ভবিষ্যতের কথা বলতে পারা পল দ্য অক্টোপাসের কথা মনে আছে প্রিয় পাঠক? ২০১০ সালের বিশ্বকাপে যখন পল দ্য অক্টোপাস জার্মানির সব ম্যাচের ফলাফল একদম ঠিকঠাক অনুমান করতে পেরেছিল, তখন আমাদের ফুটবল আগ্রহীরা তাকে এক অসামান্য জ্যোতিষী হিসাবে গ্রহণ করেছিল। মন যখন দুর্বল থাকে, আমরা চাই আমাদের মনের কথা, প্রিয় দলটি জেতবার সম্ভাবনার কথা কেউ একজন আগেই জানিয়ে দিক।
জার্মান অর্থনীতিবিদ জোয়াকিম ক্লেমেন্ট একটি বহুস্তরীয় পূর্বাভাস মডেলের মাধ্যমে পলকেও ছাড়িয়ে গেছেন। এই মডেল অর্থাৎ পরিকল্পিত ছকটি গত তিন বিশ্বকাপের প্রত্যেক বিজয়ীর নাম শত ভাগ সঠিকভাবে অনুমান করার রেকর্ড বজায় রেখেছে। যদি আসন্ন জুলাই মাসে নেদারল্যান্ডস অসামান্য দলগত নৈপুণ্যের স্মারক বিশ্বকাপ ট্রফিটি নিজেদের করে নিতে পারে, তবে ক্লেমেন্টের পরিসংখ্যানগত পূর্বাভাসের সফল হওয়া চতুর্থ বিজয়ী দল হবে তারা।
বিজয়ী নির্বাচন করবার পাশাপাশি, তাঁর এই মডেলটি ৪৮ দলের পুরো টুর্নামেন্টের একটি বিশদ চিত্র তুলে ধরেছে। তার মধ্যে রয়েছে দ্বিতীয় রাউন্ডে ব্রাজিলের বিরুদ্ধে জাপানের একটি চমকপ্রদ জয় এবং একই রাউন্ডে দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে স্কটল্যান্ডের বিদায় নেওয়ার মতো আশ্চর্য ঘটনা।
২০০৬ সালের পর দুই দশক পেরিয়ে গেছে। এবার পর্তুগালের হাতে আবারও বাদ পড়ার সম্ভাবনা থাকলেও, ইংল্যান্ডের সেমিফাইনালে ওঠার কথা।অবশ্য এই মডেলটি ‘আবারও পেনাল্টি’ হওয়ার মতো কোনো ভবিষ্যৎবাণী করেনি।
যুক্তরাজ্যে দশ বছর ধরে থাকছেন তিনি ৷ নিজেকে নৈরাশ্যবাদী বলে দাবি করেন এই অর্থনীতিবিদ। তিনি জোয়াকিম ক্লেমেন্ট। তাঁর কাছে, এই গবেষণার উদ্দেশ্য কখনই কাউকে মনে শান্তি বা কষ্ট দেয়া ছিল না। অথবা, বাজি ধরে বড় অঙ্কের টাকা জেতা ছিল না। তিনি ফলাফলের পূর্বাভাস দেওয়ার চেষ্টা করাটা যে অযৌক্তিক এই কথাটিই প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন।
ক্লেমেন্ট বলেন, ” বিশ্ববাসীকে ইকোনোমিস্টদের অহংকার দেখানোর একটি প্রয়াস হিসেবে শুরু হয়েছিল এই কাজটা। তাঁদের ধারণা, এমন সব বিষয়ের পূর্বাভাস দিতে পারেন তাঁরা যা সম্পর্কে আসলে নিজেদের কোনো ধারণাই নেই। এখন সময়টাই এত অদ্ভুত রকমের যে দু একটি ভবিষ্যৎবাণী সঠিক হয়ে গেলে মানুষ আপনাকে এক ধরনের গুরু ভাবা শুরু করবে।”
ক্লেমেন্টের প্রথম ভবিষ্যৎবাণীটি সত্যি হয়েছিল যখন তাঁর নিজের দেশ জার্মানি ২০১৪ বিশ্বকাপ জয় করে। পরে ক্লেমেন্ট ভেবেছিলেন, ২০১৮ সালে আবারও এই হিসাব-নিকাশ করলে ঝড়ে বক মারা যাওয়ার ঘটনা প্রকাশ পেয়ে যাবে। কেননা, কাকতাল বারবার ঘটে না। কিন্তু তিনি ২০১৮ সালে ফ্রান্সকে নিয়ে এবং পরবর্তীতে ২০২২ সালে আর্জেন্টিনাকে নিয়েও সঠিক ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন। তিনি বলেন, “আমি টানা তিনবার সঠিক প্রমাণিত হয়েছি বলে মানুষ এখন ভাবছে এই মডেলটি ত্রুটিমুক্ত এবং স্বাভাবিকভাবেই সামনের বারও আমাকে ঠিকঠাক বলতেই হবে।”
