কাপুচিন বানরের ভাঙা সংসার

Share post:

Date:

বিজ্ঞানীদের নতুন গবেষণা আমাদের জানায়, এল নিনো আর লা নিনোর সাথে যুক্ত বড় ধরণের জলবায়ু পরিবর্তন ক্যাপুচিন বানরের দলের অরণ্যের ভেতরের বিচরণ প্রভাবিত করতে পারে। বনের সাদা মুখের ক্যাপুচিন বানরসহ বিভিন্ন উদ্ভিদ, পতঙ্গ এবং বড় প্রাণীরা এই পরিবর্তনের সাথে বেশ মানিয়ে নিয়েছে। কিন্তু লস অ্যাঞ্জেলেসের ক্যালিফোর্নিয়া
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইভোলুশনারি অ্যান্থ্রোপলজিস্ট পেরি স্বস্তি পাচ্ছিলেন না। তিনি ২০১৫ সালে এল নিনো-সাউদার্ন অসিলেশনের প্রভাবে সৃষ্ট একটি অস্বাভাবিক তীব্র খরার সময় এমন কিছু আচরণ লক্ষ্য করেছিলেন যা একসময় অসম্ভব বলে মনে হতো। সাউদার্ন অসিলেশন হলো মূলত প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব ও পশ্চিম অংশের বায়ুমণ্ডলের মধ্যে বায়ুচাপের একটি পরিবর্তন।

স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে “ক্যাপুচিন মায়েরা বেশ যত্নশীল হয়,” তিনি আমাদের জানান। “অথচ আমি দেখছিলাম বাচ্চারা মাটিতে করুণভাবে কাঁদছে।মায়েরা শুধু নিচের দিকে তাকিয়ে ” অনেক ঝামেলা’ মনে করে চলে যাচ্ছে। তাদের বাচ্চাদের ছেড়ে যাচ্ছে।
“ক্যাপুচিনদেরও তো সহ্যের একটা সীমা আছে,” পেরি যুক্ত করেন। “আমাদের এখন থেকেই মনোযোগ দেওয়া দরকার, কারণ আবহাওয়ার সমস্ত পূর্বাভাস দেখে বুঝতে পারছি আমরা আরও বেশি অনিশ্চয়তা এবং আরও চরম জলবায়ুর মুখোমুখি হতে যাচ্ছি।”

সামাজিক আচরণের অংশ হিসেবে একে অপরের মুখ স্পর্শ করছে দুটি সাদা-মুখো কাপুচিন বানর। বন্ধুত্ব, জোট ও সংঘাত—এই জটিল সম্পর্কই জলবায়ু-চাপের মুখে কাপুচিন সমাজকে আরও ভঙ্গুর করে তুলতে পারে।
ছবি: Courtesy of Susan Perry / UCLA Newsroom

বানরদের আচরণ ও কর্মকাণ্ড

ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট অব অ্যানিমেল বিহেভিয়ার প্রতিষ্ঠানের আচরণগত পরিবেশবিদ অড জ্যাকবসন ২০১৬ সালে লোমাস বারবুদালে একজন শিক্ষার্থী ছিলেন। তাঁর অবস্থানের বছরখানেক আগেই সেখানে তীব্র খরা হয়েছিল। বনের মধ্যে এই অঞ্চলের বারোটি ভিন্ন ক্যাপুচিন বানরের দল কীভাবে চলাফেরা করছে, তা বোঝার চেষ্টা করছিলেন তিনি। তারপর বর্তমানে চরম আবহাওয়া এই বানরদের আচরণ ও সামাজিক কাঠামোর ওপর আর কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে তিনি গবেষণা শুরু করেছেন। ‘নেচার ইকোলজি অ্যান্ড ইভোলিউশন’ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে জ্যাকবসন এবং তাঁর সহলেখকরা একটি বিষয় বিশ্লেষণ করেছেন। পেরিও ছিলেন তাঁদের মধ্যে। ক্যাপুচিন বানরদের তেত্রিশ বছরের জিও লোকেশন তথা ভূ-অবস্থানগত তথ্যের সাথে জলবায়ুর পরিবর্তনের সম্পর্কের ধরণ তাঁরা বোঝার চেষ্টা করছেন।

