নিরাপদ জীবন অদেখা ভূবন

Date:

অদেখা পথে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তই বদলে দেয় জীবন ও সমাজকে, আবিষ্কার হয় নবযাত্রার, নতুন যুগের। নতুন পৃথিবীর চমক লাগে সারা বিশ্বে। সেই দেখানো পথে হাঁটে নিরাপদ মানুষ। কিন্তু যে পথ দেখায়- সে হয় পথপ্রদর্শক, সৃষ্টিশীল আবিষ্কারক। মানুষের মনে তিনিই আসীন হন। আর যে স্বাভাবিক জীবনে থেমে যায় বা অপ্রপ্তিতে ভেঙ্গে পড়ে, খোঁজেনা নতুন পথের দিশা – পাহাড়ের চূড়া আর সমুদ্রের তল দেশ, সেতো নিজেকেই আবিষ্কার করে না, মনছবি খুলে দেখে না নিজের আয়নায়। তাই সহজেই হারিয়ে যায় সময়ের আবর্তে, প্রাণহীন ভূবনে.. থাকে না.. থাকে না মানুষের হৃদয়ে।

RRS Sir David Attenborough — ব্রিটিশ অ্যান্টার্কটিক গবেষণা জাহাজ, যা জলবায়ু পরিবর্তন ও মেরু অঞ্চলের বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ব্যবহৃত হয়।

৮ মে ১৯২৬,  লন্ডনে  একটি শিশুর জন্ম, যার কণ্ঠ একদিন পৃথিবীর কণ্ঠ হয়ে উঠে।

আজ সেই শিশুটি  স্যার ডেভিড অ্যাটেনবরো , তাঁর আজ জন্ম শতবর্ষ। জন্ম দিনের শুভেচ্ছা তাঁকে।

প্রকৃতি, পৃথিবী ও বন্যপ্রাণ সংরক্ষণে এক শতাব্দীর অনুপ্রেরণা—
স্যার ডেভিড অ্যাটেনবরোকে ১০০তম জন্মদিনের শুভেচ্ছা।

এখন একটি প্রশ্নই বারবার ফিরে আসে—

যদি তিনি নিরাপদ জীবন বেছে নিতেন এবং  বিবিসি  রেডিও প্রযোজকের চাকরিটা পেয়ে যেতেন বা বিবিসি টিভির অর্জিত উচ্চপদ পরিচালক, অনুষ্ঠানের আরামদায়ক এসি রুমের চেয়ারে জীবনটাকে আটকে ফেলতেন?

তাহলে আমরা কি পেতাম এই কালজয়ী ডকুমেন্টরি ফিল্মমেকিং দার্শনিক মানুষটিকে, যিনি আমাদের শিখিয়েছেন—

মানুষ প্রকৃতির মালিক নয় বরং রক্ষাকর্তা  হিসেবে আচরণ করতে হবে.. পৃথিবীকে রক্ষা করতে হবে আমাদের সবার জন্য।

আমরা প্রকৃতির অংশ, প্রকৃতির বাইরে নই। পরিবেশ রক্ষা করা মানুষের দায়িত্ব। আমাদের হাতেই কেবল আমাদের নিজেদের একার ভবিষ্যৎ নয়, সেই সাথে পৃথিবীর অন্যান্য সমস্ত জীবের ভবিষ্যৎও নির্ভর করছে আমাদের কর্মকান্ডের উপর। এই পৃথিবীরকে আমাদেরই রক্ষা করতে হবে সকল জীব-জন্তুর জন্যও।

পৃথিবীর গল্প, প্রকৃতির ভাষা আর মানবতার দায়—
ডেভিড অ্যাটেনবরোর কণ্ঠে ‘Life on Earth’ আজও নতুন করে ভাবতে শেখায় আমাদের পৃথিবীকে।

আমরা কি সত্যিই আমাদের সন্তানদের এই ধ্বংসপ্রাপ্ত, দূষিত এবং প্রশ্নাবিদ্ধ পৃথিবী দিয়ে যেতে চাই?- তাঁর ‘ আ লাইফ অন আওয়ার প্ল্যানেট’ প্রামাণ্যচিত্রের একটি মূল বক্তব্য এটি।

