‘কৃষকের সন্তান সরদার ফজলুল করিম দেশের কৃষিজীবী ও শ্রমজীবী মানুষদের শোষণ থেকে মুক্তি ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় মার্কসীয় দর্শনে উদ্বুদ্ধ হয়ে তার জীবনব্যাপী শিক্ষা, সাহিত্য ও রাজনৈতিক কার্যক্রমকে সে লক্ষ্যে পরিচালিত করেছেন। কোনোরূপ সংকীর্ণ মতাদর্শে তাঁর পক্ষপাত কখনো ছিল না। ক্ষণস্থায়ী সত্যের ওপর গুরুত্ব না দিয়ে তিনি চিরায়ত সত্য ও মানুষের মুক্তির উপায় অন্বেষণ করেছেন। গত বৃহস্পতি বার, ১৪ মে থিয়েটার ইনস্টিটিউট চট্টগ্রামের গ্যালারি হলে আয়োজিত দেশের অন্যতম প্রধান বুদ্ধিজীবী ও লেখক-সমাজচিন্তক সরদার ফজলুল করিমের জন্মশতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে অনুষ্ঠানে বক্তারা তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপনকালে উপরোক্ত অভিমত প্রকাশ করেন।

এই স্মরণসভার আয়োজন করে ‘চিন্তাচর্চা, ‘খড়িমাটি’ ও ‘প্রগতির যাত্রী’ সামাজিক প্রতিষ্ঠান। চট্টগ্রাম চারুকলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ রীতা দত্তের সভাপতিত্বে আলোচনা করেন কবি ও কথাসাহিত্যিক অধ্যাপক মহীবুল আজিজ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক ড. মাছুম আহমেদ। মূল প্রবন্ধ পড়েন অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক ও বাম রাজনীতিক কানাই দাশ। সরদার ফজলুল করিমের জীবনী উপস্থাপন করেন শিক্ষক পূরবী চক্রবর্তী, সংগীত পরিবেশন করেন শীলা চৌধুরী ও সরদার ফজলুল করিমের ‘আমি মানুষ’ গ্রন্থ থেকে পাঠ করেন আবৃত্তি প্রতিষ্ঠান তারুণ্যের উচ্ছ্বাসের পায়েল বিশ্বাস। সূচনা বক্তব্য দেন চিন্তাচর্চার আয়োজক সুভাষ দে, ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন প্রগতির যাত্রীর সহ সাধারণ সম্পাদক রবিণ গুহ। সমগ্র অনুষ্ঠান সঞ্চালন করেন খড়িমাটি সম্পাদক কবি মনিরুল মনির।
আলোচনায় কথাসাহিত্যিক, প্রফেসর মহীবুল আজিজ বলেন, ‘বিগত শতকের ষাটের দশকে সরদার ফজলুল করিম দর্শন ও রাষ্ট্র বিজ্ঞানের এমন বিষয়সমূহ অনুবাদ করেছেন যাতে শিক্ষার্থী ও সচেতন মানুষ প্রচলিত শোষণ ও নিপীড়নকামী শাসকচক্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও বিদ্রোহী চেতনায় ন্যায় ও মর্যাদার পথে অগ্রসর হতে উদ্বুদ্ধ হয়। সরদার ফজলুল করিমকে ‘জনদার্শনিক’ অভিহিত করে অধ্যাপক মাছুম আহমেদ বলেন, ‘তিনি দর্শনকে মানুষের দৈনন্দিন জীবন, রাজনীতি ও নৈতিকতার সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন, তিনি জনগণের ভাষায় কথা বলেছেন এবং তাঁদের বৌদ্ধিক ক্ষমতায়নের জন্য কাজ করেছেন।’

মূল প্রবন্ধে অধ্যাপক কানাই দাশ সরদার ফজলুল করিমকে বিপ্লবী বৈদগ্ধ্যের মূর্ত প্রতীক হিসেবে আখ্যায়িত করে তাঁর কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘সমাজ থেকেই সমাজতন্ত্র, জিন্দাবাদ মুর্দাবাদের জন্য আপোষ না করে সমাজতন্ত্রের সত্য প্রবন্ধকার শিক্ষার পথে, জ্ঞানের পথে, উদার মানবতাবাদী জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে সমাজ সত্যকে চিনে পথ চলার ওপর গুরুত্ব দেন।’
অধ্যক্ষ রীতা দত্ত বলেন, ‘সত্যানুসন্ধান ও নন্দনতত্ত্বের মধ্যে সমন্বয় সাধন করেন সরদার ফজলুল করিম। আজীবন মানবতা, জীবন সৌন্দর্য ও মানুষকে সকল প্রকার শোষণ থেকে মুক্তি করার লক্ষ্যে তাঁর শিক্ষা, লেখনী ও জীবনকে উৎসর্গ করেছেন।’ সরদার ফজলুল করিমের জন্মশতবর্ষে একটি পুস্তিকা প্রকাশিত হয়, এটি সম্পাদনা করেন কবি মনিরুল মনির।
সুভাষ দে
বিশিষ্ট সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক


