প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এমন একটা পুনর্বিন্যস্ত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা চান যেখানে বিশ্ব জুড়ে আমেরিকার নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি সর্বোচ্চ বাণিজ্যিক সুবিধাকে নিশ্চিত করবে।
যখন বুঁরবো ডাইন্যাস্টি ১৮১৫ সালে ফরাসী সিংহাসন ফিরে পেলো, বলা হয়ে থাকে – নেপোলিয়নের প্রধান কূটনীতিবিদ ট্যালির্যান্ড বলেছিলেন – ফরাসীরা ‘ শিক্ষা নিয়েছে এবং কিছুই ভোলেনি। ‘ আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির সাথে ৪৫ কিংবা তার কয়েক বছর আগে ট্রাম্প নিজেকে যুক্ত করেছিলেন। আমার সম্প্রতি এসব মনে পড়লো, কোন কারণে ট্রাম্পের বিশ্বকে দেখার দৃষ্টি বদলেছে, যদি আদৌ কোনও কারণ থাকে, তার উৎস সন্ধান করতে গিয়ে। এটি করতে গিয়ে আমি হেনরি কিসিঞ্জারের সেই বিখ্যাত উক্তিটির কথা মনে রেখেছিলাম যে, ‘নেতৃবৃন্দ উচ্চপদে আসীন হওয়ার আগে যেসব বিশ্বাস লালন করেন, সেই বুদ্ধিবৃত্তিক পুঁজিই তাঁদের পদে থাকার সময়কার সম্বল। ‘ প্রায় দশ বছর আগে আমি আর চার্লি ল্যাডেরমান পদে বসার আগে ট্রাম্পের বিশ্বাসের ধারাবাহিকতা খতিয়ে দেখছিলাম।
তারপর পৃথিবীর সেতুগুলোর নিচ দিয়ে অজস্র জল বয়ে গেছে। ‘ ট্রাম্প টু পয়েন্ট ও‘ পরিস্থিতিতে পুরানো কি অবশিষ্ট আছে আর নতুন কি যুক্ত হলো?
ডোলাল্ড ট্রাম্পের জন্ম ১৯৪৬ সালে, তখন আমেরিকা সারা পৃথিবীতেই কর্তৃত্ব করছিলো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দুইটি ফ্রন্টেই আমেরিকা বিজয় নিশ্চিত করেছিলো। ব্যবহৃত অস্ত্রের বেশিরভাগ তাদের উৎপাদিত আর নিউক্লিয়ার যুদ্ধ সরঞ্জামের একক আধিপত্য। বিশ্বের জিডিপিতে অর্ধেকের মতো অংশগ্রহণ আমেরিকার। চৌত্রিশ বছর পর, ১৯৮০ সালে ট্রাম্প প্রথমবারের মতো দুনিয়ার রাজনীতিতে অনুপ্রবেশ করলেন তখন মার্কিনিরা গভীর সংকটে ডুবে ছিলেন। অনেকের মতে, এই সংকট পরিত্রাণহীন সংকট ছিলো৷ তারা ভিয়েতনাম যুদ্ধে হেরেছে , বিশ্ব জিডিপিতে অংশগ্রহণ অর্ধেক হয়ে গেলো। ইরানি জিম্মি সংকটের (১) কারণে মার্কিনিদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছিলো। দশক জুড়ে ডোনাল্ড ট্রাম বারবার বারবার এই খারাপ অবস্থার জন্য সমালোচনা মুখর ছিলেন। মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির অনেক আরামপ্রিয় ক্রিটিকদের মতো ট্রাম্প ওয়াশিংটনকে ‘কমিউনিজম মতাদর্শের প্রতি নরম’ বা এই মতবাদে ‘অকারণে ডুবে’ থাকার দায়ে অভিযুক্ত করেননি। প্রকৃতপক্ষে, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং এর আদর্শ সম্পর্কে তাঁর বলার মতো সত্যিকার অর্থে কিছুই ছিলো না। ট্রাম্প উদ্বিগ্ন হয়েছিলেন সাধারণ প্রতিরক্ষা ব্যয়ের ‘অযৌক্তিক বন্টন’ দেখে। তার মনে হয়েছিলো, মার্কিন মিত্ররা তার দেশের এই অন্যায্য বন্টনের ‘সুযোগ নিয়েছিলো’। এই মনোভাবই তার বিস্ফোরক খোলা চিঠি ‘টু দ্য আমেরিকান পিপল’ (আমেরিকার জনগণের প্রতি)-এর প্রতি বাক্যে মিশে ছিলো। এই চিঠি সেপ্টেম্বরের দুই তারিখ ১৯৮৭ সালে, নিউ ইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট এবং বোস্টন গ্লোব পত্রিকায় একটি পূর্ণ পৃষ্ঠার বিজ্ঞাপন হিসেবে প্রকাশিত হয়েছিল (যার খরচ ছিল ৯৪,৮০১ ডলার)। চিঠিটির প্রেক্ষাপট ছিলো, একই বছরের গ্রীষ্মের ‘ট্যাঙ্কার যুদ্ধ’, (২) যেখানে মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজগুলো ইরানি আক্রমণের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পণ্যবাহী জাহাজগুলোকে সুরক্ষা দিচ্ছিলো ; অথচ উপসাগরীয় অঞ্চলে তো বটেই, সারা বিশ্বেও আমেরিকার মিত্ররা তখন হাত গুটিয়ে বসে ছিলো।
