স্বল্পদৈর্ঘ্য ‘টু’ : সত্যজিৎ রায়ের কথা

Date:

অনুবাদ: সৈকত দে 

রায়:  (Esso) এসো-র স্পন্সর করা ছোট গল্পের ছবি নির্মাণ আমার জন্য এক নতুন অভিজ্ঞতা ছিল। এটি ছিল টেলিভিশন ধরনের  ব্যাপার, ‘বিশ্ব থিয়েটার’ সিরিজের অংশ।  সেখানে গ্রিস, সুইডেন এবং ইংল্যান্ড সব জায়গা থেকেই  কিছু কিছু  কাজ ছিল।  এবং তিনটি ছোট চলচ্চিত্র ছিল ‘ইন্ডিয়া সেকশন’-এ। বোম্বে ( এখনকার মুম্বাই : অনুবাদক) -র একটি ছোট্ট ব্যালে ট্রুপকে নিয়ে, অন্যটি রবিশঙ্করের সেতার বাদন—এখানে পরিচালকের নিজের কিছু সাংগীতিক ব্যাখ্যা ছিল। আর এই দুই জিনিসের মাঝে স্যান্ডউইচের মতো, তারা চেয়েছিলেন আমি আমার পছন্দ হয় এমন যেকোনো একটি গল্প নিয়ে কয়েক মিনিটের একটি ছবি তৈরি করি, যেখানে ইংরেজি সংলাপ থাকবে। আমি ইংরেজি সংলাপে বাংলা ছবি  করতে চাইনি। এই কারণে আমি একটি ছবি তৈরি করি দুই শিশুকে নিয়ে, কোনো সংলাপ ছাড়াই। একটি ধনী ছেলে এবং একটি গরিব ছেলে। এটি সম্পূর্ণ ১৬ মিলিমিটারে তোলা।

Two: A Film Fable (1964)
দুটি শিশু, দুটি জগৎ—একটি নীরব লড়াই, যেখানে শব্দ নেই, কিন্তু বার্তাটি তীক্ষ্ণ।

জেমস:  আর এই চলচ্চিত্রটি আপনার বর্ণনা মতো একদম সুনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেই পরিচালনা করেছেন।

রায়: হ্যাঁ, কারণ এটি মাত্র তিন দিনে শ্যুট করা হয়েছিল। বুঝতে তো পারছেন, কাজটা এত দ্রুত করা হয়েছিল যে আমি শিশু অভিনেতাদের পুরো গল্প বা অন্য কিছু বলার সময় পাইনি। তাদের সুনির্দিষ্ট কিছু কাজ করতে বলা হয়েছিল আর সত্যি কথা হচ্ছে, সম্পাদনার মাধ্যমেই চলচ্চিত্রটি দাঁড়িয়েছে। পুরো গল্পজুড়ে প্রচুর কাজকর্ম আছে, বিশেষ করে ওই ধনী ছেলেটির। এটি প্রায় পনেরো মিনিটের এক টানা সময়ের গল্প। একটি ধনী ছেলে সম্পূর্ণ একা এক বিশাল বাড়িতে আছে; আগের রাতে তার জন্মদিনের অনুষ্ঠান ছিল। তার কাছে বেলুন, খেলনা—সবকিছুই আছে। সিনেমার শুরুতে দেখা যায় মা বাইরে যাওয়ার সময় তাকে হাত নেড়ে বিদায় জানাচ্ছেন, আর ছেলেটি অত্যন্ত একা পড়ে আছে। এরপর সে তার ঘরে যায়। তাকে তাকে সাজানো রয়েছে রোবটসহ নানারকম যান্ত্রিক খেলনা। সে খেলনাগুলো চালাতে শুরু করে এবং হঠাৎ জানলা দিয়ে দেখতে পায় একটি কুঁড়েঘরে থাকা এক অতি দরিদ্র ছেলেকে, যার নিজস্ব খেলনা বলতে সামান্য জিনিস, দেখতেই পাচ্ছেন, একটি বাঁশী আর ঘুড়ি। দুই ছেলের বৈপরীত্য আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা কেন্দ্র করেই ছবিটি, ছবি জুড়ে তাদের নানা কাজ করতে দেখা যায়। নিজেদের অবস্থানের পরিচয় বহন করে এই কাজ৷ এবং, শেষ পর্যন্ত গরিব ছেলেটি তার ঘুড়িটি উড়িয়ে দেয়। কিন্তু ধনী ছেলেটির তো ঘুড়ি নেই, সে ঈর্ষাকাতর হয়ে পড়ে, এটাকে কি বলতে পারেন আপনি? – গুলতি ব্যবহার করে। ঘুড়িটিকে মাটিতে নামাতে চেষ্টা করে, কিন্তু সে মিস করে, কিন্তু তারপর সে ছোট এয়ার গান তুলে নেয়। লক্ষ্য স্থির করে শেষ পর্যন্ত ঘুড়িটি মাটিতে ফেলতে সক্ষম হয়। এবং তারপর সে তার যান্ত্রিক খেলনাগুলো সচল করে। 

কিন্তু রোবোট হেঁটে গিয়ে খেলনা ইট দিয়ে তৈরি করা ছোট মিনারটি ভেঙে দেয়। খানিক আগেই ধনী শিশুটি তৈরি করেছিল এই মিনার৷ হঠাৎ দরিদ্র শিশুটির বাঁশি বাজানো শুনতে পায় সে। একদিক থেকে গরিব ছেলেটি অদম্য এবং এটিই শেষ সমাধান৷ 

জেমস:  আর এই দুই বাচ্চা ছেলে, অভিনেতা হিসেবে, গল্প কি ছিল এই সম্পর্কে কিছুই জানত না?

