ব্যাটারি রিকশা: আমাদের ভাবনা

Share post:

Date:

ব্যাটারি রিকশা নিয়ে অনেক ধরনের আলাপ চলে আসছে গত কয়েক বছর ধরে। এই আলাপের একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনায় যাওয়ার আগে বলে রাখা ভালো, বাংলাদেশের রাস্তায় প্রধানত তিন ধরনের রিকশা আমরা দেখি। অটো রিকশা, প্যাডেলচালিত রিকশা এবং ব্যাটারিচালিত রিকশা। নগর সভ্যতায় প্রবল যান্ত্রিক সময়েও পায়ে চালানো প্যাডেল রিকশা, একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে এক দেড়শ বছর আগের মত টানছেন- এই বাস্তবতা হয়তো আমাদের নগর উন্নয়ন এবং নাগরিকের সামগ্রিক জীবনমান উন্নয়নের ধারণা প্রশ্নবিদ্ধ করে। আমাদের আলাপ ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ে।

প্রতিটি ব্যাটারিচালিত রিকশা গড়ে আশি থেকে একশো কেজির ব্যাটারির সাহায্যে চলে। একটা নির্দিষ্ট সময় পরে এইসব ব্যাটারি বদলাতে হয়। ব্যাটারিগুলোর প্রধান উপাদান সিসা। সাধারণত, চার থেকে পাঁচটি ব্যাটারি যুক্ত করে এক সেট সিসা ব্যাটারি দিয়ে চলে এই রিকশা। বিভিন্ন ক্ষমতাবিশিষ্ট আর ওজনের সিসা ব্যাটারি থাকে এগুলোতে।বৈদ্যুতিক লাইনে লাগিয়ে চার্জ দিলে ব্যাটারি চার্জ সংগ্রহ করে রাখে। সেই চার্জ দিয়ে মোটর চলে এবং বাহনটি চলাচল করে। আমরা এই বাহনটিকে আদর করে ‘গরিবের টেসলা’ বলি। এই কথা সত্য, বিপজ্জনক বাহন। যদিও তথ্য অনুযায়ী, সড়ক পথে দুর্ঘটনার কারণ হিসাবে এই বাহনের ভূমিকা সর্বোচ্চ নয়। এই রিকশা ব্যাপকভাবে সিসা দূষণ ঘটায়। সরাসরি পরিবেশে মিশতে থাকা সিসা বর্জ্য সম্পর্কে পরিবেশবাদীরা একাধিকবার আমাদের সতর্ক করেছেন। আমরা সকলে এই বিষয়ে উদাসীন থেকেছি।

২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তৎকালীন ক্ষমতাসীন সরকারের বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ সংসদে তথ্য জানান, আমাদের দেশে ৪০ লাখ ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত রিকশা রয়েছে। তবে আড়াই বছরে সংখ্যাটি যে হারে বেড়েছে, তা কমপক্ষে ৬৫ লাখ হয়েছে বললে ভুল হবে না। ব্যাটারিচালিত রিকশা আর ইজিবাইক নিষিদ্ধ করে, পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে একটি স্বাধীন দেশের খেটে খাওয়া এতো সংখ্যক মানুষকে কি লুপ্ত করে দেয়া যায়? তারা তো দেশের সন্তান, ভোটদাতা নাগরিক। যানজটের মূল কারণ হিসেবে অনেকেই চিহ্নিত করেন, দেশের সড়ক পথে ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত ব্যক্তিগত গাড়ি। সিঙ্গাপুরের পরিস্থিতি আমরা অনেকেই জানি। সে অঞ্চলে গাড়ি কিনতে গেলে প্রথমেই একটি নম্বর সংগ্রহ করতে হয়। নম্বরের সংখ্যা যেহেতু সীমিত ফলে এখনো তারা রাস্তায় ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যায় রাশ টানতে পেরেছেন। আমাদের হয়তো আর্থসামাজিক নানা কারণেই এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা সম্ভব হয়নি। হলে ভালো হতো। উন্নত বিশ্বের যানজটের পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত হয়েছে গণপরিবহনের বিস্তৃত ব্যবহারের ফলে।