ঘূর্ণিঝড়ের কারণে চার দিনের রেকর্ড বৃষ্টিতে বিশ্বের সবচেয়ে বিরল প্রজাতির গ্রেট এইপের ৭% বিলুপ্ত হয়েছে। জলবায়ু উষ্ণ হওয়ার সাথে সাথে মেরু ভালুক মানুষের এলাকার কাছাকাছি চলে আসছে। শুধু যে ক্ষুধার্ত বা হাড্ডিসার ভালুকগুলোই আসছে, তা কিন্তু নয়। প্রায় সকলেই আসছে। উগান্ডার শিম্পাঞ্জিরা তাদের দল ভেঙে যাওয়ার পর এক মারাত্মক ‘গৃহযুদ্ধে’ লিপ্ত হয়েছে। নিজেরা নিজেরা মারামারি করছে। বিজ্ঞানীরা এখনও এর কারণ খুঁজে পাননি। বিজ্ঞানীদের প্রথম পদক্ষেপ ছিল প্রতিটি দলের আকার বা সদস্য সংখ্যা একই দলের বানরদের পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর কেমন প্রভাব ফেলছে তা বোঝা। এই কাজ করতে তারা কিছু বিষয়ের ওপর নজর রেখেছিলেন। যেমন: প্রতিদিনের ফল খাওয়ার পরিমাণ, যে রাস্তায় দলটি ঘুরে বেড়াচ্ছে তার সীমানা আর খাদ্যের খোঁজে প্রতিনিয়ত তাঁরা কতটা পথ পাড়ি দেয়।

শেষ পর্যন্ত, বানরের দলগুলো কেমন করে একে অপরের সাথে যোগাযোগ ও আচরণ করত তা বোঝার জন্য তারা একটি “হায়ারার্কিকাল সোশ্যাল রিলেশনস মডেল” (ক্ষমতাভিত্তিক সামাজিক সম্পর্ক মডেল) ব্যবহার করেছিলেন। এটি বিজ্ঞানীদের আগে থেকেই অনুমান করতে সাহায্য করেছিল, দুটি ভিন্ন বানরের দল কীভাবে বনের মধ্যে চলাফেরা করবে আর কোন কোন সুনির্দিষ্ট জায়গায় তাদের নিজস্ব এলাকার সীমানা পরস্পরের ওপর চলে আসবে।
গবেষক দলটি লোমাস বারবুডাল বনের সব বানরের দলের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ না করা পর্যন্ত এই প্রক্রিয়াটির পুনরাবৃত্তি করেছিলেন।প্রতিবারে দুটি করে বানরের দল নিয়ে। পরে ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে তাদের এলাকার সীমানার ওভারল্যাপ এবং দুটি ভিন্ন দলের ক্যাপুচিন পরস্পরের মুখোমুখি হয়ে সহিংসতায় লিপ্ত হয়, তাদের আচরণ কীভাবে পরিবর্তিত হয়, তা অনুমান করার জন্য তারা এর সাথে সময়ের সাথে জলবায়ু পরিবর্তনের তথ্যও যুক্ত করেছিলেন।