ট্রাম্প যুক্তি দিয়েছিলেন যে, পারস্য উপসাগর আমেরিকার কাছে ‘ স্রেফ অল্প গুরুত্বের’ একটি এলাকা, কিন্তু অন্যান্য শক্তির কাছে এই অঞ্চল অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, এই রাষ্ট্রগুলো তাদের নিরাপত্তার জন্য মার্কিন বিনিয়োগের বিনিময়ে কেন যুক্তরাষ্ট্রকে অর্থ প্রদান করছে না? ‘ সারা বিশ্ব’ ট্রাম্প আক্ষেপ নিয়ে বলেছিলেন, ‘ আমেরিকার রাজনীতিবিদদের দেখে হাসছে, কারণ আমরা এমন সব জাহাজ পাহারা দিচ্ছি যেগুলো আমাদের নয়, এমন তেল বহন করছি যা আমাদের প্রয়োজন নেই এবং যা এমন সব মিত্রদের জন্য যাচ্ছে যারা আমাদের সাহায্য করবে না।’ মূলত জাপানের দিকেই তিনি নজর রেখেছিলেন যারা তাঁর মতে, আমেরিকার বিনামূল্যে দেওয়া সামরিক আশ্রয়ে ধনী হয়েছে। ‘এখনই সময়’, ট্রাম্প উপসংহারে বলেছিলেন, ‘জাপান, সৌদি আরব এবং অন্যদের আমাদের দেওয়া সুরক্ষার জন্য অর্থ প্রদান করতে বাধ্য করতে হবে’ । সেই অর্থ তখন ‘আমাদের কৃষক, অসুস্থ এবং গৃহহীন নাগরিকদের ‘ সাহায্যে ব্যবহার করা যেতে পারে।
এই মন্তব্যগুলো বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ তৈরি করেছিলো। মার্কিনিদের বদলে সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে ভেবে সবাই চিন্তিত হয়েছিলেন। ট্রাম্পের চিঠিটি যখন প্রকাশিত হয়, তত দিনে ১৯৮৫ সালের ‘প্লাজা অ্যাকর্ডস’ ( ৩) – এর মাধ্যমে এই সমস্যাটি আংশিকভাবে সমাধান করা হয়েছিল, এর ফলে জাপানিরা ইয়েনের মান বাড়িয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলো। এর ফলে তাদের পণ্যগুলো প্রতিযোগিতামূলক বাজারে পিছিয়ে পড়েছিলো , তবে এই ঘটনার ফলে অন্তত স্বল্প মেয়াদে তাদের নগদ উদ্বৃত্ত বেড়ে গিয়েছিলো , যার ফলে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য স্থানে তাদের এক ধরণের কেনাকাটার ধুম পড়ে যায়। ট্রাম্প আসলে প্রস্তাব করেছিলেন যে, জাপানকে রক্ষা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে ক্ষতিপূরণ দিতে এই লভ্যাংশ থেকে একটি বড় অংশ কেটে নেওয়া হোক। তিনি পশ্চিম জার্মানি সম্পর্কেও একই ধরনের মন্তব্য করেছিলেন এবং সে দেশের গাড়ি নির্মাতাদের ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন।
এই পর্যায়ে ট্রাম্প আমেরিকার শত্রুদের চেয়ে বন্ধুদের নিয়ে অনেক বেশি চিন্তিত ছিলেন। তিনি বিশেষভাবে যে মার্কিন প্রতিপক্ষকে চিহ্নিত করেছিলেন, সেটি ছিলো ইরান। ১৯৮০ সালের অক্টোবরে, যখন মার্কিন জিম্মিরা তেহরানে বন্দি ছিলেন, তখন তিনি মত প্রকাশ করেছিলেন যে এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বৈশ্বিক ‘শ্রদ্ধার’ অভাবের লক্ষণ। এমন ধরণের অবস্থান অন্য কোনো দেশ সহ্য করত না। ১৯৮৮ সালের মে মাসে ট্রাম্প ঘোষণা করেন, ‘আমি ইরানের প্রতি কঠোর হতাম। তারা আমাদের ওপর মনস্তাত্ত্বিক আধিপত্য বিস্তার করছে এবং আমাদের একদল মূর্খ হিসেবে তুলে ধরছে।’ ট্রাম্প সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে, তারা যদি মার্কিন বাহিনীর ওপর অধিক গুলিবর্ষণও করে, তবে তিনি ‘খার্গ দ্বীপের অস্তিত্ব মুছে দেবেন ’। এই দ্বীপ তখন ছিলো বিশ্বের বৃহত্তম অফশোর অপরিশোধিত তেল টার্মিনাল এবং অপরিশোধিত তেল রপ্তানির জন্য ইরানের প্রধান সমুদ্রবন্দর। সমুদ্রের গভীরে বা উপকূল থেকে দূরে অবস্থিত এক বিশেষ ধরণের শিল্প অবকাঠামো, যা অপরিশোধিত তেল পরিবহনকারী বড় ট্যাংকার থেকে তেল নেয়ার জন্য বা ট্যাংকারে তেল ভরার জন্য ব্যবহৃত হয় – এটিই অফশোর অপরিশোধিত তেল টার্মিনাল।
এই সময়ে ট্রাম্প কানাডার প্রতি কোনো শত্রুতা দেখাননি অথবা আঞ্চলিক সম্প্রসারণের প্রতিও তাঁর আগ্রহ দেখা যায়নি। প্রকৃতপক্ষে, ১৯৮৭ সালের ২ সেপ্টেম্বর ‘ল্যারি কিং শো’-তে এক আগ্রহী ফোন কলারের প্রশ্নের জবাবে—যেদিন তার খোলা চিঠিটি প্রকাশিত হয়েছিলো একই দিনে—ট্রাম্প পরিষ্কার করেছিলেন যে, তিনি কানাডার সাথে মিত্রতাকে গুরুত্ব দেন। তিনি বলেছিলেন, তারা ‘চমৎকার এক বন্ধু’ হিসেবে পরস্পরের পাশে ছিলেন। এরপর তিনি অন্যান্য মিত্রদের সাথে কানাডার তুলনা করেন যারা নিজেদের দায়িত্ব ঠিকঠাক পালন করছিলো না। গ্রিনল্যান্ড দখলের সুপ্ত বাসনা থাকলেও, সেই বাসনাটি তিনি তার নিজের মধ্যেই লুকিয়ে রেখেছিলেন।
সোভিয়েত ব্লকের পতনের পরবর্তী দুই দশকে ট্রাম্প বিশ্ব রাজনীতিতে খুব একটা সক্রিয় ছিলেন না। মাঝে মাঝে কসোভো অভিযান, ইরাক যুদ্ধ বা মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির অন্যান্য দিক নিয়ে সমালোচনা করতে তাকে দেখা যেত। তবে একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে ট্রাম্প আবার ওয়াশিংটনের ‘আত্মতৃপ্তির’ বিরুদ্ধে (তাঁর মতে ) তোপ দাগতে শুরু করেন। এবার তাঁর লক্ষ্যবস্তু জাপান নয়, বরং চীন। তিনি অভিযোগ করেন যে, ২০০১ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (WTO) যোগদানের পর চীনের অর্থনীতি ব্যাপক আকার ধারণ করেছে এবং তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘দুর্বল নেতৃত্বের’ সুযোগ নিয়ে মার্কিনিদের চাকরি ‘ছিনিয়ে’ নিচ্ছে।এবং মুনাফা লুটছে।
ফক্স নিউজের বিল ও’রিলি যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি কার পশ্চাদ্দেশে আগে লাথি মারবেন, তখন তিনি উত্তর দিয়েছিলেন: ‘আমি বলব এক নম্বরে চীন।’ তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রে আসা সমস্ত চীনা পণ্যের ওপর তিনি ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবেন। ট্রাম্প মার্কিন মিত্রদের তাদের প্রতিরক্ষার জন্য আরও বেশি অর্থ প্রদানের বিষয়েও তাঁর সংকল্প পুনর্ব্যক্ত করেন। ট্রাম্পের ২০১৫-১৬ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় এই দুটো বিষয়ই অত্যন্ত জোরালোভাবে উঠে এসেছিলো।
প্রথম মেয়াদের শাসনামলে, ২০১৭ থেকে ২০২১ সালে, ট্রাম্প বৈশ্বিক ব্যবস্থাকে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বেশি অনুকূল শর্তে পুনর্গঠন করার একটি নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। প্রাথমিক প্রচেষ্টাগুলো ব্যর্থ হবার পর, তিনি জার্মানিকে শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপের হুমকি দেন। প্রকৃতপক্ষে, চীনে তা আরোপ করেন। ট্রাম্প ইরানের সাথে হওয়া জেসিপিওএ (৪) পারমাণবিক চুক্তি থেকেও একতরফা সরে আসেন। এই চুক্তিকে তিনি একটি ‘বাজে চুক্তি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন।
রাশিয়া এবং ট্রাম্প দলের মধ্যে ‘গোপন সম্পর্ক’ নিয়ে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও, তাঁর প্রশাসন মস্কোর প্রতি পূর্বসূরি বারাক ওবামার তুলনায় আরও কঠোর নীতি অনুসরণ করেছিলো। তিনি কেবল ইউক্রেনে জ্যাভেলিন ক্ষেপণাস্ত্রই পাঠাননি, বরং পোল্যান্ড এবং বাল্টিক রাষ্ট্রগুলোতে মার্কিন উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছিলেন। ন্যাটো জোটের মিত্রদের আরও বেশি অর্থ ব্যয়ের জন্য প্ররোচিত করা হয়েছিলো, যদিও তা অনুরোধ বা প্রয়োজনের তুলনায় মোটেও যথেষ্ট ছিলো না। বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে, এই সবকিছুর প্রতিফলন ঘটেছিল প্রশাসনের ২০১৭ সালের ‘জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল’ নথিতে। ‘বড় শক্তির রাজনীতি’তে ফিরে আসার কথা বলা হয়েছিলো ঐ নথিপত্রে —বিশেষ করে চীন ও রাশিয়ার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়টিকে এই সময়ের জরুরি বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিলো। যদিও সেই নথিটি প্রকৃতপক্ষে ট্রাম্পের নিজস্ব চিন্তাধারার ঠিক কত দূর পর্যন্ত।প্রতিফলন ছিলো তা নিয়ে কিছুটা সন্দেহ রয়েছে বিশ্ব রাজনীতি সম্পর্কে আগ্রহী মহলের।
