পৃথিবীর সকল ভাষার গায়ে রক্ত লেগে আছে, আছে কান্না আর কাঁটাতার, সীমান্তচিহ্ন; বাংলা ভাষায় কিছু বেশি। যে মানুষটি এক সকালে আবিষ্কার করেন, তাঁর ভিটে ও তুলসীতলা কিংবা প্রতিদিন নামাজ পড়বার মসজিদ ও থাকবার জায়গা আলাদা দু’টি দেশের মানচিত্রের অন্তর্গত হয়ে পড়েছে এক অকস্মাৎ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে, তাঁর বেদনার উপশম নেই ৷ আরও কিছু আগে যদি ঘুরে আসি, দেখা যাবে, ব্রিটিশ শাসনে ১৭৫৭ থেকে ১৮৩৮ অবধি ছিয়াত্তরের মন্বন্তরসহ ভারতবর্ষে ১৩টি দুর্ভিক্ষে আনুমানিক দুই কোটির বেশি নরনারীর মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। ১৯৪৩ সালে বাংলায় খেতে না পেয়ে ৩৫ লাখ (মতান্তরে ৭০ লাখ) মানুষ মারা গেলেন। এই ঘটনাটি পুঁজির পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বললেও কম বলা হয়। এই ঘটনাগুলো দেশভাগের আগে নিরন্ন মানুষের ব্রিটিশ শাসক কর্তৃক হত্যার খতিয়ান। আরেকটু ভালো করে বাঁচবে বলে মানুষ পরিযায়ী পাখির মতন উড়ে যায়, কেউ জমিজমা বিক্রি করে অন্য দেশে পাড়ি জমান স্বেচ্ছায়, রাষ্ট্রীয় কারণে মানুষ যখন বাধ্যত দেশ ছাড়ে তাকে কে সান্ত্বনা দেবে ! সাতচল্লিশের আগে পরে নানা সময় মানুষ, বাধ্যত দেশ ছেড়ে চলে গেছেন ৷ আমাদের শিল্পে দেশভাগের আঁচ পড়েছে। অসংখ্য মানুষ নামহীন, নিরুপায় ইতিহাসের চোরাঘূর্ণিতে হারিয়ে গিয়েছেন। বাংলাদেশের সবুজ গ্রামে বড়ো আকারের দীঘি, জমি, বসতভিটে নিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম বসবাস করা মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে শরণার্থী ও মানুষের করুণার পাত্র এমন সংখ্যাতীত গল্প আমাদের জানা। আমরা বাংলা অভিধানের ঋষি হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সূত্রে এও জানি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে শরণার্থী শব্দটি ছিলো না। মানসিক চাপে কেউ ভারসাম্য হারিয়েছেন, পথযাত্রার ধকলে পথেই শেষ নিঃশ্বাস পড়েছে কারোর। আবার কোনো কোনো মানুষ বিশিষ্ট হয়ে উঠেছেন। মারী, জরা, দেশভাগের ক্ষত এসব অতিক্রম করে লেখার আর যাপনের জোরে, যাপনের ক্ষমতায় নিজের চিহ্ন রেখে গিয়েছেন বাংলা ভাষার সাহিত্যে।
জীবনানন্দ দাশের আদি নিবাস ঢাকা জেলার বিক্রমপুর পরগনার অন্তর্গত পদ্মাতীরবর্তী গ্রাম গাউপাড়া। জীবনানন্দ দাশের পূর্বপুরুষরা বিক্রমপুরে মুনশি পরিবার হিসেবে খ্যাত ও সম্মানিত ছিলেন। জীবনানন্দের পিতামহ সর্বানন্দ দাস ও পিতামহী প্রসন্নকুমারী। তাঁদের দ্বিতীয় পুত্র দুর্গামোহন, পরবর্তীকালে সত্যানন্দ দাস জীবনানন্দের বাবা। এই আদি ভিটে পদ্মাগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। ১৮৯৯ সালে জন্মে ১৯৫৪ সালে দুর্ঘটনায় মৃত্যু – এই স্বল্পায়ুজীবনে, জীবনানন্দ-গবেষক গৌতম মিত্র তাঁর অনন্য গবেষণাগ্রন্থ ‘পাণ্ডুলিপি থেকে ডায়েরি জীবনানন্দের খোঁজে’ প্রথম খণ্ডে জানিয়েছেন, তাঁর লেখালেখির জীবন ত্রিশ বছরে গল্প লিখেছেন ১২৭টি, উপন্যাস ১৯টি। প্রায়ই দিনপঞ্জীর বয়ান আর উপন্যাসের বয়ান একাকার। সস্তা মেসবাড়িতে দাঁতে দাঁত চেপে কলকাতা শহরের রোদ বৃষ্টি চাকরিহীনতা ও নির্বান্ধবতায় জীর্ণ হচ্ছেন। একটি বড়ো গল্প ‘নিরুপম যাত্রা’-য় আমরা দেখি, একজন মানুষের বাড়ি যেতে না পারার আকুতি, অলসতাকে প্রেম ভাবতে সে চায় না। খোঁড়া কুকুরের কথা-ও সে ভোলে না। ভাবে- ‘ মাটির উপর শুয়ে জিভ বের করে ভাবতে থাকে হয়তো এতদিন মানুষের কাছ থেকে সে যত অকল্যাণ ও গ্লানি পেল প্রভাত এলে সমস্ত জানাবে তাকে সে-‘; বাড়ি যাওয়া হলো না তার অথচ, মেসবাড়িতে মরে পড়ে রইল ৷ শেষ অংশের ভয়াবহ নির্জন বিবরণ পড়ে নিতে পারি আমরা; দেখতে পারি, ১৯৩৩ সালে লিখিত এই গল্পের সংবেদনশীল এক আত্মজবানিমূলক বিবরণ, এক দরিদ্র মেসবাসীর পরিস্থিতি : ‘ প্রভাতের রুদ্ধঘরে মাছির ভনভনানি, অসহ্য গুমোট ও মশা এক -এক সময় মৃতের পক্ষেও যেন অসহ্য হয়ে ওঠে- পৃথিবীর বাজ পাখির নয়- চড়ুই পাখি, শালিখ পাখি, এই উদাসী, করুণ, সংসারের কর্তব্য সংগ্রাম নিষ্পেষিত বন্ধনাত্মা যুবক কোনোদিন তার প্রমত্ততম কল্পনায় মনে করে নি যে এই মেসে সে মরবে- তার মৃত্যুর পর মেসের একটা দিন এই রকম কেটে যাবে- এই মেসের কয়েকটি বাবু সিগারেট আর পানের ডিবে নিয়ে রাতে নিমতলায় তাকে পোড়াতে যাবে-‘ ; পনেরো বছর পর জীবনানন্দ লিখলেন এক অমোঘ উপন্যাস। বাসমতীর উপাখ্যান। দেশভাগের ঠিক পরের বছর ১৯৪৮ সালে। এখানে স্টিমারের বাটলার গফুরের মুখ দিয়ে কী চমৎকার ভাবেই ইতিহাসসচেতন জীবনানন্দ কথা বলে ওঠেন : ‘কইলকাতার দিকে দৌড় বাজাইতে খুব ফূর্তি হইব অনেকের, কিন্তু এই দ্যাশে না-থাকোনের কিছু নাই, ভালোবাইস্যা থাকোন লইয়া কথা।’ এই ‘ভালোবাসা’ কথাটি, ভালোবাসা পাওয়ার ও দেওয়ার আকুতি আমরা জীবনানন্দসাহিত্যে পাই। যদিও তৎকালে অপ্রকাশিত, তবুও দেশভাগ, সাম্প্রদায়িকতার সংকটকে মুখ্য উপজীব্য করে সারা জীবনে রচনা করা প্রায় চল্লিশ লক্ষ শব্দের বেশ অনেকটাই খরচ করেছেন তিনি ৷ ‘ পুলিশের ব্যাটনের তলায় নুইয়ে’ থাকবার বেদনাও আমরা পাচ্ছি তাঁর কবিতায়। গৌতম মিত্র এক বিরল সংঘটনের কথা জানাচ্ছেন আমাদের। ১৯৩২ সালে জীবনানন্দ দাশ ও বুদ্ধদেব বসু লিখেছেন দু’টি উপন্যাস। নভেলের পান্ডুলিপি ও আমার বন্ধু। কৌতুহলের বিষয়, নভেলের পান্ডুলিপি উপন্যাসের বাণেশ্বর চরিত্রটি বুদ্ধদেব বসু’র আদলে নির্মিত। অসংখ্য তীর্যক মন্তব্য, শ্লেষ লেখা হচ্ছে উপন্যাসটিতে। আমরা জানি, জীবনানন্দ দাশের কবিতার অন্যতম প্রকাশক বুদ্ধদেব বসু। কিছুদিন পূর্বেই একটি নামী প্রকাশনা সংস্থা ‘আত্মজৈবনিক’ শিরোনামে তাঁর তিনটি কৃশকায় গ্রন্থ, কনিষ্ঠা কন্যা দময়ন্তী বসু সিং এর সংযোজনলেখসহ ছেপেছে। আগ্রহীরা উলটে নিতে পারবেন। আমি আপাতত তাঁর জন্মস্থান সম্পর্কে রচনাটি থেকে একটি অংশ তুলে দিতে চাই : ‘ প্রথম চোখ ফুটলো নোয়াখালিতে, তার আগে অন্ধকার, আর সেই অন্ধকারে আলোর ফুটকি কয়েকটি মাত্র। সন্ধ্যাবেলা চাঁদ ওঠার আগে উঠোন ভরে আলপনা দিচ্ছেন বাড়ির বৃদ্ধা, মুগ্ধ হয়ে দেখছি। রাতের বিছানা দিনের বেলায় পাহাড়ের ঢালুর মতো করে ওল্টানো, তাইতে ঠেশান দিয়ে পাতা ওল্টাচ্ছি মস্ত বড়ো লাল মলাটের ‘বালক’ পত্রিকার। রোদ্দুর- মাখা বিকেলে টেনিস খেলা হচ্ছে; একটি সুগোল মসৃণ ধবধবে বল এসে লাগলো আমার পেরামবুলেটরের চাকায়, বলটি আমি উপহার পেয়ে গেলুম। ‘ ‘নোয়াখালি’ শীর্ষক রচনায় তিনি