বিদেশী এবং ডায়াস্পোরা ফুটবলার: বাংলাদেশের জন্য উৎসব নাকি অভিশাপ

Date:

বাংলাদেশে বিদেশি  ফুটবলারদের নিয়ে মেতে থাকার ইতিহাস কোনো নতুন ঘটনা নয়, বরং এটি আমাদের হারিয়ে যাওয়া ক্লাব ফুটবলের গৌরবের একটি ধারাবাহিক বিবর্তন মাত্র। যা এখন ক্লাবগুলোর সংস্কৃতি থেকে শুরু করে জাতীয় দলের ডায়াস্পোরা ও ন্যাচারালাইজেশন নীতির জটিল বাস্তবতায় এসে ঠেকেছে। এই পরিবর্তন শুধু খেলোয়াড়ের উৎস বদলের গল্প নয়, বরং এটি বাংলাদেশের ফুটবল পরিচয় কীভাবে ধীরে ধীরে স্থানীয় সীমা পেরিয়ে বৈশ্বিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, তার একটি স্পষ্ট প্রতিফলন।

এই গল্পের প্রথম ধাপ শুরু হয় ১৯৮০-এর দশকের শেষ দিক এবং ১৯৯০-এর দশকে, যখন বাংলাদেশের ক্লাব ফুটবল বিদেশি খেলোয়াড়দের উপর নির্ভর করা শুরু করে। তখন আবাহনী লিমিটেড ঢাকা, মোহামেডান এসসি, এবং ব্রাদার্স ইউনিয়নের মতো ক্লাবগুলো আফ্রিকা ও এশিয়া থেকে ফরোয়ার্ড এবং মিডফিল্ডার আনতে শুরু করে। নাইজেরিয়ান স্ট্রাইকার ইমানুয়েল বাবাঞ্জি এবং ঘানার খেলোয়াড় স্যামুয়েল কুফুর টাইপের বিদেশি ফুটবলাররা (স্থানীয় লিগে বিভিন্ন ক্লাবে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে) ক্লাব ফুটবলে গতি এনে দেন, যা তখনকার দেশীয় দর্শকদের জন্য আনন্দ এনে দিয়েছিল। তবে এই পর্যায়ে তাদের ভূমিকা সম্পূর্ণ ক্লাব-নির্ভর ছিল, জাতীয় দলে কোনো প্রভাব ছিল না।

২০০০-এর দশকে এসে এই প্রবণতা আরও সংগঠিত হয়, বিশেষ করে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ চালুর পর। এই সময়ে ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড ডরিয়েলটন গোমেজ, নাইজেরিয়ান স্ট্রাইকার এলিয়াসু শিসি, এবং অন্যান্য আফ্রিকান আক্রমণভাগের খেলোয়াড়রা ক্লাব ফুটবলে বড় প্রভাব ফেলতে শুরু করেন। মোহামেডান, আবাহনী এবং শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাবের মতো দলগুলো প্রায় নিয়মিতভাবেই বিদেশি ফরোয়ার্ডদের উপর নির্ভর করতে থাকে। ফলে স্থানীয় স্ট্রাইকাররা যেমন জাহিদ হাসান এমিলি এবং জাহিদ হোসেন জাতীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ হলেও ঘরোয়া লীগে অনেক সময় সীমিত ভূমিকায় খেলতে বাধ্য হন। এই সময়েই একটি কাঠামোগত সমস্যা স্পষ্ট হয়ে ওঠে: আক্রমণভাগে দেশীয় প্রতিভার বিকাশ ধীর হয়ে যায়, কারণ গুরুত্বপূর্ণ পজিশনগুলো বিদেশিদের দখলে চলে যায়।

২০১০-এর দশকে একটি বড় পরিবর্তন আসে ডায়াস্পোরা ফুটবলারদের উত্থানের মাধ্যমে। এই সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নাম নিঃসন্দেহে জামাল ভূঁইয়া, যিনি ডেনমার্কে জন্মগ্রহণ ও প্রশিক্ষিত হলেও বাংলাদেশের জাতীয় দলের নেতৃত্বে উঠে আসেন। তিনি শুধু একজন মিডফিল্ডার নন, বরং আধুনিক বাংলাদেশ ফুটবলের প্রথম সফল ডায়াস্পোরা প্রতীক। তাঁর পাশে আরও কিছু বিদেশে বেড়ে ওঠা খেলোয়াড় জাতীয় দলের আলোচনায় আসেন, যেমন ইংল্যান্ড-ভিত্তিক মিডফিল্ডার রিয়াসাত খাতন (ডায়াস্পোরা পথ দিয়ে প্রভাবিত উন্নয়ন প্রজন্মের অংশ হিসেবে) এবং ইউরোপে খেলা বিভিন্ন ট্রায়াল খেলোয়াড়, যারা অল্প সময়ের জন্য হলেও জাতীয় দলের ক্যাম্পে অংশ নেন।

