লায়ন ফিশ: সমুদ্রের বিষাক্ত রাজপুত্র

Date:

সমুদ্রের নীল জলরাশির নিচে যে কয়টি প্রাণী একাধারে অসীম সৌন্দর্য আর চরম আতঙ্কের সংমিশ্রণ, তাদের মধ্যে লায়ন ফিশ (Lionfish) অন্যতম। একে বলা হয় সমুদ্রের “বিষাক্ত রাজপুত্র”। এর প্রতিটি পাখনা যেন এক একটি শিল্পকর্ম, আবার প্রতিটি পদক্ষেপ যেন এক একটি মৃত্যুবাণ।

লায়ন ফিশের শরীর জুড়ে থাকে লাল, সাদা এবং খয়েরি রঙের ডোরাকাটা দাগ। এর সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর লম্বা, ঝালরযুক্ত পেক্টোরাল ফিন বা পাখনাগুলো। যখন এটি স্থির হয়ে পানিতে ভেসে থাকে, তখন একে অনেকটা ময়ূরের মতো দেখায়। এর চলাফেরা অত্যন্ত ধীর এবং রাজকীয়, যেন সে জানে এই রাজ্যে তাকে চ্যালেঞ্জ করার মতো কেউ নেই।

ভারত মহাসাগরের নীল জলরাশি আর মালদ্বীপের রহস্যময় সাগরতলে রাতের আঁধারে লায়ন ফিশের মায়াবী রূপকে ক্যামেরাবন্দী  করেছেন শরীফ সারওয়ার।

এর কাঁটায় থাকা বিষ নিউরোটক্সিক। মানুষের মৃত্যু সচরাচর না হলেও, এর কামড়ে বা কাঁটার আঘাতে প্রচণ্ড ব্যথা, বমিভাব, শ্বাসকষ্ট এবং সাময়িকভাবে প্যারালাইসিস হতে পারে।

এদের কোনো নির্দিষ্ট “ভালোবাসার ঋতু” নেই; সারা বছরই এরা প্রজনন করতে পারে। একটি স্ত্রী লায়ন ফিশ প্রতি চার দিনে প্রায় ৩০,০০০ ডিম পাড়তে পারে। অর্থাৎ বছরে প্রায় ২০ লক্ষ ডিম!

বন্য পরিবেশে এরা সাধারণত ১০ থেকে ১৫ বছর বেঁচে থাকে।

আদি আবাসস্থল (Native Range)

লায়ন ফিশের আদি নিবাস ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এবং উপ-গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চল। এদের মূল বিস্তৃতি এলাকা হলো:

ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল: দক্ষিণ জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে শুরু করে অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব উপকূল পর্যন্ত।

লোহিত সাগর: লোহিত সাগর থেকে শুরু করে সুমাত্রা ও শ্রীলঙ্কা পর্যন্ত এদের স্বাভাবিক উপস্থিতি রয়েছে।

বঙ্গোপসাগরের লায়ন ফিশ। ছবি: শরীফ সারওয়ার।

বর্তমান বিস্তার (Spread and Invasion)

১৯৮০-এর দশকের পর থেকে অ্যাকুরিয়াম ব্যবসার মাধ্যমে বা দুর্ঘটনাবশত এটি আটলান্টিক মহাসাগরে ছড়িয়ে পড়ে। 

পশ্চিম আটলান্টিক মহাসাগর: যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূল (ফ্লোরিডা থেকে নিউইয়র্ক পর্যন্ত)।

ক্যারিবিয়ান সাগর: ক্যারিবীয় অঞ্চলের প্রায় সব এলাকায়।

মেক্সিকো উপসাগর: মেক্সিকো উপসাগরের উপকূলীয় অঞ্চল।

বারমুডা: উত্তর আটলান্টিকের বারমুডা অঞ্চলেও এদের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে।

বাংলাদেশের সেন্টমারটিন্স দ্বীপের জলের তলে এদের উপস্থিতি রয়েছে।

বাংলাদেশের সেন্টমারটিন দ্বীপের সাগরতলে লায়ন ফিশ। ছবি: শরীফ সারওয়ার।

এদের পাকস্থলী নিজের দেহের তুলনায় ত্রিশ গুণ বড় হতে পারে এবং এরা নিজের আকারের অর্ধেক সমান মাছও গিলে ফেলতে পারে। যদি ভুলবশত কাঁটা ফুটে যায়, যদিও এর আঘাতে মানুষের মৃত্যু সচরাচর ঘটে না, তবে এর তীব্র যন্ত্রণা সহ্য করা কঠিন। কাঁটা ফুটলে প্রচণ্ড ব্যথা, বমিভাব, শ্বাসকষ্ট এবং সাময়িকভাবে শরীরের কোনো অংশ অবশ বা প্যারালাইজড হয়ে যেতে পারে। তাই দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি। লায়ন ফিশ প্রকৃতির এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। এটি যেমন সুন্দর, তেমনই বিনাশী। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রকৃতিতে সব সুন্দর জিনিসই কোমল নয়; কিছু সৌন্দর্যের আড়ালে থাকে টিকে থাকার কঠোর লড়াই এবং রাজকীয় আধিপত্য।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Share post:

সাবস্ক্রাইব

spot_img

সম্পাদকের নির্বাচিত

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

মাইক্রোপ্লাস্টিক সম্পর্কে জানবার কথা

প্লাস্টিক দূষণ নিয়ে সামান্য খোঁজখবর নেয়া মানুষ মাত্রই মাইক্রোপ্লাস্টিক...

সমুদ্রের তলদেশের ‘সবুজ মুক্তো’: পুষ্টি ও সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত

“কখনো কি ভেবেছেন, সমুদ্রের তলদেশে আঙুরের মতো দেখতে একটি...

সেন্টমার্টিন দ্বীপে সাগরতলে কোরাল ব্লিচিং

বিশ্বজুড়ে সামুদ্রিক পরিবেশ আজ এক অস্তিত্ব রক্ষার সংকটে দাঁড়িয়ে।...