জানাচ্ছেন, ‘নোয়াখালি’-র নগন্যতা নিয়ে আক্ষেপ ছিলো…’। পরবর্তীতে, মহাত্মা গান্ধীর আন্দোলনসূত্রে কেমন করে জন্মস্থানের প্রেমে পড়লেন সে কথা লিখেছেন, আবার, ‘পুরানা পল্টন’ লেখায় নষ্টালজিক হয়ে যাচ্ছেন যদিও বলছেন, ঢাকা শহরের প্রতি বিশেষ কোনো ভালোবাসা না থাকবার কথা। ‘পুরানা পল্টন – অনেক দিন আগে যে মেয়েকে ভালোবাসতাম, হঠাৎ কেউ যেন আমার সামনে তার নাম উচ্চারণ করলো। এককালে যে নিতান্ত আপন ছিলো, তার নাম আজ কানে ঠেকছে নতুন। অবাক হতে হয়- তার সঙ্গে অতদিনের ঘনিষ্ঠতা – তা কি সত্যি? সেদিন হয়তো তাকে ইচ্ছে করেই ছেড়ে এসেছিলাম, কিন্তু আজ তার নামের শব্দে মধুরতা, বিষাদ। পুরানা পল্টন যেদিন শেষবারের মতো ছেড়ে এলুম সেই স্থানবিশেষের জন্য সেদিন আমার মনে একটুও দুঃখ হয়নি। ‘ – বুদ্ধদেব বসু সত্যবাদী এবং সাহিত্যে সত্য জিনিস জরুরী, অবশ্য তিনি যত সত্যবাদী তার চেয়ে বেশি বস্তুবাদী, সমকালীন সাহিত্যিকদের তুলনায়। তিনি বাংলা সাহিত্যের কেন্দ্রেই থাকতে চেয়েছিলেন,পুরানা পল্টন তাঁর কাছে মন খারাপের উপাদান হয়েই রইলো। দেশভাগ বুদ্ধদেব বসু’র উপর খুব একটা প্রভাব ফেলেনি৷ চৈত্র ১৩৬২ সালের প্রকাশিত ‘কবিতা’ পত্রিকার বিংশ বর্ষ, তৃতীয় সংখ্যায় মুদ্রিত ‘ভাষা ও রাষ্ট্র’ রচনার প্রথম অংশে আমরা খানিক চমকেই উঠি : ‘ আমি রাজনৈতিক নই, কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত নই, আরাম- কেদারায় ব’সেও রাজনীতির চর্চা আমি করি না। এবং আমার মধ্যে দেশপ্রেম নেই। এই পৃথিবী নামক গ্রহের কোনো – একটি অংশে দৈবাৎ নিক্ষিপ্ত হয়েছি ব’লেই তার মধ্যে ষড়ৈশ্বর্য দেখতে পাওয়া আমার পক্ষে অসম্ভব। ‘সকল দেশের সেরা সে যে আমার জন্মভূমি’ – এই হৃদয়াবেগে আমার মন কখনো সাড়া দেয় না। ‘ রচনাটির যত ভেতরে প্রবেশ করে উঠি আমরা, তত ধাতস্থ হই কেন না তার পরেই আমরা তাঁর এহেন বক্তব্যের তাৎপর্য টের পাই : ‘ বলতে চাচ্ছি যে মানুষের সাথে মানুষের প্রধান বন্ধনই হ’লো ভাষা। ধর্ম এক না হ’তে পারে, ঘরকন্নার অভ্যেসও ভিন্ন হ’তে পারে, কিন্তু যে প্রজাসমূহ এক ভাষায় কথা বলে তারাই একটা ‘দেশ’ বা ‘রাষ্ট্রে’র স্বাভাবিক অভিজ্ঞান। ‘ প্রায় তেষট্টি বছর আগের হিসেবে আধুনিক কথাটা বলেছেন তারপর : ‘ পূর্ব ভারতের যেখানে – যেখানে বাংলা বলা হয়, তা সবই মাটির এবং জলের অণুতে- অণুতে পরস্পরসম্পৃক্ত- সেটাই যথার্থ বাংলাদেশ – রাষ্ট্রনীতির খামখেয়ালে তার যখনই যা নামকরণ হোক না। সেই দেশে বাংলা ভাষা যদি প্রাধান্য না পায় তাহ’লে রাষ্ট্রিক স্বাধীনতা একেবারেই অর্থহীন হ’য়ে পড়ে। ‘ আমরা বুঝতে পারছি রাষ্ট্র ও ভাষা প্রশ্নে স্বতন্ত্র কিছু মত ছিলো বুদ্ধদেব বসুর, ফলে – দেশভাগের অসহনীয় বেদনাভার যুক্তি দিয়ে বিচার করতে কোথাও আটকায়নি।
