মোশাররফ হোসেন সাগর। বাড়ি মুন্সিগঞ্জে। গ্রাম দক্ষিণ চরমসুর। পিতা মোঃ কুদ্দুস আলী। মাতা মোরশেদা বেগম। চার ভাই বোন। সাধারণ কর্মজীবন থেকে শুরু করে আজ তিনি হয়ে উঠেছেন গভীর সমুদ্রের এক সাহসী অভিযাত্রী।অদম্য ইচ্ছাশক্তি, কঠোর পরিশ্রম এবং সমুদ্রের প্রতি গভীর ভালোবাসাই তাকে পৌঁছে দিয়েছে এক অনন্য উচ্চতায়।

স্বপ্ন জয়ের নেশা মানুষকে কত দূরে নিয়ে যেতে পারে, তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত মোশাররফ হোসেন সাগর। পৈত্রিক ভিটেমাটি ছেড়ে ভাগ্যের অন্বেষণে পাড়ি জমিয়েছিলেন নীল জলের দেশ মালদ্বীপে। সেখানে একটি স্কুবা সেন্টারে সাধারণ কর্মী হিসেবে কাজ শুরু করলেও, সমুদ্রের অতল গভীরের অজানা জগত তাকে ডাক দিচ্ছিল বারবার। সেই গভীর আহ্বান আর অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে সম্বল করেই সাগর আজ মালদ্বীপের গহীন সমুদ্রে বাংলাদেশের এক গর্বিত প্রতিনিধি।
মালদ্বীপের স্বচ্ছ নীল জলরাশির নিচে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেছেন সাগর। দীর্ঘ সাধনা আর কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি অর্জন করেছেন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত PADI ডাইভমাস্টার হওয়ার গৌরব। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি বাংলাদেশের সর্বকনিষ্ঠ পিএডিআই (PADI) ডাইভমাস্টারদের একজন যিনি মালদ্বীপে ইয়টে ডাইভমাস্টার হিসাবে কর্মরত । এখানেই থেমে নেই তার পথচলা। তিনি মালদ্বীপে কোরাল সংরক্ষণ নিয়ে ট্রেনিং করে নিজেকে সমৃদ্ধ করছেন। আর ডাইভ ইন্সট্রাক্টর হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন।
বর্তমানে মোশাররফ কর্মরত আছেন মালদ্বীপের বিলাসবহুল ‘Iruvai Liveaboard’ ইয়টে। যেখানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আসা অভিজ্ঞ স্কুবা ডাইভাররা রোমাঞ্চের সন্ধানে জড়ো হন। আর এই আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে গভীর সমুদ্রের রহস্যময় পথে ভিনদেশি ডাইভারদের পথপ্রদর্শক (গাইড) হিসেবে ইন্সট্রাক্টরদের সাথে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বাংলাদেশের এই তরুণ। তার পেশাদারিত্ব এবং দক্ষতার মাধ্যমে তিনি বিদেশের মাটিতে দেশের মেধা ও সক্ষমতার পরিচয় দিচ্ছেন।

বিদেশের সাগরে ডাইভিং করলেও সাগরের মন পড়ে থাকে জন্মভূমি বাংলাদেশে। প্রবাসের ব্যস্ততার মাঝেও দেশের সমুদ্র এবং ডাইভিং শিল্পকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরার স্বপ্ন দেখেন তিনি। তার ইচ্ছে, অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের সমুদ্র পর্যটন এবং ডাইভিং খাতকে আরও সমৃদ্ধ করা। এটি কেবল একটি পেশাগত লক্ষ্য নয়, বরং দেশের প্রতি তার গভীর মমত্ববোধেরই বহিঃপ্রকাশ।
মালদ্বীপে বর্তমানে অনেক অভিজ্ঞ বাংলাদেশি ডাইভমাস্টার ও ইন্সট্রাক্টর সুনামের সাথে কাজ করে বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকাকে গর্বিত করছেন। সাগর তাদেরই একজন হয়ে প্রবাসে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছেন।
ভৌগোলিক দূরত্ব যে স্বপ্ন পূরণের বাধা হতে পারে না, মোশাররফ হোসেন সাগর তা প্রমাণ করেছেন।
সমুদ্রের নীল জগত থেকে বাংলাদেশের এই নির্ভীক তরুণের আগামীর পথচলা আরও বর্ণিল হোক—সেই কামনাই আমাদের। মালদ্বীপের নীল জলরাশির নিচে যে জগতটি মোশাররফ হোসেন সাগর প্রতিদিন দেখেন, তা কোনো রূপকথার চেয়ে কম নয়। ‘Iruvai Liveaboard’-এর ডাইভমাস্টার হিসেবে তার যাত্রা শুরু হয় দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় অ্যাটলগুলো থেকে শুরু করে সুদূর দক্ষিণের গহীন সমুদ্র পর্যন্ত।
মালদ্বীপের ২৬টি অ্যাটলের মধ্যে ‘ইরুবাই লাইভঅ্যাবোর্ড’ সাধারণত মেইল অ্যাটল (Male Atoll), আরি অ্যাটল (Ari Atoll) এবং দক্ষিণের ফুভাহমুলাহ (Fuvahmulah) ও আড্ডু অ্যাটল (Addu Atoll) কভার করে। প্রতিটি ডাইভে সাগরকে পাড়ি দিতে হয় এক একটি নতুন রহস্যের পথে। কখনো শান্ত নীল জল, আবার কখনো সমুদ্রের প্রবল স্রোতের সাথে যুদ্ধ করে ডাইভারদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যান তিনি।
সাগরের অভিজ্ঞতায় সবচেয়ে রোমাঞ্চকর মুহূর্ত হলো টাইগার শার্ক (Tiger Shark)-এর মুখোমুখি হওয়া। বিশেষ করে তখন ডাইভারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সেই ভয়ংকর সুন্দর মুহূর্তকে ফ্রেমবন্দি করা এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। এছাড়াও নীল জলে যখন শত শত শার্কের ঝাঁক একসাথে বিচরণ করে, তখন সমুদ্রতল হয়ে ওঠে এক জীবন্ত রণক্ষেত্র। সমুদ্রের নিচে যখন মান্টা রে (Manta Ray) বা ঈগল রে (Eagle Ray) তাদের বিশাল পাখনা মেলে ভেসে বেড়ায়, তখন মনে হয় বিশাল কোনো পাখি জলের নিচে উড়ছে। সাগরের ভাষায়, “এটি এমন এক দৃশ্য যা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব।” বিশেষ করে স্টিংরে-র বিশাল ঝাঁক যখন সমুদ্রের বালুকাময় তলে বিশ্রাম নেয় বা একসাথে চলতে শুরু করে, তখন এক অপার্থিব সৌন্দর্যের সৃষ্টি হয়। সাগরের বৃহত্তম প্রাণী হোয়েল শার্ক (Whale Shark)-এর সাথে সাঁতার কাটা সাগরের প্রাত্যহিক কাজের অংশ। বিশাল এই প্রাণীর পাশে নিজেকে খুব ক্ষুদ্র মনে হলেও, এক গভীর মিতালী তৈরি হয় তাদের সাথে। এর পাশাপাশি টুনা, ব্যরাকুডা বা ট্রেভালি মাছের বিশাল বিশাল ঝাঁক যখন টর্নেডোর মতো চারপাশ দিয়ে ঘুরে বেড়ায়, তখন ডাইভাররা হারিয়ে যান এক অন্য ভুবনে। লাইভঅ্যাবোর্ডে যাত্রাপথে প্রায়ই সঙ্গী হয় ডলফিনের ঝাঁক। বোটের একদম পাশ দিয়ে তাদের লাফিয়ে চলা কিংবা ডাইভিংয়ের সময় দূর থেকে তাদের শিস দেওয়ার শব্দ শোনা এক অদ্ভুত প্রশান্তি দেয়। সাগরের কাছে এই প্রতিটি মুহূর্তই হলো প্রকৃতির এক একটি আশীর্বাদ। সাগর আরো জানান মালদ্বীপের সমুদ্রতলে লুকিয়ে আছে অসংখ্য প্রাচীন জাহাজ। কয়েক দশক ধরে পানির নিচে পড়ে থাকা এই জাহাজগুলো এখন সামুদ্রিক প্রাণীদের অভয়ারণ্য। জাহাজের মাস্তুল ও কেবিন জুড়ে এখন রঙিন কোরালের বসবাস।জাহাজের ভাঙা অংশ দিয়ে যখন সূর্যের আলো তেরছাভাবে ভেতরে ঢোকে, তখন এক অপার্থিব পরিবেশ তৈরি হয়। সাগরের ভাষায়, “একটি ডুবন্ত জাহাজের ভেতরে ডাইভ করা মানে হলো ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখা। জাহাজের খোলে যখন বড় বড় মোরে ইল (Moray Eel) বা লায়নফিশ বাসা বাঁধে, তখন মনে হয় সময় সেখানে থমকে আছে।”

সূর্য ডোবার পর সমুদ্র যখন শান্ত হয়ে আসে, তখন শুরু হয় সাগরের আসল রোমাঞ্চ— নাইট ডাইভ। দিনের বেলা যে সমুদ্র শান্ত থাকে, রাত বাড়লে সেখানেই শুরু হয় জীবন সংগ্রামের অন্য লড়াই।টর্চের আলোয় নীল জগত: পানির নিচে টর্চের আলো ফেলতেই দেখা যায় অদ্ভুত সব দৃশ্য। দিনের বেলা যেসব মাছ গর্তে লুকিয়ে থাকে, তারা শিকারে বের হয় রাতে।
বায়োলুমিনেসেন্স: মাঝেমধ্যে সাগরতলে দেখা যায় ‘বায়োলুমিনেসেন্স’ বা প্রাকৃতিকভাবে জ্বলতে থাকা অণুজীবের মেলা। পানির নিচে নড়াচড়া করলেই চারপাশটা জোনাকির মতো নীল আলোয় জ্বলে ওঠে, যা এই যাত্রাকে করে তোলে স্বপ্নের মতো।
একজন ডাইভমাস্টার হিসেবে মোশাররফ হোসেন সাগর শুধু পর্যটকদের পথ দেখান না, তিনি প্রতিদিন প্রকৃতির এই বিশালতা ও রহস্যের মুখোমুখি হন। হুলুমালের শার্ক পয়েন্ট থেকে শুরু করে গভীর সমুদ্রের অন্ধকার জাহাজ পর্যন্ত—প্রতিটি অভিযানে তিনি বয়ে চলেন বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা। প্রবাসের এই কঠিন অথচ রোমাঞ্চকর জীবনে তিনি এখন এক নির্ভীক নাম। মোশাররফ হোসেন সাগর এই নীল দুনিয়ার রহস্য প্রতিদিন পাঠোদ্ধার করেন এবং বিদেশের মাটিতে প্রমাণ করেন যে, বাংলাদেশের তরুণরা গভীর সমুদ্র জয় করতে জানে। এই রোমাঞ্চকর জীবনই তাকে করেছে অনন্য।


