অনুবাদ : অপরাজিতা মুমু
ক্রিস্টোফার নোলানের ‘দ্য অডিসি’-র শিল্পী এবং ক্রিয়েটিভ টিমের প্রতি,
আমরা গ্রিক হিসেবে আপনাদের কাছে লিখছি—প্রাচীন সময়ের কোনো টুকরো হিসেবে নয়, জাদুঘরের প্রদর্শনী থেকে আসা কোনো প্রতিধ্বনি হিসেবে নয়, মার্বেল পাথরে বন্দি কোনো চরিত্র হিসেবেও নয়। একটি জীবন্ত জাতি হিসেবে, যাদের ইতিহাস অশেষ।
প্রথমেই, আমরা আপনাদের মঙ্গল কামনা করি ।
চলচ্চিত্রের সবসময়ই এই ক্ষমতা রয়েছে যে তা সকল পুরনো পাঠ্য নতুনভাবে কল্পনা করতে পারে, ভাষা ও সময়ের সীমানা পেরিয়ে যেতে পারে এবং নতুন প্রজন্মের কাছে পুরনো গল্পগুলোকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিতে পারে। হোমারের ‘অডিসি’ অধিকাংশত মানবতার অভিন্ন সাংস্কৃতিক কল্পনার অংশ। বিশ্বের সামনে সিনেমার পর্দায় এই গল্প নিয়ে আসার উচ্চাকাঙ্ক্ষার পেছনের গল্প আমরা বুঝতে পারছি। সেই সাথে এই মহাকাব্যগুলোকে ঘিরে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলতে থাকা গল্পগুলো বারবার বলবার শৈল্পিক ঐতিহ্যকেও আমরা স্বীকৃতি দিচ্ছি। তবে সেই সাথে আমরা আপনাদের এমন কিছু বিষয় বিবেচনা করার অনুরোধ জানাচ্ছি যা গ্রিক গল্পগুলোর আধুনিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে প্রায়শই উপেক্ষা করা হয়।

আমরা অদৃশ্য হয়ে যাইনি।
মিথের যুগের পর গ্রিক মানুষরা হারিয়ে যায়নি। গ্রিক সংস্কৃতি ধ্রুপদী মার্বেল পাথরের মূর্তির মধ্যে বরফ হয়ে থাকেনি। অতি প্রাচীন সময়ের গ্রিক ভাষা নিভে যায়নি। আমরা এখনো এখানে আছি। আমরা ৩,০০০ বছরেরও বেশি সময়ের এক ধারাবাহিক ইতিহাস প্রবাহ। গ্রিক পরিচয় হারিয়ে যাওয়ার চেয়ে বরং রূপান্তরের মধ্য দিয়ে টিকে রয়েছে।
মাইসেনিয়ান বিশ্ব জন্ম দিয়েছিল হোমারের মহাকাব্যগুলোর, সেখান থেকে শুরু করে এথেন্স, স্পার্টা, করিন্থ ও থিবসের ধ্রুপদী নগর-রাষ্ট্রসমূহ। এরপর হেলেনীয় যুগ, এই যুগ আলেকজান্ডারের উত্তরসূরিদের অধীনে ভূমধ্যসাগর জুড়ে গ্রিক ভাষা ও চিন্তাভাবনা ছড়িয়ে দিয়েছিল। তারপর রোমান ও বাইজেন্টাইন আমল—যেখানে গ্রিক ভাষা প্রশাসন, দর্শন ও ধর্মতত্ত্বের একটি প্রধান ভাষা হিসেবে টিকে ছিল। আরো পরে অটোমান সাম্রাজ্যের একাধিক শতাব্দী জুড়ে ভাষা, বিশ্বাস ও সমাজ সংগঠনের মাধ্যমে এই পরিচয় রক্ষা করা হয়েছিল। সবার শেষে আধুনিক গ্রিক রাষ্ট্র, বিপ্লবের মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে এবং আজ ইউরোপ ও বৃহত্তর বিশ্বে টিকে রয়েছে।
প্রতিটি ধাপে, ইতিহাস অবিচ্ছিন্ন ছিল। ছিল ভাষা, স্মৃতি এবং সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা। গ্রিক ভাষা সম্পর্কে আজকেও বলা হয় এটি ইউরোপের সবচেয়ে প্রাচীন এবং ধারাবাহিকভাবে টিকে থাকা ভাষা। এটি আবার তৈরি করা কোনো ভাষা নয়। আরেকবার জেগে ওঠা কোনো ভাষা নয়। বরং একটি জীবন্ত ভাষা।