‘… দেশভাগের আগে হিন্দু- মুসলমানে দাঙ্গা তার কাছে জাতির সবচেয়ে বড় অভিশাপ বলে চিহ্নিত করেছিল, তাছাড়া জন্মস্থান বরিশালের ভোলার কোনো স্মৃতি নেই, কিন্তু রাজশাহীর নওগা, দিনাজপুর আর বিশেষ করে ধলেশ্বরীর পাড়ে তার বাল্যকালের ইদ্রাকপুর কোর্টে এসডিও কোয়ার্টারের স্মৃতি মন থেকে কখনই নড়ানো যাবে না। ‘ এই অংশটি অসীম রায়ের দুই খণ্ডের আত্মজীবনী ‘জীবন- মৃত্যু’ এর প্রথম খণ্ড থেকে নেয়া। কিছু খোঁজ খবর রাখা পাঠক বাদে তিনি আজ অনেকের কাছেই বিস্মৃত হয়েছেন। ‘একালের কথা’ বইতে তিনি তাঁর জাত চেনান, একবার সমরেশ বসু’র বাড়িতে খাওয়াদাওয়া সেরে লেক মার্কেটের সামনে তিনি নারী- পুরুষের সঙ্গমের প্রসঙ্গ তোলেন বেশ মজা করেই : ‘আচ্ছা অসীম, তুই কালচার করিস, কিন্তু এগ্রিকালচার ত করিস না। ‘ তবে ‘একালের কথা’ উপন্যাসের প্রথম পর্ব ‘দুই বন্ধু’ লেখার পর নৈহাটিতে সমরেশ বসুর বাড়িতেই পড়া হলো শ খানেক পাতা। তাঁর স্ত্রী গৌরী জানালেন, স্বামীর ‘আদাব’ গল্পের চেয়ে এটি তাঁর বেশি ভালো লেগেছে। উল্লেখ্য, ছেচল্লিশের আগস্টের হিন্দু মুসলমানের দাঙ্গা প্রসঙ্গ দুটি লেখাতেই আছে। ‘ একালের কথা’ সমাদৃত হলেও পরের লেখা ‘গোপালদেব’ – এর জন্য বামপন্থীদের সাথে তাঁর দূরত্ব তৈরি হয়ে গেল কেন না এই উপন্যাসের বিষয় বন্ধুর মায়ের সাথে প্রণয়। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় মনোজ বসুকে পড়াতে চাইলেন লেখাটা কেন না মনোজ বাবুর প্রকাশনা সংস্থা ছিলো। তারপর লেখকের জবানিতেই পড়ি বরং : ‘ রাশিয়া থেকে ফিরে এসে ‘একালের কথা’ সম্পর্কে বললেন, ‘আপনার দৃষ্টিশক্তি অপূর্ব, ভাষাও খুব জোরাল। তবে রস, রস… ‘ বলে দু’খানা চেটালো থাবা তুলে রসগোল্লার মতো গোল গোল বস্তু দেখাতে লাগলেন। সাড়ে তিনশ পাতার ‘ গোপাল দেব’ – এর বাণ্ডিল তাঁর সামনে রাখতে তিনি প্রায় আঁতকে উঠলেন, ‘আপনার তো মশাই খুব সাহস, একেবারে নতুন লেখক, এত বড় একটা উপন্যাস লিখে ফেললেন। আমরা তো দুটো চ্যাপ্টার লিখেই কাগজের অফিসে দৌড়াই।’ একটুক্ষণ ভেবে বললেন, ‘ নতুন লেখকের এত বড় উপন্যাস ছাপতে পারব না, আপনি বরং আমাকে একটা দু’টাকা চার আনার উপন্যাস দিন। ‘ অসীম রায়ের কথা বলতে বলতে আমরা আসলে একটা সময়ের মধ্যে ঘুরপাক খেতে চাইছি, অখন্ড বাংলার এক পুরাণ মানচিত্রে। ‘ মায়ের কাছে শুনেছে চারপাশে অজস্র হাওয়ায় দোদুল্যমান নারকেল গাছের বনের মধ্যে ফাঁকায় ইংরেজ আমলের মোটা পরিপাটি খড়ে ছাওয়া দর্মার সুশ্রী বাংলো। তার বিছানায় ঘুরবার বাই ছিল এবং প্রায়ই ঘুরতে ঘুরতে গোছা মশারির কোনায় সে ঝুলে ঘুমাত। মাঝ রাতে অন্ধকার হাতড়ে ছেলে না পেয়ে মায়ের আতঙ্ক হতো এই বেড়ার ফুটোফাটা দিয়ে শেয়াল নিয়ে গেছে তাঁর ছেলেকে। ‘
অসীম রায়ের গল্পে, বিশেষ করে সে সময়ের কমিউনিস্ট আন্দোলন ও দেশভঙ্গের বেদনার একটা প্রায় পূর্ণনথি পাওয়া যায়।
বেড়াতে কিশোরগঞ্জ যাই। পাশের গ্রামটি – উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর আদি ভিটে। মসূয়া গ্রাম ৷ বেলা পড়ে আসা বিকেলের আলোয় প্রায় বিধ্বস্ত দালানের বড়ো, ভাঙা জানালা দেখে মনে নানান কল্পনা আসে। সামনে কিছু গোরু চরে। সত্যজিৎ চর্চার সাইনবোর্ড লাগানো এক বহুতল ভবন তালামারা। কি চর্চা হয় কেউ জানে না স্থানীয়রা। পাশেই আবার ইউনিয়ন পরিষদের কার্যালয়। গোরুর আলস্যভরা লেজ নাড়ানো, তালাবন্ধ ভবন আর ইউনিয়ন পরিষদের ঝকঝকের এক চালার মধ্যে ভেঙে পড়তে থাকা রায় পরিবারের ভিটেতে গজানো গাছ, অসংখ্য ফাটল ধরা দেয়াল আমাদের সত্যজিৎ গবেষণা আর ঐতিহ্য সংরক্ষণের জাতীয় অনীহার দিকেই দৃষ্টি ফেরায়। আমার ভাবতে ভালো লাগে, শৈশব কৈশোরে এই বিশাল জানালা