ফুটবলঃ কিছু স্মৃতি, কিছু অনুভূতি

Share post:

Date:

আশেপাশে ছিটে ছিটে থাকা তিনতলা কি চারতলা বা পাঁচ তলা দালান। মাঝে অসংখ্য টিনের ঘর, গলি, রিকশার গ্যারাজ, অসংখ্য সবুজ গাছ। নব্বইয়ের দশকের চট্টগ্রামে আমার বেড়ে ওঠার এলাকাটা এমনই ছিল তবে সেটার একটা পরিবর্তন হয়ে যেত বিশ্বকাপ ফুটবল আসলে। সেবার বেশ ‘বড় হয়েছি’ বা বলা যায় ‘বড় হয়ে ওঠা’ চোখ মেলে জানালা দিয়ে চেয়ে দেখলাম আশপাশের সব বিল্ডিং এর ছাদে হঠাৎ শোরগোল পড়ে গেছে। আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, ইতালির যুগ। পাড়ার সব বড় ভাইরা লেগে গেছে পতাকা টাঙ্গাতে। বড় পতাকা, বেঁটে পতাকা, বাঁকা পতাকা, সোজা পতাকা, ঠিক নকশার পতাকা, বেঢপ নকশার পতাকা – ছাদে ছাদে নিজ নিজ দলের সমর্থন সচকিতভাবে জানানোর এক বেসামাল তোড়জোড়। কি করে সেসব পতাকা কেনার টাকা আসতো, কি লাভেই বা টানানো হচ্ছে, কেন যে এত হট্টগোল এই পতাকা টানানো নিয়ে সেসব অতশত আর বুঝে আসতো না। তবে পাড়ায় অনেকের আনন্দের হুল্লোড় যে ষোলআনা বেড়ে গেছে তা বেশ বোঝা যেত এই বিশ্বকাপ ফুটবল আসলেই!

সেসময়ে বেঁচে থাকা অনেক মাঠে, শহুরে দালানগুলোর সামনের উঠানে ক্রিকেট, ফুটবল, হাডুডু, কানামাছি বেশ চলতো। তবে বিশ্বকাপ ফুটবল আসলেই দেখা যেত সব ছেলেরা বল নিয়ে দৌড়াচ্ছে। ক্রিকেট কিছুটা ম্রিয়মান সে কয়টা দিন, কিছুদিনের জন্য বোধহয় আসলে ভুলে থাকাই দস্তুর। তা তো হবেই! এখন বিশ্বকাপ ফুটবলের সময় কি না! ছোট্ট আমার কিন্তু মনে হত যে মেয়েরা কেন খেলে না! আমরা কেন খেলতে পারি না ওদের সাথে? তবে বেশ মজাও লাগতো যে আশেপাশে খুব তর্ক ছোটাতো যে কে যাবে ফাইনালে? কে জিতবে কাপ? ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার পাল্লা সবসময়ই এদেশে ভারি থাকে সমর্থনের দিক থেকে সেটা সেকাল থেকেই বুঝে গেছি!

তবে, ফুটবল তেমন কিছু না বুঝলেও কোন কোন মুরুব্বিদের মজা নেয়াটাও বুঝতাম। তারা যখন বলতো বাইশ জন মানুষ মিলে এই এক বল নিয়ে কি বলের পেছনে দৌড়াদৌড়ি, হুটোপুটি – তখন ভাবতাম যে আসলেইতো এই বলের কি জাদু আছে যা নিয়ে বাইশ জন মানুষের মাঠে দৌড়াদৌড়ি দেখার জন্য এত উতলা হয়ে থাকে মানুষ! বলে পা লাগিয়ে খেলারও কত রকমফের! আর নানান সমর্থনের ঝগড়াঝাটিরও যে কি দামামা! অত ব্রাজিল আর্জেন্টিনাও পতাকা দেখে দেখে আর কত ভালো লাগে?! ইশ, বাংলাদেশ কেন খেলে না? অন্য দেশের পতাকার জায়গায় তখন বাংলাদেশের পতাকা থাকতো! কি ভালোই না লাগতো দেখতে…তবে বাস্তবতা আর চাওয়া-পাওয়ার দূরত্ব যে দশ হাতের চাইতেও যোজন যোজন বেশি সেটা বুঝিনি অপ্রাপ্তবয়স্ক মনে।