অগ্নিগর্ভ আগ্নেয়গিরি থেকে গভীর সমুদ্র—
প্রকৃতির নিখুঁত ভারসাম্যেই টিকে আছে পৃথিবী।
‘Perfect Planet’ সেই বিস্ময়কর বাস্তবতারই এক অনন্য অনুসন্ধান।

একটি জীবনের পূর্ণচিত্র

স্যার ডেভিড অ্যাটেনবরো  — অনন্য যাদুকরী ভয়েজ আর্টিস্ট, প্রামাণ্য চলচ্চিত্র পরিচালক, ন্যাচারালিস্ট, লেখক এবং পরিবেশ আন্দোলনের অন্যতম মুখ।

পরিচলক স্যার ডেভিড অ্যাটেনবরো

তিনি শুধু আমাদের জীববৈচিত্র্যের তথ্য দেননি—তিনি পৃথিবী ঘুরে জীববৈচিত্র্যের অজানা প্রকৃতির মনোমুগ্ধকর গল্প বলেছেন।

কোথা থেকে শুরু
জন্ম: ৮ মে ১৯২৬, লন্ডন

বেড়ে ওঠা: লেইচেস্টার
তাঁর বাবা ইউনিভার্সি অফ লেইচেস্টারের প্রিন্সিপাল ছিলেন। শৈশব থেকেই তিনি জীবাশ্ম সংগ্রহ করতেন—
এ যেন প্রকৃতির সঙ্গে তাঁর প্রথম বন্ধুত্ব।

সময়রেখা

১৯৪৫-১৯৪৭
ডেভিড অ্যাটেনবরো ইউনিভার্সিটি অফ ক্যাম্ব্রিজে ন্যাচারাল সায়েন্সে পড়াশোনা করেন।
১৯৫২
বিবিসিতে যোগদান।
১৯৫৪
জু কোয়েশ্চন —প্রথম বড় সাফল্য এনে দেয় তাঁকে।
১৯৭৯
লাইফ অন আর্থ —বিবর্তনের ইতিহাস।

২০০১ সাল
দ্য ব্লু প্ল্যানেট—সমুদ্রের রহস্য।

২০০৬ সাল
প্ল্যানেট আর্থ —ডকুমেন্টারির নতুন যুগ।

কীভাবে  আলাদা হলেন তিনি?

তিনি আমাদের সামনে পৃথিবীকে শুধু ‘বর্ণনা’ করেননি,তিনি পৃথিবী ‘জীবন্ত’ পৃথিবীবে আমাদের সামনে উপস্থিত করেছেন।

কেন তিনি ঝুঁকি নিলেন?

কারণ তাঁর মধ্যে ছিল অদম্য কৌতূহল। তিনি জানতেন—
নিরাপত্তা সৃজনশীলতাকে থামিয়ে দেয়,
অজানা পথই নতুন দিগন্ত খুলে ধরে..

বিবিসির ডিরেক্টর অব প্রোগ্রামসের মতো নিশ্চিত ও প্রভাবশালী ক্যারিয়ার ছেড়ে অনিশ্চিত প্রাকৃতিক দুনিয়াকে বেছে নেওয়ার মাধ্যমে তিনি যা অর্জন করেছেন-

০১. আরামের চেয়ে আদর্শ বড় : ক্ষমতা ও উচ্চপদস্থ চাকরির মোহ ত্যাগ করে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, বৈশ্বিক সংকটে ব্যক্তিগত আরামের চেয়ে আদর্শিক লড়াই অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

০২.প্রকৃতির কণ্ঠস্বর হওয়া: ক্ষমতার করিডোর ছেড়ে তিনি মাঠে নেমেছেন বলেই প্রকৃতি একটি বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর পেয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে পরিবেশ রক্ষার বীজ বুনে দিয়েছে।
০৩. সফলতার নতুন সংজ্ঞা: তিনি শিখিয়েছেন যে পদমর্যাদা নয়, বরং নিজের কাজের মাধ্যমে পৃথিবীকে ইতিবাচকভাবে বদলে দিতে পারাই হলো জীবনের প্রকৃত সার্থকতা।

০৪. নিঃস্বার্থ ত্যাগের নির্যাস: বিশ্ব মানবজাতি তাঁর এই ত্যাগ থেকে এই নির্যাসটুকু নিতে পারে যে, বৃহত্তর কল্যাণের জন্য ক্ষুদ্র স্বার্থ বিসর্জন দিলে ইতিহাস তাকে অমর করে রাখে।
০৫. কর্মই শ্রেষ্ঠ শিক্ষা: তিনি আমাদের চেতনাকে এই শিক্ষায় ঋদ্ধ করেছেন যে, কেবল ডেস্কে বসে সিদ্ধান্ত নয়, বরং সরাসরি মাটির কাছাকাছি গিয়ে কাজ করলেই বিশ্বকে জাগানো সম্ভব।

কীভাবে তিনি সফল হলেন?