আগের দশকগুলোতেই এসবের অনেক কিছুর আভাস পাওয়া গিয়েছিলো, তবে ট্রাম্পের অন্য কিছু পদক্ষেপের ক্ষেত্রে আগে অনুমান করা যায়নি। ২০১৭ সালের আগে তিনি এটি নিয়ে কখনো কিছু বলেছিলেন বলে কোনো রেকর্ড না থাকলেও, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচির দিকে বেশ অনেকখানি মনোযোগ দেওয়া হয়েছিলো। এক পর্যায়ে দেশ দুটি যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে বলে মনে হচ্ছিলো। তারপর, ২০১৯ সালে হঠাৎ করেই কোনো প্রেক্ষাপট ছাড়াই ট্রাম্প প্রস্তাব করেন – মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ড কিনে নিতে পারে। ডেনমার্ক দ্রুত এই ধারণাটি নাকচ করে দেয় এবং সেখানেই বিষয়টি অন্তত তখনকার মতো, থেমে যায়।
২০২৫ সালে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে শাসনভার গ্রহণের শুরুর দিন থেকেই এই বিষয়টি স্পষ্ট ছিলো যে, অনেক কিছু আগের মতো থাকলেও বেশ কিছু বড়ো পরিবর্তনও ঘটেছিলো। বন্ধু এবং শত্রু—দুই পক্ষের ওপরই এক ধরণের নতুন ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়ার প্রতিজ্ঞা পূর্বের যে কোনও সময়ের চেয়েও বেশি ছিলো। ইইউ, যুক্তরাজ্য, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়া শুল্কের খপ্পরে।পড়েছিলো। একই অবস্থা ঘটেছিলো গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের ক্ষেত্রেও। এই ঘটনা ‘মুক্তি দিবস’ হিসেবে নামাঙ্কিত করা হয়েছিলো। এই ‘মুক্তি দিবস’ শব্দগুচ্ছ সম্ভবত নিজের ওপর চাপিয়ে দেওয়া অর্থনৈতিক দাসত্ব থেকে আমেরিকার মুক্তিকে ইঙ্গিত করার জন্য ব্যবহার করা হয়েছিলো। ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রায় আক্রমণের পর থেকেই প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি করা ন্যাটো জোটের বন্ধু দেশগুলো আরও ব্যয় বৃদ্ধিতে বাধ্য হয়। কাজের গতিতে চোখে পড়বার মতো পরিবর্তন থাকলেও লক্ষণীয় পরিবর্তন ছিল, এসব সবার কাছে পরিচিতই ছিলো। তবুও পশ্চিম গোলার্ধের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপের বিষয়টি নতুন ছিলো। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে নতুন ‘জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল’ ঘোষণার আগেই ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়েছিলো এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি। ট্রাম্প প্রশাসন মনরো ডকট্রিনের পুরানো দাবিটি আবার করে যে, আমেরিকা অঞ্চলটি যুক্তরাষ্ট্রের একটি কৌশলগত সংরক্ষিত এলাকা। প্রশাসনিক কর্মকর্তারা এটিকে ‘ডনরো ডকট্রিন’ (৫) হিসেবে বলতে শুরু করেন। এই অঞ্চলের কিউবা, ভেনেজুয়েলা এবং কলম্বিয়ার মতো শত্রুভাবাপন্ন শাসনব্যবস্থাগুলোর ওপর চাপ আরও বাড়ানো হয়। প্রেসিডেন্ট বারবার প্রস্তাব করেন যে, কানাডার উচিত মার্কিন প্রজাতন্ত্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য হওয়া। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মার্কিন বিশেষ বাহিনী ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ছিনিয়ে নিয়ে মাদক পাচারের অভিযোগে বিচারের জন্য নিউইয়র্কে নিয়ে আসে।