দিয়েই টুনটুনির বই – এর লেখক, বাংলা ভাষার সেরা শিশু সাহিত্যিক উপেন্দ্রকিশোর সূর্য দেখতেন। তিনি অবশ্য বাংলার অখণ্ডতার কালেই পাড়ি জমিয়েছিলেন। তাঁর সাহিত্যে সেই অখন্ডতা হয়ে উঠেছে পুরাণপ্রতিমা। এমনকি রাজার পরাজয় ও পাখির স্বাধীনতা লাভের রূপকে, প্রকৃতির বহুরঙ বিবরণে এমন এক বোধের জাগরণসম্ভব রূপকথা ঘটিয়ে তোলেন যাকে বিশ্বাস না করে আমাদের উপায় থাকে না ফলে নথি-র মর্যাদা পেয়ে যায় এই সাহিত্য, ঐতিহাসিক পান লেখার উপকরণ, ইতিহাসকে পুনরাবিষ্কারের দলিলপত্র। দেশভাগের কথায়, কারোর মনে পড়ে যেতে পারে, জয় গোস্বামী’র ‘নন্দর মা’ কবিতাটি যার সংবেদনসম্পন্ন ব্যবহার ছিলো ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘সব চরিত্র কাল্পনিক’ চলচ্চিত্রে। সে-ই চলচ্চিত্রে, গৃহকর্মী নন্দর মা, তাঁর নাম ছিলো দুলালী, সে নাম কারো মনে নেই আজ, কতো কাঁটাতার কতো অসম্ভব কতো কান্না কতো প্রিয়জন কতো অপমান অতিক্রম করে এই ছোটো কাজের জায়গাটিতে এসে উঠলেন, কবিতাটির সূত্রে জেনে উঠি আমরা। সত্যজিৎ রায় আর ঋত্বিক ঘটক প্লেনে বাংলাদেশ আসবার সময় বাংলার নদী দেখে ঋত্বিকের ক্রন্দন বাংলার প্রকৃতির সাথে আজ মানুষও জানে। এ ঘটনা এখন ইতিহাস। আমরা দেখি, তাঁর সব চলচ্চিত্রে দেশভাগ, তার ইতিহাস ও বিশ্বাসঘাতের বেদনাসমেত আছড়ে পড়েছে যেভাবে ভরা জোয়ারের সময় সমুদ্রের ঢেউ আছড়ায় তটভূমিতে। অনেক সময় মেলোড্রামা মনে হয়। এই মেলোড্রামা আদতে ব্যক্তিবেদনা সমষ্টিতে ছড়িয়ে দেয়া, কোনোভাবেই নিজেকে শমিত করতে না পারার এ এক নাছোড় অবস্থা। এ অপারগ আশ্লেষের নাম ঋত্বিক। আঁকাড়া আবেগ। মানুষের কান্না আসে, তাই সে কাঁদে। মহাভারতের বনপর্বে অগ্নিদেবতার সাথে যুধিষ্ঠিরের পরিচয় করাতে গিয়ে ঋষি বলেছিলেন, ‘ যে অগ্নি আশ্রম রক্ষা করেন, তিনি বৈশ্বানর; যে অগ্নি- বিবাহকালে বধূর সঙ্গে পিত্রালয় থেকে শ্বশুরালয়ে আসেন তাঁর নাম দক্ষিণ অগ্নি; আর যে অগ্নি আত্মাকে দহন করে প্রজ্বলিত হন, তিনি কবি’। ‘নন্দর মা’ কবিতার একটা অংশে আমাদের মনে হয়, দেশভাগের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা না থাকলেও এমন একজন আত্মাকে দহন করা কবি-ই লিখতে পারেন: ‘ কোথায় সে দেশ? অতীতে? ভবিষ্যতে? / সে কোন বয়স আমরা ছেড়ে এলাম/ দুলালী, দুলালী – প্রিয়বালা, প্রিয়বালা/ রাস্তায় পড়ে হারিয়ে গিয়েছে নাম। / খানিকটা নাম ধানক্ষেতে পড়ে গেছে/ খানিকটা গেছে নদীজলে, আঘাটায়/ খানিকটা নাম নিয়ে নিল পাঠশালা/ খানিকটা গেল রাস্তার দাঙ্গায়। ‘
উৎপল কুমার বসু’র আদিভিটে মালখানগর, বাংলাদেশের। তিনি অবশ্য অনেক মৃদু। ফেলে আসা ঠিকানার কথা তাঁর রচনাসংগ্রহের নানা জায়গায় বিষণ্ণ তারসানাইয়ের মত ছড়িয়ে আছে, আমরা কেবল শেষ কবিতাবইয়ের প্রথম কবিতাটি দেখতে পারি : ‘ ভুলে যাই নিজের ঠিকানা/ ছোট একটা বাড়ি ছিল, কিছু দূরে নীল কুঠি। / গুটিকয় তালগাছ আর কিছু লতাপাতা/ জড়িয়ে আমার স্থাপত্যের সামান্য ঘোষণা। / ছিল হাঁস। বাল্যের পাঠ্যবই থেকে/ নেমে আসা উট ও বিদেশি গাধার দলে/ আমি একা ক্রীতদাস -/ আপাতত স্থলপদ্মের বনে নিদ্রাহীন জেগে আছি।’ শঙ্খ ঘোষের স্মৃতিতে পাকশী উজ্জ্বল। পদ্মার ধারের ছোটোখাটো রেলওয়ে কলোনী। তাঁর বাবা মণীন্দ্রকুমার ঘোষ, একজন শিক্ষক ও বাংলা বানান বিষয়ে একজন চিন্তক ( ১৪২৪ সালের শারদ ‘অনুষ্টুপ’- এ পিতাপুত্রের বানানবিষয়ক চিঠিবিনিময়কে উপলক্ষ্য করে লেখা শঙ্খ ঘোষের প্রবন্ধটি আগ্রহীরা পড়ে নিতে পারেন)। ছোটো ছেলের জীবনমৃত্যুর সংকটে, নিজের অস্থিরতার প্রশমন ঘটাতে তিনি শ্রেণীকক্ষে বসে পরপর পড়ে যেতে পারেন ‘নৈবেদ্য’ বইয়ের কবিতা। বাণারিপাড়া, পাকশী আর সুপুরিবনের সারি, ছিলো সামনে নদী পেছনে বন ডাইনে বাঁয়ে খেতছড়ানো গ্রাম, এর মধ্য দিয়ে বড়ো হয়ে উঠছিলেন শঙ্খ ঘোষ। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলছেন, ‘ একটা কথা অবশ্য বলে নিতে হবে, পাকশী যে আমার ‘দেশ’ তা কিন্তু নয়, আমার দেশ হলো বরিশালে, গ্রামের নাম বাণারিপাড়া। তবে আমার গোটা স্কুলজীবনটা কেটেছে পদ্মাপারের পাকশীতে, পাবনা জেলার ছোটো ওই রেলকলোনিতে, আমার কাছে তাই দেশের চেয়েও বড়ো হয়ে সে বেঁচে আছে মনে ৷ সেটা যে এখন এক ভিন্ন দেশ, ইচ্ছে করলেই যে কোনো সময়ে যে হাজির হওয়া যায় না সেখানে, টান বেড়ে যাওয়ার সেও হয়ত একটা কারণ। দেশ ( স্পেস) আর কাল দুটোই যখন ধরাছোঁয়ার অনেকটা বাইরে চলে যায় তখন তার মায়া যায় বেড়ে। ছেড়ে এসেছি তো সেই স্কুলজীবন শেষ হবার পরেই। সঙ্গে সঙ্গে তো ঘটল দেশভাগ। চলে এলাম কলকাতায়। ‘
ঘাটশিলা,সুবর্ণরেখা নদী। একেবারে নির্জন। শুকনো তিরতিরে নদী দেখে নিজের বইদোকানের নাম দিলেন, ‘সুবর্ণরেখা’, পুরনো, দুষ্প্রাপ্য বইয়ের সংগ্রাহক, কমলকুমার মজুমদারের শুরুর দিকের বইয়ের প্রকাশক ইন্দ্রনাথ মজুমদার জন্মেছিলেন খুলনার বাগেরহাটের মামাবাড়িতে। আর পড়াশোনা রংপুরে। সে প্রসঙ্গে বলছেন, ‘… তখন ক্লাস এইটে পড়ি। রংপুর থেকে আমরা ট্রেনে করে এসেছিলাম, পোঁটলা-পুঁটলি জিনিস- পত্তর বেঁধেছেদে যেরকমভাবে আসে সবাই। আমার বাবা তো ইছাপুর গানশেলে চাকরি করতেন, বাবা- মা এখানেই ছিলেন- অনেকদিন থেকেই। আমরা সেই অর্থে রিফিউজি নয়। ‘ ‘নদীপথে’, ‘ইতিহাসের মুক্তি’ খ্যাত অতুল গুপ্ত তখন রংপুরে থাকতেন। কানমলা দিয়েছিলেন একবার ইন্দ্রনাথকে ঘুড়ি ওড়ানোর জন্য। কমলকুমার মজুমদারের ‘অঙ্কভাবনা’ পত্রিকার যে দুটো সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিলো তার অর্থসাহায্য করেছিলেন তিনি। এ প্রসঙ্গে স্বয়ং কমলকুমারের এক উক্তি খুবই মজার : ‘ দেখ এই যে সাহিত্যিকেরা যখন লেখে, তখন তাদের মাথায় হিসেব থাকে না যে কী লিখছি। কিন্তু অঙ্কটা শিখলে তাদের মাথায় লেখার ব্যাপারে দায়িত্ববোধ হবে, হিসেব থাকবে যে কী লিখতে হবে, কতটা লিখতে হবে, এটা বেশি হবে না, এটা পৌনপুনিকতা হয়ে যাবে- এর জন্যেই অঙ্ক শেখা দরকার লেখকের৷ ‘ কমলকুমার মজুমদারের প্রথম বই ছড়ার, নাম ‘পানকৌড়ি’। প্রকাশের গল্প ইন্দ্রনাথ মজুমদারের জবানিতে আমরা শুনে নিতে পারি: ‘ ছবি ছিল উডকাটে। কমলবাবুর সঙ্গে সেই চিৎপুরে গিয়ে গামাকাঠ কিনে এনে, ঠনঠনে থেকে নরুন কিনে, এই ঘরে বসে উনি কাঠখোদাই ছবি করলেন। সেই নরুন দিয়ে উলটো করে কাটতে হবে। কেটে সেই ব্লক করে, ব্লক থেকে ডিরেক্ট, মডার্ন ইন্ডিয়া থেকে ছাপা হল- পানকৌড়ি বেরোল।’