কঠোর পরিশ্রম, ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা, টিমওয়ার্ক ও
প্রযুক্তির সীমা ভেঙে ফেলে এগিয়ে যাওয়া।

যদি তিনি চাকরিতে আটকে যেতেন.. ?

ভাবুন—
একজন সফল প্রশাসনিক কর্মকর্তা।
একটি আরামদায়ক জীবন।
কিন্তু— কোনো প্ল্যানেট আর্থ নেই
কোনো ব্লু প্ল্যানেট নেই
কোনো বৈশ্বিক পরিবেশ সচেতনতা নেই… তাহলে কি ….

তিনি বিবিসি টিভির আরামদায়ক চেয়ার ছেড়ে আগুনে ধ্বংস বনে চলে এলেন আমাদের চোখ খুলে দিতে ..।

আফ্রিকার জঙ্গল,
বিপজ্জনক প্রাণী,
দীর্ঘ শুটিং,
প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা,
একটি দৃশ্য ধারণ করতে মাসের পর মাস অপেক্ষা।

টিম

তিনি সবসময় বলেছেন— এই কাজটি একার নয়। এটি একটি দলবদ্ধ কাজ। অ্যাটেনবরোর কাজের পেছনে রয়েছে কালজয়ী এক বিশাল দক্ষ টিম। ক্যামেরাপারসন, গবেষক, সম্পাদক, প্রযোজক—সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ˆতরি হয়েছে তাঁর বিখ্যাত সব ডকুমেন্টারি ফিল্ম।

দর্শন

“মানুষ প্রকৃতির অংশ”
“পদ নয়, কাজই বড়”

পৃথিবীর জন্য বার্তা

জলবায়ু পরিবর্তন,
বন ধ্বংস,
জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় নিয়ে..

তরুণদের জন্য শিক্ষা

১. ব্যর্থতা মানো
২. থামো না
৩. ঝুঁকি নাও
৪. কঠোর পরিশ্রম করো

একটি আবেগময় দৃশ্য

একটি তিমি গভীর সমুদ্রে ডুব দিচ্ছে।
একটি পাখি তার বাচ্চাকে বাঁচাতে লড়ছে।
এই দৃশ্য আমাদের ছুঁয়ে যায়—
কারণ কেউ একজন তা আমাদের দেখিয়েছেন।

যদি তিনি না থাকতেন?

আমরা প্রকৃতিকে এতো বুঝতাম না
পরিবেশ আন্দোলন দুর্বল থাকত
আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি সীমিত থাকত

স্যার ডেভিড অ্যাটেনবরো শুধু একজন ব্যক্তি নন—

তিনি একটি যুগ, একটি শিক্ষা, একটি অনুপ্রেরণা।

ডেভিড অ্যাটেনবরোর জীবন আমাদের শেখায়—

স্বপ্ন দেখো, ঝুঁকি নাও,
কঠোর পরিশ্রম করো।
কারণ— তোমার পথই পৃথিবীর জন্য নতুন আলো হয়ে উঠতে পারে।

স্যার ডেভিড অ্যাটেনবরোর ১০০ বছরের জন্ম দিনের শুভেচ্ছা ক্ষণে বলতে হয়- স্যার আপনার জীবন কেবল একজন তথ্যচিত্র নির্মাতার গল্প নয়; আপনি এটি একটি গ্রহের সাক্ষী এবং সেই সাক্ষ্যকে মানবজাতির হৃদয়ে পৌঁছে দেওয়ার এক মহাকাব্যিক যাত্রা পথিক আপনি।

আপনি আমাদের দেখিয়েছেন যে, পৃথিবীটা শুধু মানুষের একার নয়। একটি ক্ষুদ্র পতঙ্গ থেকে শুরু করে বিশাল নীল তিমির সবার মধ্যেই এক বিস্ময়কর প্রাণপ্রাচুর্য রয়েছে।