মাদুরোকে ছিনিয়ে আনার কিছু সময় পরই ট্রাম্প আমেরিকান নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গ্রিনল্যান্ড কিনে ফেলার অধিকার দাবি করেন। ডেনমার্কের পক্ষের দেশগুলোকে কঠোর নিষেধাজ্ঞার হুমকি দেয়ার ফলে পশ্চিমা মিত্ররা স্তম্ভিত হয়ে যায়। এই প্রেক্ষাপটেই কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি দাভোসে এক অনুপ্রেরণামূলক বক্তৃতায় পুরনো ‘নিয়ম-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা’কে ‘মৃত’ বলে ঘোষণা করেন।
অন্য দিকটি ছিলো, ইউরোপের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রকাশ্য হস্তক্ষেপ। ট্রাম্প এর আগেও বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক মন্তব্যে মহাদেশটির ‘ওক’ প্রবণতাগুলোকে ( ৬) লক্ষ্যবস্তু করেছিলেন। কিন্তু ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের বিতর্কিত ভাষণে ইউরোপের তথাকথিত সভ্যতার পতন’ নিয়ে যে সমালোচনার ঝড় উঠবে, তা কেউ আশা করেনি। এই সমালোচনার ধারা পুরো বছর জুড়ে অব্যাহত ছিল এবং ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের ‘ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্ট্র্যাটেজি’-তেও তার পুনরাবৃত্তি ঘটে।
এই পদক্ষেপগুলো অধিকতর দৃশ্যমান হয়ে ওঠে যখন ট্রাম্প ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে একটি ‘মহাচুক্তি’ (grand bargain) করবার স্পষ্ট আগ্রহ দেখান। এই চুক্তির ফলে ইউক্রেনকে কার্যত পরিত্যাগ করা হয়। ২০২৫ সালের প্রথম কয়েক মাসে, মার্কিন কূটনীতিকরা জাতিসংঘে রাশিয়ার আগ্রাসনের নিন্দা জানাতে অস্বীকার করেন। ইউক্রেন ও ইউরোপীয়দের বাদ দিয়েই সৌদি আরবে রুশ কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করেন তাঁরা। ট্রাম্প এবং ভ্যান্স ওভাল অফিসে জেলেনস্কির সাথে প্রকাশ্য বাদানুবাদেও লিপ্ত হন এবং যুক্তরাষ্ট্র এমনকি সাময়িকভাবে ইউক্রেনের জন্য ইন্টেলিজেন্স সহায়তা স্থগিত করে দেয়।
এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে ২০২৫ সালের জুনে ‘১২ দিনের যুদ্ধ’ চলাকালীন ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বড়ো ধরণের বিমান হামলা চালায়। ইরানি শাসক গোষ্ঠীর সাথে পরবর্তী আলোচনাগুলোতেও উত্তেজনা অব্যাহত থাকে, ২৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ (৭) শুরু করবার পূর্ব পর্যন্ত। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর সহযোগিতায় ইরানের ওপর চালানো এই নতুন দফার বোমাবর্ষণে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি নিহত হন, যা ওই শাসনব্যবস্থা এবং পুরো অঞ্চলকে এক নতুন সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। তেহরানের সাথে এই শত্রুতার সমান্তরালে, ট্রাম্প গাজায় একটি ‘বোর্ড অফ পিস’-এর ভিত্তিতে শান্তি মীমাংসার চেষ্টা চালিয়েছেন। এটি কেবল জাতিসংঘকেই এড়িয়ে যাবে না, বরং এতে রাশিয়াকেও অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
পররাষ্ট্রনীতির এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গিটি মার্কিন শক্তি এবং আন্তর্জাতিক আইন ব্যবস্থার অপ্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতনতা আর কঠিন কঠিন কথা দিয়ে সাজানো হয়েছিলো। হোয়াইট হাউসের ডেপুটি চিফ অফ স্টাফ স্টিফেন মিলার এটি সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মন্তব্য করেছিলেন যে, ‘আমরা এমন এক পৃথিবীতে বাস করি যেখানে আপনি আন্তর্জাতিক সৌজন্য এবং অন্য সব কিছু নিয়ে যতো খুশি কথা বলতে পারেন, কিন্তু আমরা এক বাস্তব জগতে বাস করি… যা শক্তি, সেই শক্তির প্রয়োগ এবং ক্ষমতা দ্বারা শাসিত।’ তিনি আরও ঘোষণা করেছিলেন যে, গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ‘লড়াই’ করার মতো ‘কেউ’ নেই।