সংখ্যার শক্তি আর দুর্বলতা

আমরা জানি সাধারণত, বনে বড় বানরের দলগুলোর কিছু সুবিধাও থাকে আবার কিছু অসুবিধাও থাকে। একটি প্রধান সুবিধা হলো ফলের গাছে ভরপুর এলাকাগুলোর মতো সম্পদ-সমৃদ্ধ অঞ্চলগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষমতা। একটি প্রধান অসুবিধা হলো খাবারের জন্য দলের নিজেদের মধ্যকার প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়া। তার অর্থ প্রতিটি বানরের দৈনিক ফল খাওয়ার পরিমাণ কমে যেত। গবেষকরা দেখেছেন, জলবায়ুর এক্সট্রিম তথা চরম পরিবর্তনের সময়ে,যেমন প্রচণ্ড বর্ষা বা তীব্র খরা মৌসুমে দলের ভেতরের এই প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়ে ওঠে। ফলে পুরো দলটির খাবার খোঁজার দলগত দক্ষতা কমে যায়। জলবায়ুর পরিবর্তনের সাথে সাথে বিভিন্ন দলগুলোর নিজেদের ভেতরের আচরণও বদলে যেত। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একটি সাধারণ শুষ্ক মৌসুমে, বড় দলগুলো প্রায়শই ছোট দলগুলোকে দূরে ঠেলে দিয়ে বেশি ফল পাওয়া যায় এমন এলাকাগুলো নিজেদের দখলে নিয়ে নেয়। যেমন নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে বেশি ফল পাওয়া যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ফলে বড় দলের বানরেরা এই ধরনের সম্ভাবনাময় এলাকা নিজেদের দখলে রাখে।

‘খাদ্য না পাওয়া অথবা খাদ্য বিষয়ক ঝুঁকি এখন আর কেবল স্বল্প আয়ের দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই’: পরিবেশ অর্থনীতিবিদ আমাদের ব্যাখ্যা করেছেন কীভাবে জলবায়ু পরিবর্তন কৃষিব্যবস্থাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিচ্ছে। নতুন কিছু সূত্র ইঙ্গিত করছে, আদিম হোমো সেপিয়েন্সরা হয়তো রেইনফরেস্টে বাস করত। হয়তো এই তথ্যটি মানব বিবর্তন সম্পর্কে আমাদের প্রচলিত ধারণাকে বদলে দিতে পারে। তবে নতুন গবেষণায় গবেষকরা বুঝতে পেরেছেন, এই দীর্ঘদিনের ধারণাটি সবসময় সত্যি হয় না। চরম জলবায়ু পরিস্থিতির সময়, যেমন ধরা যাক এল নিনোর প্রভাবে শুষ্ক মৌসুম যখন আরও বেশি শুষ্ক হয়ে ওঠে, কাপুচিন বানররা উন্নত মানের অঞ্চলসমূহ দখল করে রাখার চেষ্টা করেনি।

জ্যাকবসন বলেন- ” আমরা এখনো বলতে পারিনা প্রকৃতির কোন কোন পরিবর্তনের ফলে এমনটি ঘটতে পারে।” “হয়তো এই ধরনের সম্পদ সংকট সময় প্রাকৃতিক খাদ্য বৈচিত্র্য এতখানি কমে যায় যে দখল করবার মতন তেমন কিছুই থাকে না। সেই জন্য এই বানরেরা দখলের চেষ্টাটুকু থেকে বিরত থাকে।”

গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ুর এই শঙ্কিত হওয়ার মতো অবস্থা হয়তো বানরের দলের আদর্শ আকার নির্ধারণের জন্য দরকারি ভারসাম্যকে নষ্ট করে দিচ্ছে। তাছাড়া, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে এল নিনো বা লা নিনার মতো বিপর্যয় ঘটাবার মতো জলবায়ু পরিস্থিতি যত তীব্র হচ্ছে, নানা রকমের পরিবর্তন প্রাণীদের সমাজকে কীভাবে প্রভাবিত করবে তা বোঝা ততই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

মায়ের পিঠে আঁকড়ে থাকা সাদা-মুখো কাপুচিন শাবক। দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, খরা ও অতিবৃষ্টির মতো চরম জলবায়ু পরিস্থিতি কাপুচিন বানরের খাদ্যসংগ্রহ, চলাফেরা এবং মা-শিশুসহ দলগত সম্পর্কের ওপর চাপ তৈরি করছে।
ছবি: Courtesy of Susan Perry, PhD / Southwest Jaguars