যখন অডিসির মতো গল্পগুলো আরেকবার বলা হয়, তখন এই ধারাবাহিকতাটি অত্যন্ত গুরুত্ব দাবি করে।
অডিসিয়াস কেবল ধৈর্য, সংগ্রাম ও ঘরে ফেরার এক সার্বজনীন প্রতীকই নন। এই প্রতীক এমন এক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের অংশ যা এই ইতিহাসের প্রতিটি স্তর অতিক্রম করে প্রবাহমান থেকেছে। বাইজেন্টাইন পণ্ডিতদের দ্বারা বারবার বলা হয়েছে। মধ্যযুগের পৃথিবীতে অনুলিপিকৃত পাণ্ডুলিপিতে সংরক্ষিত হয়েছে। রেনেসাঁর সময় ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে পঠিত হয়েছে। আজও গ্রিসে এটি শেখানো হয়, বলা হয় এবং নতুন করে ব্যাখ্যা করা হয়।
এই কারণেই রিপ্রেজেন্টেশন সংক্রান্ত আলাপ-আলোচনা আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বর্জন বা কোন কিছু সীমিত করবার দাবি জানাচ্ছি না। আমরা বৈচিত্র্য কিংবা নতুনভাবে ব্যাখ্যার বিরুদ্ধেও যুক্তি দিচ্ছি না। গ্রিক সংস্কৃতি নিজেই যুগে যুগে পারস্পরিক আদান-প্রদান, অভিবাসন আর সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে।
আমরা যা চাচ্ছি তা আরও সহজ এবং মানবিক।পৃথিবীর সামনে যখন গ্রিক গল্পগুলো আরেকবার বলা হয়, তখন যেন সেই গল্পগুলোর ভেতরে গ্রিক মানুষেরাই লুপ্ত হয়ে না যায়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, চলচ্চিত্র শিল্প রিপ্রেজেন্টেশনের ওপর সঠিকভাবে জোর দিচ্ছে। এই রিপ্রেজেন্টেশন নিশ্চিত করছে যেন আবহমান সংস্কৃতির সকল ধারাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, সকল ধরনের কণ্ঠস্বর অন্তর্ভুক্ত করা হয়। গল্প বলার প্রক্রিয়ায় বাস্তব অভিজ্ঞতা যেন মুছে না যায়। আদিবাসী গল্পগুলো এখন ক্রমশ তাদের স্বরে কথা বলছে। আদিবাসীদের কাছ থেকে সাংস্কৃতিক পরামর্শ নেওয়া এখন একটি সাধারণ নিয়মে পরিণত হচ্ছে।নিজেদের শেকড়ের পরিচয়কে এই মুহূর্তের পৃথিবীতে শৈল্পিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
আমরা শুধু এইটুকুই চাই যেন এই সচেতনতা গ্রিক ঐতিহ্যের ক্ষেত্রেও প্রসারিত হয়।
গ্রিক পরিচয় জীর্ণ বা ফাটলে আচ্ছন্ন বলে নয়, বরং এটি অবিচ্ছিন্ন বলেই আমরা এই দাবি জানাচ্ছি।
‘দি অডিসি’ সংক্রান্ত আলোচনায় কেউ কেউ যুক্তি দিয়েছেন যে, পুরাণ বা মিথলজি পুরো বিশ্বের সম্পদ এবং একে কোনো সাংস্কৃতিক উৎসের কূটকচালে বন্দি করা উচিত নয়। অন্য সকলেই চলচ্চিত্রের কুশীলব নির্বাচনের বৈচিত্র্যকে ঐতিহাসিক সুনির্দিষ্টতার চেয়ে আধুনিক বৈশ্বিক দর্শক-শ্রোতাদের প্রতিফলন হিসেবে দেখেন। মানে দর্শকদের পছন্দের কাছে অনেক সময় ঐতিহাসিক সুনির্দিষ্টতা ম্লান বা তুচ্ছ হয়ে যায়।