এই সব উক্তি এবং ঘটনাপ্রবাহ অনেককে ভাবিয়ে তুলেছে। ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্বকে বিভিন্ন ‘প্রভাববলয়’- এ বিভক্ত করার কোনো লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে কি না – এই ভাবনা চিন্তিত করে তুলেছে। এই চিন্তার বিষয় পশ্চিম গোলার্ধ—বিশেষ করে ল্যাটিন আমেরিকা, সেই সাথে কানাডা এবং গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য থাকবে। ইউরোপে (অন্তত এর পূর্ব অংশে) রাশিয়ার আধিপত্য থাকবে এবং এশিয়ায় চীন নেতৃত্ব দেবে আর তাইওয়ান ও দক্ষিণ চীন সাগর দখল করে নেবে। এমনকি বিশ্বকে এমন কিছু ‘বিরাট অঞ্চলে’ ভাগ করার কথা উঠেছিলো। ধারণাটি ১৯৩০ ও ১৯৪০-এর দশকে নাৎসি আন্তর্জাতিক আইনজ্ঞ কার্ল স্মিট সমর্থন করেছিলেন।
এই ধরণের ব্যবস্থা রাশিয়ায় সমাদৃত হবে, এটি নিশ্চিতভাবেই সত্য হিসেবে ধরে নেয়া যায়। কারণ, কুখ্যাত ‘ইউরেশীয়বাদী’ এবং শ্মিট-উৎসাহী আলেকজান্ডার দুগিন ব্যবস্থাটিকে স্বাগত জানিয়েছেন। চীনেও এর অনেক অনুরাগী থাকবে, যেখানে ‘এশীয় মনরো ডকট্রিন’-এর ধারণাটি অন্তত ১৯৩০-এর দশক থেকে প্রচলিত রয়েছে। ‘মনরো ডকট্রিন’ শব্দটির ওপর ভিত্তি করে প্রখ্যাত চীন বিশেষজ্ঞ রানা মিটার রসিকতা করে বলেছেন যে, পিআরসি (চীন) হয়তো ‘সাউথ চায়না জি’ (South China Xi)-কে নিয়ন্ত্রণ করার ধারণাটি পছন্দ করবে। (এখানে “South China Xi” এক ধরণের শ্লেষ বা শব্দ নিয়ে মজা — “South China Sea”-এর সাথে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর নাম মিলিয়ে বলা হয়েছে।)
অজানার প্রতি সংশয় যে ইউরোপ, এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় তীব্র ‘পরিত্যক্ত হওয়ার ভয়’ জাগিয়ে তুলবে, তা বোঝা কঠিন নয়। বাস্তবে অবশ্য ট্রাম্প বিশ্বকে ‘ভাগ করে নিতে’ চান – এই ধারণাটির খুব কমই নমুনা দেখা গেছে। তিনি নিশ্চয়ই পশ্চিম গোলার্ধের দাবি করেছেন, কিন্তু নিজেকে শুধু সেখানেই সীমাবদ্ধ রাখার কোনো ইচ্ছা তাঁর নেই। মধ্যপ্রাচ্যে তাঁর বারবার হস্তক্ষেপ এবং ইউরোপ ও এশিয়ার নিরাপত্তা নিয়ে তাঁর অব্যাহত আগ্রহ দন্দেহজনক। ভেবে দেখতে গেলে, রাশিয়ার বিরুদ্ধে তেল নিষেধাজ্ঞা এবং ইউক্রেনকে চলমান বুদ্ধিবৃত্তিক সহায়তা — বিশ্ব জুড়ে আমেরিকানদের পিছিয়ে আসার ইঙ্গিত দেয় না। রাশিয়ানরা এটি জানে।
২০২৫ সালের শুরুর দিনগুলোর মতো এখন মস্কোতে খুব সামান্যই বিজয়োল্লাস চলছে। পুতিনের বর্তমান মূল দাবি — ইউক্রেন যেন ডনবাসের বাকি অংশ ছেড়ে দেয়, পুরোপুরি অগ্রহণযোগ্য হতে পারে, কিন্তু যুদ্ধের শুরুতে ঘোষিত কর্তৃত্ববাদী কর্মসূচির তুলনায় এটি অনেক কম উচ্চাকাঙ্ক্ষী।
পরিবর্তে, আমরা যা দেখছি তা হলো বিশ্বব্যাপী আরেকটি ‘প্লাজা অ্যাকর্ড ‘ স্থাপনের চেষ্টা। এক ধরণের পুনর্গঠিত আমেরিকান ‘করদাতা ব্যবস্থা’ (Tributary System), যেখানে মিত্রদের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ব্যয়ের বোঝা আরও সমানভাবে ভাগ করে নেওয়া হবে আর যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতিগুলোকে বাণিজ্যিক সুবিধার জন্য ব্যবহার করা হবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০২৫ সালের গ্রীষ্মে ইউরোপীয় ইউনিয়ন যে বাণিজ্য চুক্তি মেনে নিয়েছিল — যার নাম ‘পারস্পরিক, ন্যায্য ও ভারসাম্যপূর্ণ বাণিজ্য বিষয়ক কাঠামো চুক্তি’ ছিলো খানিকটা অরওয়েলিয়ান ধরণের। ব্রাসেলসের দৃষ্টিকোণ থেকে নামটি মোটেও তেমন ছিল না। তবুও, যুক্তরাষ্ট্রের সুরক্ষার ওপর ইউনিয়নের নির্ভরশীলতা ইইউ-কে কোনও কিছু বেছে নেয়ার সুযোগ দেয়নি।
এই ঘটনাপ্রবাহের অনেক কিছুই গণতান্ত্রিক পশ্চিমা বিশ্ব এবং নিয়ম মেনে চলা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রবক্তাদের কাছে অনেক দিক থেকেই সঠিকভাবে অস্বস্তিকর।
ট্রাম্প প্রশাসন তার অবজ্ঞাপূর্ণ বক্তব্য, প্রেসিডেন্টের প্রতি চাটুকারিতাকে উৎসাহিত করা, তাঁর ক্রমাগত মিথ্যে বলা (যেমন আফগানিস্তানে নিজের বন্ধুদের সামরিক কার্যকারিতা নিয়ে), তার ভূখণ্ডকেন্দ্রিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা প্রদর্শনের মাধ্যমে পশ্চিমা জোটকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
ডেনমার্কের উপর গ্রিনল্যান্ড নিয়ে চাপ প্রয়োগের চেষ্টা ছিলো দৃশ্যমান ভাবেই নিন্দনীয়, কারণ এটি শুধু এক ন্যাটো জোটভুক্ত মিত্রকেই লক্ষ্য করেনি, বরং এমন একটি দেশকে লক্ষ্য করেছে যারা প্রতিরক্ষায় ধারাবাহিকভাবে বেশি ব্যয় করছে, আফগানিস্তানে যাদের হতাহতের সংখ্যা (অনুপাতে) যুক্তরাষ্ট্রের সমান ছিলো , এবং ইউরোপের সব দেশের মধ্যে যাদের কঠোর অভিবাসন নীতি ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির সবচেয়ে কাছাকাছি ছিল।
এই কথা বলা যায় , আমরা নিজেরাই দায়ী। দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকার বিনীতভাবে অনুরোধগুলোকে আমরা উপেক্ষা করেছি যাতে ন্যাটোর সদস্য দেশগুলো প্রতিরক্ষায় আরও বেশি ব্যয়ের বোঝা ভাগ করে নেয়। আর তার চেয়েও খারাপ কথা হলো, ১৯৮০-এর দশক থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সতর্কবাণীগুলো আমরা কানেই তুলিনি।
মার্ক কার্নি দাভোসে একটি চমৎকার বক্তৃতা দিয়েছেন। কিন্তু তার দেশের অত্যন্ত সামান্য প্রতিরক্ষা ব্যয় ট্রাম্পকে নিজস্ব একটি গল্পই শোনাচ্ছে। বাইডেন বা ইউরোপীয়দের কেউই পুতিনকে ইউক্রেনে আক্রমণ করতে বাধা দিতে পারেনি। ট্রাম্প ২০২৪ সালের নভেম্বরে পুনর্নির্বাচিত হওয়ার আগে ইইউ এবং যুক্তরাজ্যের হাতে আড়াই বছরেরও বেশি সময় ছিলো। চাইলে এই সময়ের মধ্যেই তাদের সামরিক ব্যবস্থাকে ঠিকঠাক করে ফেলা যেতো । রাশিয়াকে আটকাতে তারা অনেক বেশি খরচ করছে, এটি মূলত ট্রাম্পের কঠোর পদক্ষেপ ও বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায়ই হয়েছে।
পশ্চিমা ব্যবস্থার সামনে আছে এক প্যারাডক্স যা তাকে একটি দ্বন্দ্বের মুখোমুখি করে তুলেছে। একদিকে, ট্রাম্প প্রশাসন তার মিত্রদের নিজেদের এবং যৌথ প্রতিরক্ষার জন্য অনেক বেশি কিছু করতে বাধ্য করেছে। এটি সত্যিই ভালো । এমন কিছু তারা নিজেদের উদ্যোগে কখনোই করতো না। অন্যদিকে, প্রেসিডেন্টের অপমানজনক ভাষায় যুক্তিহীন কথা আর প্রায়ই বিপথগামী নীতিমালা নিঃসন্দেহে পশ্চিমকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং পশ্চিমা মনোবল কমিয়ে দিয়েছে। ট্রাম্প, তার নিজের ভাষায় বলতে গেলে, বিনিয়োগ বাড়িয়েছেন বটে, কিন্তু ব্র্যান্ড ভ্যালু ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন। আমরা এখনো বুঝতে পারছি না, এসব পশ্চিমা শেয়ারের দামের জন্য ঠিক কী অর্থ বহন করে। শেষ পর্যন্ত বলা যায়, ট্রাম্পীয় প্যারাডক্সটি তাঁর প্রশাসনের ইউরোপের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রসারিত হয়েছে। ওয়াশিংটন বারবার শুধু মহাদেশটির সামরিক অবক্ষয়েরই সমালোচনা করেনি, বরং তার কথিত ‘সভ্যতাগত’ অবক্ষয়েরও সমালোচনা করেছে। পরের অভিযোগটি নিয়ে যাই