মেক্সিকোর ইউনিভার্সিদাদ ভেরাক্রুজানার একজন বিহেভিয়ার সায়েন্টিস্ট ফিলিপ্পো অরেলি এই গবেষণার সাথে যুক্ত ছিলেন না। তবে তিনি মেক্সিকোতে স্পাইডার মাঙ্কির ওপর চরম আবহাওয়ার প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি ২০১৫ সালে, খরা চলাকালীন কোস্টারিকার শুষ্ক ক্রান্তীয় বনে কাপুচিন এবং স্পাইডার মাঙ্কির শিশু মৃত্যুর হারও নথিবদ্ধ করেছিলেন। সেই চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কাপুচিন বানরদের মধ্যে শিশু মৃত্যুর হার অনেক বেশি ছিল। অথচ বিস্ময়ের হল, স্পাইডার মাঙ্কিরা সাময়িকভাবে বংশবৃদ্ধি বন্ধ করে দিয়েছিল।
কাপুচিন বানররা এক উদ্ভট ও প্রাণঘাতী অভ্যাসের বশে নবজাতক হাউলার বানরদের অপহরণ করা শুরু করেছে। স্বজাতীয় প্রাণী খাওয়ার মতো লোমহর্ষক কাণ্ড করতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়েছিল এই সুন্দর দেখতে বানররা। “জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আরও ঘন ঘন এবং তীব্র হবে প্রাণীদের এমন সব আচরণ,” অরেলি বলেন। “এবং আমরা জানি না ভবিষ্যতে কী ঘটতে যাচ্ছে। এই সময় পর্যন্ত স্পাইডার মাঙ্কিরা খুব ভালোভাবে বেঁচে বর্তে রয়েছে। কিন্তু তারা আর কতদিন পারবে তা আমরা জানি না।”

পেরি এই কথার সাথে একমত পোষণ করেন। তিনি আমাদের তথ্য দেন, এল নিনোর কারণে সৃষ্ট খরার মতো বিরল ঘটনাগুলো নিয়ে গবেষণার সময় প্রাথমিক ভিত্তি বা স্বাভাবিক অবস্থার পরিমাপ থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

“আমরা জানি স্বাভাবিক অবস্থা কেমন হয়,” তিনি ব্যাখ্যা করেন। “পুরো পৃথিবী জুড়ে আমরা এখন যে বিপর্যয় বা বিশৃঙ্খলা টের পেতে শুরু করেছি, আপনি যদি হুট করে তার মধ্যে প্রবেশ করে গবেষণা শুরু করতে চান, তবে আপনি আসলে আগামাথা কিছুই টের পাবেন না। আপনাকে আগেই পুরো পরিস্থিতির একটা প্রাথমিক চিত্র নিজের সামনে উপস্থিত করতে হবে কেবলমাত্র তখনই আপনি তুলনামূলক একটা গবেষণার ফলাফল আশা করতে পারেন। “

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সাবস্ক্রাইব

spot_img

সম্পাদকের নির্বাচিত

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

হিমালয়ের হাসি মুখ মাকড়সা

স্পাইডার ম্যান ফ্র‍্যাঞ্চাইজির নতুন ফিল্ম আসছে। অ্যা ব্র‍্যান্ড নিউ...

ধেয়ে আসছে এল নিনো!

পৃথিবীর পরিবেশ সচেতন বিজ্ঞানীরা প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর নিবিড় নজর...

প্রজাপতি, প্রজাপতি : ব্ল্যাক হেয়ারস্ট্রিক

সারে কাউন্টির একজন প্যাশনেট প্রজাপতি গবেষক আমাদের জানিয়েছেন কেমন...

সেন্ট মার্টিন্সের বিস্ময়কর প্রাণী অয়েস্টারের না-বলা কথা

বাংলাদেশের একমাত্র কোরাল সমৃদ্ধ দ্বীপ সেন্ট মার্টিন্সের স্বচ্ছ নীল...