ঢাকা জেলার রাইনাদি গ্রামে জন্ম অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের। শৈশবের যে স্মৃতিতে তিনি মেদুর হন তা হলো, ঠাকুরদার মৃত্যুর পর তাকে যখন শ্মশানে নেয়া হলো দেখা গেলো ঠাকুরদার লেপের তলায় শিশু অতীন গুটিসুটি শুয়ে। খুব ভালোবাসতেন তো। নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে, অলৌকিক জলযান, ঈশ্বরের বাগান আর মানুষের ঘরবাড়িতে তাঁর খুব মায়াময় সময় ধরা আছে৷ মানচিত্রের কাটা ছেঁড়ার যন্ত্রণা গর্ভযন্ত্রণার চেয়ে কম নয়। অনেক অকালজাত শিশু অকালেই বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার ইতিহাস আমাদের জানা। কিন্তু রাষ্ট্রে এতোসব মানুষজন নিয়ে জড়িয়ে থাকে, তার ছিন্নতার সাথে অনেক মানুষের ছিন্নতার আর বিপন্নতার প্রশ্ন জড়ানো থাকে।
১৯৯৯ সালের ২৬ জুন থেকে ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হতে শুরু করে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের আত্মজীবনী ‘ অর্ধেক জীবন’। শুরুতেই বন্ধু শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘সতীর্থ সম্ভাষণ’ : ‘তুই পারবি’। কোনো এক অজ্ঞাত কারণে এই দু’পৃষ্ঠার অসামান্য রচনাটি আত্মজীবনীটির গ্রন্থাকারে প্রকাশকালে যুক্ত হলো না ৷ দু দশক আগের এই লেখার দুটি দীর্ঘ অংশ পড়ে নেয়া যাক।
অংশ এক। আমাদের বালক বয়স থেকে কৈশোরেই যুদ্ধ, নজরুল নির্বাক, রবীন্দ্রনাথ প্রয়াত, শচীনদেব, সায়গল বোম্বাইবাসী, মন্বন্তর, দাঙ্গা, দেশভাগ, স্বাধীনতা। স্বাধীনতার পর ভীমরুলের চাকে ঢিল। কাঠগোলা থেকে বয়ে আনা কাঠের চোকলা বস্তা ফেঁসে বেরিয়ে পড়েছে যেন। চারদিকে সমস্যা উড়ে বেড়াচ্ছে। কলকাতাকে ঘিরে এক হাজার উদ্বাস্তু কলোনি। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ এক রকমের ঠিকাদারের জন্ম দিয়েছিল। পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় আর এক ধরনের ঠিকাদার জন্মালো। ব্যাংক রান হতে লাগল ঘন ঘন। রবীন্দ্রসঙ্গীতের স্কুল ছড়িয়ে পড়ছে দক্ষিণে- উত্তরে – এমন কি মফস্বল শহরেও। দিল্লি উদ্বাস্তু সমস্যা মানতেই চাইছে না। ওর ভেতর বিধানচন্দ্র যতটা পারেন করে চলেছেন৷… স্বাধীনতার আগের হিরোরা ফিকে হতে শুরু করলেন। কলেজে কলেজে স্টুডেন্ট ফেডারেশন। জমিদারি উচ্ছেদ আধাখেচড়া। কলকাতার বেশ কিছু বিধানসভার আসন কমিউনিস্টরা দখল করলেন। তারাশংকরের লেখায় জলের পরিমাণ বেড়ে গেছে ৷ সত্যজিৎ পথের পাঁচালীর চিত্রনাট্য করবেন করবেন। কথায় কথায় বিভূতিভূষণ, জীবনানন্দর নাম আমাদের মুখে বারবার উঠে আসছে।…
অংশ দুই। বঙ্কিমচন্দ্রের বাবা যাদবচন্দ্র ছাপা ১৪/১৫ পৃষ্ঠার একটি আত্মজীবনী লিখেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ছেলেবেলা আর জীবনস্মৃতিতে নিজের জীবন ছুঁয়ে গেছেন। নিজের জীবনকে উপন্যাসের মোড়কে তবু দেওয়া যায়। কিন্তু আত্মজীবনী বড় কঠিন ঠাঁই।… নিজের মৃত্যুর পর আত্মজীবনী লেখা অনেক সহজ। বেঁচে থাকতে আত্মজীবনী – হাজার একটা বাঁধা। তারপর প্রশ্ন জাগে – আমি কে এমন যে আত্মজীবনী লিখবো? লজ্জা করে। তবু বলব- সুনীল তুই সাহসী। হয়তো পারবি। আমাদের কোনও ব্রজেন শীল নেই। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেই ৷ রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী নেই। তুই একই সঙ্গে এইসব। তুই পারলেও পারতে পারিস।