এসব চার বছর পর পরে বুঝতে বুঝতেই বড় হয়ে ওঠা। বিয়ের পরে দেখলাম আমার যাপনসঙ্গী ভীষণরকমের ফুটবলপাগল। যে বছর বিয়ে হল সে বছরেই বিশ্বকাপ ফুটবলের সেই অবিস্মরণীয় ফাইনাল – ফ্রান্স আর আর্জেন্টিনার একেবারে টান টান, মাথায় মাথায় দ্বৈরথের কথা কে আর ভুলতে পারে! সেবার চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায়। ফাইনালে আর্জেন্টিনা জিততেই আতশবাজির ফোয়ারা আর আনন্দের চিৎকার আশপাশ জুড়ে। রাতের গুম গুম নির্ঘুম প্রহরগুলো ভেঙ্গে খানখান আনন্দে আনন্দে। পাড়ায় পাড়ায় ছোটদের অনেকের জার্সি কেনা
সার্থক!

এবার কি হবে? সেমিফাইনালের আগেই এই বিশ্বকাপের ঝুড়িতে নানান রঙের
আলোচনা-সমালোচনা। এর মাঝেই গুটি গুটি পায়ে শেষের দিকে পৌঁছে গেছে ‘গ্রেটেস্ট শো অন দি আর্থ’! আর সব মিলিয়েই এই আশ্চর্য রঙ্গমঞ্চের থলেতে মজুদ কেবলমাত্র তিন খানা ম্যাচ!

সামনে আর কি কি হবে?
আরও আলোচনা-সমালোচনা?
আরও তাতিয়ে ওঠা?
নাকি তার উল্টোটা?
নতুন স্মৃতি গড়ে উঠে সামনের আরও চার বছরের জন্য থিতিয়ে পড়ার আগেই যেন খেলাগুলো আমাদের সকলকে ভীষণরকম আনন্দ দেয়। ফুটবল নামক এক অত্যাশ্চর্য খেলার পেছনে সমস্ত রাত জাগা, আবেগের অলিগলি পেরিয়ে যেন এদেশের সমর্থকদের কাছে শেষ পর্যন্ত কান্নাহাসি মিলিয়ে আনন্দই মূখ্য থাকে, আবার আমরা সকলে যেন ফুটবল বিশ্বকাপের আসর ভাঙ্গার পরে যার যার সমর্থন নিয়ে ফিরে যেতে পারি আমাদেরই আপন দেশের চিরচেনা ভীড়ে কোন বিদ্বেষ ছাড়া, কোন কটুক্তি-শ্লেষ ছাড়া।
সে-ই যেন হয়।
সেটাই যেন হয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সাবস্ক্রাইব

spot_img

সম্পাদকের নির্বাচিত

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের আমলনামা ১৯৬৬

তেইশে জুলাই, ছেষট্টি- বুয়েনোস আইরেসের টিট্রো কোলোনের সবাই একত্রিত...

ইঞ্চা: ফুটবলের পাগলা সমর্থক

মেক্সিকান লেখক হুয়ান ভিয়োরো তাঁর ‘গড ইজ রাউন্ড’ বইতে...

বৃষ্টিতে, ঠান্ডায়, অন্ধকারে

লেখা: আনহেল দি মারিয়া ভাষান্তর: রোহণ ভট্টাচার্য আমার আজও স্পষ্ট মনে...

ইরান : মার্কিনি দিগন্ত বিস্তৃত চোখে এক বিন্দু বালুকণা

আজ রবিবার বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছে ইরান। গ্রুপ পর্বের...