আপনার  কর্মের  মধ্যে শুধু প্রকৃতিকে দেখাননি, প্রকৃতির গভীরতা  অনুভবও উপস্থাপন করেছেন।

আপনার কণ্ঠে যখন কোনো প্রাণীর বর্ণনা করেন, তখন মনে হয় প্রতিটি প্রাণের এক একটি গৌরবময় ইতিহাস আছে।

আপনি তুলে ধরেন- আমরা প্রকৃতির ওপর কর্তৃত্ব করার কেউ নই বরং আমরা এই বিশাল বাস্তুসংস্থানের একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। আপনি দেখান আমরা যদি প্রকৃতিকে ধ্বংস করি, তবে প্রকারান্তরে আমরা নিজেদেরই ধ্বংস করছি।

আশির দশকে আপনি যখন শুরু করেছিলেন, তখন পৃথিবী ছিল সবুজ। কিন্তু শতবর্ষের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আপনি বুক ফেটে বললেন কীভাবে আমরা আমাদের বনভূমি ও সমুদ্রকে ধ্বংস করছি। যখন পৃথিবী বিপন্ন, তখন চুপ থাকা অপরাধ। তথ্য দিয়ে আপনি আমাদের মস্তিষ্ককে জাগিয়েছেন আর আবেগ দিয়ে জাগিয়েছেন আমাদের বিবেক।

আশাবাদের শক্তি ( হোপ ফর দ্য ফিউচার)

এত ধ্বংসলীলা দেখেও আপনি কখনো হাল ছাড়েননি। তাঁর ” অ্যা লাইফ অন আওয়ার প্ল্যানেট” তথ্যচিত্রে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, প্রকৃতি আবার নিজেকে সারিয়ে তুলতে পারে, যদি আমরা তাকে একটু সুযোগ দিই। আপনার চেতনা আমাদের শেখায়—এখনো সময় শেষ হয়ে যায়নি, আমাদের ছোট ছোট পদক্ষেপও বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

পরবর্তী প্রজন্মের প্রতি দায়বদ্ধতা

আপনি শতবর্ষী হয়েও লড়ে যাচ্ছেন আমাদের সন্তানদের জন্য। আপনি জানিয়ে দিয়েছেন- আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে এই পৃথিবী উত্তরাধিকারসূত্রে পাইনি, বরং আমাদের সন্তানদের কাছ থেকে ধার নিয়েছি। এই দায়বদ্ধতা আমাদের জীবনযাত্রায় মিতব্যয়ী ও পরিবেশবান্ধব হতে অনুপ্রাণিত করে।

ডেভিড অ্যাটেনবরো আমাদের জন্য যে চেতনা রেখে যাচ্ছেন, তা হলো ‘সহমর্মিতা’। পৃথিবীর প্রতিটি ঘাসফুল আর প্রতিটি বরফখণ্ডের প্রতি মমতা। তাঁর কণ্ঠ আজ আমাদের কানে বেজে ওঠে এক সতর্কবাণী হিসেবে, আবার এক গভীর আশার গান হিসেবে। তিনি আমাদের শিখিয়ে গেলেন—এই নীল গ্রহটি আমাদের একমাত্র ঘর, আর একে রক্ষা করা আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ কাজ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Share post:

সাবস্ক্রাইব

spot_img

সম্পাদকের নির্বাচিত

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

স্ত্রীর চোখে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়

মানব চক্রবর্তী: কত বছর বয়সে আপনার বিবাহ হয়েছিলো? কমলা বন্দ্যোপাধ্যায়:...

শিলাইদহঃ প্রসঙ্গ রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, রবীন্দ্র একাডেমী ও পর্যটন কেন্দ্র

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী কুষ্টিয়া। তাঁর প্রাণকেন্দ্র কুমারখালী। কুমারখালী নামের...

বাংলাদেশে প্রফেশনাল আন্ডারওয়াটার ফটোগ্রাফির একজন পথ প্রদর্শক

শরীফ সারওয়ার বাংলাদেশের আন্ডারওয়াটার এবং আন্ডারওয়াটার ফটোগ্রাফির ক্ষেত্রে অনন্য...

আন্ডারওয়াটার ফটোগ্রাফির কবি : শরীফ সারওয়ার

বাংলাদেশের প্রায় সমান বয়সী আন্ডার ওয়াটার ফটোগ্রাফার শরীফ সারওয়ার...