ব্যাটারি চালিত রিক্সা মানুষের নানারকম শারীরিক দুর্যোগ ঘটায়। তার ঝাঁকুনি শরীরে প্রভাব ফেলে। এমনিতেই আমাদের দেশের বেশিরভাগ রাস্তা গাড়ি চলাচলের উপযুক্ত নয়। নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহারে নানাবিধ দুর্নীতি এবং সঠিক, জনবান্ধব ব্যবস্থাপনার অভাবে কিছুদিন পরে পরেই আমাদের সড়কপথে ভিন্ন ভিন্ন আকৃতির গর্ত তৈরি হয়। জলাবদ্ধতা নিরসনে কারো কোন দৃশ্যমান উদ্যোগ না থাকায় জমে যাওয়া জল সামান্য বৃষ্টির ফলে জমে যাওয়া জল নগরে দুর্ভোগ তৈরি করে। এই সকল কারণ একপাশে সরিয়ে ব্যাটারিচালিত রিক্সা অথবা ইজিবাইক বিলুপ্ত করে দেয়া কোন কার্যকর সমাধান হতে পারে না। নারী এই রিকশায় আরো বেশি দুর্যোগের শিকার হন তাঁর প্রকৃতিদত্ত শরীরের কারণেই। পিরিয়ডকালীন, প্রসূতিকালীন সময়ের নারীদের পক্ষে ঝাঁকুনি তাঁদের শরীরে বিপর্যয় ঘটায়। নিয়ন্ত্রণ রাখা এই রিকশায় কঠিন। যেকোনো সময় ব্যাটারি চার্জ ফুরিয়ে গেলে নিয়ন্ত্রণ অচল হয়ে পড়ে। তখন দুর্ঘটনা ঘটে। আবার অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা আমাদের দেশে এক ধরনের সংকট তৈরি করে। তবে জরুরী প্রশ্ন এই, যারা এই শত শত ব্যাটারি রিকশার মালিক তাদের বিরুদ্ধে কখনোই ব্যবস্থা নেয়া হয় না। বড় বড় যেসব সংস্থা এই ব্যাটারি রিকশার আলাদা আলাদা যন্ত্রপাতি আমদানি করেন তারাও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান। প্রায় নিরন্ন রিক্সা শ্রমিকদের পুনর্বাসন ব্যতিরেকে উচ্ছেদ না করে বিকল্প কোন ব্যবস্থার আয়োজন আমাদের রাষ্ট্রের করতেই হবে। অথবা উচ্ছেদ যদি করতেই হয় তবে যারা এইসব রিকশার মালিক, যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করেন তাদেরকেও আইনের আওতায় আনতে হবে। আমাদের দেশের আর্থসামাজিক কাঠামো অনুযায়ী নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত মানুষের বেশিরভাগ সময়ই যাতায়াতের জন্য ব্যাটারি রিকশা আর ইজি বাইক ছাড়া কোন উপায় থাকে না ফলে কোন বড় ধরনের সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে আমাদের এই ব্যাপারগুলিও সংবেদনশীলতার সাথে ভেবে রাখা দরকার।

( এই রচনাটি প্রথম আলোর অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত রাফসান গালিব ও দীপু মালাকারের দুটি প্রতিবেদনের কাছে ঋণী।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সাবস্ক্রাইব

spot_img

সম্পাদকের নির্বাচিত

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

‘বার্স্ট অফ জয়’ : পুলিৎজার জয়ী ছবির শিক্ষা

ডিজিটাল ক্যামেরা ওয়ার্ল্ড অনলাইনে প্রকাশিত টম মে প্রণীত প্রতিবেদন...

নেপালের বর্ণিল গাই যাত্রা

নেপালের তিব্বত সীমান্তে রাসুয়া জেলায় ভয়াবহ এবং মর্মান্তিক হড়পা...

বাংলার ইগল: বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান

একটি জাতি কেবল তার বর্তমান দিয়ে গড়ে ওঠে না;...

সুস্থ বাংলাদেশের দিকে

মাজার থেকে নৌকা বাইচ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থেকে মুক্ত মতের...