এই সময়ে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে থাকা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের খুঁজে বের করার চেষ্টা শুরু করে। বিভিন্ন ট্রায়ালে অংশ নেন ফিনল্যান্ডে জন্ম নেওয়া ডিফেন্ডার তারিক কাজী-ধরনের খেলোয়াড়রা (ডেভেলপমেন্ট ক্যাম্প পর্যায়ে), যারা মূলত বিদেশী লিগের lower league ও academy সিস্টেম থেকে উঠে আসেন। যদিও এই প্রক্রিয়া তখনো পূর্ণাঙ্গ কাঠামো পায়নি, তবুও এটি একটি নতুন খেলোয়াড় খোঁজার প্রবণতার জন্ম দেয়।

এরপর আসে ন্যাচারালাইজেশন বা নাগরিকত্বভিত্তিক খেলোয়াড় অন্তর্ভুক্তির ধারা, যা তুলনামূলকভাবে বিতর্কিত। নাইজেরিয়ান বংশোদ্ভূত ডিফেন্ডার এলেতা কিংসলে এই ধারার সবচেয়ে পরিচিত নাম, যিনি বাংলাদেশি নাগরিকত্ব পাওয়ার পর জাতীয় দলের বিবেচনায় আসেন। তাঁর মতো আরও কিছু বিদেশি খেলোয়াড় বিভিন্ন সময়ে ক্লাব ফুটবলে খেলেছেন এবং জাতীয় দলে সম্ভাব্য সংযোজন হিসেবে আলোচিত হয়েছেন, যেমন শেখ রাসেল কেসিসি ও শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাবে খেলা কিছু আফ্রিকান ডিফেন্ডার ও মিডফিল্ডার।

এই ধারাবাহিকতায় জাতীয় দলে এখন তিনটি স্তরের বিদেশি-উৎপত্তির প্রভাব দেখা যায়। প্রথমত, ডায়াস্পোরা লিডার হিসেবে জামাল ভূঁইয়, তারিক কাজী এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন ট্রায়াল খেলোয়াড়; দ্বিতীয়ত, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে উঠে আসা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তরুণরা, যারা নিয়মিতভাবে ক্যাম্পে অংশ নিচ্ছেন; এবং তৃতীয়ত, অন্য দেশের জাতীয় দলে খেলে ফেলা শামিত সোম কিংবা সুলিভান ব্রাদার্স যাদেরকে ক্লাব ফুটবলের দলবদলের মতই উৎসব করে নিয়ে আসা হয় দেশবদল করে বাংলাদেশ জাতীয় দলে।

এই পুরো কাঠামো বাংলাদেশের ফুটবলে একদিকে উন্নতির সম্ভাবনা তৈরি করেছে, অন্যদিকে একটি গভীর প্রশ্নও সামনে এনেছে। যখন বিদেশি ফরোয়ার্ডরা ক্লাব ফুটবলে গোল করছে, যেমন বসুন্ধরা কিংসের ব্রাজিলিয়ান ও নাইজেরিয়ান আক্রমণভাগ, তখন দেশীয় ফরোয়ার্ডদের ভূমিকা সীমিত হয়ে যাচ্ছে। আবার জাতীয় দলে জামাল ভূঁইয়ার মতো খেলোয়াড়রা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, কিন্তু ধারাবাহিক ডায়াস্পোরা পাইপলাইন এখনো তৈরি হয়নি। সব মিলিয়ে, বাংলাদেশ ফুটবল এখন একটি রূপান্তরের মাঝামাঝি পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে একটি জটিল বাস্তবতা সৃষ্টি হয়েছে। এই বাস্তবতার কেন্দ্রে এখন একমাত্র বড় প্রশ্ন – বাংলাদেশ কি বিদেশি ও ডায়াস্পোরা শক্তির উপর নির্ভর করে এগোবে, নাকি নিজের ঘরোয়া প্রতিভা গড়ে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ফুটবল সংস্কৃতি তৈরি করবে?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Share post:

সাবস্ক্রাইব

spot_img

সম্পাদকের নির্বাচিত

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

বাংলাদেশের হারিয়ে যাওয়া খেলাধুলা

বাংলাদেশ এর গ্রামীণ জনপদ, নদীবিধৌত চরাঞ্চল এবং শহরের প্রান্তিক...

বাংলাদেশের নারী ফুটবলের গল্প

বাংলাদেশ নারী ফুটবলের গল্প এখন এক নতুন মোড়ে দাঁড়িয়ে,...

বাংলাদেশের বর্তমান ক্রিকেট রাজনীতির এপিঠ ওপিঠ

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (Bangladesh Cricket Board)-এর আভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এখন...

প্রযুক্তি ও খেলাধুলার সম্পর্ক

খেলাধুলার জগতে প্রযুক্তির প্রবেশ এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা...