ওয়াইল্ডফ্লাওয়ারিং : বুনো ফুল যেভাবে ফোটে

Date:

বেশিরভাগ সময় আমাদের জীবনের প্রেম ভালবাসার যে সাংস্কৃতিক তাৎপর্য তা মূলত একটি উদ্দেশ্য ঘুরে আবর্তিত হয়। উদ্দেশ্যটি খুব সামান্য- সঠিক মনের মানুষকে খুঁজে পাওয়া। পৃথিবীর সকল যুগেই সম্পর্কে জড়ানো, সেই সম্পর্ককে নাম দেয়া, কোন একটা নামে সেই সম্পর্ককে চিহ্নিত করা এবং সম্পর্কের একটা প্রচলিত ধারা বা টাইমলাইন মেনে চলবার একটা অলিখিত রীতি চালু ছিল। প্রায় সময় এই ধরনের ঘটনা ঘটতো ব্যক্তির মনের ইচ্ছাকে এক পাশে সরিয়ে রেখে। এখন জেনজি প্রজন্ম এই চিরচেনা গল্পকে পাল্টে দিয়েছে। অনলাইনে ইদানীং নতুন যে ডেটিং ট্রেন্ডটি নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে, তা হলো “ওয়াইল্ডফ্লাওয়ারিং” (wildflowering)।

 এই দশকের অন্যান্য ভাইরাল ডেটিং শব্দের তুলনায় শব্দটি বেশ ইতিবাচক এবং চমৎকার। সম্পর্কের কোনো নির্দিষ্ট বা এক পক্ষের চাপিয়ে দেওয়া রাস্তা ধরে হাঁটার বদলে, ওয়াইল্ডফ্লাওয়ারিং মূলত মানুষকে নিজের এবং নিজের সঙ্গীর জন্য যা সবচেয়ে ভালো মনে হয়, তাতেই মনোযোগ দিতে উৎসাহিত করে। এর মূল কথা হলো—বাইরের কোনো সামাজিক রীতনীতির বাধ্যতা বা সময়ের চাপ ছাড়াই নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করা এবং আপনি আসলে কী চান তা বুঝে নেওয়া।

সহজ কথায়, ওয়াইল্ড ফ্লাওয়ারিং ধারণাটি “ডিটিআর” (DTR – defining the relationship বা সম্পর্কের সংজ্ঞা নির্ধারণ করা) ধারণার সম্পূর্ণ উল্টো। কোনো ছকে আঁটা রুটিন বা চরম সিদ্ধান্তের পেছনে না ছুটে, একজন মানুষ শুধু দেখতে চান সম্পর্কটি কোন দিকে যাচ্ছে এবং এই বিষয়টিকে তার নিজের গতিতে স্বাভাবিকভাবে এগোতে দেন।

আজকের দিনে ডেটিং করা এবং সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা যেখানে বেশ কিছুটা ক্লান্তিকর বা মানসিক চাপের কারণ হতে পারে, সেখানে ওয়াইল্ডফ্লাওয়ারিং প্রেমের মধ্যে এক দারুণ আরামের স্পাইসি পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। অবশ্য, নতুন এই ধারণা কিছু বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

ওয়াইল্ডফ্লাওয়ারিং (Wildflowering) কী

মূল ভাবনাটি বুনো ফুলের মতো, যা মাঠে-ঘাটে (এমনকি সিমেন্টের ফাটলেও) মানুষের প্রায় কোন রকম হস্তক্ষেপ ছাড়াই প্রাকৃতিকভাবে ফুটে ওঠে। ডেটিং বা সম্পর্কের ক্ষেত্রে ওয়াইল্ডফ্লাওয়ারিং বলতে বোঝায়—কঠিন বা বাঁধাধরা আকাঙ্ক্ষাগুলো ছেড়ে দেওয়া এবং অন্য কারও সাথে নিজের জীবন ভাগ করে নেওয়ার পাশাপাশি নিজের স্বতন্ত্র সত্তাকেও ধরে রাখা।

তার মানে এই নয় যে কেউ এনগেজমেন্ট বা বিয়ের বিরোধী। তার বদলে, এই ধারণাটির উদ্দেশ্য হলো সম্পর্কের ক্ষেত্রে অন্যদের সাথে তাল মিলিয়ে চলার মানসিক  চাপ বা রূপকথার মতো রোমাঞ্চ কাহিনির প্রত্যাশার পেছনে ছোটার মানসিকতা থেকে দূরে থাকা। এর পরিবর্তে এমন একটি অংশীদারিমূলক সম্পর্ক গড়ে তোলা, যা নিজস্ব সুবিধাজনক গতিতে বিকশিত হয়। এই ধরনের সম্পর্কের ভিত্তি থাকে প্রকৃত আনন্দ ও আত্মিক যোগাযোগ। ওয়াইল্ডফ্লাওয়ারিং আমাদের সম্পর্কের নির্দিষ্ট সময়সীমা, নামকরণ এবং সামাজিক চাপ থেকে মুক্ত হওয়ার ব্যবস্থা করে দেয়।  তার ফলে মানুষ কোন ধরনের মানসিক চাপ ছাড়াই একটি সম্পর্ক চালিয়ে যেতে পারে এবং সম্পর্কের টিকে থাকার সম্ভাবনা বেড়ে যায় কেননা তখন এতে কোন বাধ্যবাধকতা থাকে না।

ওয়াইল্ডফ্লাওয়ারিংএর নানা অসুবিধা

ওয়াইল্ডফ্লাওয়ারিং শুনতে যতটা সুবিধাজনক এবং সহজ মনে হয়, এর কিছু নেতিবাচক দিকও রয়েছে।এটি নিশ্চিতভাবেই সবার জন্য নয়।

অনেকে যুক্তি দেন, এমন একটি ধারণা সম্পর্কের উন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় সত্য প্রকাশের সাহস  এবং নিজের দুর্বলতা প্রকাশের ভয়কে এড়িয়ে যাওয়ার এক অজুহাত হয়ে উঠতে পারে। ওয়াইল্ডফ্লাওয়ারিং কেবল তখনই কাজ করে যখন এটি আত্মসচেতনতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে, এড়িয়ে যাওয়ার মানসিকতা থেকে নয়।

সম্পর্কের কোনো নাম বা নির্দিষ্ট সময়সীমা এড়িয়ে চলার আরেকটি অসুবিধা হলো, যে কেউই নিজের মানদণ্ডের ব্যাপারে অতিরিক্ত শিথিল হয়ে যেতে পারেন, এমন এক পরিস্থিতিতে পড়তে পারেন যা মানুষটি কখনোই চাননি, অথবা সঙ্গীর সাথে সম্পর্কের উন্নয়ন না ঘটিয়ে কেবল অলসভাবে সময় পার করতে পারেন।

‘সাইকোলজি টুডে’-এর মতে, কেউ যদি সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে, এড়িয়ে চলার স্বভাবের হন, অথবা ভুল সম্পর্কে খুব দীর্ঘ সময় ধরে থাকার প্রবণতা থাকে, তবে ওয়াইল্ডফ্লাওয়ারিং তার জন্য সঠিক পদ্ধতি নাও হতে পারে। খোলামেলা যোগাযোগ না থাকলে, গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা এড়িয়ে যাওয়ার এক সহজ রাস্তা হতে পারে এই জাতীয় সম্পর্ক।

অন্যদিকে, কেউ যদি সম্পর্কটি কোন দিকে যাচ্ছে সে সম্পর্কে এখনই উত্তর পেতে উত্তেজিত ও আগ্রহী থাকে, তবে ওয়াইল্ডফ্লাওয়ারিং তাকে কিছুটা ধীরস্থির হতে আর কোনো জোর খাটিয়ে তৈরি করা ফলাফল ছাড়াই সম্পর্কটিকে নিজের গতিতে বিকশিত হতে উৎসাহিত করতে পারে।

ফুলের মত ফোটা

ডেটিং করা এক রকম চেকলিস্ট বা নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর প্রতিযোগিতা হিসেবে না দেখে, ওয়াইল্ডফ্লাওয়ারিং মানুষকে নিজস্ব গতিতে সম্পর্ক ও আত্মিক বন্ধন গড়ে তোলার দিকে মনোনিবেশ করতে উৎসাহিত করে। সম্পর্কের সময়সীমা বা নাম দেওয়া সহজাতভাবেই খারাপ। এটা শেখার আসল বিষয় নয়। আসল বিষয়টি হলো, বাইরের প্রত্যাশা পূরণ করার চেয়ে আসল মনের মানুষের সাথে প্রকৃত তৃপ্তি পাওয়া অর্থাৎ সম্পর্কটিকে তার নিজস্ব ছন্দে চলতে দেওয়া শেষ পর্যন্ত বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অন্য কথায়, সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর সম্পর্কগুলো পরস্পরের নিজেদের শর্তে, যা খাঁটি মনে হয় তার ওপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Share post:

সাবস্ক্রাইব

spot_img

সম্পাদকের নির্বাচিত

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

স্ত্রীর চোখে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়

মানব চক্রবর্তী: কত বছর বয়সে আপনার বিবাহ হয়েছিলো? কমলা বন্দ্যোপাধ্যায়:...

খনিয়াদিঘী মসজিদের কথা

https://youtu.be/D9lqBVlUNxw বাংলাদেশের প্রাচীন মসজিদগুলোর একটি হলো খনিয়া দীঘি মসজিদ। এই...

শিলাইদহঃ প্রসঙ্গ রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, রবীন্দ্র একাডেমী ও পর্যটন কেন্দ্র

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী কুষ্টিয়া। তাঁর প্রাণকেন্দ্র কুমারখালী। কুমারখালী নামের...

নিরাপদ জীবন অদেখা ভূবন

অদেখা পথে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তই বদলে দেয় জীবন ও...