স্ত্রীর চোখে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়

Share post:

Date:

[আঠাশে জানুয়ারি ১৯৯০ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্ত্রী শ্রীমতী কমলা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর অসুস্থতা ও বার্ধক্য সত্ত্বেও ‘জলার্ক’-র প্রতিনিধিদের কাছে এই সাক্ষাৎকারটি দেন। প্রতিনিধি ছিলেন মানব চক্রবর্তী, দিলীপন ভট্টাচার্য ও প্রদীপ রায়গুপ্ত। টেপ-রেকর্ডারে নেওয়া এই সাক্ষাৎকারটির অনুলিখন করেছেন দিলীপন ভট্টাচার্য।]

মানব চক্রবর্তী: কত বছর বয়সে আপনার বিবাহ হয়েছিলো?

কমলা বন্দ্যোপাধ্যায়: আঠারো বছরে, উনিশশো আটত্রিশে।

মা: বিবাহের পর তাঁর পরিবারের সঙ্গে মানিয়ে নিতে আপনার কোনো অসুবিধে হয়েছিলো কি?

ক: না, কোনোরকম অসুবিধে হয়নি কখনো।

মা: তাঁর বন্ধুদের মধ্যে আপনার প্রিয় ছিলেন কারা? কে কে আসতেন আপনাদের বাড়িতে?

ক: বিয়ের পরে পরেই একজনকে দেখেছি-গুরুগতি প্রসাদ, পদবীটা মনে নেই-উনি ছিলেন বন্ধু। লেখকদের মধ্যে অনেকেই আসতেন-গোলাম কুদ্দস, মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায়, সরোজ দত্ত, ‘নতুন সাহিত্য’-এর অনিল সিংহ, ননী ভৌমিক, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, অমল দাশগুপ্ত। তা ছাড়া সুভাষের স্ত্রী গীতা, গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

মা: তাঁর (মানিকের) স্বভাবের কোন কোন দিক আপনার বিশেষ ভালো লাগতো?

ক: সবার সাথে মেলামেশা করতে ভালোবাসতেন। খাওয়াতে খুব ভালোবাসতেন। খুব মিশুকে ছিলেন।

মা: তাঁর বাজানো বাঁশি বা গাওয়া গান আপনি নিশ্চয়ই শুনেছেন?

ক: হ্যাঁ, হ্যাঁ, জ্যোৎস্না রাত্রে লিখতে লিখতে প্রায়ই হঠাৎ উঠে গিয়ে বাঁশি বাজাতে আরম্ভ করতেন। বাঁশিটা খুব প্রিয় ছিল। গানও খুব ভালোবাসতেন। করতেনও, তবে বেশি না; বাড়িতে করতেন, আমাদের মেয়েরা গান শিখতো, ওদের সাথে।

মা: কী গান গাইতেন?

ক: রবীন্দ্রসঙ্গীত ছাড়া কীর্তনও গাইতেন। ‘কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি’- তাঁর খুব প্রিয় গান ছিলো।

দি : রবীন্দ্রসঙ্গীত কি শেষের দিকে কম গাইতেন?

ক: কই, না। রবীন্দ্রসঙ্গীত ভালোবাসতেন। অন্যান্য গানও গাইতেন, কীর্তনও। যখন যেরকম হুজুগ হতো, কিছুই ঠিক ছিলো না। লিখতে লিখতে হঠাৎ হারমোনিয়াম নিয়ে বসতেন।

মা: আপনাদের বাড়িতে পুজো-আর্চার রেওয়াজ ছিলো?

ক: না, মোটেই রাজি ছিলেন না। বাপের বাড়ি লক্ষ্মী পুজো করতাম তো, কিন্তু করতে আর হলো না, দিলেন না করতে!

মা: অঞ্জলির তো প্রশ্নই ওঠে না?

ক: না। প্রসাদ কেউ দিলেও খেতে দিতেন না।

মা: আপনাদের জীবনের সব থেকে সুখের সময়ের কথা কিংবা কোথাও বেড়াতে যাওয়ার কথা যদি মনে থাকে বলুন।

ক: আমার প্রথম মেয়ে যখন হলো, তিনমাসের সময় রাঁচি গেলাম। ওখানে আমার মেজো ভাসুর থাকতেন। বেশ কিছুদিন ছিলাম। তারপর ছেলেমেয়েরা সব ছোট ছোট ছিল তো, বেড়ানো বেশি হয় নি। উনি বেড়ানোর জন্য তেমন সময় দিতেন না।

দি : যখন তাঁর কোনো বই প্রকাশ হতো বাড়িতে কেমন বহিঃপ্রকাশ হতো তার?

ক: খুশি হতেন।

দি : তাঁর লেখার অভ্যাস নিয়ে কিছু বলুন।

ক: লেখার সময়ে তাঁকে কোনোভাবেই ‘ডিসটার্ব’ করা চলতো না। একদম না।

দি: কোনো লেখার ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন দেখা দিলে আপনার সঙ্গে কি আলোচনা করতেন?

ক: না, লেখার বিষয় নিয়ে আমার সাথে কিছু আলোচনা হতো না। লেখার সময়ে তাঁর কাছে একদম যেতে দিতেন না। ছোট্ট একটা ঘরে একমনে বসে লিখতেন। লিখতে লিখতে খাওয়ার কথা ভুলে যেতেন। তবে চা খুব খেতেন।

মা: তাঁর বইয়ের খুব সমাদর বা প্রশংসা হলে বাড়িতে কোনো প্রতিক্রিয়া লক্ষ করতেন তাঁর? 

ক: ঐ বলতেন যে এইসব হয়েছে। আনন্দ হতো তা তো বোঝাই যেতো।

প্রদীপ রায়গুপ্ত: তিনি কি চেয়ার-টেবিলে ব’সে লিখতেন?

ক: হ্যাঁ। চেয়ার-টেবিল মানে নামেই। যে ঘরে থাকতাম ওঁর সঙ্গে! একটা ঘরে শ্বশুর মশাই চটের পার্টিশন দেওয়া একটা পোরশনে, আমরা অন্য একটায়। বরানগরের বাড়িতে খুবই কষ্টের মধ্যে বসে লিখতেন।

মা: আপনারা টালিগঞ্জে কবরখানার পাশে একসময়ে থাকতেন না?

ক: হ্যাঁ, বিয়ের পর ঐ বাড়িতেই প্রথম আমি এসেছি। ওটাই নিজের বাড়ি ছিলো। পরে শ্বশুরমশাই ওটা বিক্রি ক’রে দেন।

মা: ১৯৫৪ সালের পয়লা জানুয়ারি তাঁর ডায়েরিতে ‘মা’ বলে একটা উল্লেখ আছে। এর কোনো পূর্বপ্রস্তুতি ছিল ব’লে আপনার মনে হয়?

ক: না, ওটা ঠিক বুঝতে পারি নি।



মা: প্রতিভাবানের স্ত্রী হওয়ার অনেক বিড়ম্বনা থাকে। আপনার সেরকম কোনো কথা মনে পড়ে? 

ক: না।

দি: আপনার শরীর খারাপ হ’লে সাহায্য করতেন?

ক: ঐ সব দিকে খুব নজর ছিলো। একবার আমায় আঙুলহাড়া হয়েছিলো, রান্না করতে পারতাম না। উনিই রেঁধে সকলকে খাইয়েছেন।

মা: আপনি তো তাঁর বইগুলি মোটামুটি পড়েছেন, কোনটি আপনার সবচেয়ে প্রিয়?

ক: পদ্মানদীর মাঝি। ওটাই সব থেকে বেশি ভালো লাগে।

মা: কোনো উপ্যাসে তাঁর নিজের কথা বলেছেন, অর্থাৎ কোনো আত্মজৈবনিক উপন্যাস আছে তাঁর?

প্র: সম্পূর্ণ না হোক, খানিকটা খানিকটা এসেছে কি?

ক: তেমন কিছু মনে পড়ছে না।

মা: বিরূপ সমালোচনা তিনি কীভাবে গ্রহণ করতেন?

ক: খুব বিরক্ত হতেন।

মা: তাঁর আদর্শের সঙ্গে জীবনচর্যায় সঙ্গতি ছিলো?

ক: হ্যাঁ, তা তো ছিলো। অনেক কষ্টের মধ্যে চলতে হয়েছে।

মা: তিনি ভিখিরিদের ভিক্ষা দিতেন?

ক: হ্যাঁ, দিতেন।

মা: বাচ্চাদের সঙ্গে মিশতেন?

ক: আমাদের বাড়ির সামনে মাঠ ছিলো। লিখতে লিখতে হঠাৎ উঠে গিয়ে কিছুক্ষণ বাচ্চাদের সঙ্গে খেলতেন। সামনের সিঁড়ির ধাপে গিয়ে বসতেন। আর জ্যোৎস্না রাতে ঐখানে বসেই বাঁশি বাজাতেন। লেখার কোনো নির্দিষ্ট সময় ছিলো না। কোনো কোনো দিন কিছুই লিখতেন না। কাউকে কাছে যেতে দিতেন না লেখার সময়ে। আমি ফ্লাস্কে চা রাখতাম। অনেক রাত পর্যন্ত লিখতেন। তবে রাত পুরো জাগতেন না, খুব ভোরে উঠে কখনও দেখেছি লিখছেন।

দি: পার্টির সঙ্গে সম্পর্কটা কেমন ছিলো?

ক: আমার শ্বশুরমশাই টালিগঞ্জের বিরাট বাড়িটা বিক্রি ক’রে টাকাটা ছেলেদের মধ্যে ভাগ ক’রে দেন। এক-একজন আট-ন হাজার টাকা পান। সেই টাকাটা আমি চোখেও দেখলাম না, সব পার্টিতেই দিয়েছিলেন। আমাকে জানাননি।

মা: আমাদের পত্রিকায় দু-একজন লিখেছেন, পার্টি শুধু তাঁকে দিয়ে লিখিয়েই নিয়েছে, বিনিময়ে কিছু দেয় নি। আপনি কী মনে করেন?

ক: না, মনে হয় না সেরকম কিছু।

মা: উনি কি পার্টির মিটিং-মিছিলে যেতেন?

ক: মিটিং-এ যেতেন, মিছিলে খুব একটা যেতেন না। মাঝে মাঝে যেতেন বরানগরে থাকতে।

দি: আপনাকে নিয়ে কখনো মিটিং-এ গেছেন?

ক: হ্যাঁ, তবে খুব কম। মনে আছে একবার মহম্মদ আলি পার্কে, (ছেলেদের দেখিয়ে) ওরা সব ছোটো, ওদেরও নিয়ে গেছেন। সময়টা মনে নেই।

মা: উনি যখন কমিউনিস্ট পার্টির কাজকর্ম, সম্মেলন ইত্যাদি নিয়ে মেতে থাকতেন তখন কি মদ্যপানের মাত্রা একটু কমতো?

ক: কমিউনিস্ট পার্টির কাজকর্মের সঙ্গে তার কমা-বাড়ার কোনো সম্পর্ক নেই। এমনিই কমে বাড়ে। এই নিয়ে আমার সাথে অশান্তিও হতো। কমানোর জন্য অনেক সময়ে বলেছেন, ‘না, আর নয়’, আবার পরক্ষণেই-

প্র: সুকান্ত ভট্টাচার্য কখনো আপনাদের বাড়ি গিয়েছিলেন?

ক: একবার মনে হয় টালিগঞ্জের বাড়িতে গিয়েছিলো।

প্র: নিজের লেখার সম্বন্ধে তাঁর (মানিকের) কেমন ধারণা ছিলো?

ক: খুবই আস্থা ছিলো, তাঁর গোটা লেখক-জীবনে এটা বেশ দৃঢ় ছিলো।

সম্পাদকীয় মন্তব্য
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ফ্রয়েড থেকে মার্কস ( শ্রাবণ ১৩৯৭ , জলার্ক থেকে প্রকাশিত হয় প্রথম পুস্তক সংস্করণ। ছত্রিশ বছর পর নতুন প্রজন্মের জন্য সাক্ষাৎকারটি এই বই থেকে নিয়েই আমাদের অনলাইনে প্রকাশিত হলো, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মদিনে । এখানে তাঁর স্ত্রী কমলা বন্দ্যোপাধ্যায় লেখক স্বামীর এক অন্তরের রূপ তুলে ধরেছেন যা আমাদের পড়া জরুরি। আদি সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী, প্রকাশক সকলের প্রতি ঋণ স্বীকার করি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সাবস্ক্রাইব

spot_img

সম্পাদকের নির্বাচিত

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

নভেরার জন্য এলিজি

১৯৪৭ এ ধর্মের ভিত্তিতে ভারত-পাকিস্তান ভাগ হলেও পূর্বপাকিস্তানের ভাষা...

‘বার্স্ট অফ জয়’ : পুলিৎজার জয়ী ছবির শিক্ষা

ডিজিটাল ক্যামেরা ওয়ার্ল্ড অনলাইনে প্রকাশিত টম মে প্রণীত প্রতিবেদন...

ব্যাটারি রিকশা: আমাদের ভাবনা

ব্যাটারি রিকশা নিয়ে অনেক ধরনের আলাপ চলে আসছে গত...

নেপালের বর্ণিল গাই যাত্রা

নেপালের তিব্বত সীমান্তে রাসুয়া জেলায় ভয়াবহ এবং মর্মান্তিক হড়পা...