিধি পাণ্ডুলিপির ক্যাটালগ

১৭৫৭ সালের পলাশির যুদ্ধের পর বাংলার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসে। কলকাতার বিকাশ এবং ব্রিটিশ প্রশাসনের সঙ্গে স্থানীয় ধনী পরিবারগুলোর সম্পর্ক দুর্গাপূজার আয়োজনেও প্রভাব ফেলে।

জমিদারবাড়ির পূজায় অতিথি আপ্যায়ন, ভোজ, সংগীত ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। এর মাধ্যমে পরিবারগুলো নিজেদের সম্পদ ও সামাজিক প্রভাব প্রকাশ করত। ফলে দুর্গাপূজা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের পাশাপাশি সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের মাধ্যম হয়ে ওঠে।

দুর্গাপূজার ইতিহাসে বড় পরিবর্তন আসে সাধারণ মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে। হুগলির গুপ্তিপাড়ায় বারোয়ারি পূজার সূচনা নিয়ে একটি প্রচলিত কাহিনি রয়েছে। কাহিনি অনুযায়ী, কয়েকজন মানুষ ব্যক্তিগত পূজায় অংশ নিতে না পেরে নিজেরাই সম্মিলিতভাবে পূজার আয়োজন করেন। ‘বারোয়ারি’ শব্দটির সঙ্গে ‘বারো ইয়ার’ বা বারোজন বন্ধুর ধারণা যুক্ত করা হয়। তবে এই পূজা ঠিক কোন সালে শুরু হয়েছিল, তা জানা যায় না।

পরবর্তীকালে পাড়ার মানুষ সম্মিলিতভাবে চাঁদা তুলে পূজার আয়োজন করতে শুরু করেন। গড়ে ওঠে পূজা কমিটি। তাদের উদ্যোগে মণ্ডপ নির্মাণ, প্রতিমা তৈরি ও উৎসব পরিচালনার ব্যবস্থা হয়। এভাবে দুর্গাপূজা ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত আয়োজনের গণ্ডি পেরিয়ে সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়।

বিশ শতকে পাড়াভিত্তিক পূজা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বড় মণ্ডপ নির্মাণের মাধ্যমে এই উৎসবের জনপ্রিয়তা আরও বাড়ে। তবে সর্বজনীন পূজার বিকাশ ধীরে ধীরে ঘটেছে।

দূর্গাপুজা
দূর্গাপুজা; ছবি: Asiannews

দুর্গাপূজার অন্যতম আকর্ষণ প্রতিমা ও মণ্ডপের সাজসজ্জা। শিল্পীরা বাঁশ, খড় ও মাটি দিয়ে প্রতিমা তৈরি করেন। পরে রং, পোশাক ও অলংকার দিয়ে তা সাজানো হয়। এই কাজে বহু শিল্পী ও কারিগর যুক্ত থাকেন।

মহালয়ার মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজার আবহ তৈরি হয়। ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত বিভিন্ন ধর্মীয় আচার পালিত হয়। ঢাকের বাদ্য, আরতি, অঞ্জলি ও ধুনুচি নাচ উৎসবকে বিশেষ বৈশিষ্ট্য দেয়। বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে পূজার সমাপ্তি ঘটে।

বর্তমানে ঐতিহ্যবাহী প্রতিমার পাশাপাশি থিমভিত্তিক মণ্ডপ ও আধুনিক আলোকসজ্জার ব্যবহার বেড়েছে। ফলে দুর্গাপূজা শিল্পী ও কারিগরদের সৃজনশীলতা প্রকাশের বড় ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।

আরও পড়ুন: প্রাণের ঠাকুর শ্রী শ্রী অনুকূল চন্দ্র

বাংলাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতিতেও দুর্গাপূজার গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা ও শহরে মন্দির ও সর্বজনীন মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। ধর্মীয় আচার পালনের পাশাপাশি আয়োজন করা হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

উৎসবটি স্থানীয় অর্থনীতিতেও ভূমিকা রাখে। প্রতিমা নির্মাণ, মণ্ডপসজ্জা, পোশাক, আলোকসজ্জা ও পরিবহনের কাজে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হয়।

তবে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দুর্গাপূজার সূচনা ও বিকাশের ইতিহাস জানতে স্থানীয় নথি, মন্দিরের দলিল এবং গবেষণাপত্রের সাহায্যে আরও অনুসন্ধান প্রয়োজন।

কলকাতার দুর্গাপূজা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

২০২১ সালে কলকাতার দুর্গাপূজা UNESCO-র মানবতার অপরিমেয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। এই স্বীকৃতিতে প্রতিমা নির্মাণ, মণ্ডপসজ্জা, শিল্পীদের কাজ এবং মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।

বর্তমানে দুর্গাপূজা ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি জীবন্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পরিচয় বহন করে। তবে বড় জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহার এবং বিসর্জনের সময় জলদূষণ কমানো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

দুর্গাপূজার ইতিহাস দীর্ঘ পরিবর্তনের ইতিহাস। প্রাচীন ধর্মীয় ঐতিহ্য থেকে শুরু করে রাজা-জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতা এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগের মধ্য দিয়ে এই উৎসব বর্তমান রূপ পেয়েছে।

আজ দুর্গাপূজা বাঙালির ধর্মীয় বিশ্বাস, শিল্প ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সময়ের সঙ্গে এর আয়োজন বদলেছে, যুক্ত হয়েছে আধুনিক শিল্প ও প্রযুক্তি। তবু অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির বিজয়ের বার্তা এর মূল আকর্ষণ হয়ে রয়েছে। দুর্গাপূজা তাই শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বাঙালির দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও এক জীবন্ত প্রকাশ।

আর্টিকেলে ব্যবহৃত প্রধান তথ্যসূত্র

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সাবস্ক্রাইব

spot_img

সম্পাদকের নির্বাচিত

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

দুর্গা ও মহিষাসুরের যুদ্ধ: হিন্দু পুরানের পৌরাণিক কাহিনি

হিন্দু পুরাণের অন্যতম বিখ্যাত কাহিনি হলো দেবী দুর্গা ও...

নভেরার জন্য এলিজি

১৯৪৭ এ ধর্মের ভিত্তিতে ভারত-পাকিস্তান ভাগ হলেও পূর্বপাকিস্তানের ভাষা...

‘বার্স্ট অফ জয়’ : পুলিৎজার জয়ী ছবির শিক্ষা

ডিজিটাল ক্যামেরা ওয়ার্ল্ড অনলাইনে প্রকাশিত টম মে প্রণীত প্রতিবেদন...

ব্যাটারি রিকশা: আমাদের ভাবনা

ব্যাটারি রিকশা নিয়ে অনেক ধরনের আলাপ চলে আসছে গত...