এক শিশুর সরলতা—কিন্তু তার মধ্যেই লুকিয়ে আছে বাস্তবতার কঠিন বিভাজন।
Two–এর নিঃশব্দ প্রতিযোগিতার এক প্রান্ত।

রায়: না। তাদের যা যা করবার সব করতে বলা হয়েছিল কিন্তু গল্পে প্রয়োগের ব্যাপারটা তাদেরকে জানানো হয়নি। তারা কিছুই জানতো না কারণ তাদের সাথে আলাদাভাবে কাজ করা হয়েছিল। জাক্সটাপজিশন অর্থাৎ পাশাপাশি স্থাপন করেই এই দুইজনের সম্পর্ক আমরা প্রতিষ্ঠা করেছিলাম, দেখতেই পাচ্ছেন সম্পাদনা, দৃশ্যগুলো আগে পরে বসানো, নানা সংযোজন বিয়োজন সবই ঘটছিল। যখন গরিব ছেলেটার কিছু করে দেখানোর দরকার ছিল, মুখোশ পরে নাচানাচি করছিল, তাকে বলা হয়নি যে, সে বড়লোক বাচ্চাটার জন্য নাচছে, একটা নির্দিষ্ট দিকে তাকিয়ে সে এটা করে যাচ্ছিল। আর ধনী বাচ্চার সাথেও একই পদ্ধতিতে কাজ করেছি৷ 

আমি বলেছি – ” এটা করো, ওটা করো” – আমি এটুকুই বোঝাতে চেয়েছি।

( ফিল্ম কমেন্ট বর্ষ চার সংখ্যা চার গ্রীষ্ম ১৯৬৮ সংখ্যা থেকে শুধু স্বল্পদৈর্ঘ্য ‘টূ’ সংক্রান্ত আলাপটুকু নেয়া হলো।)  

মারি সিটন ‘পোট্রেইট অফ অ্যা ডিরেক্টর: সত্যজিৎ রায়’ গ্রন্থে বলছেন- ‘টু এসো সংস্থার জন্য নির্মিত। সংলাপ ছাড়া ছবি, শুধু শব্দ আর সাঙ্গীতিকতা। অনেক খেলনার মালিক ধনী, অশান্ত শিশু এবং একটি মাত্র ঘুড়ির মালিক একটি গরিব শিশু- এই দুই শিশুর একটি দুপুরের আবহ বোঝাতে সত্যজিৎ এক আশ্চর্য ধরনের স্বতন্ত্র সুর ব্যবহার করলেন নেপথ্যে,  দুইটি শিশুর অসম অবস্থান, শিশুসুলভ গর্ব তুলে ধরতে। ছবিটির ‘ত্যুর দে ফোর্স’ ( শ্রেষ্ঠত্ব) তার সারল্যে। ‘

টীকা 

১. নর্থ ক্যালকাটা ফিল্ম সোসাইটির পত্রিকা ‘চিত্রভাষ’ এর ‘সত্যজিৎ রায়, ইংমার ব্যারিমান এবং মিকেলাঞ্জেলো আন্তনিওনি’-সংখ্যার তিরাশি পৃষ্ঠা থেকে সাক্ষাৎকারটি নেয়া হয়েছে। মূল শিরোনাম ছিল – সত্যজিৎ রায় ওয়াজ ইন্টারভিউড ইন হিজ ক্যালকাটা হোম বাই জেমস ব্লু / অন সার্টেন কোয়েশ্চনস অন শর্ট ফিল্ম ‘টু’। ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসে এই পত্রিকা প্রকাশিত হয়।  ২. Esso মার্কিনি তেল কোম্পানি৷ তাঁদের সাংস্কৃতিক প্রোগ্রাম ‘ এসো ওয়ার্ল্ড থিয়েটার’। এই সংস্থার ব্যানারেই স্বল্পদৈর্ঘ্য ‘টু’-এর নির্মাণ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Share post:

সাবস্ক্রাইব

spot_img

সম্পাদকের নির্বাচিত

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

‘এই নিয়ে সংসার’ : একটি প্রিভিউ

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকেই রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত টেলিভিশনে বাঙালির বিশেষ...

দম : যুদ্ধবিরোধী চলচ্চিত্র

১ জীবন - এক অনন্ত অনুভূতির নাম। যতক্ষণ শ্বাস থাকে...

চা গরম – আদৌ গরম?

আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সাদের 'রেহানা মরিয়ম নূর' যখন চলচ্চিত্র দর্শকের...