আমরা সবাই জানি, বিশ্বকাপের সাফল্য আংশিকভাবে কিছু চেনা “পদ্ধতিগত” বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। যেমন—দেশের জনসংখ্যা, সম্পদ, জলবায়ু এবং ফিফা বিশ্ব র্যাংকিং। তবে ক্লেমেন্ট তাঁর প্রতি চার বছর পর পর দেওয়া পূর্বাভাসের পাঠকদেরঅনুরোধ করেছেন এর বিষয়বস্তুকে পুরোপুরি অন্ধভাবে বিশ্বাস না করতে, জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও। কারণ এই বিষয়গুলো কেবল পুরো গল্পের টুকরো মাত্র। তিনি আরও যুক্ত করেন, “বাকি ৫০% হলো ভাগ্য।”
“প্রতিটি খেলাই অত্যন্ত উঁচু মানের। বিশেষ করে, এমন টুর্নামেন্টে আমরা প্রতি দিন এমন বড় মাপের দলগুলোকে একে অপরের বিরুদ্ধে খেলতে দেখি যাদের দক্ষতা এবং যোগ্যতা প্রায় সমান। এসব আসলে সম্পূর্ণ নির্ভর করে নির্দিষ্ট দিনের নির্দিষ্ট খেলোয়াড়ের ফর্ম, রেফারির একেকটি সিদ্ধান্তের ওপর। দক্ষতার সাথে গোল করার চেষ্টা হলেও সেই চেষ্টা গোলপোস্টের বারে লেগে ফিরে এলে কিছুই করার থাকে না। এই ধরনের বিষয়গুলো সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত।”
প্রতিবার টুর্নামেন্ট ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে, এই অর্থনীতিবিদের তৈরি করা মডেলটি তাঁর দৈনন্দিন কাজের ক্লান্তি থেকে একটি চমৎকার স্বস্তি দেয়। “বিশেষ করে যখন চারদিকে এত সংকট, যুদ্ধ এবং নানা বিপন্ন বোধ করবার মতো ঘটনা ঘটছে, তখন এমন মডেল তৈরি করবার চেষ্টা আমাকে আনন্দ দেয়। আমার বিশ্বাস পাঠকদেরও ভালো লাগবে। এই চেষ্টা বিশ্বজুড়ে ঘটে চলা সমস্ত খারাপ পরিস্থিতি থেকে মানুষের মনকে কিছুটা হলেও অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেবে।” তবে প্রতিটি সঠিক পূর্বাভাসের সাথে সাথে ক্লেমেন্টের ওপর প্রত্যাশার চাপও বাড়ছে। তিনি ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক ‘প্যানমিউর লিবারাম’-এ একজন স্ট্র্যাটেজিস্ট হিসেবে কাজ করেন। অফিসে ক্লেমেন্টকে তাঁর সহকর্মী অর্থনীতিবিদদের বিভিন্ন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। যেমন, ডাচ টটেনহ্যাম মিডফিল্ডার জাভি সিমন্সের এসিএল ইনজুরি অর্থাৎ হাঁটুর সমস্যা এই মডেলে কীরকম প্রভাব ফেলবে?
তাই তাঁর পূর্বাভাসের নির্ভুলতা নিয়ে অনেক ধরণের সতর্কতা বা সংশয় থাকার পরেও তিনি বেশ আনন্দ নিয়েই বিশ্বকাপের সবগুলো খেলা উপভোগ করবেন।
তিনি সংবাদ মাধ্যমকে জানান, “আমার বেশ কয়েকজন সহকর্মী আছেন যারা আমার ওই বক্তব্য প্রকাশের পর নেদারল্যান্ডসের পক্ষে কিছু টাকা বাজি ধরেছেন। নেদারল্যান্ডস যদি বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়ে যায়, তবে আমার মনে হয় পরের দিন থেকে আমাকে ঘরে ঢুকে যেতে হবে। হোম অফিস করা ছাড়া উপায় থাকবে না।”