আমরা সেই দৃষ্টিভঙ্গিগুলো বুঝি। তবে সর্বজনীনতার জন্য একটি মহান সংস্কৃতির ধারাবাহিকতার উৎসের সাথে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার প্রয়োজন নেই। একটি গল্প সমগ্র মানবজাতির হতে পারে, অন্য দিক থেকে একই সাথে যে মানুষ ও ভাষা থেকে গল্পটির জন্ম হয়েছে, তাকেও স্বীকৃতি দেওয়া সম্ভব।
আমরা এ কথা রাগের বশে বলছি না, বরং স্বীকৃতির জায়গা থেকে বলছি। কারণ প্রায়শই গ্রিক ইতিহাসকে এমন কিছু ধরনে দেখা হয় যা শেষ হয়ে গেছে, অস্তিত্বশীল সত্তা সেভাবে দেখা হয় না। যেন গ্রিসের অস্তিত্ব কেবল এক প্রাচীন অতীতেই ছিল।বাইজেন্টাইন ধারাবাহিকতা, অটোমানদের অধীনে টিকে থাকা, বিপ্লবের মাধ্যমে পুনর্জন্ম এবং বর্তমান কাল পর্যন্ত—বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা শহর, গ্রাম, দ্বীপ ও প্রবাসী সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে তার কোনো অস্তিত্ব নেই।
তাই হোমারের জগতে—সমুদ্র, পরিভ্রমণ, দেবদেবী এবং ফিরে আসা রাজাদের মাঝে—প্রবেশ করার সময় আমরা অনুরোধ করব আপনি যেন এই চেতনাটি বুকে ধারণ করেন: গ্রিস কেবল প্রাচীনকালের কোনো ইতিহাসের অঞ্চল নয়। এটি একটি জীবন্ত দেশ। গ্রিক জনগণ কোনো ঐতিহাসিক চরিত্র নন। আমরা আপনাদের সমসাময়িক। ভবিষ্যতের যেকোনো সময়ে গ্রিক ইতিহাসের যেকোনো অধ্যায়—প্রাচীন, মধ্যযুগীয় বা আধুনিক—থেকে গল্প বলার সুযোগ তৈরি হলে, আমরা আশা করি আপনি মনে রাখবেন যে গ্রিক ঐতিহ্য সেই গল্পগুলো থেকে হারিয়ে যায়নি। আমাদের ঐতিহ্য সেখানে আত্মার সবটুকু নিয়ে উপস্থিত, জীবন্ত এবং এখনো নিজের কথা নিজেই বলছে।
আমরা চলচ্চিত্রটির সাফল্য আশা করি। যে শিল্প এই ধরনের একটি মহাকাব্যকে সিনেমায় জীবন্ত করে তুলতে চাইছে তার প্রতি সম্মান জানাই। আমরা আশা করি, এই প্রচেষ্টা এমন এক সিনেমা তৈরিতে অবদান রাখবে যা মূল উৎসের ইতিহাসকে মুছে না ফেলে মানুষের কল্পনাশক্তিকে প্রসারিত করে যাবে।
আমরা বিলুপ্ত হয়ে যাইনি।
আমরা এখনো এখানেই আছি।
মাইসিনিয়ান অনুরণন, ক্ল্যাসিকাল দর্শন, হেলেনীয় বিস্তার, বাইজেন্টাইন ধারাবাহিকতা, অটোমানদের অধীনে টিকে থাকার সংগ্রাম আর আধুনিক রাষ্ট্রসত্তা – এই সবকিছুর মধ্য দিয়ে আমরা টিকে আছি।
সব সময়ই ছিলাম।
কে. এন.
( গ্রিক সিটি টাইমসে প্রকাশিত চিঠির অনুবাদ৷ প্রকাশিত চিঠির লেখক নিজের পূর্ণ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ছিলেন। চিঠির গুরুত্ব বিবেচনা করে, আমাদের পাঠকদের জন্য অনুবাদ করা হলো। – সম্পাদকীয় নোট)


