মঙ্গল গ্রহ নিয়ে পৃথিবীর মানুষের কল্পনার কোন শেষ নেই। কত শত বিজ্ঞান গল্প কাহিনী এবং চলচ্চিত্রের নির্মাণ ঘটেছে! বাংলা ভাষায় অসামান্য উপন্যাস লিখেছেন প্রেমেন্দ্র মিত্র, “মঙ্গল গ্রহে ঘনাদা”। আগামীকাল মঙ্গলের অনেকটা পাশ দিয়ে এই উড়ানের একমাত্র কারণ হলো লাল গ্রহটির থেকে কিছুটা সাহায্য নেওয়া, এই সাহায্য মহাকাশযানের গতি বাড়িয়ে দেবে এবং মহাকাশযানের গতিপথকে সাইকি গ্রহাণুর দিকে ঝুঁকিয়ে দেবে।
নাসার এই গ্রহাণু-মুখী মিশন আগামী শুক্রবার, পনেরোই মে মঙ্গলের পাশ দিয়ে উড়ে যাবে। সাইকির দিকে এগিয়ে চলা এই মহাকাশযান উড়ানের সময় লাল গ্রহটির প্রায় ২,৮০০ মাইল (৪,৫০০ কিলোমিটার) কাছাকাছি আসবে।

(ছবির স্বত্ব: NASA/JPL-Caltech/ASU)
উড়ানটির উদ্দেশ্য হলো মঙ্গল গ্রহের মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে ব্যবহার করে সাইকির বর্তমান ১২,৩৩৩ মাইল প্রতি ঘণ্টা (১৯,৮৪৮ কিমি/ঘণ্টা) গতিবেগকে আরও বাড়িয়ে দেওয়া। ধাতু সমৃদ্ধ গ্রহাণু ‘১৬ সাইকি’ বা ‘সাইকি’ ১৭৩ মাইল ( ২৮০ কিলোমিটার) চওড়া। মঙ্গল এবং বৃহস্পতির মধ্যকার প্রধান গ্রহাণু বেল্টে অবস্থিত। সাইকির দিকে নিজের গতিপথ পরিবর্তন করতে সাহায্য করবে ফ্লাইবাই বা উড়ানটি।
২০২৩ সালের অক্টোবর। এই বছর উৎক্ষেপণ করা হয় সাইকি। মহাকাশযানটি ২০২৯ সালে তার সমনামী গ্রহাণু সাইকিতে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এটি বিজ্ঞানীদের একটি অত্যন্ত অনন্য জিনিস অধ্যয়নের সুযোগ করে দেবে। ধারণা করা হয় যে, ১৬ সাইকি আদি সৌরজগতের একটি প্ল্যানেটেসিমাল। এই শব্দের অর্থ ক্ষুদ্র গ্রহাণুকণা। এই জিনিসটির বাইরের স্তরগুলো শত কোটি বছরের সংঘর্ষের কারণে ক্ষয় হয়ে গেছে। এই কারণে, এটির খোলা নিকেল-লোহার কেন্দ্রটি পাথুরে গ্রহগুলোর সাধারণত লুকিয়ে থাকা কেন্দ্রভাগ সংক্রান্ত গবেষণার একটি বিরল সুযোগ তৈরি করেছে।
তবে সাইকি মহাকাশযান তার জেনন গ্যাস প্রপেল্যান্ট তথা জ্বালানি সাশ্রয় করতে কেবল মঙ্গলের মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে ব্যবহার করে গতিই বাড়াবে না, লাল রঙের এই গ্রহটির পাশে উড়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াটি সাইকিকে তার যন্ত্রাংশগুলো পরীক্ষা ও মেপে দেখার একটি সুযোগও দেবে। সুযোগটি মহাকাশযান প্রধান গ্রহাণু বেল্ট বা গ্রহাণু বলয়ে পৌঁছানোর পর ব্যবহার করবে। সাইকির নিজস্ব মাল্টিস্পেক্ট্রাল ইমেজারটি মঙ্গলের হাজার হাজার পর্যবেক্ষণ বা ছবি ধারণ করতে ব্যবহার করা হবে। এই প্রক্রিয়াটি চলতি মাসের শুরুর দিকে শুরু হয়েছে।