সুনীল গিয়েছিলেন ফরিদপুর থেকে ৷
বলছিলেন এক জায়গায়, দেশভাগ নিয়ে তাঁর বাবার উক্তি, ভারত স্বাধীন হলো আর আমরা আমাদের দেশ হারালাম! দিল্লিতে বসে কয়েকজন নেতার সিদ্ধান্ত আর জন্মস্থান হারাতে হলো। সারাজীবন এই ঘটনাকে ব্যক্তিগত অপমান হিসেবে দেখেছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।
শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের এক আনপ্যারালাল সৃজন সাধু কালাচাঁদ। তেরোটি গল্প এই চরিত্র নিয়ে। চরিত্রটি ভাবতো, ওটা প্রশ্নপত্রের আত্মা যখন পরীক্ষার হলে উড়তো প্রজাপতি। কাঁহা কাঁহা মুলুকে চলে যেত সে, রোগী দেখতে। রোগী মানে অকৃতকার্য ছাত্র যার রিপোর্ট কার্ড এর নাম্বার বিশেষ মিকচার দিয়ে ঘষে তুলে নতুন নাম্বার বসিয়ে দেবে কালাচাঁদ আর তারপর অম্লান বদনে ছাত্র আরেক স্কুলে ভর্তি। কিলিমানজারো পাহাড়ে বসে আছে কালাঁচাদ। সেখানে সিংহের ছানা খেলা করে। ওর বাবা, টিফিন কেড়ে খাওয়া সিনিয়র স্টুডেন্ট আর হেডমাস্টারের উদয় সাধুর কাছে। সিনিয়র ভুলে যাচ্ছে বর্ণমালা। আর কেড়ে খেও না, তাহলেই সব মনে পড়বে, কালাচাঁদের আদেশ ৷ ছেলেকে মারবেন না তবেই ছেলে ফিরবে।
খুলনা জেলার আট স্কুলের আট হেডু পরীক্ষা দিচ্ছে। গার্ড দিচ্ছেন কালাচাঁদ। কাউকে ঘাড় ঘোরাতে দিচ্ছেন না। হু হু বাতাসে ইট চাপা দিয়ে শুকোতে দিয়েছেন তিনি রাশিরাশি টাকা,বন্যার জলে ভিজে যাওয়া। কালাচাঁদ আমার সাধু ছেলে কিছুই চেপে রাখে না। পায়রা চুরি করে খেয়ে ফেললে মায়ের স্বীকারোক্তি। কিংবা ক্লাস থ্রি থেকে জীবনী লেখা। চৌবাচ্চার অংক বুঝতে পুরো স্কুলকে জলের সংকটে ফেলা। চৈতন্যের পরিব্রাজনের রাস্তা দিয়ে হেঁটে কত দূর দূর যেতে চাওয়া।
সেই কোন ক্লাস থ্রিতে বাবা কিনে দিয়েছিলেন ঘিয়ে রঙ এর কাগজের ‘সোনার ঝাঁপি’, গ্রেট দেব সাহিত্য কুটিরের। আর বেরোতে পারলাম না অই চুম্বকটান থেকে। ওই মায়ার ঘোর থেকে। কতজনকে ডেকে ডেকে পড়িয়েছি তার ইয়ত্ত্বা নেই আর।
মাঝে মাঝে একা লাগলে গল্পসমগ্রের একটা গল্প খুলে বসি। যেমন সেই ক্লাস থ্রিতেই পড়েছিলাম ‘সম্পাদক’ গল্পটি। অমরত্ব কলমের কালির সাথে মেশানোর কোনো গুঁড়ো কি না স্কুল পড়ুয়া সম্পাদক খুঁজতে যায় কালির দোকানে। কালজয়ী মণীষী এসব তো আসলে বিজ্ঞাপনের ভাষা। সেসব কথা অই কচি বয়সে পড়ে আনন্দ হয়েছিলো। নিজের একটা রাস্তা টের পেতে শুরু করেছিলাম। ক্লাস সেভেনের মিস্টার ব্লেক, সাধু কালাচাঁদ গল্পমালাসহ অনেক লেখাতেই ফেলে যাওয়া দেশ নিয়ে তিনি, শ্যামল লিখেছেন। পড়লে আজো মনে হয়, যে মানুষেরা এত বিপন্নতার মধ্যেও বেঁচে আছেন তাঁদের হয়ে শ্যামলের মতন সৃজনশীল লেখকেরা লিখে রেখেছেন দেশভাগের উপায়হীন ইতিহাস। সাধারণ মানুষের সেসকল লম্বা উদ্বাস্তু মিছিল আজ সারা পৃথিবীর কোনো না কোনো অংশের বাস্তবতা। বেঁচে থাকবার মৌল মরিয়া ইচ্ছেতে নিজেদের যাপনে আর অক্ষরে যারা ধরে রেখেছেন সে কৃষ্ণকালের তথ্যচিত্র, এই লেখায় তাঁদের কয়েকজনকে স্মরণ করা হলো মাত্র। পুরাণের চরিত্রদের প্রতিমা হয়ে ওঠার যৎসামান্য কিছু বিবরণ। প্রতিমার পুরাণ ইতিহাসেরও কিছু বিবরণ, হয়তো বা।