মনে করি না কেন, এটি এমন একটি আমেরিকার ইঙ্গিত দেয় না যে আমেরিকা ইউরোপ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করতে চাইছে বরং তার উল্টোটাই। ট্রাম্প প্রশাসন উদ্বেগ থেকে কথা বলছে, উদাসীনতা থেকে নয়—রাগের চেয়ে দুঃখ থেকেই বেশি। ট্রাম্প এবং ভ্যান্স ইউরোপকে ‘বাঁচাতে’ চান, এবং তাঁরা নিরাময় সম্ভব এমন একটি ইউরোপ চান। এই দৃষ্টিভঙ্গি নিজস্ব চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসে, যেমনটি আমরা দেখেছি, কিন্তু সম্পূর্ণভাবে পরিত্যক্ত হওয়ার চেয়ে এটি অনেক বেশি পছন্দ করবার মত ব্যাপার।। ট্রাম্পের ইউরোপ নিয়ে আগ্রহী হওয়ার চেয়েও খারাপ জিনিস হলো ইউরোপ নিয়ে তাঁর কোনো আগ্রহ না থাকা।
অনুবাদকের সংযোজন
মঙ্গলবার, সাত এপ্রিল রাতে, ইরানের মতো প্রাচীন সভ্যতা ধ্বংস করে দেয়ার মতো হুমকি দিলেও বিশ্বের দুই পরাশক্তি চীন আর রাশিয়ার হস্তক্ষেপে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ঐ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। যদিও ট্রাম্পের মতিগতির কোনও ঠিক না থাকায়, ইরান সংকটের শুভ নিষ্পত্তি এখনও অনিশ্চিত বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ইরানে অস্ত্র সরবরাহকারী দেশগুলোর উপর পঞ্চাশ শতাংশ হারে শুক্ল আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প।
টীকা
১. ইরানি জিম্মি সংকট : ইরান জিম্মি সংকট একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থগিত হয়ে যায়। ৪ নভেম্বর, ১৯৭৯ থেকে ২০ জানুয়ারি, ১৯৮১ পর্যন্ত ৪৪৪ দিনের জন্য বাইশ জন আমেরিকান কূটনীতিক এবং নাগরিককে তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে জিম্মি করে রাখা হয়েছিলো।
২.ট্যাঙ্কার যুদ্ধ : বৃহত্তর ইরান ইরাক যুদ্ধের অংশ
৩. প্লাজা অ্যাকর্ডস : প্লাজা অ্যাকর্ডস ছিলো একটি ঐতিহাসিক চুক্তি যা ১৯৮৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের প্লাজা হোটেলে স্বাক্ষরিত হয়। তৎকালীন পাঁচটি শীর্ষ শিল্পোন্নত দেশ—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, পশ্চিম জার্মানি, ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্য এই চুক্তিতে অংশ নেয়।
৪. জেসিপিওএ : জেসিপিওএ (JCPOA) বা জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (যৌথ সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা) হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সংক্রান্ত একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি, যা সাধারণভাবে ইরান পারমাণবিক চুক্তি নামে পরিচিত।
৫. ডনরো ডকট্রিন : Donroe Doctrine” (ডনরো নীতি) শব্দটি ১৮২৩ সালের ঐতিহাসিক মনরো নীতির (Monroe Doctrine) একটি সমসাময়িক এবং বিতর্কিত রূপান্তর, যা সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির সাথে সম্পর্কিত। এটি মূলত পশ্চিম গোলার্ধে (আমেরিকা মহাদেশে) মার্কিন আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি দৃষ্টিভঙ্গি।
৬. ওক প্রবণতা : Woke Tendencies হলো সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন হয়ে ওঠার একটি প্রবণতা
৭. অপারেশন এপিক ফিউরি : অপারেশন এপিক ফিউরি (Operation Epic Fury) হলো ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল কর্তৃক ইরানের বিরুদ্ধে শুরু করা একটি যৌথ সামরিক অভিযানের কোড নাম। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি নির্দেশে এই অভিযান পরিচালিত হয়।
Engelsberg Ideas অনলাইনের ব্রেন্ডান সিমসের ‘ট্রাম্প টু পয়েন্ট ও রচনা অবলম্বনে