(ছবির স্বত্ব: পটভূমি: NASA JPL, NASA/STScI/J. DePasquale/A. Pagan। ইনসেট: NEO Coordination Centre, ESA)
২৩ ফেব্রুয়ারি এক কক্ষপথ ঠিকঠাক করবার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার মধ্য দিয়ে সাইকি মহাকাশযানের পরিচালনাকারীরা প্রথমবার মহাকাশযানটিকে মঙ্গলের মুখোমুখি করার প্রস্তুতি শুরু করেন। মহাকাশযানের সব থ্রাস্টার ১২ ঘণ্টা ধরে চালু রাখা, সাইকির গতি বাড়ানো এবং মঙ্গলের কাছাকাছি পৌঁছানোর পথটিকে আরও নিখুঁত করার চেষ্টা এসব প্রস্তুতির অংশ। দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থিত নাসার জেট প্রোপালশন ল্যাবরেটরি। সেখানে সাইকি মিশনের পরিকল্পনা প্রধান সারাহ বায়ারস্টো বলেন, “আমরা এখন গ্রহের পাশ দিয়ে উড়ে যাওয়ার জন্য একদম সঠিক লক্ষ্যমাত্রায় রয়েছি। মে মাস জুড়ে মহাকাশযানটির কাজের সবকিছুই আমরা ফ্লাইট কম্পিউটারে প্রোগ্রাম করে দিয়েছি।” তিনি আরও যোগ করেন, “ফ্লাইট চলাকালীন সাইকির ক্যামেরার কার্যক্ষমতা কয়েক পিক্সেলের চেয়ে বড় কোনো বস্তুর মাধ্যমে পরীক্ষা করার এটাই আমাদের প্রথম সুযোগ এবং আমরা মিশনের অন্যান্য বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি দিয়েও পর্যবেক্ষণ চালাব।” নাসার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানা যায়৷
মঙ্গল গবেষক দলটি মনে করে যে সাইকি মহাকাশযানটি মঙ্গলের চারপাশে এক টোরাস বা আবছা ধূলিময় বলয় দেখতে পেতে পারে। ধারণা করা হয়, ক্ষুদ্র মহাকাশীয় শিলা বা অত্যন্ত ছোটো উল্কাপিণ্ড গ্রহটির দুটি উপগ্রহ ফোবোস ও ডেইমোসের অবস্থানে আঘাত করায় এবং সেখান থেকে ধূলিকণা মহাশূন্যে ছিটকে পড়ার ফলে এই বলয়টি তৈরি হয়েছে।
সূর্য, সাইকি এবং মঙ্গলের মধ্যবর্তী একরৈখিক অবস্থানের কারণে এই ধূলিময় উপাদানগুলো সূর্যের আলো প্রতিফলিত করতে পারে, যা মহাকাশযানের যন্ত্রপাতি দিয়ে দেখা যাবে। এছাড়াও, গবেষকরা মঙ্গলের চারপাশের ছোট ছোট উপগ্রহ খোঁজার জন্য সাইকি মহাকাশযানটিকে ব্যবহার করবেন। এই অভিজ্ঞতাটি তখন মিশনটির উপকারে আসবে, যখন মহাকাশযানটি প্রায় তিন বছর পর গ্রহাণুটিতে পৌঁছাবে। তারপর সাইকির চারপাশের ছোট উপগ্রহ অর্থাৎ মুনলেট অনুসন্ধান করবে।
“যদি আমাদের সমস্ত যন্ত্রপাতি চালু করা যায় এবং আমরা বৈজ্ঞানিক যন্ত্রগুলোর ক্যালিব্রেশন সম্পন্ন করতে পারি, তবে সেটি হবে এক বড় প্রাপ্তি,” বলেছেন ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলে-র সাইকি মিশনের প্রধান গবেষক লিন্ডি এলকিন্স-ট্যান্টন।স্পেস ডট কমে প্রকাশিত রবার্ট লিয়ার নিবন্ধ অবলম্বনে


